হংকংয়ের শীর্ষ সব ভ্রমণস্থানের গল্প

চীনের উপনিবেশ থেকে মুক্ত হওয়া ছোট একটি দেশের নাম হংকং। আকারে ছোট হলেও বিশ্বের অর্থনীতির বাজারে সবচেয়ে সচল চক্রনাভি আর বিলাসবহুল কেনাকাটার জায়গা বলা হয় এই দেশটিকে। তবে আধুনিকতাকে ছাপিয়ে এখানকার সবচেয়ে সূক্ষ্ম যে বিষয়টি আপনার নজর কাড়বে তা হলো এর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির চর্চা। হংকং দেশটির নিজের মধ্যে আলাদা এক শক্তি কাজ করে যা একটা ছোট জায়গায় প্রচুর মানুষকে সচল রাখতে সাহায্য করে। এখানকার প্রতিটি কোণাই পর্যটকদের কাছে নতুন মনে হবে, মনে হবে আলাদা কোনো উপাদান দিয়ে সাজানো যার জন্য এত সুন্দর লাগছে প্রতিটি জায়গা। হোক সেটা হংকংয়ের কোনো পবিত্র মন্দির অথবা আধুনিক ইলেক্ট্রনিক জিনিসপত্র বিক্রি করার বিশাল শো-রুম।
চীনের প্রশাসনিক এলাকা বলে চিহ্নিত হংকংয়ে ঐতিহ্যবাহী চাইনিজ সংস্কৃতির চর্চাও করা হয় সমানভাবে, যদিও অনেক আগেই চীনের উপনিবেশ থেকে মুক্তি লাভ করেছে হংকং। পর্যটকদের জন্য হংকং সাজিয়ে রেখেছে এমন সব জায়গার সমাহার যা এখানে প্রতিবছর ঘুরতে আসা প্রতিটি পর্যটককে মুগ্ধ করে তোলে মূহুর্তে মূহুর্তে। চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক হংকং শীর্ষ সেসব ভ্রমণস্থান যা হংকং ভ্রমণকালে থাকবে আপনার পছন্দের তালিকার একদম শীর্ষে।

স্টার ফেরী

হংকংয়ে ভ্রমণকালে পর্যটকরা যে একটি বিশেষ ভ্রমণের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন তার নাম ভিক্টোরিয়া হার্বারের স্টার ফেরী ভ্রমণ। ১৮৮০ সাল থেকে শুরু হওয়া হংকংয়ের এই স্টার ফেরীতে চড়তে খরচ করতে হয় মাত্র কয়েক হংকং ডলার।

ছবিঃ independent.co.uk

প্রায় সব ধরনের আকারের ফেরী বা জাহাজ রয়েছে এখানে। হংকংয়ের শিম শা শুই থেকে সেন্ট্রাল নামক এক জায়গার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন কয়েক মিনিটি পরপর স্টার ফেরী ছেড়ে যায়। যখন হংকংয়ের মতো ছোট আয়তনের দেশের যানজটে ফুসফুস চাইবে একটুখানি প্রাণবন্ত বাতাস টেনে নিতে তখন আপনার দরকার হবে স্টার ফেরীর।
শিম শা শুই থেকে সেন্ট্রাল পর্যন্ত স্টার ফেরীর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা এতই ভালো যে ফেরার পথে আপনি আবার সেন্ট্রাল থেকে শিম শা শুই স্টার ফেরীতেই ফিরবেন। এখানকার পানির বাতাসে অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করে। যেহেতু কয়েক মিনিট পর পরই ফেরী ছাড়ে এবং সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ফেরী চলমান থাকে তাই যেকোনো সময়ই পাওয়া যাবে ফেরীর রেলিংয়ের ধারের একটি সিট।

ভিক্টোরিয়া পিক

হংকংয়ের সবকিছু পাখির চোখে দেখতে যে জায়গাটায় আপনার অবশ্যই যেতে হবে তার নাম ভিক্টোরিয়া পিক। এখানকার স্কাইলাইন পুরো হংকং বিখ্যাত। ট্রামে করে চলে যাওয়া যায় অত্যন্ত উঁচু এই জায়গায়।

ছবিঃ cdn.cnn.com

ভিক্টোরিয়া পিকে যাওয়ার ট্রামটি পাওয়া যাবে হিলটন হোটেলের পেছনে অবস্থিত মুররে ভবনের ঠিক সামনে থেকে। আপনাকে এই ট্রামটি নিয়ে যাবে হংকংয়ের অন্যতম উচ্চতম স্থান ভিক্টোরিয়া পিকে যেখান থেকে চোখের দৃষ্টিতে ধাঁধা লাগাবে পুরো হংকং দ্বীপ, জমকালো শহর আর স্কাইস্ক্র্যাপারগুলো। এত উঁচুতেও খুব সুন্দর করে সাজানো এক পার্ক বানানো আছে পর্যটকদের জন্য। পড়ন্ত বিকেলের সময়টাই নাকি ভিক্টোরিয়া পিকে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময়। সূর্যাস্তের ঠিক আগে আগে গোধূলী বেলায় সেই পার্কে কাটানো এক-দুই ঘণ্টার অভিজ্ঞতার অপার্থিবতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়াটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়।

ভিক্টোরিয়া সেন্ট্রাল বিজনেস ডিসট্রিক্ট

ভিক্টোরিয়া সেন্ট্রাল বিজনেস ডিসট্রিক্টে ঘুরতে আসলেই আপনি বুঝে যাবেন কেন হংকংকে বিশ্বের সবচেয়ে সচল অর্থনৈতিক চক্রনাভি বলা হয়। যেখানেই তাকাবেন এই নগরীর শুধু স্কাইলাইন উঠে যেতে দেখবেন আপনার পাশ থেকে।

ছবিঃ picdn.net

এখানকার গগনচুম্বী অট্টালিকায় ঘেরা আর আধুনিকতায় ভরা জাঁকজমক দেখতে প্রচুর পর্যটক ভিড় জমায় এখানে। সবচেয়ে জনপ্রিয় সুউচ্চ ভবনটির নাম “ব্যাংক অফ চায়না” যা একসময় হংকংয়ের সবচেয়ে উঁচু ভবন হিসেবে পরিচিত ছিল এবং যা এখনো বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবনগুলোর মধ্যে একটি। যদি মানবহাতে তৈরী এই ভবনাদি দেখতে ভালো না লাগে তবে ঘুরতে যেতে পারেন “মান মো টেম্পল”য়ে যা হংকং দ্বীপের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহৎ চাইনিজ মন্দির।

ওয়ং তাই সিন টেম্পল

হংকংয়ের সবচেয়ে নতুন নিদর্শনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ওয়ং তাই সিন টেম্পল। এটি ১৯২০ সালের দিকে বানানো একটি ব্যক্তিগত মন্দির বিশেষ ছিল যা ১৯৬৮ সালের দিকে নতুন করে তৈরী করা।

ছবিঃ dreamstime.com

১৯৬৮ সালের বানানো সেই নতুন মন্দিরটিই আজকের ওয়ং তাই সিন টেম্পল যা সকল পর্যটকের জন্য উন্মুক্ত। মন্দিরটি হংকংয়ের কওলনে অবস্থিত এবং এটি নির্মাণ করা হয়েছিল তাওইস্ত ঈশ্বর “ওয়ং তাই সিন”কে সম্মানপ্রদর্শন করে। ওয়ং তাই সিনকে হংকংয়ে ঘোড়সওয়ারি প্রতিযোগিতার ভাগ্য আর রোগমুক্তকারী ঈশ্বর হিসেবে মানা হয়।
প্রতি বছর বর্ষাকালে এখানে ওয়ং তাই সিনের নামে এক বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন মন্দির ভবনে গড়া এই বিশাল মন্দির কমপ্লেক্সটির অন্যতম ভবনগুলো হলো “হল অফ থ্রি সেইন্টস”, “গুড উইশ গার্ডেন” ইত্যাদি। মন্দিরের হলরুমে পাওয়া যাবে প্রচুর ভাগ্যপরীক্ষকের দেখা। মন্দির ঘুরতে আসা সকলেরই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে ইচ্ছেমতো অনুদান দিতে হয়।

শিম শা শুই

হংকংয়ের দিনগুলোতে আপনি যে জায়গাটায় সবচেয়ে বেশিবার যাবেন ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে, তার নাম শিম শা শুই। শিম শা শুই মূলত হংকংয়ের কেনাকাটা আর বিনোদনের চক্রনাভি।

কওলন-ক্যান্টন রেলওয়ে ক্লক টাওয়ার , ছবিঃ theculturetrip.com

এখনকার মূল রাস্তার নাম “নাথান রোড” যার দুইপাশেই পাওয়া যাবে প্রচুর রেস্টুরেন্ট, বুটিক, নানান জিনিসে ভরপুর কিছু অনন্য দোকান। যদি হংকংয়ের বিলাসিতা উপভোগ করতে চান তবে চলে যেতে হবে “ক্যান্টন রোড” এ। এছাড়াও এখানে আছে প্রাক্তন কওলন-ক্যান্টন রেলওয়ে ক্লক টাওয়ার যা হংকংয়ের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে বিশ্বদরবারে। আরো আছে শিম শা শুই কালচারাল কমপ্লেক্স, হংকং স্পেস মিউজিয়াম আর হংকং মিউজিয়াম অফ আর্ট।

দ্য এভিনিউ অফ স্টারস

শিম শা শুই এ থাকাকালীন যে একটি জায়গা বিশেষভাবে ঘুরতে হবে তার নাম “দ্য এভিনিউ অফ স্টারস”। নাম শুনে জাদুঘর মনে হয় তাই না? আসলে এটা জাদুঘর জাতীয় একটি স্থাপনাই বটে, তবে সেই জাদুঘর কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ করে না।

ছবিঃ asiawebdirect.com

যা সংরক্ষণ করে তা হলো হংকংয়ের সব নামীদামী সিনেমা-তারকাদের যাবতীয় সবকিছু। হংকং সিনেমা জগতে বেশ ভাল অবদান রাখা সব সিনেমা নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে তৈরী দ্য এভিনিউ অফ স্টারস। এই স্থাপনাকে হলিউডের “ওয়াক অফ ফেইম”য়ের হংকং আর চাইনিজ সংস্করণ বলা চলে যেখানে স্থান পেয়েছে ব্রুস লি’র মতো সিনেমা তারকারা।
শিম শা শুই জলাধারের ঠিক সামনেই অবস্থিত দ্য এভিনিউ অফ স্টার। জলাধারের পাশের জায়গাটিই অত্র এলাকার একমাত্র খোলামেলা জায়গা, তাই বসে আড্ডা দেয়া বা একান্ত সময় কাটানো থেকে শুরু করে জগিং করা, হাঁটার জন্য পর্যটক বা স্থানীয়দের বেশ পছন্দের জায়গা এটি। এখানে সন্ধ্যায় বেশ বড়সড় এক গানের আসর বসে, নাম “দ্য সিম্ফনি অফ লাইফ।

বিগ বুদ্ধা (টিয়ান টান বুদ্ধ প্রতিকৃতি)

হংকংয়ের ল্যানটাও দ্বীপের পো লিন মনেস্ট্রিতে রয়েছে হংকংয়ের অন্যতম আকর্ষণ, ৩৪ মিটার মানে ১০০ ফুটেরও বেশি উঁচু বুদ্ধ প্রতিকৃতি। ১৯৯৩ সালে এই প্রতিকৃতি স্থাপনার আগে এই এলাকাটি একদম জনমানবশূন্য ছিল।

ছবিঃ travelcaffeine.com

এই পবিত্র বুদ্ধ প্রতিকৃতিটিকে মানা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মুক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধ প্রতিকৃতি। যারা সকালে ঘুম থেকে উঠে যান তাদের জন্য এখানে রয়েছে বিশেষ কিছু। এখানকার ভিক্ষুদের দিকনির্দেশনায় সকাল বেলায় উঠে যাওয়া যায় ল্যানটাও শৃঙ্গে আর উপভোগ করা যায় মনেস্ট্রির গা ঘেঁষে উদীয়মান সকালের সূর্যের রক্তিম আভার অপার্থিবতা। আশ্রমের ঠিক দক্ষিণ দিকে আছে হংকংয়ের একমাত্র চা বাগান আর ল্যানটাও দ্বীপের অন্যদিকে আছে শেক পিক রিসার্ভইর নামক বিশাল এক পানির ড্যাম।
ফিচার ইমেজ- blogspot.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কালাপোখারির অস্থিরতায়: সান্দাকফুর পথে

কলকাতার আলুসেদ্ধ গরম ও এক পশলা বৃস্টি