সপ্তমাশ্চর্যের দেশ পেরুর যত বিখ্যাত ভ্রমণস্থানের গল্প

সপ্তমার্শ্চযের একটি আশ্চর্যের অধিকারী দেশ পেরু। পেরু আয়তনের দিক দিয়ে ছোট একটি দেশ কিন্তু আশ্চর্য আর ভ্রমণস্থানগুলোর সৌন্দর্যে কোনো দিক দিয়েই পিছিয়ে নেই এই দেশটি। ষোড়শ শতাব্দীতে স্পেন জয়লাভ করে পেরুর রাজ্য দখল আর বসতি বসায় এখানে। পেরুকে বলা হতো ইনকা সাম্রাজ্যের বসতি। স্পেন পেরু জয়ের আগে এখানে বসতি ছিল ইনকা নামের এক অভিজাত সম্প্রদায়ের যারা প্রত্নতাত্ত্বিক দিক দিয়ে বেশ শৌখিন ছিল।
ইনকাদের তৈরী প্রত্নতত্ত্ব আর ঐতিহাসিক সব কারুকাজে পেরুর পরতে পরতে লেগে আছে সৌন্দর্যের আগুন। তবে শুধু প্রত্নতত্ত্বই নয় দেশটিতে আছে পাহাড়, আছে সমুদ্র আর বহু উচ্চতায় অবস্থিত পুণ্য নগরী। একজন প্রকৃত ভ্রমণপ্রেমী পেরুর মতো একটি দেশে গিয়ে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে ফিরে আসবে, এটা হতেই পারে না। পেরুর গলিতে গলিতে যেমন ইতিহাস কথা বলে তেমনি এর আকাশে বাতাসে পাওয়া যায় অনেক বছরের নিগূঢ় আভিজাত্যের সুবাস।
প্রতি বছর প্রচুর পর্যটক ঘুরতে যায় পেরুতে, এর প্রতিটা দেয়াল ছুঁয়ে অনুভব করার চেষ্টা করে কী ছিল এখানে আজ থেকে প্রায় কয়েকশ বছর আগে। বুক ভরে ইতিহাস শুঁকে নেয় প্রতিটা ভ্রমণপ্রেমী হৃদয়। আজ তাহলে পেরুর গল্পই করা যাক। চলুন দেখে আসি পেরুর কোথায় কী আছে ঘুরে বেড়ানোর মতো।

মাচু পিচু

ছবিঃ staticflickr.com

এটা বলার কোনো অপেক্ষা রাখে না পেরুর ভ্রমণস্থানগুলোর মধ্যে একদম শীর্ষে রয়েছে সেই সপ্তমার্শ্চযের একটি, মাচু পিচু। মাচু পিচু নিয়ে আগের লেখায় বিশদ গল্প করেছি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭,০০০ ফুট মানে ২,১০০ মিটার উপরে আন্দিজ পাহাড়ের কোলে অবস্থান মাচু পিচুর। ধারণা করা হয় পনেরোশ শতাব্দীর দিকে এই মাচু পিচু নগরী স্থাপন করা হয়েছিল মিলিটারি ঘাঁটি হিসেবে। পরবর্তীতে এটি ইনকা সাম্রাজ্যের রাজকীয় আবাসে পরিণত হয়।
এখানে যেমন আছে আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগের ইতিহাস তেমনি আছে অতি যত্নে সংরক্ষিত অক্ষয় সব প্রাচীর, ফোয়ারা আর অসাধারণ সব মন্দির। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দিরের নাম “দ্যা টেম্পল অফ থ্রি উইন্ডো”। ঘুরে বেড়ানোর মতো অসাধারণ জায়গা এই মাচু পিচু, সাথে পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্যের একটির সাক্ষী হতে পারার সুযোগ তো আছেই।

চুস্কো

ছবিঃ airpano.ru

পেরুর ঐতিহাসিক সব ধ্বংসাবশেষ যেমন মাচু পিচু, স্যাক্রেড ভ্যালি অফ ইনকার প্রবেশদ্বার হলো বিখ্যাত শহর চুস্কো। পেরুর ইনকা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী রাজধানী ছিল চুস্কো। এর ভবন গঠনে যেমন ইনকাদের প্রাচীন শৌখিনতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তেমনি আধুনিকতার প্রমাণ পাওয়া যায় চুস্কোর প্রাণকেন্দ্র “প্লাজা দে আরমাস” দেখলে।
প্লাজা দে আরমাসের আশেপাশে গড়ে উঠেছে প্রচুর রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে আর গির্জা। পুরো শহরটাতেই অন্যরকম এক আমেজ কাজ করে। শহর থেকে একটু দূরে গেলে পাওয়া যাবে বিখ্যাত বিশাল এক দেয়ালিকা কমপ্লেক্স যার নাম “সাকসেহুয়ামান”। চুস্কোতে দুইদিন থাকলে প্রেমে পড়ে যেতে হবে এই শহরের।

আরেকুইপা

ছবিঃ aworldtotravel.com

পেরুতে এসে পর্যটকরা সবচেয়ে বেশি ভিড় জমায় যে শহরগুলোতে তাদের মধ্যে আরেকুইপা অন্যতম। শুধু অন্যতম বললে ভুল হবে, বিশেষভাবে অন্যতম। এই বিশেষ্যত্বের কারণ হলো আরেকুইপা এমনই এক শহর যা তিন তিনটি মৃত আগ্নেয়গিরির একদম কোলে অবস্থিত। এখানকার স্থানীয় এবং স্প্যানিশ কলোনিগুলো এক কথায় মন মাতানো মোহনীয়তায় ভরপুর।
স্প্যানিশ কলোনিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো “সান্তা ক্যাটেলিনা” বিহার। সান্তা ক্যাটেলিনাকে বলা হয় শহরের ভেতর আরেক শহর। এই বিশেষ বিশেষণ দেয়ার কারণ সান্তা ক্যাটেলিনার সাজানো গোছানো পথঘাট, রঙ-বেরঙয়ের ঘরবাড়ি আর প্রচুর ফুলের সমারোহ। আরেকুইপা বেশ রোমান্টিক শহরও বটে।

স্যাক্রেড ভ্যালি অফ ইনকাস

ছবিঃ charismaticplanet.com

একসময়কার ইনকা সম্প্রদায়ের প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত ছিল স্যাক্রেড ভ্যালি অফ ইনকাস নামের এই নগরীটি। ইনকাদের কাছে এই নগরীটি বেশ প্রিয় ছিল এর ভৌগোলিক আর জলবায়ুগত সৌন্দর্যের জন্য। স্যাক্রেড ভ্যালি অফ ইনকাস আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত। মাচু পিচু আর চুস্কোর খুব কাছেই এর অবস্থান।
যারা মাচু পিচু ঘুরতে যায় তাদের একই সাথে চুস্কো আর স্যাক্রেড ভ্যালি অফ ইনকা দুটোই দেখা হয়ে যায় যদি তেমন পরিকল্পনা করে বের হওয়া হয়। স্যাক্রেড ভ্যালি অফ ইনকার মানে হলো ইনকাদের পবিত্র নগর-উদ্যান। নামের সাথে বেশ মিল পাওয়া যায় এই নগরীর প্রতিটি ধ্বংসাবশেষ আর গ্রামগুলোয়। এখানকার বিখ্যাত শহর হলো পিসাক আর অলামটায়টাম্বু।

লিমা

ছবিঃ salsa-tipiti.org

লিমা শুধু পেরুর রাজধানীই নয়, পেরুর সবচেয়ে বড় শহরও এটি। একই সাথে ঐতিহ্য আর আধুনিকতাকে লালন করে লিমা। লিমার অধিকাংশই স্প্যানিশদের তৈরী। এই নগরীর আবিষ্কারকও একজন স্প্যানিশ যার নাম ফ্রান্সিস্কো পিজাররো। লিমা পর্যটকদের জন্য সাজিয়ে রেখেছে অসাধারণ ঐতিহ্য, জিভে পানি আনা সব খাবার-দাবারের বৈচিত্র্য, বিচিত্র সংস্কৃতি আর দুর্দান্ত রাতের সৌন্দর্য।
পেরুর সবচেয়ে ব্যস্ততম শহর লিমা। তবে জীবনানন্দে মেতে উঠতে পেরুতে লিমার চেয়ে ভালো কোনো শহর নেই। এখানে দেখার মতো আছে পুরনো সব গির্জা, বুদ্ধ আশ্রম, স্প্যানিশ প্রাসাদ আর আর পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি।

ইনকুইতোস

ছবিঃ eldoradohoteles.com

সড়কপথে যাওয়া যায় না এমন বিশ্বের সবচেয়ে বড় নগরী এই ইনকুইতোস নগরী। একমাত্র উড়োজাহাজ আর নৌকায় করেই প্রবেশ করা সম্ভব এই নগরীতে। বিশাল এই নগরীর পুরোটা পানিতে ঘেরা। পানিতে ঘেরা হলেও পর্যটকদের নজর কাড়তে একটুও পিছপা হয়নি ইনকুইতোস।
আমাজনের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিখ্যাত এই নগরীটি। পেরুভিয়ান আমাজনের জল-জঙ্গলে হারিয়ে যেতে প্রচুর পর্যটক ড়িভ জমায় ইনকুইতোসে। এখানে আছে প্রজাপতির খামার, অনাথ পশুপাখিদের আশ্রয়কেন্দ্র আর সংরক্ষিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যারা জীবনে একবার হলেও ভয়ংকর সুন্দর আমাজনে যেতে চান তাদের জন্য সর্বোত্তম জায়গা হলো পেরুর ইনকুইতোস।

৭. ত্রুজিলো

ছবিঃ cloudfront.net

পেরুর বৃহৎ শহরগুলো থেকে একটু ছোট শহর ত্রুজিলো। ১৫৩৪ সালের দিকে এই শহরের গোড়াপত্তন করে স্প্যানিশরা। এই শহর মূলত গড়ে তোলা হয়েছিল ইনকাদের বিরুদ্ধে স্প্যানিশ সৈন্যদের এক করে তোলার জন্য। ত্রুজিলো বিখ্যাত কলাম্বিয়ান ঐতিহাসিক ভ্রমণস্থান “চ্যান চ্যান” এর অনেক কাছেই অবস্থিত। বেশ সাজানো গোছানো শহর এই ত্রুজিলো। বেশ শান্তির জায়গাও বটে। এখানকার খাবার-দাবার আর গির্জাগুলোই ধরে রেখেছে ত্রুজিলোর মূল আকর্ষণ।
ফিচার ইমেজ- natbg.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কলকাতা থেকে দার্জিলিংয়ে শেষ হওয়া এক রিইউনিয়নের গল্প

টুমলিং থেকে কালাপোখারি: বাঁকে বাঁকে রোমাঞ্চ