মেঘপাহাড়ের দেশ সুইজারল্যান্ডের স্বর্গরাজ্য থেকে বলছি

যদি জিজ্ঞেস করা হয় মধুচন্দ্রিমায় প্রিয়জনকে নিয়ে কোথায় যেতে চান? অধিকাংশের উত্তর সুইজারল্যান্ডের দিকে গড়াবে। ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি আর অস্ট্রিয়ায় ঘেরা স্বপ্নের এই দেশটি আল্পস পর্বতমালার দেশ। শুধু বরফে মাখা পর্বতরাজীর চূড়াই নয়, সুইজারল্যান্ডে আছে টলটলে নীল পানির হ্রদ, বিশাল সবুজের কার্পেটে মোড়ানো দুর্দান্ত সব ভ্যালি আর রুপকথার গল্পে পাওয়া হ্রদের দারুণ সব পাড়ের সৌন্দর্য। চারটি দেশের কোলে প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া এই দেশে ঘুরতে এলে মনে হবে শুধু একটি দেশ ঘুরছি না, বরং ভ্রমণ করছি কয়েকটি দেশে।
এত বৈচিত্র্য, এত সৌন্দর্যের মাঝে সুইজারল্যান্ডের সংস্কৃতিও নজর কাড়ার মতো। ইতিহাসের পাতা উল্টালে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ, জেনেভা, লুস্যান আর এর রাজধানী বার্নের ঐতিহাসিক সংস্কৃতি চোখে পড়বে সবার আগে। প্রতি বছর প্রচুর পর্যটক ঘুরতে যায় সুইজারল্যান্ড, রেখে আসে পদচিহ্ন আর নিয়ে আসে একগাদা সোনালি স্মৃতি। আপনার মাথায়ও যদি থাকে সুইজারল্যান্ড যাবার কথা, দেশটি ঘুরে দেখার কথা তবে লেখাটি আপনার জন্যই। চলুন এক নজরে দেখে নিই সে দেশের দারুণ কিছু ভ্রমণস্থান যা সুইজারল্যান্ড ভ্রমণকালে থাকবে পছন্দের তালিকার শীর্ষে।

দ্যা ম্যাটারহর্ণ

আলপ্স পর্বতমালার উচ্চতম কিছু শৃঙ্গের মধ্যে “দ্যা ম্যাটারহর্ণ” অন্যতম। সুইজারল্যান্ড-ইতালি সীমান্তে অবস্থিত এই পর্বতের শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য রাতের ঘুম কেড়ে নিতে সক্ষম। প্রায় ৪,৪৭৮ মিটার মানে প্রায় সাড়ে তের হাজার ফুট উঁচু এই পর্বতের শৃঙ্গে ওঠার শখ মানুষের সেই আদিকাল থেকেই।

ছবিঃ pinimg.com

দ্যা ম্যাটারহর্ণের প্রথম এক্সিপিডিশন ছিল একটি ভয়াবহ বিভীষিকার মতো। ১৮৬৫ সালের সেদিনে প্রথম এক্সপিডিশনে অংশগ্রহণকারী চারজন ট্রেকারই শৃঙ্গের গাত্র থেকে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন অকালে। এখন প্রতি গ্রীষ্মেই অনেক অভিজ্ঞ ট্রেকার ট্রেক করে যায় দ্যা ম্যাটারহর্ণে। ম্যাটারহর্ণের ঠিক নিচেই আছে “জারম্যাট” নামে ছোট গোছানো এক গ্রাম যেখানে পরিবেশ ঠিক রাখতে সকল প্রকার মোটরচালিত যানবাহন নিষিদ্ধ করেছে সুইজারল্যান্ড সরকার। আরো আছে দারুণ কিছু রিসোর্ট আর অসাধারণ সব রেস্টুরেন্ট।

জাংফ্রাউযখ

ইউরোপের উচ্চতম স্থান হিসেবে পরিচিত জাংফ্রাউযখ মূলত একটি হিল স্টেশন জাতীয় জায়গা। সুইজারল্যান্ডের বার্নিজ ওবারল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় রেলভ্রমণ হচ্ছে জাংফ্রাউযখ পর্যন্ত রেলভ্রমণটি।

ছবিঃ blogspot.com

প্রায় ৩,৪৫৪ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই হিল স্টেশনে আছে পর্বত পর্যবেক্ষণের জন্য আলাদা ঘর যেখান থেকে বিশাল প্যানারমিক ল্যান্ডস্কেপের সন্ধান পাওয়া যায় চোখের দৃষ্টিসীমার ভেতরেই। সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত ভ্যালি লুওতেরব্রুনেনের ট্রেকিং ও এখান থেকেই শুরু হয়। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট খেতাব প্রাপ্ত ইউরোপের সবচেয়ে দীর্ঘতম হিমবাহ “গ্রেট এলেটশ্চ গ্লেসিয়ার”ও জাংফ্রাউযখেই অবস্থিত। সুইজারল্যান্ডের দুর্দান্ত কিছু ট্রেক যেমন ফাউলহর্ণ, গ্রিণডেলওয়াল্ড, আইগার ট্রেইল, ওয়েটারহর্ণের ট্রেকিং শুরু করতে হয় এখান থেকে। যারা একটু কম সক্রিয় ট্রেকিংয়ের ব্যাপারে, তাদের জন্য আছে ক্যাবল কারের ব্যবস্থা।

ইন্টারলেকেন

পশ্চিমে থুন হ্রদ আর পূর্বে ব্রিয়েঞ্জ হ্রদের কোলে অবস্থিত সুইজারল্যান্ডের অন্যতম ভ্রমণাকর্ষণের নাম ইন্টারলেকেন। নগরায়ন পরিকল্পনার রত্ন হিসেবে পরিচিত এই ইন্টারলেকেনে আছে প্রায় ৩৫ একরের মতো খোলা জমি যেখান থেকে দেখা যায় আইগার, মঞ্চ, জাংফ্রাউয়ের মতো দারুণ কিছু পর্বতশৃঙ্গ।

ছবিঃ tripzilla.com

আল্পাইন অভিযাত্রার স্বর্গদ্বার বলা হয় ইন্টারলেকেনকে। পাহাড়ে ক্লাইম্বিং, হাইকিং, ট্রেকিং, প্যারাগ্লাইডিং, স্কিং, হ্রদের পানিতে কায়াকিং- কী না করা যায় এখানে! গ্রীষ্মের একটি সুন্দর ছুটির সপ্তাহ কাটানোর একদম যথাযথ স্থান ইন্টারলেকেন। দেশের অন্যান্য জায়গা থেকে ইন্টারলেকেন আসার মোট পাহাড়ি ট্রেন আছে ৪৫ খানা, রেলভ্রমণটাও স্মরণীয় হয়ে থাকার মতো ভ্রমণের পর্যায়ের পড়ে।

লুসার্নি

একবার চোখ বন্ধ করে চিন্তা করুন পাহাড়ে কোলে টলটলে নীল পানির বিশাল এক হ্রদ, হ্রদের পাশে গড়ে ওঠা মোটরবাইকবিহীন পরিষ্কার আকাশের অলিগলি, ঐতিহাসিক ভবনে ভরপুর এক শহরের কথা। নিশ্চয় মনের মধ্যে এতক্ষণে ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছে?

ছবিঃ eurail.com

সৌন্দর্যের দিক দিয়ে তো বটেই, লুসার্নি বিখ্যাত এর বাৎসরিক বিরাট আন্তর্জাতিক সংগীতানুষ্ঠানের জন্য। প্রতি বছর বিশ্বের নামীদামী গায়ক, লেখক, কম্পোজার আর বিশেষ অর্কেস্ট্রা প্রেমীদের সমাগম ঘটে এখানে। শহরের মূল আকর্ষণ হিসেবে আছে “চ্যাপেল ব্রীজ” যেটি চতুর্দশ শতাব্দীতে বানানো এবং আছে “লায়ন মনুমেন্ট” যেখানে একটি মৃতপ্রায় সিংহের প্রকৃতি দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে সুইস গার্ডদের প্রতি যারা কিনা ফরাসী বিপ্লবের সময় টুইলারিসদের সাথে সংঘর্ষে প্রাণ হারায়। আরো আছে “সুইস ট্রান্সপোর্ট মিউজিয়াম”, “লেক লুসার্নি” ইত্যাদি।

লেক জেনেভা

সুইজারল্যান্ড আর ফান্সের সীমান্তে ছোট শহর জেনেভা। এমনিতেই অন্যরকম সুন্দর শহর জেনেভা,তার উপর বিশ্বের সবচেয়ে বড় আল্পাইন হ্রদও যে জেনেভারই দখলে। লেকটিকে শহরের নামেই নামকরণ করা হয়, নাম লেক জেনেভা।

ছবিঃ imgur.com

আল্পস পর্বতমালার বরফে আবৃত শৃঙ্গরাজীর প্রতিফলন যখন জেনেভা হ্রদে পড়ে তখন পাড়ের সবুজ ঘাসে গা এলিয়ে স্নিগ্ধ এক বিকেলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে আপনি পৃথিবীতেই আছেন। ইউরোপের দেশগুলোতে এই জেনেভা শহরের পরিচয় শান্তির রাজধানী হিসেবে। হ্রদের ধারে গড়ে ওঠা পার্ক, রিসোর্ট আর বহু আগে থেকে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা ঐতিহাসিক সব ভবনের ভিড়ে কখন যে হারিয়ে যাবেন বুঝতেই পারবেন না। বলা হয়ে থাকে জেনেভা পুরো শহরটাই একটা ভ্রমণস্থান। বুঝতেই পারছেন আল্পস পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এই শহরের আনাচেকানাচে সৌন্দর্যের বসবাস।

সেইন্ট মরিটজ

এ পর্যন্ত দুই-দুইবার সুইজারল্যান্ড শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজন করেছে। তবে আরো অবাক করার বিষয়, সমুদ্র সমতলে নয় বরং সেই দুটি শীতকালীন অলিম্পিকের ভেন্যু ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৮০০ মিটার উপরে বিশ্বের অন্যতম পর্বত গন্তব্য সেইন্ট মরিটজে।

ছবিঃ cloudinary.com

কাঁচের মতো টলটলে লেক, বরফের চাদরে মোড়ানো হাঁটার পথ, আল্পাইন বন আর বিশাল উচ্চতা সেইন্ট মরিটজকে করেছে পর্যটনের দিক দিয়ে অন্যরকম আকর্ষণীয়। সেইন্ট মরিটজের দুটো ভাগ, একটি উপরে অবস্থিত আরেকটি নিচের দিকে। উপরে অবস্থিত ভাগটির নাম সেইন্ট মরিটজ ডর্ফ আর নিচের অংশটি সেইন্ট মরিটজ ব্যাড নামে পরিচিত। সেইন্ট মরিটজ ব্যাডে আছে সেইন্ট মরিটজ হ্রদ, সেখানে থাকা খাওয়ার খরচও কম। যতই উচ্চতা বাড়ে ততই সবকিছুর দাম বাড়ে সেখানে। শীতকালে এখানে পর্যটকরা স্কিং, স্কেটিং, স্নোবোর্ডিনং, ববস্লেডিংয়ে মশগুল থাকেন যেখানে গ্রীষ্মে প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকে হাইকিং, বাইকিং, ওয়াটারস্পোর্ট, গ্লেসিয়ার স্কিং ইত্যাদি।

বার্ন

সুইজারল্যান্ডে এসে এর রাজধানী ঘুরে যাবেন না এটা তো হয় না। সুইস রাজধানী বার্নের বুকে বয়ে চলা “এরে নদী” আর পুরো শহরের একটা পুরাতন বিশ্বভাব এই শহরের প্রেমে পড়তে যথেষ্ট। প্রচুর জাদুঘর আর চিত্রকর্মের গ্যালারিতে সমৃদ্ধ বার্ন শহরটি চিত্রকর্ম প্রেমীদের খুব পছন্দ হবে।

ছবিঃ atcdn.net

এখানকার সবচেয়ে আকর্ষনীয় চিত্রকর্মের গ্যালারি এক বিখ্যাত চিত্রকরের সব দুর্দান্ত কাজ দিয়ে সাজানো, গ্যালারির নামটাও তাঁর নামেই রাখা “জেনট্রাম পাউল ক্লি”। আরো ঘোরা যেতে পারে এখানকার “বার্ন মিউজিয়াম অফ আর্ট”, এখানকার স্থানীয় বাজার যেটি পার্লামেন্ট স্কয়ারের পাশেই অবস্থিত।

জুরিখ

সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহরের গল্পটা দিয়েই শেষ করি তাহলে। জুরিখ সুইস পরিবহন জগতে অনন্য এক নাম। লিম্মাত নদীর অববাহিকায় তৈরী হওয়া লেক জুরিখের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এই শহর সাধারণত সুইজারল্যান্ডে আসা পর্যটকদের পছন্দের একদম শীর্ষে থাকে।

ছবিঃ travelocity.com

বাইরের যেকোনো দেশ থেকে সুইজারল্যান্ডে পানিপথে ঢুকতে হলে তাকে জুরিখ হয়েই আসতে হবে। তাই সুইজারল্যান্ড ভ্রমণটাই পর্যটকদের শুরু হয় জুরিখ দিয়ে। জুরিখের “ওল্ড টাউন” এর অলিগলিতে হাঁটলে পাওয়া যাবে প্রায় ৫০টির মতো জাদুঘর আর ১০০টিরও অধিক চিত্রকর্মের গ্যালারি। একটা শহরে যদি এত এত সংস্কৃতির চর্চা হয় তবে বুঝতেই পারছেন শহর হিসেবে কতটা প্রাণবন্ত জুরিখ।
মূল শহরের সব জাদুঘর, পুরনো ঐতিহাসিক স্থাপনা আর চিত্রকর্মের গ্যালারি ঘোরা শেষে শহর থেকে “ইউটিলবার্গ মাউন্টেইন” যাবার ট্রেনে চড়ে বসুন, পুরো শহরের ছবি একবারে ধরা পড়বে চোখের দৃষ্টিসীমায়।
ফিচার ইমেজ- ognature.com

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. এই সাইটের পোস্টগুলো যতই পড়ছি ততই নতুন নতুন জিনিস শিখছি। এডমিনকে ধন্যবাদ এত সুন্দর একটি সাইট পরিচালনা করার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সন্ধ্যার মায়াবী বিছানাকান্দি

ভালুকা থেকে মুক্তাগাছা হয়ে গৌরীপুর: একদিনে ময়মনসিংহ ভ্রমণের আদ্যন্ত