ভারতের শ্বাসরুদ্ধকর কিছু হিল স্টেশনের গল্প

পাহাড়, মেঘ, পানি ভালোবাসে না এমন পর্যটক খুঁজে পাওয়া শুধু কষ্টই নয় বরং অসম্ভব। যারা সাধারণত ঘুরতে পছন্দ করেন তারা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার আগে এই তিনটি জিনিসের কোনটা সেখানে আছে তা দেখে নিতে ভুল করেন না। যদি থাকে এই তিনটি আকর্ষণের কোনো একটি, ব্যস আর কোনো চিন্তা ছাড়াই ঘুরে চলে আসা যায় যেকোনো জায়গা থেকে। কেমন হয় যদি কোথাও মেঘ, পাহাড় আর পানির মেলবন্ধন থাকে একসাথে? যদি এক ভ্রমণেই দেখা মেলে তিন আকর্ষণের? হিলস্টেশনের কথা উঠে আসে এই প্রসঙ্গেই।
পাশের দেশ ভারতে এমন অনেক দারুণ হিলস্টেশন রয়েছে যার প্রতিটাই অপেক্ষা করে আছে অবিরাম অফুরন্ত সৌন্দর্য পর্যটকের ভ্রমণপিপাসা মেটানোর জন্য। এক সপ্তাহের একটি দারুণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পেতে ঘুরে আসা যায় এখানকার যেকোনো একটি বা দুটি হিলস্টেশন থেকে। চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক দারুণ সেসব হিলস্টেশনের আদি এবং অন্ত।

কন্নোর, তামিল নাড়ু

কন্নোর হিল স্টেশন, ছবিঃ wikimedia.org

ভারতের সর্ব দক্ষিণের রাজ্য তামিল নাড়ু। নিজের মধ্যে প্রকাণ্ড এক সবুজ বিশ্ব সাজিয়ে রেখেছে তামিল নাড়ু। ভারতের নীলগিরি হিল স্টেশনের অন্তর্ভুক্ত তিনটি উপ-হিল স্টেশনের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত হিল স্টেশন এই কন্নোর হিল স্টেশন। তামিল নাড়ুর অসাধারণ সব ট্রেকিং রুট, বিস্তৃর্ণ সবুজ উপত্যকা আর বোটানিক্যাল গার্ডেন, চা বাগান, কফি বাগানের ভিড়ে নিজেকে হারানোর মুহূর্তটিও দেয়ালে ছবি হিসেবে বাঁধিয়ে রাখার মতো মুহূর্ত হবে লিখে দিলাম।

হাফলং, আসাম

হাফলং হিল স্টেশন, ছবিঃ cloudinary.com

নামটা শুনে নিশ্চয়ই আমাদের দেশের জাফলংয়ের কথা মনে পড়ে গেছে? হাফলং আসামের একমাত্র হিলস্টেশন যা কিনা ভারতের গোহাটি থেকে মোটর গাড়ি দিয়েই যাওয়া সম্ভব। গোহাটির অদূরে অবস্থিত এই হাফলং হিল স্টেশনের মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে হাফলং হ্রদ, মাইবোং আর জাতিংগা গ্রাম সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। প্রায় ২ লক্ষ বিভিন্ন প্রকার ফুলের বাড়ি এই হাফলং হিল স্টেশন। মাইবোং আর জাতিংগা গ্রামে থাকার সময় এখানকার খাবার-দাবার চেখে নিতে ভুলবেন না। স্থানীয় মানুষজনের আচার-ব্যবহারও মন কাড়ার মতো।

ছিখালদারা, মহারাষ্ট্র

ছিখালদারা হিল স্টেশন,ছবিঃ ytimg.com

ভারতের অন্যান্য বাঘা বাঘা হিল স্টেশনের চেয়ে একটু কম পরিচিত মহারাষ্ট্রের এই হিল স্টেশন মোটেই সৌন্দর্যের দিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। মহারাষ্ট্রের এই হিল স্টেশনে ট্রেনে আসা যাবে আকোলা নামক স্টেশন থেকে। ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে আর প্রকৃতির মাঝে নিজেকে খুঁজে পেতে এই জায়গার জুড়ি মেলা ভার। এখানকার টাইগার সেংশুয়ারি, কিতচাকধারী, শাক্কার হ্রদ আর গাওইলঘুর দূর্গ পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে বেশ ভালো সময় ধরে।

পনমদি, কেরালা

পনমদি হিল স্টেশন, ছবিঃ singhruby.com

ভারতের সাগরকন্যা কেরালার অন্যতম হিল স্টেশন পনমদি। কেরালার সৌন্দর্যের ধরণটাই যে অনিন্দ্যসুন্দর, অতি অনিবার্য। সেখানে পনমদির মতো একটি হিল স্টেশন কেরালার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণে। পনমদির সবচেয়ে ভালো দিক হলো কেরালার রাজধানী কোচি থেকে একদম সহজেই চলে আসা যায় পনমদিতে। সকাল-সন্ধ্যা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঘটতে থাকা সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তেই কেটে যাবে সারাবেলা। মনে হবে এই মর্ত্যে বুঝি স্বর্গ নেমে এলো পনমদির সে সূর্য কিরণের হাত ধরে।

তাওয়াং, অরুণাচল প্রদেশ

তাওয়াং মনেস্ট্রি, ছবিঃ theholidayindia.com

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,০০০ ফুট উপরের এক হিল স্টেশনের নাম তাওয়াং। অরুণাচল প্রদেশে অবস্থিত এই হিল স্টেশনের সৌন্দর্য আসলে কোনো লেখনিতে তুলে ধরা সম্ভব নয়। ভুটান এবং তিব্বতের একদম মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এখানে আসলে একই সাথে পাওয়া যাবে বুদ্ধধর্মীয় এবং উত্তর-পূর্ব তিব্বতীয় রীতিনীতি আর সংস্কৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন। এখানকার তাওয়াং মনেস্ট্রি তো অবশ্যই ঘুরতে হবে। দুর্দান্ত রোমাঞ্চপ্রেমীদের জন্য এখানে রয়েছে প্যারাগ্লাইডিং থেকে শুরু করে রক ক্লাইম্বিং, ট্রেকিংয়ের পূর্ণ সুযোগ। তবে হতাশার বিষয় বাংলাদেশীদের অরুণাচল প্রদেশে ঢুকতে দেয় না, তবে অদূর ভবিষ্যতে ঢুকতে দেয়ার যাবতীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

শিমগা, কর্ণাটকা

যগ জলপ্রপাত, শিমগা। ছবিঃ hiqcdn.com

কর্ণাটকায় ঘুরতে আসা অধিকাংশ পর্যটক শুধু মাইসোর আর কর্গ ঘুরেই চলে আসেন। তবে আসল সৌন্দর্য আরো ভেতরে লুকিয়ে আছে। কর্গ থেকে কর্ণাটকার আরেকটু ভেতরের দিকে গেলে পাওয়া যাবে অত্র অঞ্চলের নয়নাভিরাম এক হিল স্টেশনের সন্ধান যার স্থানীয় নাম শিমগা। শিমগায় আর কিছু থাকুক বা না থাকুক, দারুণ কিছু জলপ্রপাত আছে। এখানকার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ জলপ্রপাতের নাম “যগ জলপ্রপাত”। আরো জলপ্রপাতের মধ্যে রয়েছে সাগারস, কোদাছাড়ি, তালাগুপ্পা প্রভৃতি। এত এত জলপ্রপাতের ভিড়ে হারিয়ে না যেতে দেখে নিতে হবে এখানকার অসাধারণ সব উপত্যকা আর চা-কফির বাগান।

ধনৌলটি, উত্তরাখণ্ড

ধনৌলটি হিল স্টেশন, ছবিঃ blogspot.com

ভারতের উত্তরাখণ্ডকে আমি বলি আশ্চর্যের রাজ্য। ভারতের বাঘা বাঘা সব ট্রেকিংয়ের মূল স্বর্গদ্বার শুরু হয়ে এখান থেকেই। উত্তরাখণ্ডের মুসৌরি থেকে মাত্র ২৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত উত্তরাখণ্ডের অন্যতম সুন্দর হিল স্টেশন ধনৌলটি। কোলাহল মুক্ত, যানজটবিহীন কয়েকটা দিন কোনো হিল স্টেশনের হোমস্টের বারান্দায় বসে কাটিয়ে দিতে চাইলে ধনৌলটির বিকল্প বেছে নেয়া খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই মুসৌরি ভ্রমণ শেষেই বেরিয়ে পড়া উচিত অফুরন্ত সৌন্দর্য আর শান্তির জায়গা ধনৌলটির উদ্দেশ্যে।

পেলিং, সিক্কিম

পেলিং, ছবিঃ trinityairtravel.com

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত সিক্কিমের নাম শোনেননি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। শিলিগুড়ি থেকে ট্রেনেই যাওয়া যায় সিক্কিমে। অসম্ভব সুন্দর সিক্কিমের অসাধারণ এক হিল স্টেশনের নাম পেলিং। এখানকার মূল আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে পেমায়াংস্তে, সাংগা চোলিং মনেস্ট্রি আর পেলিংয়ের অদ্ভুত সুন্দর সব ঐতিহাসিক স্থাপত্য। পেলিংয়ের সবুজের সাম্রাজ্য তো বাড়তি পাওনা হিসেবে থাকছেই। এখান থেকে ফেরার সময় দেহ-মন-প্রাণ একদম সতেজ মনে হবে। বাংলাদেশিদের জন্য আপাতত সিক্কিম প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সবার জন্য উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে যতদূর জানা যায়।
ফিচার ইমেজ- ytimg.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

E T B এর ইভেন্ট: প্রবাল দ্বীপে বৃষ্টি বিলাস এবং আরামের ট্যুর

দম বন্ধ করা সুন্দর সবুজ পুনাখা শহরে