অন্নপূর্ণা: পর্বত আরোহণের কঠিনতম নাম ও কিছু কারণ

অন্নপূর্নাআর গঠন। ছবিঃ রাহুল তালুকদার।

পৃথিবীর উচ্চতম থেকে শুরু করে কঠিনতম যে পর্বত-ই হোক, জয়ের অদম্য নেশায় মানুষ ঠিকই চড়ে বসেছে মৃত্যুকে জয় করে এসব পর্বতের শৃঙ্গে। কঠিনতম পর্বতগুলো জয় করতে গিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয়েছে হাজার হাজার দুঃসাহসী পর্বত অভিযাত্রীদের৷ শুধু উচ্চতার জন্য নয়, পর্বতের গঠন প্রকৃতির জন্য মধ্য সারির এই পর্বতটি পৃথিবীর সব থেকে কঠিনতম পর্বত হিসেবে স্থান ধরে রেখেছে।

অন্নপূর্ণা মূলত একটি পর্বত নয়, অনেকগুলো চূড়ার সমন্বয়ে এই পর্বতটি একটি স্তুপ আকারের পর্বতের মতো। একটি ৮,০০০ মিটার, ৬,০০০ মিটারের ১৬টি শৃঙ্গ ও ৭,০০০ মিটারের ১৩টি শৃঙ্গ নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। অন্নপূর্ণা ১ নামের ৮০৯১ মিটার তথা ২৬,৫৫০ ফিট উঁচু এই পর্বতটির অবস্থান নেপাল থেকে হিমালয়ের উত্তর দিকে।

১৯৫০ সালে প্রথমবারের মতো অভিজ্ঞ পর্বতারোহী Maurice Herzog অন্নপূর্ণা ১ জয় করেন। ১৯৫০ সালের পর থেকে ২২২ জন দুঃসাহসী অভিযাত্রি এই পর্বতে ওঠার চেষ্টা করেন যার মধ্যে ১৬২ জন পর্বত সফলভাবে জয় করে ফিরে আসতে সক্ষম হন আর বাকি ৬০ জন মৃত্যুবরণ করেন।

দূর থেকে মাউন্ট অন্নপূর্ণা। ছবিঃ রাহুল তালুকদার

উচ্চতার দিক দিয়ে পৃথিবীর ১০ম উচ্চতম এই পর্বত বেশ কিছু কারণে পৃথিবীর সব থেকে কঠিনতম আরোহণ উপযোগী পর্বত। কীভাবে পৃথিবীর দশম উচ্চতম পর্বতটি পর্বতারোহীদের কাছে সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জের উত্তরের জন্য আলোচনার প্রথমেই আসে পর্বতের গঠন প্রকৃতি, অস্থিতিশীল গ্লেসিয়ার, পর্বতের অস্বাভাবিক আবহাওয়া, অতিরিক্ত মৃত্যুহার আর আরোহণের জন্য ব্যবহৃত জটিলতম ট্রেইল৷ তাই এই পর্বত জয়ের জন্য দরকার হয় ভাগ্য আর অমানুষিক পরিশ্রমের।

আরোহণের জন্য কঠিন

যদিও মাউন্ট এভারেস্টের তুলনায় অন্নপূর্ণা এর উচ্চতা কম, কিন্তু গঠনগত দিক দিয়ে অন্নপূর্ণা অত্যন্ত জটিল। কিন্তু গঠনগত দিক দিয়ে অত্যন্ত অনুপযোগী এর আরোহণ রুট।  সরু এবং পিচ্ছিল পাথর আর পুরু বরফের আস্তরণের জন্য ওঠা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। হুট হাট বিশাল বরফধ্বস আর অস্থিতিশীল বরফের আস্তরণের জন্য অনান্য স্বাভাবিক পর্বতারোহনের তুলনায় পাচগুণ বেশী পরিশ্রাম করতে হয় পর্বতারোহীদের।

এছাড়া পদে পদে লুকিয়ে আছে বরফের গভীর খাদ বা ক্রেভার্স। উপর থেকে দেখে বোঝার উপায় থাকে না নিচে কী আছে। এসব লুকানো গভীর খাদের জন্য এই পর্বত আরোহণ অতন্ত বিপজ্জনক।

অতিরিক্ত বরফের আস্তরন আর পর্বতের খাড়া গঠন দুর্বল করে দেবে অভিযাত্রীকে। ছবি:ফাতেহ আলম খান ধ্রুব।

অস্থিতিশীল বিপজ্জনক গ্লেসিয়ার:

অন্নপূর্ণা খুব-ই স্পর্শকাতর গ্লেসিয়ার দিয়ে তৈরি। যখন তখন ফাটল ধরে নেমে আসে প্রাণঘাতী বরফধ্বস। সামান্য জমে থাকা বরফের চাইগুলোর জন্য সামান্য পদাঘাতেই ঘটে থাকে ভয়াবহ বিপর্যয়।

বরফের বিশাল বিশাল খণ্ড চুরমার করে আছড়ে পড়ে পর্বতের গা থেকে। আর এই বিপর্যয়ের আভাস বুঝে ওঠা যায় না আগে থেকে। তাই একমাত্র অন্নপূর্ণাতেই সঠিক আবহাওয়ার অপেক্ষা করতে হয় আরোহণ শুরু করার জন্য। যা পর্বতারোহীদের মূল্যবান সময় ও আত্মবিশ্বাস কেড়ে নিতে থাকে প্রতি মুহুর্তে।

অত্যন্ত অস্থিতিশীল বিশাল গ্লেশিয়ার গুলো পর্বতারোহনের অন্যতম ভয়াবহ বাঁধা। ছবি : রাহুল তালুকদার

দ্রুত পরিবর্বতনশীল আবহাওয়া:

ক্ষণে ক্ষণে অতি পরিবর্তনশীল আবাহাওয়া এই পর্বতকে দূর্ভেদ্য করে রেখেছে অভিযাত্রীদের নাগাল থেকে। অন্নপূর্ণার আবহাওয়া অন্য সকল পর্বতের তুলনায় খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়। হঠাৎ প্রবল তুষারপাত, তুষার ঝড় বা মেঘে ঢেকে যাওয়া যেন প্রতিদিনকার নিয়ম।

এ কারণে অভিযাত্রীদের প্রতি মুহুর্তেই ভুগতে হয় সিদ্ধান্তহীনতায়। সামিটের অংশটুকুতে আবহাওয়া পরিবর্তনের হার সব থেকে বেশী থাকায় চূড়ায় পৌঁছানো সব থেকে কঠিন কাজ হয়ে পড়ে। এই পর্বত অভিযানের সময় হিসেবে এপ্রিল থেকে মে মাসকেই উপযুক্ত হিসেবে ধরা হয়।


খুব দ্রুততম সময়ে আকাশ নীল থেকে কালো হয়ে যায় এই পর্বতে। ছবি : রাহুল তালুকদার

আরোহণের জটিলতম ট্রেইল:

এই পর্বতে ওঠার জন্য ১৯৫০ সালের পর থেকে একটি ট্রেইল বা পথই ব্যবহার করা হয়। অনেকেই নতুন ট্রেইল তৈরি করে ব্যর্থ হয়েছেন বার বার। মৃত্যু সংকুল একটা রাস্তাতেই এই পর্বতে আরোহনের জন্য প্রতিদিনই দরকার হয় নতুন পরিকল্পনার। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথেই নতুন আরোহণের জন্য নতুন রাস্তায় পা বাড়াতে হয় পর্বতারোহীদের।

বিরূপ আবহাওয়ার জন্য প্রতিনিয়তই নতুন দড়ি সংযোজন বা রোপ ফিক্সিংয়ের প্রয়োজন হয়। যার জন্য শেরপাদের প্রয়োজন হয় অনেক বাড়তি সময়। এছাড়া গ্লেসিয়ার, নরম বরফের আস্তরণ, রক ক্লাইম্বিং একত্রে অর্থাৎ মিক্স ক্লাইম্বিং এই উচ্চতায় আরো দুর্গম করে তোলে আরোহণের রাস্তাকে।


অত্যধিক ঢাল ও বিপদসংকুল এই পর্বতে ওঠার পথ। ছবি: রাহুল তালুকদার

অস্বাভাবিক মৃত্যুহার:

প্রায় ৪২% মৃত্যুহার নিয়ে ১৯৫০ সালের পর এই পর্বতে অভিযানে গিয়ে ৬০ জন অভিযাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। গত ৬৮ বছরে মাত্র ১৪২ জন অভিযাত্রী সফলভাবে এই পর্বত অভিযান সম্পন্ন করতে পেরেছেন। তাই মৃত্যুহারের ব্যাপারে মাউন্ট এভারেস্ট বা কে২ এর তুলনায় বেশ বেশী।

প্রত্যেক তিন জন অভিযাত্রীর মধ্যে একজন প্রাণ হারিয়েছেন একজন। এটার জন্য মানসিকভাবে অভিযাত্রীদের প্রস্তুত হতে সময় দরকার হয়। এ কারণেই খুব কম মানুষ এই পর্বত অভিযানে গিয়ে থাকেন।

কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন:

অন্নপূর্ণা অভিযানে যেতে হলে আপনাকে হতে হবে অপ্রতিরোধ্য এবং অর্জন করতে হবে  পর্বতারোহন সম্পর্কে অঢেল জ্ঞান। বিশেষভাবে শারীরিক প্রস্তুতি নিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ব্যয়ামের মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য করে তোলাটাই সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। মাথায় রাখতে হবে পৃথিবীর সব থেকে বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদের ক্ষান্ত করেছে এই  পর্বত।

অনেকেই মাউন্ট এভারেস্ট বা কে টু এর মতোপৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলো জয় করার পর মাউন্ট অন্নপূর্ণার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। তার মানে এই পর্বত জয়ের জন্য আপনাকেও হতে হবে সেরাদের সেরা। অভিজ্ঞতা থাকতে হবে উচ্চ মাত্রার রক ক্লাইম্বিং, আইস ক্লাইম্বিং ও মিক্স ক্লাইম্বিংয়ের। উচ্চমাত্রার প্রশিক্ষণের পর প্রচুর অনুশীলনের পর অর্জন করতে পারবেন এই পর্বত অভিযানের প্রয়োজনীয় জ্ঞ্যন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভরা জ্যোৎস্নায় হাওর বিলাস

মিশন দামতুয়া সাথে মারায়ংতং ক্যাম্পিং