আমেরিকার যত ভ্রমণস্থানের গল্প: সান ফ্রান্সিসকো নামা

আমেরিকা ভ্রমণের গল্প বলছি বেশ কয়েক পর্ব ধরে৷ আজ এমন এক শহরের গল্প বলবো যার নাম আমেরিকার নামের সাথে অনেকাংশেই জুড়ে আছে, যে শহর বিখ্যাত এর রীতিনীতি আর আনকোরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য। উত্তরীয় আমেরিকার রত্ন হিসেবে পরিচিত সেই শহরের নাম সান ফ্রান্সিস্কো।

আমেরিকার অন্যতম সুন্দর শহর সান ফ্রান্সিস্কো গড়ে উঠেছে অপরূপ সাগর-সৈকত, জাদুঘর, দুর্দান্ত মাউন্টেন রেঞ্জ আর বিখ্যাত গোল্ডেন গেট ব্রীজ নিয়ে৷ শুধু এগুলোই না বরং সান ফ্রান্সিস্কোতে আরো আছে আলকাট্রাজ আইল্যান্ড, ফিশারম্যান্স ওয়ার্ফ, গোল্ডেন গেট ব্রীজ পার্ক সহ নামীদামী আরো অনেক পর্যটনস্থান যা সান ফ্রান্সিস্কো ভ্রমণের দিনগুলোতে হতে পারে প্রতিদিনকার গন্তব্য।

আপনার পরবর্তী গন্তব্য যদি হয় আমেরিকার সান ফ্রান্সিস্কো তবে লেখাটি আপনার জন্যই। তবে ঘুরতে যাওয়ার আগে কোথায় ঘুরবেন সেটা প্রথমে জেনে নেয়া দরকার। চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক, সান ফ্রান্সিস্কো ভ্রমণের দিনগুলোতে কোন কোন পর্যটনস্থান হবে নিত্যদিনের গন্তব্য৷

১. গোল্ডেন গেট ব্রীজ

ছবিঃ hdnicewallpapers.com

আপনি উত্তরীয় ক্যালিফোর্নিয়ার যে শহরেই যাবেন না কেন আপনাকে সবাই একটা বিশেষ জায়গা ঘুরে আসার ব্যাপারে পরামর্শ দেবে, সেটা হলো গোল্ডেন গেট ব্রীজ। বিভিন্ন সিনেমায় দেখে থাকা এই ব্রীজের আন্তর্জাতিক পর্যটন চাহিদা এতই বেশি যে সান ফ্রান্সিস্কোতে ঘুরতে আসা প্রায় সকল পর্যটকেরই খুব প্রিয় একটি জায়গায় পরিণত হয় এই গোল্ডেন গেট ব্রীজ।

একদম সকালে অথবা পড়ন্ত বিকেলে গোল্ডেন গেটের সৌন্দর্য যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই পর্যটকরা ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন এই ব্রীজে অথবা তার আশেপাশে৷ ১৯৩৭ সালের ২৮ মে থেকে যাত্রা শুরু করা কমলা রঙের এই কিংবদন্তি ব্রীজ সান ফ্রান্সিস্কোর অন্যতম ছবি তোলার জায়গা। দিনে এবং রাতে আলাদা সৌন্দর্যে বিধৌত হওয়া এই ব্রীজটি সান ফ্রান্সিস্কোর সাথে মেরিন কান্ট্রি এবং উত্তরীয় আমেরিকার অন্যান্য অংশকে সংযুক্ত করে।

ব্রীজটির সৌন্দর্য সবচেয়ে ভালোভাবে দেখার জন্য সান ফ্রান্সিস্কোর এদিকটায় রয়েছে নোব হিল নামক এক জায়গা যেখান থেকে ব্রীজের সৌন্দর্য আর ক্যামেরায় তোলা ছবি দুটোয় দেখা/তোলা যাবে পরিপূর্ণভাবে।

২. আলকাট্রাজ আইল্যান্ড

ছবিঃ picdn.ne

আমেরিকার অন্যতম বিখ্যাত জেলখানার নাম আলকাট্রাজ কারাগার। একটা ছোট দ্বীপের উপর গড়ে ওঠা অভেদ্য এক কারাগারের গল্প বলে আলকাট্রাজ। সান ফ্রান্সিস্কো বেতে অবস্থিত এই কারাগারটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯৩৩ সালে, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ধারণ করেছে আমেরিকার বিখ্যাত সব ক্রিমিনালদের এবং শেষে ১৯৬৩ সালে বন্ধ হয়ে যায় কারাগারটি৷ আল ক্যাপোনি আর বার্ডম্যানের মতো আসামীদের স্থায়ী বাসস্থান ছিল আলকাট্রাজ যা পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে নতুন করে চালু করা হয় একটি পর্যটনস্থান হিসেবে।

সান ফ্রান্সিস্কো থেকে বোটে করে যাওয়া যায় কারাগারটিতে, যাওয়ার সময় বোটেই শুনতে পাবেন আলকাট্রাজের কয়েদি আর গার্ডদের ধারণকৃত এক বিশেষ অডিও রের্কড যা মিনিটে মিনিটে আলকাট্রাজের ৩০ বছরের গল্প বলে। এই ৩০ বছরে আলকাট্রাজে মোট কয়েদি সংখ্যা ছিল ১,৫৭৬ তবে কখনোই একবারে ২৫০ এর বেশি কয়েদি ছিল না যদিও এর ধারণ ক্ষমতা ছিল ১০ ফিট বাই ৪ ফিটের ৪৫০টি কক্ষ। এখানে পর্যটকরা যায় একটা পুরনো কিন্তু বিখ্যাত কারাগারের ইতিহাস জানতে আর উপরিপাওনা হিসেবে পেয়ে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে সামুদ্রিক পাখির সৌন্দর্য।

৩. ফিশারম্যান্স ওয়ার্ফ

ছবিঃ hotelnikkosf.com

আপনি যদি সান ফ্রান্সিস্কোতে এই প্রথম যাচ্ছেন তবে যে জায়গাটি অবশ্যই ঘুরে দেখা উচিত তা হলো এই ফিশারম্যান্স ওয়ার্ফ৷ সান ফ্রান্সিস্কো দেখার জন্য হাতে কম সময় থাকলেও চলে আসা যায় এখানে, এখান থেকে সান ফ্রান্সিস্কো ভ্রমণ শুরু করাটা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ৷ সান ফ্রান্সিস্কো শহরের পুরাতন অংশ হিসেবে পরিচিত এই ফিশারম্যান্স ওয়ার্ফে রয়েছে উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত সব জাহাজের সংগ্রহ যেগুলো সংরক্ষিত আছে সান ফ্রান্সিস্কো ম্যারিটাইম ন্যাশনাল হিস্টোরিক পার্কে।

এখানকার প্রচুর রেস্টুরেন্ট, দোকানপাট আর ওয়াটারফ্রন্টের পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সেট-আপ পুরো সান ফ্রান্সিস্কোর একটা সামগ্রিক ধারণা দিয়ে দেবে৷ মজার ব্যাপার হলো, মাদাম তুসোর মোমের জাদুঘরও এই ফিশারম্যানস ওয়ার্ফের পাশেই অবস্থিত৷

৪. গোল্ডেন গেট ব্রীজ পার্ক

ছবিঃ baycityguide.com

বাগান আর জাদুঘরের ঠিকানা বলা হয় গোল্ডেন গেট ব্রীজ পার্ককে। খুব চমৎকার সাজানো গোছানো সবুজ উদ্যানে ছেয়ে থাকা এই পার্ককে সান ফ্রান্সিস্কোর মধ্যমণি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। প্রায় ৫,০০০ এরও অধিক প্রজাতির গাছ, বেশ কয়েকটি হ্রদ, সাইকেল চালানোর পথ নিয়ে গড়ে ওঠা পুরো পার্কটি বেশ পছন্দের ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে।

এখানকার মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে দে ইয়াং মিউজিয়াম, ক্যালিফোর্নিয়া একাডেমি অফ সায়েন্স মিউজিয়াম, স্টেইনহার্ট একুরিয়াম, জাপানিজ টি গার্ডেন, সান ফ্রান্সিস্কো বোটানিক্যাল গার্ডেন সহ আরো অনেক কিছু। পায়ে হেঁটে পুরো পার্ক ঘুরে দেখতে চাইলে পুরো একটা দিন লেগে যাবে পার্কটি ঘুরতে৷ বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পার্কে সাইকেল ভাড়া করার সুযোগ আছে, সাইকেলে করে পুরো পার্কটি ঘুরে দেখার জন্য সেখানে দরকার হবে মাত্র কয়েক ঘন্টা।

৫. চায়না টাউন

ছবিঃ wordpress.com

অন্যান্য দেশের চায়না টাউন যদি আপনার ঘুরে দেখা হয়ে থাকে তবে সান ফ্রান্সিস্কোর চায়না টাউনের ব্যাপারে প্রথমেই যে ব্যাপারটা মাথায় গেঁথে নিতে হবে সেটা হলো এটি মোটেই অন্যান্য দেশের চায়না টাউনের মতো নয়, সান ফ্রান্সিস্কোর চায়না টাউনের ব্যাপারই আলাদা। এশিয়ার বাইরে এটি সর্ববৃহৎ চায়না টাউন আর উত্তরীয় আমেরিকায় সবচেয়ে পুরনো চায়না টাউন। ১৯০৬ সালের ভূমিকম্পে পুরোপুরিভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই চায়না টাউন একদম শুরু থেকে চাইনিজ আদলে বানানো হয় আবার এবং মজার ব্যাপার হলো নতুন চায়না টাউন দেখতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর।

এখন চাইনিজ মন্দির, নাট্যমঞ্চ, বিভিন্ন অনুষ্ঠান আর ঐতিহ্যবাহী সব স্থাপত্য নিয়ে চায়না টাউন সান ফ্রান্সিস্কোর এক অন্যতম পর্যটন স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। চায়না টাউনের সৌন্দর্য আর রীতিনীতি সবচেয়ে ভালো উপভোগ করা যায় যখন কোনো চাইনিজ উৎসব যেমন চাইনিজ নিউ ইয়ার চলে তখন। অন্যান্য সময়েও ঘুরে দেখার মতো এখানে আছে গ্র্যান্ট এভিনিউ, বুশ এভিনিউ সহ প্রচুর স্থাপত্য আর ঐতিহ্যবাহী অলিগলি।

ফিচার ইমেজ- wallpapersultra.net

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঘুরে আসুন নিউজিল্যান্ডের গোল্ডেন বে

নৈনিতালের রোমাঞ্চিত সকালে