সুখী দেশ ভুটানের পথে

হঠাৎ করেই ঠিক করলাম ভুটান ঘুরতে যাব। আগে থেকে বেশি কিছু ভাবিনি এই ট্যুরটা নিয়ে, তবে প্রথম থেকেই গ্রুপ ট্যুর করার ইচ্ছা ছিল। এর আগে আমি নেপালে শুধু নিজের পরিবার নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু বেশি মজা পাইনি, গ্রুপ ট্যুরে আর যাই হোক নিজেকে একা লাগে না। তাছাড়া এর থেকে অনেক কিছু শিখতে পারা যায় সেটাই বা কম কীসে?
অবশেষে আমরা ৩৩ জন একসাথে মানে বিশাল এক বাহিনী ভুটান ট্যুরে যেতে পেরেছিলাম। যেহেতু এটা গ্রুপ ট্যুর তাই বাজেট আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং একজন গ্রুপ লিডার ট্রাভেলারের আন্ডারে আমরা সবাই গিয়েছিলাম তাই ধাপে ধাপে খরচের হিসাব দেওয়া সম্ভব নয় তবে এটুকু বলতে পারব আয়োজনটা বিন্দাস ছিল সবখানে। আমরা সবাই ফূর্তিতেই ছিলাম।

ছবিসূত্রঃ লেখক

আপনি যদি সড়ক পথে যান তবে ভুটান ভ্রমণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হবে ভারতীয় ট্রানজিট ভিসার যা কিনা ঢাকার গুলশান শাখা এবং দেশের অন্য জেলা শহর যেখানে ইন্ডিয়ার ভিসা অফিস আছে সেখান থেকে করে নিতে হবে। তবে ট্রানজিট ভিসা করার সময় অন্যান্য কাগজপত্রের সাথে কনর্ফাম বাসের টিকেট দিতে ভুলবেন না যেন। আরেকটা বিষয়, আপনার যদি আগে থেকেই ইন্ডিয়ার ভিসা থেকে থাকে তা বাতিল হয়ে যাবে ট্রানজিট ভিসা নিলে।
আর যদি আপনি এয়ারে যেতে চান সেক্ষেত্রে আপনাকে বিমানে করে পারো এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যেতে হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ১০ এয়ারপোর্টের মধ্যে একটি হলো পারো এয়ারপোর্টে। তবে দেখতে খুব সুন্দর, সাজানো গোছানো পরিপাটি এয়ারপোর্টটি। আমার খুব ভালো লেগেছে, দূর থেকে দেখেই এর প্রেমে পড়ে যাই। হিমালয় পাহাড়ের মাঝে ছোট্ট একটা রানওয়ে। সেখানেও দুটো পাহাড়ের মাঝ দিয়ে অনেক এঁকেবেঁকে যেতে হয়। পারো এয়ারপোর্ট সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২৩৫ মি. উপরে অবস্থিত, আর এর দৈর্ঘ্য হলো ১,২০০ মি.। এটাই পৃথিবীর একমাত্র এয়ারপোর্ট যার রানওয়ের দৈর্ঘ্য তার উচ্চতার চাইতে কম।
শুনেছি মাত্র ৮ জন পাইলট এখানে প্ল্যান ল্যান্ড করানোর জন্য অভিজ্ঞ, এর সত্যতা আমার জানা নেই। কিন্তু সত্য আর মিথ্যা যা-ই হোক, ভুটানে প্লেনে আসতে চাইলে আপনার এয়ারলাইন্স বাছাই করার খুব বেশি সুযোগ নেই। কারণ ভুটানে মাত্র দুটো আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সই যায়। একটি হলো ড্রুক এয়ারলাইন্স, আরেকটি ভুটান এয়ারলাইন্স। বাংলাদেশ থেকে গেলে আপনি ড্রুক এয়ারলাইন্সেই যেতে পারবেন, এছাড়া আর কোনো এয়ারলাইন্স নেই।
ছবিসূত্র: লেখক

ভুটানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেক ভালো। ভুটানে শুধুমাত্র দুটো দেশের এমব্যাসি আছে, একটা হলো ভারত, আরেকটা বাংলাদেশ। আপনি যদি বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া বা মালদ্বীপের নাগরিক না হন, তা হলে ভুটানে যাবার জন্য আপনাকে ভিসা নিতে হবে। আপনার বাংলাদেশি পাসপোর্ট হলে ইমিগ্রেশনে অন এরাইভাল ভিসা নিয়ে ভুটান ঘুরে আসতে পারেন।
বাইরের দেশের নাগরিকরা নিজেরা ভুটানের ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করতে পারে না। তাদের অনলাইনে কোনো ট্রাভেল অপারেটরের কাছ থেকে ট্রাভেল প্যাকেজ কিনতে হয়, এর সাথে আরো অনেক কিছু আছে- বিভিন্ন কিছুর স্বল্পতার জন্য এখানে বর্ণনা করা গেল না।
আমরা সড়ক পথেই ৩৩ জন ইন্ডিয়ার ট্রানজিট ভিসা নিয়ে এ বছর রোজার ঈদের পরের দিন এস আর পরিবহন থেকে একটা এসি কার রির্জাভ করে কল্যাণপুর বাস ডিপো থেকে যাত্রা শুরু করি। বুড়িমারী বর্ডারে আগে পোঁছানোর জন্য গাড়ি আগেভাগেই ছেড়ে দেয়, যার ফল আমরা পরদিন প্রত্যেকটা বর্ডার পার হবার সময় বুঝেছি। কারণ মোট চারটা বর্ডার ফেস করে ভুটান ঢুকতে হয়। কারণ প্রত্যেকটা বর্ডারে আমরাই ছিলাম প্রথম বাসের যাত্রী। এজন্য আমাদের গ্রুপ লিডার ধন্যবাদ আশা করতে পারে, তার প্লানেই এটা সম্ভব হয়েছে।
ছবিসূত্র: লেখক

যা হোক, বুড়িমারি সীমান্তে পৌঁছেছেন আর বুড়ির হোটেলে খাওয়া দাওয়া করেননি এমন লোক খুব কমই পাওয়া যাবে। তাই আমরা সকাল ৭টা বাজতেই সকালের নাস্তাটা গরম ভাত, ডিম ভাজা আর গরম পাতলা ডালের সাথে সেরে নিলাম। বুড়ির হোটেলের বুড়ির সম্পর্কে বলব এই লেখার একদম শেষ ভাগে। তার সাথে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, তিনি অসম্ভব মেধাবী এক নারী।
বুড়িমারি ইমিগ্রেশন অফিস খোলে সকাল ৯টায়, বুড়িমারি ইমিগ্রেশন অফিসে কাজ শেষ হতে কিছুটা সময় লাগে, তবে আমাদের বেশি সময় লাগেনি, ইমিগ্রেশন অফিসের প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে পায়ে হেঁটে প্রবেশ করি ভারতে। চ্যাংড়াবান্ধা (ভারত) ইমিগ্রেশন অফিসে কাজ শেষ করতে তেমন সময় লাগে না। তারা ভালোই দ্রুত কাজ করেন। ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে ডলার/টাকা, রুপিতে এক্সচেঞ্জ করে নিয়ে (এখানেই ভালো রেট পাবেন) আমাদের জন্য নির্ধারিত মিনি বাসে উঠে বসি। বুড়িমারি থেকে জয়গাঁও আসতে দেড় ঘণ্টার মতো লাগবে। বাসে করে যাবার সময় পাবেন জলপাইগুড়ি জেলার চা বাগানের মনোরম দৃশ্য যা আপনার মনকে আন্দোলিত করবে, পাবেন ডুর্য়াস ফরেস্ট।
ছবিসূত্র: offroadbangladesh.com

ডুর্য়াসকে উত্তর বাংলার পাহাড়ি অঞ্চলের আর ভুটানের গেটওয়ে বলা হয়ে থাকে। এটি চা বাগান, গভীর বন আর তিস্তা নদীর জন্য বিখ্যাত। যাওয়ার সময়ে কপাল ভালো থাকলে দু-একটা জীবজন্তু চোখে পড়তে পারে। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার জয়গাঁও হচ্ছে ভারতের শেষ সীমানা। ওপাশে ভুটানের ফুয়েন্টশলিং বর্ডার। ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন অফিস থেকে Departure/এক্সিট (সব ঠিক থাকলে সময় তেমন লাগে না) সিল লাগিয়ে সোজা ভুটান। ভুটান গেটের পাশেই ফুন্টসলিংয়ে ভুটান ইমিগ্রেশন অফিস। এখান থেকে অন এরাইভাল ভিসা নিতে হবে, এখান থেকে শুধুমাত্র মাত্র থিম্পু  আর পারো এর অনুমতি পাওয়া যায়।

(চলবে)

ফিচার ইমেজ- tourism.gov

Loading...

7 Comments

Leave a Reply
  1. ভাইজান আমি ও কোন গ্রুপ এর সাথে ভুটান টুরে যেতে চাই এ সম্পর্কে যদি কোন দিকনির্দেশনা পেতাম অনেক উপকৃত হতাম কোন গ্রুপ এর সন্ধান কি ভাবে পেতে পারি? ইত্যাদি । আমাদের জন্য ভুটানে ব্যবসা করার কোন সুযোগ আছে কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

থানচি: বান্দরবানের বিস্ময়!

আন্দামান সাগরে ঝড়ের কবলে একদিন (ভিডিও)