আমেরিকার যত ভ্রমণস্থানের গল্প: অ্যারিজোনা নামা

দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকার হৃদয় বলে খ্যাত আরিজোনা প্রদেশ পর্যটকদের জন্য এক স্বপ্নময়ী গন্তব্যের নাম। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে বিধৌত এই প্রদেশের প্রতিটি নগর, প্রত্যন্ত গ্রাম, গ্রামে বসবাসরত আদিবাসি আর উপত্যকাগুলো এই প্রদেশকে করেছে আমেরিকার আর দশটা প্রদেশ থেকে আলাদা৷ এই প্রদেশের বিশ্ববিখ্যাত গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চাক্ষুষ সাক্ষী হতে সারা পৃথিবী থেকে পর্যটকরা ছুটে আসে এখানে, লুফে নেয় অ্যারিজোনা ভ্রমণের দুর্দান্ত সুযোগ।

ফিনিক্স আর সেডোনার মতো শহর যে প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত সেই অ্যারিজোনাতে আছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের সব নিদর্শন, ঐতিহাসিক ভুতুড়ে নগর, মরুভূমি, হ্রদ, পর্বতমালা, জলপ্রপাত এমনকি স্কি করা যায় এমন আগ্নেয়গিরি। গত কয়েক পর্বে গল্প করেছি আমেরিকার সান ডিয়েগো, সান ফ্রান্সিস্কো, শিকাগো, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস আর টরোন্টো নিয়ে৷ এ পর্বে থাকছে আগ্নেয়গিরি আর উপত্যকার প্রদেশ অ্যারিজোনার বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যের গল্প।

অ্যারিজোনা ভ্রমণের দিনগুলোতে এই পর্যটন স্থানগুলো থাকে পর্যটকদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে। চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক অ্যারিজোনা ভ্রমণে কোন কোন পর্যটন স্থান হতে পারে আপনার নিত্যদিনের গন্তব্য।

১. গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন

ছবিঃ i.pinimg.com

অ্যারিজোনার তো বটেই গোটা আমেরিকার অন্যতম পর্যটন স্থান এই গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন আপনার কল্পনায় দেখা যেকোনো দুর্দান্ত উপত্যকা থেকে কোনো অংশে কম সুন্দর নয়৷ কলোরাডো নদীর পাশে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিশাল এই উপত্যকা যেন মানুষকে অবাক করার জন্যই সৃষ্টি। বিকেল বেলার পড়ন্ত সূর্যের লাল আভায় সবচেয়ে সুন্দর দেখা যায় গোটা উপত্যকা অঞ্চলটিকে৷ পর্যটকরা এই সময়টাই বেছে নেয় এখানে ঘুরতে যাওয়ার জন্য।

অধিকাংশ পর্যটক দক্ষিণ চক্রনেমি বা রিম থেকে উপভোগ করে থাকে এই উপত্যকার সৌন্দর্য। উপত্যকার ধার ঘেঁষে পায়ে হাঁটার রাস্তা আছে এদিকটায়৷ উত্তর চক্রনেমি থেকেও শুরু করা যায় এই উপত্যকা ভ্রমণ, তবে শীতকালে এপাশটা অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। হাইকারদের জন্য আছে চমৎকার হাইকিং ট্রেইল যা ধরে হেঁটে গেলে খুব কাছাকাছি যাওয়া যায় উপত্যকার। আরো ভালোভাবে এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হেলিকপ্টারে করেও পর্যটকরা ঘুরে আসে এই গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন থেকে। বলা যায় অ্যারিজোনা মূলত বিখ্যাত এই গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের জন্যই।

২. সেডোনা

ছবিঃ doanarae.com

লাল পাহাড়ের শহর বলে খ্যাত সেডোনা ফিনিক্স শহর থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার ড্রাইভিং দূরত্বে অবস্থিত। অ্যারিজোনার অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক আয়োজন দেখতে পাওয়া যায় সেডোনাতে। তবে এই একদিনের ট্রিপে ইচ্ছে করলে যোগ করা যায় পুরো সেডোনা শহর ঘুরে ফেলার পরিকল্পনা। আরো কয়েক ঘণ্টা ওক গাছের জঙ্গলের মধ্যকার রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে গেলে দেখা মিলবে সেডোনা মূল শহরের।

মূল শহরের বিখ্যাত রাস্তা ৮৯এতে আছে প্রচুর পর্যটকের জন্য বিশেষভাবে তৈরী করা দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, আর্ট গ্যালারিসহ আরো অনেক কিছু। পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের শহর সেডোনাতে পাওয়া যাবে জনপ্রিয় সব হাইকিং আর বাইকিং ট্রেইল। তবে এগুলোর থেকেও যে জিনিসটি আরো বেশি জনপ্রিয় তা হলো সেডোনার জীপ ট্যুর যা আপনাকে দেবে প্রত্যন্ত আমেরিকার আনকোরা অভিজ্ঞতা। সেডোনা ভ্রমণে আরো পাওয়া যায় এখানকার পবিত্র এবং মহাজাগতিক কিছু স্থাপনা আর বসতি যার অভিজ্ঞতা হবে সারাজীবন মনে রাখার মতো।

৩. মনুমেন্ট ভ্যালি

ছবিঃ arizona-leisure.com

অ্যারিজোনা আর ইউটাহের সীমান্তে অবস্থিত অ্যারিজোনার বিখ্যাত মনুমেন্ট ভ্যালি অ্যারিজোনা ঘুরতে আসা পর্যটকদের অন্যতম পছন্দনীয় পর্যটন স্থান। শুধু আরিজোনার নয় বরং দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকার অন্যতম পর্যটন স্থান হিসেবে খ্যাত এই মনুমেন্ট ভ্যালিতে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে প্রস্তর যুগের পাথর আর বালির সমন্বয়ে বিশাল এক এলাকা যা পর্যটকদের দেয় এক অন্যরকম রুক্ষ অভিজ্ঞতা৷

এই ভ্যালির মধ্যমণি হলো নাভাজো ট্রাইবাল পার্ক যেখানে আপনি পাবেন বেশ চিত্তাকর্ষক এক পর্যটন কেন্দ্র আর ১৭ মাইল লম্বা এক গাড়ি চালানোর রাস্তা যার দুই ধারে শুধু দেখা মিলবে অসংখ্য ছোট বড় নুড়ি পাথরের। চাইলে গাইড নিয়েও ঘুরে ফেলা যায় পুরোটা এলাকা। একদিনের ট্রিপের জন্য আরিজোনার অন্যতম শীর্ষ গন্তব্য এটি।

৪. ফিনিক্স

ছবিঃ nfocus.com

এমনিতে আরিজোনার বিখ্যাত শহর হিসেবে ফিনিক্সের সুনাম যথেষ্ট, তবে বিশেষ করে শীতকালে গল্ফ খেলোয়াড় আর আরামপ্রিয় পর্যটকদের জন্য এই শহর হয়ে ওঠে স্বর্গসম। নামীদামী হোটেলে থাকার পাশাপাশি স্পা করানো অথবা মরুভূমির তপ্ত রোদে রোদ পোহানো ফিনিক্স ঘুরতে আসা পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের কাজ৷

ফিনিক্সের মেট্রোপলিটন এলাকা যেমন স্কটসডেল এবং মেসাতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শপিং কমপ্লেক্স, গল্ফ কোর্স, বিখ্যাত সব রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন মরুভূমির পার্ক বিশেষ করে হাঁটা, বাইকিং আর হাইকিংয়ের জন্য বানানো। এখানকার অন্যতম বিখ্যাত জাদুঘর হার্ড মিউজিয়াম পর্যটকদের বলে প্রাচীন ফিনিক্সের গল্প।

৫. হাভাসু ফলস

ছবিঃ kid101.com

হাভাসুপাই ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশনে সুপাইয়ের কাছাকাছি অবস্থিত ১০০ ফিট উচ্চতার এক জলপ্রপাতের নাম হাভাসু ফলস। নীলচে সবুজ পানির এই বড়সড় জলপ্রপাত সকল সৌন্দর্যের সীমা ছাড়িয়ে পরিপূর্ণতা পায় বসন্ত কালে। যখন হাভাসু জলপ্রপাতের নদীটির স্রোত বেড়ে যায় মনে হয় সেখানে একটি নয় বরং জলপ্রপাত আছে মোট দুটি। কলোরাডো নদীর অববাহিকায় হাভাসু ফলসের কাছেই বাস করে প্রায় সাড়ে চারশোর মতো হাভাসুপাই ইন্ডিয়ানস, ওরা সেখানের স্থানীয় আদিবাসী।

আগে কৃষিকাজ ছিল তাদের জীবিকার মূল উৎস, এখন সেখানে পর্যটক বৃদ্ধি পাওয়ায় আস্তে আস্তে পর্যটন শিল্পের চর্চা করা শুরু করেছে তারা জীবিকা নির্বাহের জন্য। দুর্ভাগ্যবশত এখানে দৈনিক হাইকিং করা যায় না, রাতে থাকতে হলে আগে থেকে রিজার্ভেশন দিতে হয়, বিভিন্ন ফি পরিশোধের মাধ্যমে পারমিট নিতে হয় এই জলপ্রপাত ঘুরে দেখার। তবে চাইলে ঘোড়ায় করে অথবা হেলিকপ্টারেও ঘুরে আসা যায় এই জলপ্রপাত থেকে।

ফিচার ইমেজ- videoblocks.com

Loading...

One Ping

  1. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্টেশনের লকার রুম, খুচরো ভ্রমণের স্বস্তি

সেন্ট্রাল আমেরিকায় ব্যাকপ্যাকিং টিপস