ঘুরে আসুন 'সিটি অব পার্ল' খ্যাত হায়দ্রাবাদে

হায়দ্রাবাদ ভারতের তেলঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ইতোপূর্বে এটি অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের অন্তর্গত থাকলেও ২০১৪ সালে নতুন সৃষ্টি হওয়া তেলেঙ্গানা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২৫০ বর্গমাইল আয়তনের এই শহরটি ভারতের ৪র্থ জনবহুল শহর যার জনসংখ্যা প্রায় ৬.৭ মিলিয়ন। ১৫৯১ খৃষ্টাব্দে তৎকালীন কুতুবশাহী বংশের শাসক কুলী কুতুব শাহ-এর শাসনামলে শহরটি ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে।

খনি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই শহরে বিশ্ববিখ্যাত কোহিনূর হীরা, হোপ হীরা, নূর-উল-এইন হীরা এবং নাসাক হীরা প্রস্তুত হয়েছিল। তাই এই শহরটি ‘City of Pearl’ নামেও বিখ্যাত। শহরটিতে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে যা শহরটির সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী বহন করে। আজ এই শহরের কিছু দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে সংক্ষেপে জানানোর চেষ্টা করব। 

কুতুবশাহী সমাধি সৌধ (Qutb Shahi Tombs)

কুতুবশাহী সমাধি সৌধ হায়দ্রাবাদের ইব্রাহীমবাগের গোলকুণ্ডা দূর্গ থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। এখানে কুতুবশাহী রাজবংশের অনেক সুলতানের সমাধি রয়েছে, যাদের মধ্যে সুলতান কুলী কুতুব শাহ ও তার ছেলে জামশীদ কুলী কুতুব শাহ, সুলতান ইব্রাহীম কুলী কুতুব শাহ, সুলতান মোহাম্মদ কুলী কুতুব শাহ ও তার মেয়ে হায়াত বকশী বেগম উল্লেখযোগ্য। একটু উঁচু জায়গায় নির্মিত এক গম্বুজ বিশিষ্ট সৌধগুলোয় তৎকালীন পারস্য, পাঠান আর হিন্দু স্থাপত্যের সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। 

কুতুবশাহী সমাধি সৌধ; Source: digitalkaleidoscope.in

গোলকুণ্ডা দূর্গ (Golconda Fort)

হায়দ্রাবাদ শহর থেকে ১১ কিলোমিটার পশ্চিমে গোলকুণ্ডা নামক জায়গায় অবস্থিত। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কাকট্য রাজবংশের সময়কালে এ দূর্গটি নির্মাণ করা হলেও পরবর্তীতে কুতুবশাহী রাজবংশের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং কুতুবশাহী আমলের রাজধানী হিসেবে সুপরিচিত হয়। প্রায় ৩০০ ফুট উঁচুতে গ্রানাইট পাথরের উপর নির্মিত এই দূর্গটি বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও যুদ্ধের সময় ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

এক সময় এই জায়গাটিতে হীরা কেনা বেচার বিশাল বাজার ছিল, জগৎবিখ্যাত দরিয়া-ই-নূর এবং হোপ হীরাটি এই গোলকুণ্ডা খনি থেকেই উত্তোলন করা হয়। এখানে রয়েছে সে সময়কার অস্ত্রাগার, ওসমানিয়া মসজিদ, তারামতি মসজিদ, হীরাখানা মসজিদ, শিব মন্দির, সেলাইখানা ইত্যাদি। 

গোলকুণ্ডা দূর্গ; Source: onlinehyderabad.in

চারমিনার (Charminar)

১৫৯১ খৃষ্টাব্দে সুলতান মোহাম্মদ কুলী কুতুব শাহ গোলকুণ্ডা হতে রাজধানী সরিয়ে হায়দ্রাবাদে স্থানান্তর করেন। সে সময়ে ভয়াবহ প্লেগ রোগ নির্মূল হওয়ার পর সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপ চারটি মিনার বিশিষ্ট মসজিদটি নির্মাণ করেন যা শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত।

ভারতীয় টাকায় ১০০ রুপী দিয়ে টিকেট কেটে আপনি এই চারমিনার মসজিদের উপরে উঠতে পারবেন। প্রায় ১৫০টি সিঁড়ির ধাপ পাড় করে মাটি থেকে ৪৯ মিটার উঁচু মিনারগুলোয় উঠলে পুরো হায়দ্রাবাদ শহরের এক অসাধারণ দৃশ্য আপনার চোখে ভেসে উঠবে।

চারমিনার; Source: locals.xyz/hyderabad

চৌমহল্লা রাজপ্রাসাদ (Chowmahalla Palace)

এটি পুরনো হায়দ্রাবাদে স্থাপিত একটি রাজপ্রাসাদ যা চারমিনার মসজিদের পাশেই অবস্থিত। হায়দ্রাবাদের শাসকগোষ্ঠী নিজামরা অনেক প্রাসাদ নির্মাণ করেন যার মধ্যে এই চৌমহল্লা রাজপ্রাসাদটি সবচেয়ে বিখ্যাত। চারমহল বিশিষ্ট এই প্রাসাদটি নিজামদের সরকারী বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এখানে রয়েছে নজরকাড়া আসফ জাহী যুগের সিংহাসন। আসফ জাহী বংশধররাই পরবর্তীতে নিজাম হিসেবে হায়দ্রাবাদ শাসন করে। ৪৫ একর জায়গার উপর নির্মিত এই প্রাসাদটিতে সেই আমলের অনেক দামী দামী তৈজসপত্র, আসবাবপত্র, নিজামদের ব্যবহৃত গাড়ি, সে আমলের অস্ত্র ইত্যাদি রয়েছে। 

চৌমহল্লা রাজপ্রাসাদ; Source: thebetterindia.com

রামোজি ফিল্ম সিটি (Ramoji Film City)

হায়দ্রাবাদ শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে নির্মিত এই ফিল্মসিটিটি হায়দ্রাবাদের অন্যতম একটি ট্যুরিস্ট স্পট। এখানে হিন্দি, তামিল, তেলেগু, বাংলা, মালায়ালাম ভাষার বহু দর্শক নন্দিত সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে যার মধ্যে চেন্নাই এক্সপ্রেস, বাহুবালী ১ ও ২, ডার্টি পিকচার, রা-ওয়ান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এখানে কলকাতার অলিগলি, চেন্নাইয়ের মহল্লা, মুম্বাইয়ের বস্তি, দিল্লির পুরান বাজার ইত্যাদি সহ আরও বহু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

রামোজি ফিল্ম সিটি; Source: socialsamosa.com

মক্কা মসজিদ (Makkah Masjid)

মক্কা মসজিদ ভারতের বৃহৎ ও প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম যা হায়দ্রাবাদে অবস্থিত। এই মসজিদটি পুরাতন হায়দ্রাবাদ শহরের একটি অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা যা চারমিনার মসজিদের সন্নিকটে অবস্থিত।

মসজিদটির মূল ভবন নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত ইট পাথর সুদূর সৌদি আরবের মক্কা থেকে আনা হয়েছিল, তাই এই মসজিদের নামকরণ “মক্কা মসজিদ” করা হয়। এই মসজিদটি শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত এবং পুরো শহরের পরিকল্পনাকারী ছিলেন মোহাম্মদ কুলি কুতুব শাহ।

মক্কা মসজিদ; Source: karnatakatravel.blogspot.com

হুসেইন সাগর লেক (Hussain Sagar Lake)

হুসেইন সাগর হায়দ্রাবাদ শহরে কেন্দ্র অবস্থিত একটি লেক, যা ১৫৬৩ সালে ইব্রাহীম কুলী শাহ কর্তৃক খনন করা হয়। ১৯৯২ সালে লেকটির মাঝখানে একটি বুদ্ধমূর্তি স্থাপন করা হয়। রাতে লেজার আলোকসজ্জায় সজ্জিত মনোরম পরিবেশ বেশ আকর্ষণীয়। ৩০ রূপীর বিনিময়ে বোট ভাড়া করে বুদ্ধমূর্তির কাছে যাওয়া যায়। 

হুসেইন সাগর লেক; Source: commons.wikimedia.org

নেহেরু জুওলজিক্যাল পার্ক (Neheru Zoological Park)

ভারতের বৃহত্তম চিড়িয়াখানাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এই নেহেরু জুওলজিক্যাল পার্ক যা হায়দ্রাবাদে অবস্থিত। এখানে সাফারী পার্ক এরিয়ায় সিংহ, বাঘ, ভাল্লুক বন্যপরিবেশে বাস করে। এখানে ভ্রমণে অনেক রোমাঞ্চকর অনুভূতির স্বাদ পাবেন। 

নেহেরু জুওলজিক্যাল পার্ক; Source: hydtouristplaces.blogspot.com

সালার জং জাদুঘর (Salar Jung Museum)

মুসি নদীর দক্ষিণ তীরে পুরনো হায়দ্রাবাদে রয়েছে বিখ্যাত সালার জং জাদুঘর যা ভারতের ৩য় বৃহত্তম জাদুঘর। এটি গড়ে তোলেন নবাব মীর ইউসুফ আলী খান নামের এক সৌখিন মানুষ। তার নানান দুষ্প্রাপ্য আর অমূল্য জিনিস সংগ্রহ করা আছে জাদুঘরটিতে। বর্তমানে মিউজিয়ামটিতে ৩৮টি গ্যালারি, ৫০ হাজার বই এবং প্রায় ৪৩ হাজার জিনিস সংগ্রহ করা রয়েছে। 

সালার জং জাদুঘর; Source: negina.wordpress.com

বিখ্যাত খাবার

পুরনো এ শহর ভোজনরসিকদের কাছে এক কথায় স্বর্গ। এখানে কয়েকটি খাবারের জায়গা খুবই জনপ্রিয়। যেমনঃ শাহ-আলি-বান্দা রোডে অবস্থিত ‘পিস্তা হাউস’ এর বার্গার আর হালিম এর জন্য প্রসিদ্ধ। জগৎবিখ্যাত হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানীর উৎপত্তি এই হায়দ্রাবাদ থেকেই। চারমিনারের কাছে ‘শাহাডাব’, ‘মদিনা বিরিয়ানী’, ‘প্যারাডাইস টেকওয়ে’, ‘ক্যাফে বাহার’ ইত্যাদি হোটেলে হায়দ্রাবাদের মানুষ ভিড় করেন। 

হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানী; Source: atntimes.com

বিঃদ্রঃ হায়দ্রাবাদ ভ্রমণের আগে হোটেল বুকিং করে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত শীতের দিনগুলো হায়দ্রাবাদ ভ্রমণের জন্য আরামদায়ক। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এ শহরে ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন।

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সবুজ ধানের মাঠ পেরিয়ে দিবর দীঘি ও অবাক স্তম্ভ

নভেম ইকো রিসোর্ট: শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতির মধ্যে অনবদ্য এক রিসোর্ট