কী আছে এমন দক্ষিণ কোরিয়ায় যা পর্যটকদের হৃদকম্পন বাড়িয়ে তোলে?

যারা দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ান তাদের কাছে বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশগুলো অনেকটা প্রজেক্টের মতো, একটা দেশ ঘোরা শেষ হলে শুরু হয়ে যায় আরেক দেশ ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা। দেশ থেকে দেশান্তরে যাওয়ার যে তীব্র বাসনা সেই বাসনাই মানুষকে পরিণত করে বিশ্ব-নাগরিকে। বিশ্বের পথে চলার অমোঘ ইচ্ছে থেকেই মানুষ ঘুরে বেড়ায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে।
আজকের ভ্রমণকারীরা যেন কবি নজরুল ইসলামের বেদুইনের আধুনিক সংস্করণ মাত্র। বিভিন্ন দেশের গল্প ইতোমধ্যে করেছি আগের লেখাগুলোয়। আজ জমকালো আধুনিক কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি দেশ আর সে দেশের রোমাঞ্চকর সব ভ্রমণকীর্তির গল্প বলি। দেশটির নাম দক্ষিণ কোরিয়া। প্রকৃতি, সৌন্দর্য, আধুনিকতা আর বেশ উন্নত প্রযুক্তির দেশ দক্ষিণ কোরিয়ায় বহু বছর সামাজিক-রাজনৈতিক ঝামেলা থাকা সত্ত্বেও পর্যটনে একটুও পিছিয়ে নেই দেশটি।
কে-পপ, ইন্টারনেট ক্যাফে আর কিমছি (কোরিয়ান জাতীয় খাবার) এর মতো বিখ্যাত কিছু যুগান্তকারী উপাদান আমরা পেয়েছি একমাত্র কোরিয়ানদের জন্য। বিচিত্র এই দেশটিতে প্রতি বছর ঘুরতে যায় প্রচুর পর্যটক আর লাভ করে এড্রেনালিন ক্ষরণকারী, হৃদকম্পন বাড়িয়ে দেয়া কিছু দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা। চলুন তাহলে দেখে আসি কী আছে এমন দক্ষিণ কোরিয়ায় যা পর্যটকদের হৃদকম্পন বাড়িয়ে তোলে।

এভারল্যান্ড টি-এক্সপ্রেস

ছবিঃ thetravelintern.com

দক্ষিণ কোরিয়ার এভারল্যান্ড টি-এক্সপ্রেসের নাম যারা শোনেননি তাদের জেনে রাখতে হবে এদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত রোলার কোস্টারের নাম এভারল্যান্ড টি-এক্সপ্রেস। ভাবছেন এ আর এমন কী? বাচ্চাকাচ্চাদের রোলার কোস্টার ভেবে যদি ভুল করে থাকেন তবে আরো জানুন, এই রোলার কোস্টারটি ঠিক ১৫০ ফুট উঁচু থেকে অভিকর্ষের টানে একদম নিচের দিকে যাবে আপনার সবটুকু সাহস কেড়ে নিয়ে। আপনি যদি যথেষ্ট সাহসী আর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাপ্রেমী হয়ে থাকেন তবে দক্ষিণ কোরিয়ার এই রোলার কোস্টারটি আপনার নজর কাড়বেই কাড়বে।

হেঁটে বেড়ান ফ্যাশনের সড়ক মেংডং সড়ক ধরে

ছবিঃ picdn.net

দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশ্বের ফ্যাশনের কেন্দ্রবিন্দুও বলা হয়ে থাকে। আদি থেকে আধুনিক সব রকম ফ্যাশনের চর্চা করে কোরিয়ানরা। এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্যাশনেবল এলাকা হচ্ছে সিউলের মেংডংয়ের আশেপাশের এলাকাগুলো। একদম চূড়া থেকে গোড়ার হাল-ফ্যাশনের সাক্ষী হতে প্রচুর মানুষ আসে এখানটায়। জমজমাট এই মেংডংয়ে আসলেই কেনাকাটা করতে ইচ্ছে করবে যে কারো। তাই বলা হয় এখান থেকে কেনা জিনিসগুলো দৈতাকার এক ব্যাগে ঢুকালেও জায়গা হবে না সে ব্যাগে। এলাকাটি দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতির পরিচায়কও বটে।

নিজেকে উপহার দিন টেম্পলস্টেতে থাকার একটি দিন

ছবিঃ ninelling.com

পার্থিব দুনিয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে, শহুরে কোলাহল, যানজট, চিন্তা-দুশ্চিন্তা, দৈনন্দিন জীবনের নিত্য ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে একদিনের জন্য থেকে আসুন দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম পবিত্রস্থান টেম্পলস্টেতে। একদিনের জন্য কোরিয়ান ভিক্ষু বা সন্ন্যাসী হওয়ার সুযোগও আছে সেখানে।
কোরিয়ান বুদ্ধত্ব জানতে হলে তাদের একজন হয়ে, ভিক্ষু হয়ে কাটাতে হবে এখানে একটি দিন। ভিক্ষুদের সাধারণ কিন্ত অনন্য নিয়মমাফিক খাবার-দাবার, দৈনন্দিন নিয়মিত ধ্যান চর্চা বা মেডিটেশন আর জায়গাটির নিজস্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সুষমতায় নিজের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাবেন আপনি। জীবনের জটিলতা থেকে মুক্তির উপায় এখানেই যে নিহিত।

তায়কোয়ান্দো শিখুন দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকার দিনগুলোতে

ছবিঃ staticflickr.com

“তায়কোয়ান্দো” শব্দটির সাথে অনেকের পরিচয় নাও থাকতে পারে। তবে যারা শব্দটির সাথে পরিচিত তারা জানেন এটা ঠিক কতটুকু রোমাঞ্চকর এক বিদ্যা। মার্শাল আর্টকে কোরিয়ায় জাতীয় খেলার সম্মান দেয়া হয় আর এই কোরিয়ান মার্শাল আর্টকে বলা হয় তায়কোয়ান্দো। একটা দেশের জাতীয় খেলা এত রোমাঞ্চকর হতে পারে দক্ষিণ কোরিয়াকে না দেখলে বোঝা যায় না, তাই দক্ষিণ কোরিয়ার দিনগুলোতে শিখে ফেলা যায় বিখ্যাত এই মার্শাল আর্ট।
এখানকার তো বটেই পুরো বিশ্বের তায়কোয়ান্দো হেডকোয়ার্টার সিউল শহরের অল্প দূরত্বেই অবস্থিত, নাম “তায়কোয়ান্দোন”। সারা বিশ্বের মানুষ এখানে আসে তায়কোয়ান্দোর মতো ঐতিহাসিক বিদ্যার সাক্ষী এবং শিক্ষার্থী হতে। একটি তিনতলা জাদুঘরও আছে এখানে যা তায়কোয়ান্দোর ইতিহাসের গল্প করবে আপনার কাছে।

চেখে দেখুন জাগালছি মাছ-বাজারের দারুণ সব সামুদ্রিক খাবার-দাবার

ছবিঃ dreamstime.com

দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় মাছ বাজার জাগালছি মাছ বাজার যা সমুদ্র সৈকতের একদম পাড়েই অবস্থিত। দক্ষিণ কোরিয়ায় সামুদ্রিক খাবার-দাবারের স্বর্গ বলা হয় জাগালছিকে। মাথা খারাপ করে দেয়া অজস্র মাছের প্রজাতি থরে থরে সাজানো আছে এখানকার প্রতিটি দোকানে। সবচেয়ে ভালো জিনিস হলো, আপনার যে মাছ বা চিংড়ি খেতে ইচ্ছে করবে শুধু তাদের সেটা দেখিয়ে দিলেই হবে। একদম সেখানেই আপনার সামনে ভেজে তৈরী করে দেবে আপনার ভোজ্য মাছটি।
অত্র এলাকায় শুধু সামুদ্রিক খাবারই নয় বরং পাওয়া যায় দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত কিছু স্ট্রিটফুড। দক্ষিণ কোরিয়ার ট্টেওকবক্কি (ঝাল ভাতের তৈরী কেক), হট্টেওক (মিষ্টি প্যানকেক), কিম্ব্যাপ (ভাতের তৈরী এক প্রকার খাবার) আর ক্লাসিক চিকেন স্কিওয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত স্ট্রিটফুডগুলোর মধ্যে অন্যতম যার সব কয়টিই পাওয়া যাবে জাগালছিতে।

যাত্রা শুরু করুন দক্ষিণ কোরিয়ার বাকচন হানক গ্রামের দিকে

ছবিঃ theculturetrip.com

এদেশের প্রকৃতির একদম কাছাকাছি যেতে হলে প্রথমেই আধুনিক শহর ছেড়ে ধরতে হবে গ্রামের পথ। তেমনই এক গ্রাম বাকচন হানক। সিউল থেকে খুব কাছেই অবস্থিত এই গ্রামের গোড়াপত্তন শুরু করেছিল জোসিউন রাজবংশ। সেখান থেকে পথচলা শুরু অনিন্দ্য এই গ্রামটির। সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যের অপূর্ব মেলবন্ধনের দেখা মিলবে এখানকার বাড়ি গড়ার ধরনে।
এই গ্রামের প্রতিটি বাড়িকে “হানক” বলা হয় যার প্রতিটি কোরিয়ান স্টাইলে অনন্য এক ভবন-গড়নে তৈরী। সিউলের প্রাণকেন্দ্র নামে পরিচিত এই বাকচন হানকের স্থানীয়দের সাথে আধো আধো ইংরেজীতে কথা বলে যদি কিছু বুঝতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে পাবেন গ্রামটির অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। গ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে তখন জানা যাবে আরো ভালো করে। এখানকার স্থানীয়রা যথেষ্ট অতিথিপরায়ণ বলেই সুপরিচিত।

ডিএমজেড যেতে ভুলে যাবেন না

ছবিঃ media.mnn.com

দক্ষিণ কোরিয়ায় ঘুরতে আসলে ফেরার পথে শেষ দিনগুলোতে অবশ্যই ডিএমজেড ঘুরে যাওয়া উচিত। ডিএমজেড মানে “ডি মিলিটারাইজড জোন” অর্থাৎ যেখানে মিলিটারির আনাগোনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে দক্ষিণ এবং উত্তর কোরিয়া সরকার। দক্ষিণ এবং উত্তর কোরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত এই প্রাকৃতিক জায়গাটিতে আর কিছু পান না পান, শান্তি অবশ্যই পাবেন।
কোনো এক অজানা কারণে এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এক বন্যপ্রাণীর জীবনাচরণ। তাই এখানে ভ্রমণকালে আপনার দেখা হয়ে যেতে পারে বিলুপ্তপ্রায় কিছু প্রাণীর সাথে যাদের এখানে কেউ বিরক্ত করে না। ডিএমজেডের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা হবে অন্যরকম আনন্দের এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা যা সহজে ভুলে যাওয়া যে কারো পক্ষেই অসম্ভব।
ফিচার ইমেজ- orangesmile.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নিরিবিলি পিকনিক স্পটে মজার ভ্রমণ

ভুতিয়ার মায়াবী বিলে পদ্মের সন্ধানে