ভ্রমণে জীপ রিজার্ভ, শেয়ার নাকি পাবলিক বাস?

আমরা যারা প্রায় সময়েই, সুযোগ পেলেই কোথাও না কোথাও বেরিয়ে পড়ি, একা, বন্ধু-বান্ধব বা পরিবার নিয়ে তারা এই ভ্রমণকালীন সময়ে ট্রান্সপোর্ট নিয়ে নানা রকম দুশ্চিন্তায় থাকি। অনেকেই নানা জায়গায় যাওয়ার আগে আমাকে নানাভাবে এই প্রশ্ন করেছে। আর আমার এখন পর্যন্ত একা, বন্ধুদের নিয়ে, পরিবার নিয়ে আর একত্রে একাধিক পরিবার নিয়েও দেশের আর দেশের বাইরে ভারতের নানা জায়গায় যাওয়া হয়েছে। তো সেই নানা সময়ের, নানা রকম জায়গায় নানা রকম যানবাহনের সবগুলো অভিজ্ঞতার সমন্বয় করে যেটা পেলাম সেটা নির্ভর করে অনেকগুলো বিষয়ের উপরে আর আপনার ভ্রমণের ধরনের উপরে।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে স্বাভাবিকভাবেই যে ভ্রমণের আবার ধরন কী রে ভাই? যাবো, গাড়ি ভাড়া নেব, খাবো, বেড়াব, ছবি তুলব, ঘুমাব আর তারপর সময় শেষ হয়ে গেলে ফেরার পথ ধরবো।

হুম আপনি ঠিক আছেন, আবার ঠিক নেই-ও! কীভাবে?

ক্যাপশন? ছবিতেই আছে! ছবিঃ লেখক 

দেখুন আজকাল ভ্রমণ আর শুধু গেলাম, দেখলাম, ছবি তুললাম, খেলাম আর ঘুমালাম এইটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভ্রমণ এখন আধুনিক জীবনযাপনের একটা অন্যতম অনুষঙ্গ, ভ্রমণ এখন ব্যস্ত জীবনের কর্মের প্রেরণা, ভ্রমণ এখন আগামী দিনগুলোর সুখের অ্যালবাম, ভ্রমণ এখন বৃদ্ধ বয়সের ধূসর আকাশে ঝিকিমিকি তারা, ভ্রমণ এখন দুঃখ-কষ্ট-হতাশা আর ব্যর্থতা ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করার প্রেষণা।

হ্যাঁ তাই, সত্যি আমি তাই-ই মনে করি। ভ্রমণ এখন আর শুধু ভ্রমণ নয়। ভ্রমণ এখন অনেক কিছুর। জীবন, জীবনের দর্শন, বোধ, চিন্তা-চেতনা, মানসিকতা বদলে দেবার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ভ্রমণের। আপনারা যারা নিয়মিত ভ্রমণ করেন তারা নিজের কথা, নিজেদের বদলে যাওয়ার ব্যাপারগুলো একটু তলিয়ে দেখলেই দেখতে পাবেন কতটা সত্য বা মিথ্যা বললাম বা বানিয়ে বানিয়ে বললাম? নাহ, এটা আমার অনুভূতি, উপলব্ধি আর আমার অল্প অভিজ্ঞতায় দেখা।

তাই ব্যক্তিভেদে ভ্রমণের ধরন যদি খুঁজতে যাই, তাহলে দেখতে পাই যে, কেউ কেউ ভ্রমণে যাই শুধু ভ্রমণে যাই এইটুকু বলে নিজের মতো করে সুখ পেতে। দুইদিন কোথাও থেকে, খেয়ে, একটু ঘুরে আর ছবি তুলেই তার ভ্রমণ শেষ হয়ে যায়।

শেয়ার জীপ। ছবিঃ লেখক 

কেউ ভ্রমণে যায় নানা রকম নতুন নতুন আর অচেনা জায়গা দেখতে, উপভোগ করতে আর নতুন কিছুর স্বাদ নিতে।

কেউ ভ্রমণে যায় নানা রকম জীববৈচিত্রের ছবি তুলতে, প্রকৃতির ছবি নিজের চোখে দেখে ক্যামেরায় ধরে রাখতে।

কেউ ভ্রমণে যায় পুরাতাত্ত্বিক টানে, প্রাচীন নানা রকম ইতিহাসের আকর্ষণে, মোহগ্রস্ত হয়ে।

আর কেউ কেউ ভ্রমণে যায় শুধু দেখতে নয়, খেতে আর ঘুমোতে নয়, তারা ভ্রমণে যায় নানা রকম ভাষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, মানুষ আর তাদের জীবনাচারণ দেখতে, বুঝতে আর নিজের মতো করে সেগুলো উপভোগ করতে।

এছাড়াও আরও নানা রকম উদ্দেশ্যে মানুষ ভ্রমণে যায়। তো এই ধরনগুলোর উপর নির্ভর করে আসলে আপনি কী ধরনের বাহন আর কী রকম খরচে সেগুলো ব্যবহার করে নিজের ভ্রমণের সুখটুকু উপভোগ করতে চান।

এই ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা যা বলে সেটা হলো-

যদি পরিবার এবং সাথে ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথাও ভ্রমণে যান সেক্ষেত্রে সব সময় কম টাকা খরচের চিন্তা না করে একটু বেশী খরচ হলেও সম্ভব হলে জীপ, কার বা মাইক্রো ভাড়া করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে নিজেদের ইচ্ছামতো থেমে থেমে আর দর্শনীয় জায়গাগুলো নিজেদের মতো করে দেখে দেখে যাওয়া যেতে পারে।

ভাড়ায় চালিত ছোট পরিবারের জন্য কার। ছবিঃ লেখক 

আবার এই একই রকম গাড়ি, জীপ বা কার রিজার্ভ করতে পারেন দল বেঁধে কোথাও যাবার ক্ষেত্রেও। ৪/৬/৮ জনের বা এরচেয়ে বেশী জনের গ্রুপ হলেও। সেক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় বাসের সমপরিমাণ ভাড়াতেই নিজেদের একটা জীপ হয়ে যায়। তখন নিজেদের মতো করে পুরো জার্নিটা উপভোগ করা যায়। নিজেদের ইচ্ছামতো থামা যায়, থাকা যায় আর দেরি করলেও কোনো সমস্যা হয় না।

এরপর যেটা বেটার অপশন, সেটা হলো শেয়ার জীপ। হ্যাঁ, এটা কম খরচে, দূরের গন্ত্যব্যে দ্রুত যেতে সবচেয়ে ভালো একটা মাধ্যম আমার মনে হয়েছে। কিন্তু এই অপশনটা তাদের জন্যই ভালো যারা সংখ্যায় কম, দুই বা তিনজনের বেশী নয়। আবার তাদের প্রত্যেকেই হতে হবে সমমনা এবং কিছুটা ছাড় দেয়ার ও কষ্ট করার মানসিকতা।

শেয়ার জীপে বিলাসিতার কোনো সুযোগ নেই। নিজের ইচ্ছামতো সব সময় জানালার পাশে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনাও কম, কিছুটা চাপাচাপি করে বসে যেতে হতে পারে, এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে যদি মানিয়ে নিতে পারেন তবে শেয়ার জীপ বেটার নয় বেষ্ট অপশন অল্প খরচে, কম সময়ে, দূরের গন্ত্যব্যে যাওয়ার জন্য।

নানা রকম স্বাদ নিতে পাবলিক বাস অসাধারণ। ছবিঃ লেখক 

আর একদম শেষে বলা যেতে পারে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, বিশেষ করে বাস বা মেইল ও লোকাল ট্রেনের কথা। এই অপশনটা খুব কম কিন্তু কিছু বিশেষ মানসিকতার আর ধরনের মানুষের জন্য।

সেটা কেমন?

সেটা হলো এই অপশনটা হলো সর্বপ্রথমে তাদের জন্য যারা খুবই কম খরচে বেড়াতে বা কোথাও ভ্রমণে যান।

দুই, এই অপশনটা হলো তাদের জন্য যারা ভ্রমণে শুধু দেখতে, খেতে, ছবি তুলতে আর ঘুমোতে যান না। যারা ভ্রমণে যান, নিজের মতো করে যেখানে খুশি সেখানে যেতে, যতটা পারা যায় ততটা যেতে, যেভাবে যাবে সেভাবে যেতে। যাদের কোথাও যাবার তেমন কোনো তাড়া নেই, বা থাকলেও যেতে না পারলেও যাদের তেমন কোনো ক্ষতি নেই।

আর এই অপশনটা হলো তাদের জন্য, যারা ভ্রমণে যান, প্রকৃতি, স্থাপনা আর পাহাড় বা সমুদ্র দেখার পাশাপাশি সেই জায়গার মানুষ দেখতে, তাদের একটু বুঝতে, সেই জায়গার পরিবেশ, ভাষা, সংস্কৃতি, মানুষের আচার আচরণ, খাদ্য সহ নানা রকম জীবন যাপন দেখতে।

সবশেষে বলবো এই অপশনটা তাদের জন্য যাদের কাছে ভ্রমণটা সত্যিকারের একটা নেশা, যাদের কাছে ভ্রমণ একটা প্যাশন, যাদের কাছে ভ্রমণ মানে নতুন কিছুর অনুপ্রেরণা, যাদের কাছে ভ্রমণ হলো নিজের মতো করে বেঁচে থাকার প্রেষণা।

স্লিপার ক্লাস ট্রেনও হতে পারে দারুণ বাহন। 

এই অপশনটা তাদের জন্যই ভ্রমণ যাদের কাছে জীবনটা উপভোগের, সুখের স্মৃতি জমানোর, নিজের কাছে নিজের হাসার, কাঁদার আর নিজের জন্য নিজের কিছু করার।

এখন আপনি কোন ধরনের ভ্রমণে বের হচ্ছেন সেটা আপনি-ই ভালো বুঝবেন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র ফয়েজ লেক ভ্রমণের আদ্যোপান্ত

লাটাগুড়ির শিশির ভেজা স্বপ্নের সকাল