প্রেমের শহর প্যারিসের যত বিখ্যাত ভ্রমণস্থানের কাহিনী

বলা হয়ে থাকে, যদি ঘুরতে বের হন প্রিয়তমাকে নিয়ে তবে প্যারিসই হোক আপনার পরবর্তী গন্তব্য। কথাটা এমনি এমনি বলা হয় না, প্রেমের শহর হিসেবে বিখ্যাত ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস বুকে ধারণ করে আছে প্রায় ২০০০ বছরের ঐতিহ্য। ব্যবসা, ফ্যাশন, ঐতিহ্য আর ঘুরে বেড়ানোর মতো জায়গার দুর্দান্ত সব দিক দিয়ে প্যারিস শহরটি বেশ এগিয়ে। প্যারিসকে ফ্যাশনের রাজধানীও বলা হয়। বিশ্বের নামীদামী সব ফ্যাশন ডিজাইনারের অধিকাংশই প্যারিসের।
প্যারিস নিয়ে আমাদের মধ্যে বেশ ভালো উন্মাদনা কাজ করে। বিশেষত এমন কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি কিনা প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের নাম শোনেননি! তবে আইফেল টাওয়ার ছাড়াও প্যারিসে আছে ঘুরে দেখার মতো অসাধারণ কিছু জায়গা যেগুলোর ল্যান্ডস্কেপ পুরো বিশ্ববিখ্যাত। চলুন তাহলে ঘুরে আসা যাক প্যারিসের সেসব ভ্রমণস্থান থেকে যেখানে বাস্তবে যাওয়ার ইচ্ছেটা শুরু হবে এখান থেকেই।

আইফেল টাওয়ার

ছবিঃ alphacoders.com

কোন সন্দেহ ব্যতিরেকে প্যারিসের ভ্রমণস্থানগুলোর মধ্যে শীর্ষে থাকবে আইফেল টাওয়ার। প্যারিসের কথা চিন্তা করলেই যে ভ্রমণস্থানের চিত্র মাথায় চলে আসে সেটি হলো আইফেল টাওয়ার। প্যারিসের চ্যাম্প দে মার্স পার্কে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত এই আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা মোট এক হাজার ফুট মানে প্রায় ৩০ তলা ভবনের সমান উঁচু। বিশ্বনন্দিত এই স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৮৮৯ সালে এবং তখন থেকে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশিবার ছবি তোলা স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজ অবধি। প্যারিসে যাবেন আর আইফেল টাওয়ার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবেন না, সেটা হয় না!

ল্যুভর

ছবিঃ i.ytimg.com

জাদুঘরে যদি আপনার আগ্রহ থাকে তবে ল্যুভর জাদুঘরের নাম আপনার কান এড়িয়ে যাবে না কখনোই। বিশ্বের বাঘা বাঘা সব জাদুঘরের মধ্যে প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর অন্যতম। এই জাদুঘরের পিরামিডের আকৃতিতে বানানো কাঁচের প্রবেশপথ দেখলেই প্রেমে পড়ে যেতে পারেন। প্রায় ১ মিলিয়নেরও বেশি ঐতিহ্যবাহী স্মারক নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে জাদুঘরটি যাদের মধ্যে বিশ্ববিখ্যাত সব চিত্রকর্মের কথা উঠে আসবে সবার আগে। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির “মোনালিসা”, মাইকেল এঞ্জেলোর “ডাইয়িং স্লেইভ”, গ্রিক ভাস্কর্য “ভেনাস অফ মাইলো”র স্থায়ী ঠিকানা যে প্যারিসের এই ল্যুভর জাদুঘর। তাই প্যারিস ঘুরতে এলে এই জাদুঘর ভ্রমণ হাতছাড়া করা যাবে না একদমই।

আর্ক দে ট্রায়াম্ফে

ছবিঃ blogspot.com

প্যারিসের ইতিহাসের সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর নেপোলিয়ান বোনাপার্ট এই দুটো বিষয় এবং ব্যক্তিত্ব খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নেপোলিয়ানের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধের বিজয় আর সেসব যুদ্ধে নিহত হওয়া হাজারো সৈনিকের স্মরণে ১৮০৯ সালে প্যারিসে বানানো হয়েছিলো আর্ক দে ট্রায়াম্ফে। লম্বায় প্রায় ১৬৪ ফুট আর প্রস্থে প্রায় ১৪৮ ফুটের বিশাল এই ধনুকাকৃতির স্থাপনাটি। স্থাপনাটির গায়ে হাজারো সেসব সৈনিকের নাম লেখা যাদের কারণে নেপোলিয়ান পেয়েছিলেন একের পর এক বিজয়। আর্কের নিচে রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত হওয়া অজ্ঞাতনামা এক শহীদের সমাধিসৌধ।

নটর ডেম দে প্যারিস

ছবিঃ alphacoders.com

প্যারিসের ভ্রমণ অনেকটাই অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে যদি প্যারিস এসে নটর ডেমে না আসা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে অসাধারণ বৃহৎ গির্জার মধ্যে নটর ডেম দে প্যারিস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্যারিসের গোথিক স্থাপত্যকলা বুঝতে হলে এখানে আসতেই হবে প্যারিসের ভ্রমণের দিনগুলোতে। প্রায় ৪০০ ফুট উঁচু এই গির্জার উপরের অংশে আছে বিশাল বিশাল দুটি টাওয়ার আর একটি সর্পিলাকার স্থাপনা। ত্রয়োদশ শতাব্দীর এই অসাধারণ স্থাপনা একজন প্রকৃত দর্শককে সুযোগ করে দেয় বিখ্যাত কিছু ধ্বংসাবশেষ, গোথিক ভাস্কর্য আর অনিন্দ্য সব খোদাই করা প্রস্তর সম্ভার দেখার।

সেক্রে কোয়ুর

ছবিঃ picdn.net

প্যারিসের সবচেয়ে উঁচু স্থানের নাম মন্টমার্ত্রে হিল। সবচেয়ে উঁচু স্থান হওয়ায় তো বটেই, মন্টমার্ত্রে বিখ্যাত আরেকটি বড়সড় কারণে। মন্টমার্ত্রে হিলে রয়েছে প্যারিসের বিখ্যাত রাজপ্রাসাদ সেক্রে কোয়ুর। সাদা গম্বুজ নিয়ে বেড়ে ওঠা এই রাজপ্রাসাদের সোনালি মোজাইক করা মেঝে, বিশাল বিশাল কাঁচের জানালা আর অন্দর মহলের অসাধারণ কারুকাজ প্রতি বছর প্যারিস ঘুরতে আসা শত শত পর্যটককে টেনে আনে এখানে।

জার্ডিন দু লুক্সেমবার্গ

ছবিঃ cd1.ne

ইংরেজিতে লুক্সেমবার্গ গার্ডেন নামে পরিচিত জার্ডিন দু লুক্সেমবার্গ প্যারিসের দ্বিতীয় বৃহৎ সর্বজনীন পার্ক বিশেষ। বিশাল এই পার্ক বসে সময় কাটানোর বেশ ভালো একটি জায়গা। পুরো পার্ক জুড়েই আছে সুন্দর সব ভাস্কর্য আর পানির ফোয়ারা। বাচ্চাদের জন্য আছে খেলাধুলার আলাদা জায়গা। বড়দের জন্য আছে জগিংয়ের পথ, টেনিস কোর্ট, ফিটনেস সেন্টার। বাচ্চারা ইচ্ছে করলে ঘোড়ায়ও চড়তে পারবে, ছোট ছোট নৌকায় উঠে বৈঠাও টেনে নেয়া যাবে এখানে। মোদ্দাকথা, অবসর সময় কাটানোর জন্য প্যারিসের এই পার্কে সবরকম ব্যবস্থাই আছে।

মিউজি দি’ওরসে

ছবিঃ blogspot.com

প্যারিস চিত্রকর্ম আর সংস্কৃতি লালনে অনেক বেশি এগিয়ে আছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় প্যারিসের সব জাদুঘর ঘুরে আসলে। মিউজি দি’ওরসে তেমনই একটি বিখ্যাত জাদুঘর প্যারিসের। মূলত এই জাদুঘর বিখ্যাত এর ভেতর সংরক্ষিত বিভিন্ন সময়ের বিখ্যাত সব চিত্রকারের দুর্দান্ত সব চিত্রকর্মের জন্য যার সংখ্যা হাজারের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। প্রাক্তন একটি রেলওয়ে স্টেশনকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই চিত্রকর্মের রাজ্য যা আপনাকে মধ্য অষ্টাদশ শতাব্দি থেকে উনবিংশ শতাব্দির বিখ্যাত চিত্রকার মোনেট, ভ্যাগ গগ, সিজেইন, ডেজাস, পিসাররো, রিনইর এর চিত্রকর্মে মোহিত করবে কোনো প্রশ্ন ব্যতিরেকে।

সেইন্টে চ্যাপেল

ছবিঃ assets.classicfm.com

১২৩৯ সালের দিকে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া এক জাদুঘরের নাম সেইন্ট চ্যাপেল। তৎকালীন রাজা নবম লুইসের নির্মাণ কাজ শুরু করেন মূলত তাঁর শখের সব ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণ করতে যেগুলোর মধ্যে যিশু খ্রিষ্টের “ক্রাউন অফ থর্ন”ও ছিল। পরবর্তী ফরাসি বিপ্লবের সময় ভগ্নপ্রায় সেইন্ট চ্যাপেল আবার পুনঃনির্মাণ করা হয় উনবিংশ শতাব্দীতে। ফ্রান্স এবং প্যারিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষিত আছে এখানে
ফিচার ইমেজ- alphacoders.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কলকাতার গর্ব ঐতিহাসিক ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল

ভরা পূর্ণিমায় দিগন্তের হাওর বিলাস