কম খরচে বেশি ভ্রমণের সূত্র!

dav

প্রথম প্রথম ভ্রমণে গিয়ে বুঝতাম না যে আসলে কীভাবে ভ্রমণটাকে আরও বেশী উপভোগ্য করা যায়, কীভাবে সবটুকু সময়কেই কোনো না কোনো অর্জন হিসেবে খাতায় লিপিবদ্ধ করা যায়, কীভাবে পুরো ভ্রমণের সবটুকু সময়ই নতুন কিছু দেখা বা উপভোগ করা যায় আর সেই সাথে ভ্রমণের খরচটাও কিছুটা কমিয়ে আনা যায়?

তবে দিন যত গড়াতে থাকলো, নতুন কোথাও ভ্রমণের আকর্ষণ, আকাঙ্ক্ষা আর অবাধ্যতা যত বাড়তে লাগলো, ধীরে ধীরে নিজের চাহিদার সবটুকুই পূরণ করতে শিখলাম। শিখলাম কীভাবে পুরো ভ্রমণের সবটুকু সময়ই নতুন নতুন অর্জনে ভরে ফেলা যায়, সুখ স্মৃতির বুক পকেট কতটা ভরিয়ে ফেলা যায় হাজারো স্মৃতি দিয়ে, কীভাবে অভিজ্ঞতা হয়ে গেলে অল্প সময়ে বেশী দেখা আর বেশী উপভোগ করার পাশাপাশি খরচ খানিকটা কমিয়ে আনা যায়।

কক্সবাজার,। ছবিঃ তাহসিন সাহেদ

বেশী দেখা আর কম খরচের যে উপায়টা আমি খুঁজে পেয়েছি এবং এটা খুঁজে পাওয়ার পর থেকে সব সময় আমি আমার নিজস্ব এই সূত্রটা মেনে চলি আর তাতে করে দারুণ সফলও হয়েছি এখন পর্যন্ত। এই সূত্রটা প্রথম খুঁজে পাই আমাদের দ্বিতীয় বার সেন্ট মারটিন যাবার পরে। সেবার, সেন্ট মারটিন পৌঁছাই দুপুর নাগাদ। তো হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে বের হব, ঠিক তখনই একজন বলে বসলেন তিনি এখন একটা ভাতঘুম দেবেন, তারপর ঘুম শেষে শেষ বিকেল বা সন্ধ্যায় বীচে যাবেন!

এই কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। বলে কী! এমন দুর্লভ জায়গায় এসে কেউ একটা বেলা ঘুমিয়ে কাটানোর কথা কীভাবে ভাবতে পারে? সেটাও এই আদুরে রোদের ঝকঝকে নীল আকাশের মাঝে, সাথে ঝিরঝিরে বাতাসে বীচের কাছে গিয়ে না বসে থেকে? তার উপরে কিছুটা রাগ করেই আমরা সবাই বেড়িয়ে পড়েছিলাম পুরো সেন্ট মারটিন পায়ে হেঁটে হেঁটে দেখবো বলে, একদম বীচ ধরে ধরে এগিয়ে। আর সেটাই করেছিলাম সেবার। যদিও আমাদের দেখে তিনিও শেষ পর্যন্ত তার ভাতঘুম বাদ দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন একটু পরেই।

সেন্ট মারটিন। ছবিঃ লেখক

আর এই যে না ঘুমিয়ে পুরো সেন্ট মারটিন পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখার জেদ করে বেরিয়ে পড়েছিলাম, সেজন্যই আজও আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত বহুবার সেন্ট মারটিন যাবার পরেও, সেই দিন, সেই বিকেল, সেই সন্ধ্যা আর সেই কেয়া বনের মাঝে পথ হারিয়ে জ্যোৎস্না রাতে হোটেলের উঠানে পৌঁছানোর স্মৃতিটুকুই সবচেয়ে জ্বলজ্বলে আর সুখের, অপার আনন্দের।

এই ভ্রমণ থেকেই আমি উপলব্ধি করে নিয়েছিলাম যে, ভ্রমণে গিয়ে যদি একটি বেলা ঘুমিয়েই থাকি, তাহলে আর এত খরচ করে, কষ্ট করে, সময় নষ্ট করে ভ্রমণে গিয়ে কী লাভ? ঘুমিয়েই যদি থাকবো সে তো নিজের বিছানাতেই আরামে ঘুমাতে পারতাম। এরপর থেকেই আমি যখন আর যেখানেই বেড়াতে গিয়েছি আমার একটা অন্যতম নিজস্ব নিয়ম বা সূত্র হলো ভ্রমণে গিয়ে রুমে নয়, বাইরে থাকতে হবে। সেটা যে পাহাড় বা সমুদ্রই হতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

হতে পারে, কোনো নদী, খাল, বিল, মাঠ-ঘাট এমনকি ফাঁকা কোনো রাস্তা হলেও আমার ক্ষতি নেই। কারণ দেখার তো কোনো শেষ নেই, আর কখন কী দেখে, নতুন একটা গল্প পেয়ে যাই কে জানে? তাই আমি ভ্রমণে গিয়ে তখনই রুমে ফিরি, যখন আমার পা দুটো আর চলে না, আমি নিজেকে আর বইতে পারি না, চোখ দুটো ঘুমে নিজ থেকেই বন্ধ হয়ে যায় বারে বারে।

দার্জিলিং। ছবিঃ লেখক

আর সেই সাথে সান্দাকফু ট্রেক থেকে শুরু হয়েছিল বেশী বেশী বাইরের রূপ উপভোগের সাথে কম-কম খরচের একটা অনন্য উপায়। আমার সকল ভ্রমণে আমি সাধারণত খুব খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে যাই কোনো প্রকার এলার্ম বা কারো সাহায্য ছাড়াই। বাইরের প্রকৃতিই এক্ষেত্রে আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু, কারণ সে আমার ঘুম নিজ থেকেই ভাঙিয়ে দেয় নিয়মিত। ব্যস বেরিয়ে পড়ি ঝটপট, নিজে বা সবাইকে নিয়ে, যদি সাথে কেউ থেকে থাকে।

এক্ষেত্রে আমরা যেটা করি, সকালের অংশে ঘুরতে ঘুরতেই এদিক ওদিক চোখ রাখি ভালো আর ভারী সকালের মনের মতো নাস্তা কোথাও পাওয়া যায় কিনা? যদি নিজেদের মনের মত ভারী কোনো নাস্তা আমরা পেয়ে যাই, সেটাই সবাই বেশ ভালো করে পেট পুরে খেয়ে নেই, একটু বেশী বেলায় হলেও চেষ্টা করি খুঁজে পেতে। যেন এই নাস্তা দিয়েই দুপুরে ক্ষুধার কিছুটা প্রশমিত করা যায়। যেন দুপুরের খাবারের জন্য আলাদা সময় নষ্ট না করে হালকা কিছু স্ন্যাক্স, চা বা কফি, চলতি পথে দুই একটি ফল খেয়েই যেন দুপুরটা কাটিয়ে দিতে পারি আরও বেশী দেখে আর উপভোগ করে।

ফোরট অ্যাগোণ্ডা, গোয়া। ছবিঃ লেখক

কারণ বেশ কয়েকবার পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে দুপুরের জন্য যদি আলাদা করে লাঞ্চ টাইম রাখা হয়, তাহলে পুরো একটা বেলায় শুধু খেতেই চলে যায়! কীভাবে? দুপুরের ফুল ডিশ খাবার খেতে গেলে সাধারণত অর্ডার দেয়ার পরেও ২০/৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। এরপর খাবার পরিবেশিত হলে আয়েশ করে সেসব খেতে লাগে আরও অন্তত ২০/৩০ মিনিট। গেল এক ঘণ্টা চলে। আর যদি একটু খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন দুপুরে পেট পুরে খাওয়ার পরে সাধারণত কোথাও বের হওয়া যায় না একটু বিশ্রাম না নিয়ে।

সেক্ষেত্রে গেল আরও ৩০-৪০ মিনিট, কখনো একটু কমবেশি। তার মানে এই দুপুরের খাবারের জন্য অন্তত দুই ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়ে যায়! আর যদি দুপুরের খাবার অর্ডার দেবার পরে সেগুলো তৈরি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় তাহলে আরও ৩০-৪০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে কমপক্ষে। তাহলে ২-৩ ঘণ্টা যদি দুপুরের খাবারেই চলে যায় এক বেলার আর বাকি রইলো কী? তাহলে কী খেতে এসেছি? নাকি বেড়াতে, ঘুরতে, দেখতে?

ডিনারের ভারী খাবার, কেরালা। ছবিঃ লেখক 

তাই আমরা সব সময় চেষ্টা করি সকালে বেশ ভালো খেয়ে, দুপুরে চলতি পথেই হালকা কিছু খেয়ে সময় আর অর্থ দুই-ই বাঁচিয়ে বেশী বেশী আমাদের ভ্রমণ উপভোগ করতে। অথবা সকালে যদি তেমন কিছু না পাই, তবে চেষ্টা করি, সকালে হালকা চা-বিস্কিট খেয়ে সকাল আর দুপুরের মধ্যের কোনো একটা সময়, এমন কোনো জায়গা খুঁজে বের করতে যেখানে একই সাথে প্রকৃতি উপভোগের পাশাপাশি খাওয়াও যাবে। যেন খাওয়া, দেখা আর সময় বাঁচানো সবগুলোই একই সাথে হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে সারাদিন ইচ্ছামতো ঘুরে সন্ধ্যায় দিনের বেড়ানো শেষ করে হোটেলে ফেরার আগেই রাতের ভরপুর ডিনার করে নেই।

এইভাবে আমাদের ভ্রমণেগুলোতে সাধারণত দুইবেলা খাবার খাওয়া হয়ে থাকে সব সময়ই। যে কারণে এক বেলার খাবার টাকা অনায়াসে বেঁচে যায়, আর যে সময়টা খাবারের জন্য নষ্ট হতো সেই সময়টা নতুন নতুন জায়গা আর প্রকৃতি অনেক বেশী উপভোগ করা যায়। সেই সাথে কমে যায় ভ্রমণের খরচের অর্থও। যেটা আমরা সব সময় করে থাকি। আর এখন আমার সাথে, আমার ভ্রমণ দলে যারা থাকে এমনকি আমার পরিবারও এই সূত্র মেনে চলতে শিখে গেছে। যা আমাদের অল্প খরচে বেশী বেশী ভ্রমণের দারুণ উপায় হয়ে গেছে।  

মুঘল গার্ডেন, কাশ্মীর। ছবিঃ লেখক

এই হলো আমাদের অল্প খেয়ে, কম খরচে বেশী ঘুরে বেড়াবার ব্যক্তিগত উপায় বা সূত্র। যদিও সবাই এটা পারবে না, এটা সবার জন্য নয়। যারা ভ্রমণ পাগল, যাদের অর্থ আর সময় কম, কিন্তু মানিয়ে নিতে পারে যে কোনো পরিস্থিতির সাথে, এই সুত্র তাদের জন্য।

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. দাদা, খুব সুন্দর করে গুছিয়ে লিখেছেন। আমি নিজেও খুব-খুব চেষ্টা করি যতটা অল্প খরচে ঘোরা যায়। সেক্ষেত্রে, আমি ধরমশালায় থাকার চেষ্টা করি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধরমশালা গুলোতে খাবারের ব্যবস্থা থাকে। সেখান থেকে খেতে পারলে, খুব কম খরচে খাওয়া হয়ে যায়।
    দ্বিতীয় তো, যদি শুকনো খাবার যেমন মুড়ি, চিড়ে, গুঁড়ো দুধ, বিস্কিট প্রভৃতি খেয়ে একটা বেলা কাটানোর মতো সক্ষমতা থাকে, তাহলেও খরচ একটু কমানো যায়। মনে রাখতে হবে, দৈনিক পুষ্টির অভাব যেন না ঘটে। তাই, সবজায়গায়তেই কলা, ডিম পাওয়া যাবে। সেগুলো খাওয়া যেতে পারে। এই পদ্ধতি মাথায় রেখেই, আমি চারটি দেশও ঘুরে এসেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিস্তীর্ণ মুপ্পোছড়া ও প্রশান্তির ন'কাটা ঝর্ণা

ব্যাংককের নতুন শপিং রাজ্য "আইকন সিয়াম"