তিনাপ সাইতার– এক রোমাঞ্চকর যাত্রা: ঘরে ফেরার বার্তা

যাতিলুয়ি বা তেগাল্লালাং রাইস ট্যারেসেস; source;putubalitourguide.com

শেষ দিন: (রনিনপাড়া – পাইক্ষ্যংপাড়া – রোয়াংছড়ি – বান্দরবান শহর)

আগের দিন রাতেই টনির সাথে কথা বলে রেখেছিলাম, আমরা খুব ভোরে বের হয়ে যাব। সে অনুযায়ী শুকনো খাবার ও কলা কিনে রাখলাম। প্রবাদ আছে পাহাড়ে যত সকালে বের হবে তত রোদের তাপ কম পাবে৷ তাই আমরা সকালের নাস্তা বির্সজন দিয়ে ভোর ৬টায় রওনা দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। প্রথম ডেস্টিনেশন পয়েন্ট যাত্রী ছাউনি পর্যন্ত যেতে পারলে আর পাহাড়ে উঠতে হবে না, এরপর খালি নামার রাস্তা।

খুব ভোরে ঘুম ভাঙার দরুণ সবাইকে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠিয়ে দিলাম। শাহীন, বাবু ভাই আগের দিন আমাদের সাথে তিনাপ না যাওয়ায় বেশ ঝরঝরে কন্ডিশনে আছেন। মুখ, হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে সকাল ৬টা বেজে গেল৷ এর মধ্যে টনিও এসে পড়লো। বের হবার আগ মুর্হুতেই বুঝি সবার টাট্টির বেগ চাপে৷ টাট্টিখানার লম্বা সিরিয়াল শেষ করে ঠিক ৬.১৮ তে রনিনপাড়া থেকে যাত্রা শুরু করলাম। বিদায় বেলায় পাড়াটা ভালভাবে দেখে নিচ্ছি। বিদায় রনিনপাড়া, স্মৃতিপটে বেঁচে রবে বহুদিন।

দূরে দেখা যায় আকাশের নীল। ছবিঃ লেখক।

পাড়া থেকে বের হতেই আমাদের ২০ মিনিটের মতো লাগল৷ পাহাড়ে খুব সকালেই সূর্য উঠে যায়। তবে এই মিষ্টি রোদের তাপ সহনীয় পর্যায়ে আছে। তাই হাঁটার গতি বেশ ভালো৷ আজকে কোনো তাড়া নেই, কোনো মায়া নেই। ধীরে সুস্থে যাচ্ছে আমাদের আনলাকি থারটিন কাফেলা দল। আজকে বাবু ভাইয়ের স্পীড দেখে আমি হতবাক, আমাদের সবার আগে যাচ্ছেন উনি৷ আর কিছুদূর আগানোর পর এসে গেলাম সেই খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে৷ এবার শুধু ওঠো।

জগৎটা একটা দমের খেলা। দম মারো, ওপরে ওঠো৷ এই সাত সকালে উপরে উঠতে গিয়ে চিকন ঘাম বের হয়ে গেল৷ অল্প অল্প পানিতে ঢোক দিচ্ছি আর ওপরে উঠছি। কতক্ষণ ধরে ওপরে উঠছি মনে নেই। তবে কিছুক্ষন পর ছায়া দেখে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে কলা, বিস্কুট খেয়ে নিলাম। এখান থেকে আবার উপরে ওঠা শুরু করলাম। এক সময়ে পৌঁছে গেলাম আমাদের প্রথম ডেস্টিনেশন যাত্রী ছাউনি।

আজ হব আমি ধংস। ছবিঃ ঈসমাইল হোসেন।

এবার শুধু নিচে নামা। আর ঘড়িতে বাজে মাত্র ৭.৩০। উপরে উঠে যেমন বুক ধড়ফড় করে, নিচে নামতে পায়ের উপর প্রেসার পড়ে৷ অনেক সময় ঢাল বেশি হলে ব্যালেন্স করা যায় না। আরও আধা ঘন্টা হাঁটার পর রোদের তাপ একটু একটু টের পাওয়া শুরু করলাম। গাড়ির রাস্তা তাই নামতে অত বেগ পেতে হচ্ছে না। এভাবে প্রায় ২ ঘন্টা নামার পর পৌঁছে গেলাম পাইক্ষ্যংপাড়া। যেহেতু নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এসে পড়েছি, এবার সময় নিয়ে রেস্ট নেবার পালা৷ পাড়া ঢোকার মুখে লাইন ধরে কল থেকে সবাই পানি খেলাম। বোতলে পানি রিফিল করে নিলাম।

এরপর পাড়ার চায়ের দোকানে ঢুকে প্রথমে হামলে পড়লাম সবাই কলার উপর। ১টাকা পিস কলা, যত খুশি তত খাও। ক্ষুধাটা লেগেছিল বেশ, কলার কাদি পুরো শেষ৷ পাইক্ষ্যংপাড়ায় প্রায় সব কোম্পানির নেটওয়ার্ক আছে। আছে টাটা স্কাই এর ডিশ লাইন৷ এত গহীনে প্রযুক্তির ছোঁয়া দেখে ভালোই লাগলো। আজকে রবিবার বম জাতিদের প্রে ডে বিধায় বেশির ভাগ দোকান বন্ধ।

চায়ের দোকানের পাশেই এক দাদা কম্বল, চাদর নিয়ে বসেছিল৷ বেশ সুন্দর কারুকাজ৷ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আয়েশ করে দাম জিজ্ঞেস করলাম। বেশ রিজেনেবল দাম। কিন্তু ব্যাগ ভারী হবার ভয়ে কম্বল আর চাদর নেবার সাহস করলাম না। এত বেশি রেস্ট নিয়েছি, ৭টায় বের হওয়া একটা দল এসে পড়লো পাইক্ষ্যংপাড়া৷ এবার আর বসে থাকা যায় না। পাইক্ষ্যংপাড়া থেকে আবার নামা শুরু করলাম।

পাহাড়ি ফুল। ছবিঃ ঈসমাইল হোসেন।

আমাদের সাথে জাবের, ওলী, বাবু ভাইরা কম বেশি ইঞ্জুরড। রেস্ট নিয়ে নিয়ে হাঁটতে হচ্ছে এখন। সূর্য মামা আজকে আমাদের কোনোভাবেই পরাজিত করতে পারবে না। এভাবে আরও দেড় ঘন্টা হাঁটার পর একটা জায়গায় এসে থামলাম আমরা। টনি বললো এখন এখান থেকে নিচে নামলেই ট্রলারের জায়গায় এসে পড়বো।

গায়ের ব্যাগখানা ফেলে পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসলাম। দূর পাহাড়ে দেখা যাচ্ছে মেঘের ভেলা। নীলাভ আকাশের সাথে সবুজের মিতালী। অদ্ভূত সুন্দর লাগছে ছোট ছোট রেঞ্জগুলো। অনেক কিছুই মিস হয়ে গেছে প্রথম দিন। আজকে যেন তা পরিপূর্ণভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছে।

চল ফিরে যাই ঘরে। ছবিঃ লেখক।

খন্ড খন্ড মেঘের ভেলা জমেছে
ওই দূর পাহাড়ের কোণে,
বহুরুপী তোমার সাজে
সেই যে কবে ডুব দিয়েছি
ওই নীল পাহাড়ের মাঝে।

ঝর মেঘ আজ তুই ঝর
বৃষ্টির অশ্রুর জল
আজ নামবে পাহাড়ী ঢল,
দূর থেকে কান পেতে
পার কি শুনতে সেই পাহাড়ি কান্না।

গন্তব্য কত কাছে এসে কত দূরে। রেস্ট নিয়ে আবার নামার পথ শুরু হলো। এবার আমাদের চান মিয়াও হাল্কা পায়ে ব্যথা অনুভব করা শুরু করেছে। সিদ্ধান্ত হলো যারা ইঞ্জুরড তারা আস্তে আস্তে আসবে, বাকিরা আগে চলে গিয়ে ট্রলার ধরবে। আধা ঘন্টা নামার পর আমরা পৌঁছে গেলাম ট্রলারের জায়গায়টায়। রোদের তাপে গাটা তেঁতে উঠলো।

এবার বাকিদের জন্য অপেক্ষার ফাঁকে রোয়াংছড়ি খালে ডুব দিয়ে নিলাম। আর নেই হাঁটার পথ এবার শুরু আরাম আর আরাম। সবাই আসার পর দুই ট্রলারে এবার শুর হলো আমাদের ফিরে যাবার যাত্রা। শ্বেতশুভ্র দানব তিনাপ সাইতার৷ এক অভিজ্ঞতা, এক রোমাঞ্চ, এক ফেলে আসা স্মৃতি। দেখা হবে আবার কোন দিন। ততদিন থেকে যাও তুমি স্মৃতিপটে, মনের অতলে গহন – গভীর কোণে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাগর কন্যা কুয়াকাটা: ফাতরার বন

তিনাপ সাইতার- এক রোমাঞ্চকর যাত্রা: তিনাপের পথে