ভ্রমণের সময় ক্যামেরা ও গিয়ার নির্বাচন সম্পর্কিত টিপস

ভ্রমণের সময় এটি অনেক বড় একটি ফারাক তৈরি করতে পারে যে, ছবি তোলার জন্য কী ধরনের সরঞ্জাম আপনার সাথে করে নিচ্ছেন। কোথাও কোথাও আলোর স্বল্পতার মধ্যে ছবি তুলতে হবে, হয়তো আপনার একটি ক্যামেরা দরকার যাতে বড় একটি সেন্সর এবং ভালো লেন্স এবং ওয়াইড অ্যাপাচার আছে। এর জন্য দেখা যায় খেলাধুলা এবং বিবাহের ছবি তোলার জন্য ফটোগ্রাফাররা খুব দামী এবং খুব ভালো ভালো ইকুইপমেন্ট বহন করছেন।

কিন্তু ট্রাভেলের ক্ষেত্রে এই জিনিসগুলো ঠিকঠাক ভাবে কাজে দেবে না। কারণ ট্রাভেলের বিষয়টি পুরোপুরি আলাদা। বরং এখানে সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এটি, আপনার বাজেট, আপনার দক্ষতা এবং কোনটি আপনার জন্য সব থেকে বেশি প্রয়োজন সেটি নির্বাচন করা।


কী পরিমাণ খরচ করবেন ক্যামেরার জন্য

আসলে যে ইকুইপমেন্টটি আপনার বাজেট সীমার মধ্যে নেই, সেটি নিয়ে বার বার রিসার্চ করার কোনো প্রয়োজন নেই। নিজে ক্যামেরার জন্য একটি বাজেট নির্ধারণ করুন এবং অবশ্যই মাথায় রাখবেন মেমোরি কার্ড, ব্যাটারি, ফিল্টার এবং অন্যান্য ইকুইপমেন্ট কেনার মতো একটি ফান্ড যেন আপনার কাছে আলাদাভাবে গচ্ছিত থাকে।

ক্যামেরার জন্য আপনি বিভিন্নভাবে বাজেট রেডি করতে পারেন। যেমন খুব স্বল্প বাজেটের ভেতর ১২,০০০ থেকে ২৪,০০০ টাকায়, এরপর একটু যদি বাজেট বেশি হয় তাহলে ২৪ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকায় এবং মিড রেঞ্জের ভেতর ৪০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়, যদি খুব হাই রেঞ্জ হয় তাহলে এক লক্ষ টাকা বা তার অধিক।


বহন উপযোগী ক্যামেরা নির্বাচন

ওজন ভ্রমণের সময় ওজন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এটা যে কোনো না কোনোভাবে আপনাকে মানতেই হবে। হয়তো আপনি আপনার ইচ্ছা মতো ছবি তুলতে পারবেন বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল বিভিন্ন অ্যাপাচার বিভিন্ন ধরনের লেন্স ব্যবহার করে, কিন্তু ওই লেন্স এবং ক্যামেরার ওজন আপনাকেই বহন করতে হবে। যদি সাদামাটাভাবেই ভ্রমণ করার ইচ্ছা থাকে তাহলে আপনি ফোন ব্যবহার করতে পারেন। ফোনে এখন ভালো ছবি তোলার জন্য যথেষ্ট রকম ফিচার থাকে।

এছাড়া আপনি যদি প্রফেশনালি এবং ফটোগ্রাফিতে বিশেষ সতর্ক এবং আগ্রহী হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনাকে এমন কিছু ক্যামেরা বহন করতে হবে, যেটি বহন করতে গিয়ে আপনার ভ্রমণের স্বাভাবিকতা নষ্ট হবে না। ভ্রমণের স্বাভাবিকতা নষ্ট হলে ভ্রমণে স্বাতন্ত্র্যতা থাকে না।


প্রথমত ওজন কমাতে আপনি বড় ডিএসএলআর ক্যামেরাগুলোকে পাশে রেখে মিরর লেস ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারেন। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজন আপনাকে বহন করতে হবে না। মিররলেস ক্যামেরার লেন্সগুলো ছোট হয় বলে স্বাভাবিকভাবেই বেশ কম ওজনের হয়ে থাকে। ট্রাভেলের সময় আমি বেশ কিছু মানুষ দেখেছি যারা ২-৩ লক্ষ টাকার ভারী ক্যামেরার সাথে বহন করে, শুধুমাত্র অটো মুডে ছবি তুলেছেন।

সেক্ষেত্রে যদি তারা একটি ভালো ক্যামেরা যুক্ত ফোন ব্যবহার করতেন আমার মতে তারা ওই ক্যামেরা থেকে ভালো ছবি পেতেন। কোথাও ভ্রমণ করতে যাওয়ার আগে অবশ্যই দেখে নেবেন, কী পরিমাণ ওজন আপনি বহন করতে পারবেন এবং সেখানের পরিবেশ অনুযায়ী উপযোগী ক্যামেরা বাছাই করেছেন কি না।

ট্রাভেলের উপযোগী কিছু ক্যামেরা

ভালো ও খারাপ ক্যামেরার মধ্যে আসল পার্থক্য হচ্ছে ক্যামেরার সেন্সর এবং সেন্সরের সাইজ। যে ক্যামেরার সেন্সরের আকার যত বড় হবে ক্যামেরা তত ভালো পারফর্ম করবে, কম আলোয় ভালো ছবি তুলবে এবং স্বাভাবিকভাবেই এর দাম বেশি হবে।



(নিচে আমি কিছু ফোন থেকে শুরু করে ডিএসএলআরের ক্যামেরা কনফিগারেশন সহ বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করছি)

  • গুগোল পিক্সেল টু: ফটোগ্রাফির জন্য এই ফোনের ক্যামেরা বিশ্বের সব থেকে রিলায়েবল বলেই ব্যবহৃত হয়। এটিতে রয়েছে ফুল ম্যানুয়েল ফটোগ্রাফি সিস্টেম। 1.4 অ্যাপাচারের লেন্স, এছাড়া আছে র ছবি শুট করার মতো ক্ষমতা। আছে অপটিক্যাল ইমেজ স্টাবিলিজেশন এবং কম আলোতে খুব ভালো মানের ছবি তুলতে এই ফোনটি বেশ ভালো কাজে দেয়।
  • আইফোন এক্স: এই ফোনটিও আপনি ব্যবহার করতে পারেন ছবি তোলার ক্ষেত্রে। এটিতেও রয়েছে ওয়ান পয়েন্ট এইট অ্যাপাচার এর লেন্স, যার ফলে কম আলোতে খুব ভালো ছবি তোলার ক্ষমতা আছে এই ফোনের।
  • ক্যানন পাওয়ার শট alpha-1 90 এ আই এস: খুব স্বল্প বাজেট হলে মাত্র ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে এই ক্যামেরাটি কিনে নিতে পারেন। এটিতে আছে 12x অপটিক্যাল জুম এবং খুব সহজেই আপনার পকেটে ধরে যাবে।

  • গো প্রো হিরো 7 ব্লাক: এই কোম্পানির উৎপাদনকারীরা সব সময় ট্রাভেলের বিষয়টি মাথায় রেখেই ক্যামেরা উৎপাদন করে। যেমন- যেকোনো পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা, অতিরিক্ত গরম, পানির নিচে, বিভিন্ন জায়গায় আপনি এটা দিয়ে ছবি এবং অতি উন্নত রেজুলেশনের ভিডিও ধারণ করতে পারবেন। এটি খুবই ছোট আকৃতির হয় এবং সহজেই যে কোনো পকেটে ঢুকে যাওয়ার মতো ঘরে তৈরি করা হয়েছে। যেগুলো মোটামুটি ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে কিনে নিতে পারবেন।
  • সনি আলফা এ৬৩০০/এ৬০০০: ছোট আকৃতির মিরর লেস ক্যামেরা হিসেবে সনি আলফা সিরিজ বর্তমান বিশ্বে খুব খ্যাতি অর্জন করেছে। সহজেই পকেটে ধরে যাওয়ার মতো এবং হাতের মধ্যে চলে আসার মতো ক্যামেরা রয়েছে, খুবই দ্রুত গতিসম্পন্ন শাটার স্পিড, খুবই নিম্ন অ্যাপাচারে ছবি তোলার ক্ষমতা এবং যেকোনো পরিবেশে ছবি তোলার মতো ফিচার।
  • ক্যানন Eos 6D mark2: এই ক্যামেরাটি সাইজে বড় এবং ওজনে ভারী হলেও খুবই কম আলোয় এবং সব ধরনের পারিপার্শ্বিক সিচুয়েশনে ছবি তোলার এক অপরূপ ক্ষমতা রয়েছে। ফুল ফ্রেম সেন্সর যুক্ত এই ক্যামেরাটি বেশ দামি। বাংলাদেশী টাকায় কমপক্ষে ২ থেকে ৩ লাখ টাকার মতো।

ক্যামেরার জন্য লেন্স নির্বাচন

লেন্স নির্বাচন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্যামেরা যে ধরনেরই হোক না কেন, যেখানে ভ্রমণ করতে যাবেন সেখানকার পরিবেশ উপযোগী লেন্স যদি না হয় তাহলে কোনো ছবি মনঃপুত হবে না। যেমন, বিশাল ল্যান্ডস্কেপ তোলার ক্ষেত্রে যদি জুম লেন্স নিয়ে যাওয়া হয় তাহলেই বিপাকে পড়বেন। তাই কোথায় কোন লেন্স নিয়ে যাবেন সেটি নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার।

আমি ভ্রমণের সময় যে ধরনের লেন্স সাথে নেয়ার চেষ্টা করি:

  • একটি প্রাইম লেন্স। যেটাতে ফোকাল লেন্থ ফিক্সড থাকবে এবং ৫৫ মিলিমিটারের লেন্স হলে ভালো হয়। যার অ্যাপাচার সর্বনিম্ন ওয়ান পয়েন্ট এইট হলে ভালো হয়। মানুষের ছবি এবং খাবারের ছবি তোলার জন্য উপযুক্ত হলেই হবে।
  • একটি ছোট এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন ওয়াক এরাউন্ড জুম লেন্স। যেটি আপনাকে ওয়াইড ল্যান্ডস্কেপ এবং ক্লোজ পোর্টেট নিতে সাহায্য করবে। যেমন, ২৪-১০৫ মিলিমিটার।

এছাড়া যে যে সরঞ্জাম সম্পর্কে আপনাকে সচেতন থাকতে হবে:

  • অতিরিক্ত ব্যাটারি: ভ্রমণে যাওয়ার আগে অবশ্যই চেষ্টা করবেন একটি এক্সট্রা ব্যাটারি নেয়ার জন্য। কারণ প্রতিটি ক্যামেরার ব্যাটারি ৩০০ থেকে ৫০০টি ছবি নেওয়ার পর ডাউন হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে কিছু কিছু জায়গায় যদি আপনি সেটাকে রিচার্জ করতে না পারেন অথবা ছবি তোলার মাঝখানে যদি ব্যাটারী শেষ হয়ে যায় এক্ষেত্রে অনেক ভালো ভালো মুহূর্ত মিস হয়ে যেতে পারে।
  • অতিরিক্ত হার্ড ড্রাইভ: আপনার স্টোরেজ ডিভাইসের ক্যাপাসিটি অনুযায়ী অবশ্যই আপনাকে অতিরিক্ত ছবি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন কোনো স্টোরেজ সাথে রাখতে হবে।

  • ফিল্টার্স: ক্যামেরার লেন্সগুলো সাধারণত বেশ দামী হয়। তাই সেগুলোকে রক্ষা করাটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এক্ষেত্রে ফিল্টার ব্যবহার করতে পারেন। ক্যামেরা ফিল্টার ব্যবহার করার ফলে আপনি আলট্রাভায়োলেট রশ্মি, ধুলোবালি থেকে আপনার ক্যামেরা এবং লেন্স দুটিকে রক্ষা করতে পারবেন।
  • মেমোরি কার্ড: মেমোরি কার্ডের দাম তুলনামূলকভাবে কম, তাই চেষ্টা করবেন অতিরিক্ত কিছু মেমোরি কার্ড সাথে রাখার। সাধারণত মেমোরি কার্ডগুলো ৩২ জিবি থেকে ৬৪ জিবি পর্যন্ত হয় এছাড়া ১২৮ জিবি এর উপরেও কিছু মেমোরি কার্ড বর্তমান বাজারে পাওয়া যায়।
  • ট্রাইপড: ভ্রমণের সময় ট্রাইপড মূলত একটি বোঝার মতো হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বিভিন্ন পরিস্থিতি অনুযায়ী ল্যান্ডস্কেপ এবং লং-এক্সপোজার ছবি তোলার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত জরুরী। তাই যদি অতিরিক্ত ওজন বহন করার মতো অবস্থা থাকে তাহলে অবশ্যই ট্রাইপড বহন করার চেষ্টা করবেন।

এবং সব শেষের কথা হচ্ছে, অবশ্যই ট্রাভেলের আগে আপনার ক্যামেরাটি ভালোভাবে প্যাক করতে ভুলবেন না। ক্যামেরার ব্যাগ এবং ক্যামেরার সকল ইকুইপমেন্টগুলো যাতে সহজেই আপনার হাতের কাছে থাকে, অথবা দরকারের সময় সহজেই সেটাকে খুঁজে পাওয়া যায়, সেভাবে ব্যাগের মধ্যে এগুলোকে রেখে তারপর বহন করবেন। এছাড়া বাজেট ট্রাভেলারদের ক্ষেত্রে যদি বাজেটে সমস্যা থাকে, এমন কোনো কথা নেই ভালো ছবি তোলার জন্য দামি ক্যামেরা ব্যবহার করতে হবে।

ভালো ছবি তোলার জন্য আপনার ছবি তোলার দক্ষতাই  আপনাকে সাধারণ ক্যামেরা দিয়েই ভালো ছবি তোলার সামর্থ্য যোগাবে। এছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবহার করেও বর্তমান খুব ভালো মানের ছবি তোলা যায়। তাই চেষ্টা করবেন ভালো ক্যামেরা যুক্ত একটি মোবাইল ফোন সাথে নেবার। পরিস্থিতি অনুযায়ী যদি ক্যামেরা নষ্ট হয়ে যায় বা ক্যামেরার ব্যাটারী শেষ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে যেন বাড়তি একটি অপশন আপনার কাছে থাকে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পাইন বনের মধ্যে দিয়ে লাভার পথে ঘাটে

গোমুখ অভিযান: মুশৌরির পথে, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে