ভারতের দুর্দান্ত সব রেলভ্রমণের ইতিকথা

আমাদের পাশের দেশ ভারতে প্রতি বছর প্রচুর বাঙালি ঘুরতে যায়। একই দেশে হরেক রকম আবহাওয়ার স্বাদ খুব সহজে একমাত্র ভারতেই পাওয়া সম্ভব। ভারতের এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলের রুপবৈচিত্র্যে বিশাল তফাৎ। এর মূল কারণ দূরত্ব আর সে দেশের আয়তন। বিশাল আয়তনের এই দেশে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম রেলওয়ে। গড়ে ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার বেগে চলমান এসব দ্রুতগামী ট্রেনে চড়তে যেমন আলাদা আকর্ষণ কাজ করে তেমনি যে পথ দিয়ে ট্রেনগুলো যায় সেগুলোও রুপসৌন্দর্যের দিক দিয়ে এক কথায় অনন্য।

বলা হয়ে থাকে, যদি ভারতের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয় তবে চড়ে বসতে হবে এখানকার ট্রেনগুলোতে, হোক সেটা বাতাসের বেগে চলমান দ্রুতগামী কোনো ট্রেন অথবা শহুরে কোনো ট্রাম নয়তো নয়নাভিরাম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে স্থান পাওয়া কোনো টয় ট্রেন। ভারতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কিছু রেলভ্রমণ নিয়েই থাকছে আজকের আয়োজন যার প্রতিটিই রোমাঞ্চ আর সৌন্দর্যে একদম স্বয়ংসম্পূর্ণ। চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক শীর্ষ তেমন কয়েকটি রেলভ্রমণ।

মেট্টুপুলায়াম থেকে ওটি রুট

ছবিঃ makemytrip.com

কেরালার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর মধ্যে মেট্টুপুলায়াম থেকে ওটিগামী টয় ট্রেন অন্যতম। ওটির জলকালিতে আঁকা সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এই টয় ট্রেনটি পাহাড়ের গা ঘেঁষে ধীরে ধীরে চলতে থাকে। টয় ট্রেনের ভালো দিকটি এখানেই, এর ধীর গতি। এই গতি আপনাকে পূর্ণ সুযোগ দেবে ইচ্ছেমতো সৌন্দর্য উপভোগ করার। আশেপাশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য তো বটেই, এই টয় ট্রেনের ভেতরকার সাজসজ্জা অনেকটা পুরনো আমলের ধাঁচে বানানো যা এই টয় ট্রেনকে করে তুলেছে আরো আকর্ষণীয় এবং বিশ্বমানের।

জয়সাল্মির-যোধপুর রুট

ছবিঃ mapsofworld.com

পাহাড়ের দেশ ঘোরা শেষে চলে আসতে পারেন মরুভূমির দেশ রাজস্থানে। রাজস্থানের এই বিস্তীর্ণ মরুভূমি বছরের কোনো সময়ই তেমন আকর্ষণীয় না মনে হলেও জয়সাল্মির থেকে যোধপুর যাওয়ার ট্রেনখানা চলে একদম মরুভূমির মধ্য দিয়ে। রৌদ্রের দাবদাহে বেদুইনের আধুনিকতা পাওয়া যাবে রাজস্থানের এই রেলভ্রমণে।

মুম্বাই-পুনে রুট

ছবিঃ i.ytimg.com

ভারতের দক্ষিণের শহর মুম্বাই। আগের নাম বোম্বে। অল্প দূরত্বেই আছে সুন্দর শহর পুনে। মুম্বাই থেকে পুনে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো মাধ্যম গাড়ি এবং রেল। তবে খরচের কথা চিন্তা করলে রেলভ্রমণই শ্রেয়। খরচের কথা চিন্তা করে মুম্বাই থেকে পুনে যাওয়ার ট্রেনে উঠে পড়লে উপরি পাওনা হিসেবে পেয়ে যাবেন ভারতের দক্ষিণ পশ্চিম ঘাট আর রেললাইনের দুইপাশে বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা রেইন ফরেস্ট। ট্রেনে ওঠার পরে ঝমঝমিয়ে যদি বৃষ্টি নামে তবে এই ভ্রমণকে আপনি মনে রাখতে বাধ্য হবেন বাকিটুকু জীবন।

রামেশ্বরাম রেল রুট

ছবিঃ cloudfront.net

ভারতের বিভিন্ন সিনেমায় এই রেলভ্রমণের প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। এতই নয়নাভিরাম এই রেলভ্রমণ যে সেই পুরনো আমল থেকে শুরু করে আজ অবধি বিভিন্ন সিনেমায় বারংবার ব্যবহৃত হয়েই আসছে।

কালকা-শিমলা রুট

ছবিঃ লেখক

ভারতের যেখান থেকেই শিমলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করুন না কেন কালকা স্টেশনে আপনার আসতেই হবে। কালকা স্টেশন ভারতের হিমাচল প্রদেশে অবস্থিত। কালকা থেকে দুইভাবে শিমলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা যায়, গাড়িতে এবং টয় ট্রেনে। তবে প্রথমবার যদি শিমলা যাবার পরিকল্পনা করে থাকেন তবে এই টয় ট্রেনের ভ্রমণ হাতছাড়া করা একদমই উচিত হবে না। একপাশে পাহাড় আর অন্যপাশে বিস্তীর্ণ ভ্যালির অপরিসীম সৌন্দর্যে মোহিত হওয়ার পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে স্থান পাওয়া এই টয় ট্রেন ৬ ঘণ্টায় কালকা থেকে শিমলা পৌঁছাবে গুনে গুনে ১০৬ টানেল পার হয়ে।

দার্জিলিং-হিমালয়ান রুট

ছবিঃ siliguritimes.com

শিমলার টয় ট্রেনের মতোই দার্জিলিংয়েও আছে টয় ট্রেনে যাওয়ার সুবিধা। শিলিগুড়ি থেকে টয় ট্রেনে যাওয়া যায় দার্জিলিং। পুরনো আমলের সাজসজ্জায় মোড়ানো এক একটা টয় ট্রেনে উঠলেই আভিজাত্যের এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে। দার্জিলিং শহরও ঘুরে ফেলা যাবে হিমালয়ান অঞ্চলে বিখ্যাত এই টয় ট্রেনে।

নীলগিরি-ওটি রুট

ছবিঃ static.toiimg.com

বাংলাদেশের নীলগিরি নয়, ভারতের নীলগিরির কথা বলছি। দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত অপূর্ব সুন্দর এই হিলস্টেশন থেকে ওটি যাওয়ার যে রেলভ্রমণ তার দুইপাশ জুড়ে রয়েছে দিগন্তজোড়া নীল আকাশ আর সবুজের বিস্তীর্ণ তেপান্তর।

মুম্বাই-গোয়া রুট

ছবিঃ i.pinimg.com

যদি কখনো ভারতের গোয়ায় না যাওয়া হয়ে থাকে তবে প্রথমবার উড়োজাহাজে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে ট্রেনে উঠে পড়ুন। দূরপাল্লার এই রেলভ্রমণে প্রথম দিকে একটু একঘেমেয়ি লাগলেও ট্রেন যখন মুম্বাইয়ে ঢুকবে তখন থেকে শুরু হবে সৌন্দর্যের লীলাখেলা। সমুদ্রের জন্য তো বটেই গোয়া সবুজের বিশাল বিশাল প্রান্তরের জন্য বেশ বিখ্যাত যার অধিকাংশই ট্রেনে যাবার পথে চোখে পড়বে।

বেঙ্গালুরু-কন্যাকুমারী রুট

ছবিঃ cloudfront.net

ভারতের সাইন্স সিটি হিসেবে খ্যাত বেঙ্গালুরু এমনিতেই প্রচুর সুন্দর। বেঙ্গালুরু থেকে কন্যাকুমারীর যে রেলভ্রমণ তা ওই অঞ্চলে বিশেষভাবে বিখ্যাত। এই রেলভ্রমণের রেললাইনগুলোর অধিকাংশই পানিকে দুইপাশে রেখে এগিয়ে চলে। মনে হবে যেন পানির উপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রেলগাড়িটি।

জম্মু-উদামপুর রুট

ছবিঃ railanalysis.in

এই রেলভ্রমণটি সাধারণ যেকোনো রেলভ্রমণের তুললায় একটু আলাদা। সমতলের রেললাইনের তুলনায় এই রুটে আছে উঁচু পাহাড়ের গায়ে তৈরী করা মিটার গজের রেললাইন যার উপরে যখন রেলের চাকা গড়ায় তখন থেকেই শুরু হয় সৌন্দর্যের অবিরাম ধারা। কাশ্মীরের সেই পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড়ের বুক বেয়ে চলা সেই রেলভ্রমণ কতটা দুর্দান্ত রোমাঞ্চের মাধ্যম হবে তা নিজে না গিয়ে বোঝা খুবই দুষ্কর।

ভুবনেশ্বর-ব্রহ্মপুর রুট

ছবিঃ i.ytimg.com

ভারতের অন্যতম সুন্দর রেলভ্রমণের আধার এই ভুবনেশ্বর থেকে ব্রহ্মপুর যাওয়ার রাস্তাটি। ভারতে রেল ভ্রমণের অনিন্দ্য অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে এই পথে ভ্রমণ করতে হবে আপনার। এক পাশে মালিয়াদ্রী এবং অন্য পাশে টলটলে পানির চিলকা হ্রদ আপনার রেল ভ্রমণকে করে তুলবে অন্যরকম সুন্দর এক অভিজ্ঞতার বিষয়বস্তু।

ভারতের রেলের ভ্রমণ এমনিতে সুখকর না হলেও দুইপাশের অপার সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যবাহী ট্রেনগুলোর ভেতরকার সাজসজ্জা দিয়ে চোখ জুড়ানোর জন্য মানুষ ছুটে যায় বারবার একই গন্তব্যে রেলগাড়িতে চেপে। এর মূল কারণ ভারতের ট্রেনগুলোর ভাড়া নিতান্তই কম গাড়ির তুলনায় আর ট্রেনগুলোর যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তবে এসব ট্রেনে চড়ে ভয়ংকর সুন্দর কিছু অভিজ্ঞতা পেতে হলে অনেক আগে থেকে কেটে রাখতে হয় ট্রেনের টিকিট। তা না হলে ১২০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে ট্রেনের টিকেট পাওয়া যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া। ভ্রমণ হোক সুন্দর এবং প্রাঞ্জল।

ফিচার ইমেজ- thaneweb.com

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্বের সেরা কয়েকটি হোটেল

প্রথম বিপ্লবী নারী শহীদ প্রীতিলতার আত্মাহুতিস্থল ও রেলওয়ে স্কুল