তিনাপ সাইতার- এক রোমাঞ্চকর যাত্রা: তিনাপের পথে

নীল পাহাড়ের দেশে; ছবি: টিকেটশালা

দ্বিতীয় দিন- (রনিনপাড়া – দেবছড়াপাড়া – তিনাপ সাইতার – রনিনপাড়া)

পাহাড়ের ভোরটা খুব মিষ্টি হয়। আর আজকের ভোরটা যেন নতুন রূপে সেজেছে। ঘুম থেকে উঠে গেলাম ৫.১৪ তে। দেখি সবাই নাক ডেকে এখনও ঘুমাচ্ছে। বাইরে বের হয়ে ঝিরিঝিরি বাতাসে মনটা স্নিগ্ধতায় ভরে গেল৷ হেঁটে রনিনপাড়ার চার্চের সামনে আসলাম৷ দূরে দেখা যাচ্ছে মেঘের মেলা। মেঘগুলো যেন সবুজ এই পাহাড়ে পেখম মেলে দূরদূরান্তে হারিয়ে যাচ্ছে। আর আমার চিন্তা চেতনাকে করছে আচ্ছন্ন।

সবুজ এই পাহাড়ে দেবদারুর ছায়া হয়ে 
পথিক তোমায় আমি শীতল করতে চেয়েছিলাম, 
না হতে পারি দেবদারু, এই সবুজের উপত্যকায় 
আমি অতি ক্ষুদ্র ঘাসফুল হয়ে বাঁচতে চাই।
অতি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে 
এই পাহাড়ি সরুপথ বেয়ে,
তোমার নিস্তব্ধতাকে ছুঁয়ে যেতে চাই নিবিড় পরশে 
কোনো মায়াময়ী পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে৷

তিনাপের পথে। ছবিঃ ঈসমাইল হোসেন

আচ্ছন্নতার ঘোর কাটিয়ে আবার কটেজে ফিরে এলাম। ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে৷ আস্তে আস্তে সবাইকে ডেকে তুললাম। ৫.৪৫ এর মধ্যে সবাই উঠে গেল৷ হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বাথরুমের কাজ সেরে আমরা টনির জন্য বসে আছি। টনির সাথে যেন আমাদের আড়িপাতা হয়ে গেছে। কোনো চাপা অভিমান নিয়ে দূরে আমাদের টনি ভাই। ততক্ষণে পেটে ক্ষুধার নহর বয়ে চলছে৷ টনির দেখা নেই৷ অপেক্ষার প্রহরের অবসান ঘটিয়ে টনির আগমন ঘটলো সাতটায়।

এসে বলছে, আপনাদের নাস্তা রেডি, আমার বাসায় আসেন। ততক্ষণে মেজাজ সপ্তম আসমানে থাকলেও কিছু বললাম না। এর মধ্যে আমাদের ৪ জন আবার ঘোষণা করেছে কালকে কোমর ভাঙা কষ্টের কারণে তারা আজ তিনাপ যাবে না৷ তাড়াতাড়ি টনির বাসা থেকে সকালের প্রাতঃরাশ সেরে আমরা বের হবার জন্য প্রস্তুত। তবে নিয়তির খেলা বোঝা বড় দায়৷ ৪ জনের মাঝে ২ জন আবার চাংগা হয়ে গেল তারা যাবে। কটেজের বাইরে দাঁড়িয়ে গজগজ করছে পুরো টিম।

আস্তে আস্তে রনিনপাড়া থেকে ঢাকা থেকে আসা সব গ্রুপ বের হয়ে গেল। শেষ গ্রুপ্টা যখন বের হয়ে গেল তখন ৭.৪৫ বাজে। এখন পুরো রনিনপাড়া খা খা ময়দান। শুধু আছে আমাদের গ্রুপটা৷ টনি তার ভাই মাফুইন আর আতপ’দাকে আমাদের সাথে দিল।আল্লাহ’র রহমতে আমরা ১১জন রওনা দিলাম সকাল ৮টার দিকে।

দেবছড়া পাড়া। ছবিঃ লেখক।

নাদিম ভাই এক অদ্ভূতুড়ে মানুষ। সবার আগে হেঁটে চলে যান একা একা৷ এরপর সামনে গিয়ে সবার জন্য অপেক্ষা করেন। আমাদের গ্রুপে ফয়সাল ভাইয়ের দলে ওলী, জাবের ভাইয়ের বেশ কষ্ট হচ্ছে। অনেক বছর পর তারা ট্রেকিংয়ে বের হয়েছেন। বিশাল বড় রনিনপাড়া আর আকাশে চান্দি ফাটা রোদ। পাড়া থেকে বের হতেই ২০ মিনিট লেগে গেল। রনিনপাড়া থেকে তিনাপের দূরত্ব ১৩ কি.মি, পাড়ি দিতে হবে ৪ ঘন্টার পথ- এটা ভেবেই পেটে গুড়গুড় শুরু হলো। গাইড আমাদের বাঁশ কেটে এনে দিল। এখন এক নাগাড়ে পাহাড়ী পথ ধরে উপরের দিকে ওঠা। এই ওঠার নেইকো কোনো শেষ৷

২০-২৫ মিনিটের মধ্যে আমরা পাহাড়ের উপরে উঠে গেলাম। এবার এ পথ ধরে খাড়া নিচে নামতে হবে। এবার একে একে আবিষ্কার করলাম রনিনপাড়া থেকে বের হওয়া গ্রুপগুলো। দুইটা গ্রুপকে ক্রস করে আগে চলে গেলাম। এতে করে আমাদের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। খাড়া রাস্তা একপাশে, খাদও আমাদের আত্মবিশ্বাস টলাতে পারলো না। নেই কোনো ভয়, ভয়কে করবো জয়। সামনে রনিন পাড়া থেকে ৭টা বাজে বের হওয়া মেয়েদের গ্রুপকে ক্রস করার পর এবার এটাকে আমরা স্পোর্টস হিসাবে নিয়ে নিলাম। উঁচু নিচু খাড়া বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে তিনাপ যাবার পথে একমাত্র পাড়া দেবছড়া এসে যখন পৌঁছালাম তখন ঘড়ির কাঁটায় ৯.৫০ বাজে। এখন থেকে তিনাপ ২ ঘণ্টার পথ৷

দেবছড়াপাড়া থেকে দেখা যায় সিপ্পি আরাসুয়াং। ছবিঃ লেখক।

ছবির মতো সুন্দর দেবছড়া পাড়া। চারদিকে পাহাড় ঘেরা ছোট সাজানো গোছানো পাড়া। দেবছড়া পাড়া থেকে দেখা যায় ড্রিম ডেস্টিনেশন সিপ্পি আরসুয়াং। সিপ্পি সবাই এক নামে চেনে, তবে বম ভাষায় এর নাম যে রাম জং কয়জন বা জানে? ২,৯৩৯ ফুট এই পাহাড়কে জোঁকের স্বর্গরাজ্যও বলা হয়ে থাকে। দূর থেকে সিপ্পির সৌন্দর্য আমাদের মোহিত করলো। আবার কোনোদিন হয়তো দূরের ওই পাহাড়টাকে জয় করতে আসবো। ১০ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম আমরা।

দেবছড়া পাড়া থেকে আমাদের নামতে হবে দেবছড়া ঝিরিতে। তিনাপ যাবার একমাত্র ঝিরিপথ। রাস্তা বেশ খাড়া আর বৃষ্টির কারণে পিচ্ছিল হয়ে ছিল। প্রায় ৩০ মিনিট যাবার পর আমরা ঝিরির সন্ধান পেলাম৷ আহা কি শান্তি! ঝিরির ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে দেহ মন প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। আবার হারিয়ে গেলাম ঝিরির সেই আলো ছায়ার খেলার মাঝে৷ দুই পাশে জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়, বন্য পরিবেশের মাঝে আমরা হেঁটে যাচ্ছি।

এই পথে নাকি মাঝে মাঝে গয়াল দেখা যায়। তবে আমরা কোনো গয়ালের চিহ্ন পেলাম না। এই মায়াময় পথ ধরে কিছুদূর হেঁটে যাবার পর কিছু গাছের আর বাঁশের তৈরি সাঁকো পাওয়া যাবে হালকা ডুবন্ত অবস্থায়। এগুলা পার করে সামনে এগোনোর পর ছোট একটা সুন্দর খুমের সন্ধান পেলাম। এখানে হালকা রেস্ট নিয়ে পানিতে ডুব দিয়ে চাঙা হয়ে নিলাম। এই খুমের পথ ধরে নিচে নেমে দেখতে পেলাম ঝিরির পথটা দুই পাশের পাথরের দেয়ালের মাঝে সরু হয়ে চলে গেছে।

গরীবের নাফাখুম। ছবিঃ লেখক।

এবার ঝিরি ছেড়ে পাহাড়ে ওঠার পালা। উপরে ওঠার রাস্তাটা কষ্টসাধ্য, তবে বিপদের কোনো আশংকা নেই। ওই দিন এই ৮২ কেজি দেহে কোনো দাম্ভিক দানব যেন ভর করেছিল। পাহাড়ের মাথায় ওঠার পর এতক্ষণ পর মনে হলো আমাদের কোনো গাইড আছে। মাফুইন আমাদের পাইন্দু খাল দেখালো। উপর থেকে দেখা যাচ্ছে এক চিলতে পাইন্দু খাল৷ এবার একটু উপরে ওঠার পর বেশ খাড়া একটা পাহাড়ি রাস্তা নিচে নেমে গিয়েছে। একে তো খাড়া আর আগের রাতে বৃষ্টির কল্যাণে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে রয়েছে। প্রতি পদক্ষেপের সাথে ঝুরো মাটি নিচের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে।

সাবধানে পা ফেলে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসলাম। নেমেই প্রথমে একটা খাল পেলাম। এটাই সামনে গিয়ে পাইন্দু খালের সাথে মিশেছে। বেশ ভালো স্রোত৷ এখান থেকে কিছু দূর আগানোর পর পেয়ে গেলাম পাইন্দু খাল৷ খালের পানি হাঁটু সমান। আমাদের পার হতে বেশি বেগ পেতে হলো না। এখান থেকে মূলত পাথুরে বোল্ডারের পথ শুরু৷ খানিকটা দূর এগানোর পর হুবহু নাফাখুমের মতো একটা জায়গা পেলাম। দেখে তব্দা খেয়ে গেলাম। এ কি তোমার লীলা বিধাতা! ততক্ষণে দূরে থেকে শুনতে পাচ্ছি তিনাপের গর্জন।

দানবের সাথে ঈসমাইল ভাই। ছবিঃ লেখক।

বড় বড় বোল্ডারের পথ পাড়ি দিয়ে ৫-১০ মিনিট পর এসে পড়লাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য তিনাপ সাইতারে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্বেত শুভ্র দানব, পানির গর্জন দ্বারা করছে সে হুংকার৷ অবাক বিস্ময়ে আমি তার রূপ সুধা পান করতে লাগলাম। সবাই ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে আর আমি গা এলিয়ে দিলাম জল প্রপাত থেকে সৃষ্ট খুমের পানিতে। অনন্ত কাল ধরে যেন ভেসে চলছি আমি। মাথাটা বড় পাথরে হেলিয়ে উপরের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। কত সুন্দর তোমার সৃষ্টি বিধাতা!

উপরের দিকে একটা পাথুরে পথ ধরে উপরে উঠে জল প্রপাতের পিছনে যাওয়া যায়৷ পিছন দিক গিয়ে আমরা বেশ কিছু ছবি তুললাম। পাহাড়ি ঝর্ণা, জলপ্রপাত উপভোগ করতে হয় নিরবে, নিভৃতে নিঃসংগতার মাঝে। কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে চিৎকার, অপরাধী গানের তালে নিরবতা অদ্য থাকে বৈকি। যে হইচইয়ের জন্য শহর ছেড়ে পাহাড়ে আসা সেখানেও মানুষের হইচই। সব কিছু ছাপিয়ে এক দাম্ভিক দানব মৃদু হেসে তাকিয়ে ছিল আর এক দানবের পানে৷ আমি জেদী আমি অহংকারী, আমি পাহাড় করবো জয়- এই দাম্ভিকতার কাছে শ্বেত শুভ্র দানবের দাম্ভিকতা যেন মিইয়ে গেল৷ কীভাবে যে সময় পার হয়ে গেল টের পেলাম না। এবার ফেরার পালা৷

তিনাপ সাইতার। ছবিঃ ঈসমাইল হোসেন।

ফেরাটা এত ক্লান্তিকর ছিল না। দুপুর ১টার দিকে রওনা হয়ে হেলে দুলে দেবছড়া পাড়ায় পৌঁছে গেলাম আমরা। পুরো টিম স্পিরিট এখন তুংগে। তবে এর মধ্যে জাবের ভাই পড়লো সেভিয়ার ইঞ্জুরিতে। পায়ের রগ ফুলে লাল হয়ে আছে৷ দেবছড়া পাড়া পর্যন্ত আমরা এক সাথে এসে এবার আবার ভাগ হয়ে গেলাম। আতপ’দা কে নিয়ে পাঁচজনের টিম আগে চলে গেল আর আমি রয়ে গেলাম ফয়সাল ভাইয়ের টিমের সাথে। মাফুইনকে নিয়ে আমাদের ৬ জনের টিম আবার আগে বাড়তে লাগলো। কোনো বিপদ ছাড়াই রনিন পাড়ায় বিকাল ৫টার ভিতর পৌঁছে গেলাম।

গোসল, খাওয়া পর্ব সেরে সন্ধ্যার দিকে রনিনপাড়া খেলার মাঠে আমরা ৬ জনের একটা দল বসলাম। আমি, চান মিয়া, রুবেল, মনা, নাদিম আর ঈসমাইল ভাই। সফল অভিযানের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছে গেছি আমরা। তাই তো মনে এত সুখ। পাহাড়ী হাওয়ায় দেহ শীতল হলো, একটু আগে বৃষ্টি হয়েছিল ভিজে মাটির সোদা গন্ধ আমাকে করে তুললো নস্টালজিক। কিছুক্ষণ এখানে সুখ দুঃখের আলাপ করে চলে গেলাম পাড়ার টংয়ের দোকানে। এই রুক্ষ, কঠোর পাহাড়ের মাঝে যে সরল মনের মানুষ থাকে এখানে না এলে হয়তো জানতেই পারতাম না।

ঝর্নার ধারে বসে আমি। ছবিঃ ঈসমাইল হোসেন।

আমরা গিয়ে চায়ের অর্ডার দিলাম। প্রথম চুমুক দিয়েই নাদিম ভাই বলে বসলো, মামা চা ঠাণ্ডা। মামা সরল হেসে বললো, আচ্ছা এই চা ফ্রি। আপনাদের জন্য গরম চায়ের ব্যবস্থা করছি। ১ টাকা পিস কলা, যত খুশি তত খাও। ১৫ টাকায় এক বাটি ন্যুডলস দিল, দু’জন মানুষ খেয়েও শেষ করা যায় না। এরা এত সরল কেন? দোকান থেকে বের হবার সময় আমাদের একটা বড় শসাও ফ্রি দিয়ে দিল। এখন বাজে রাত ৮টা। আজকে ২৬শে আগস্ট, আজকে ফুল মুন। জীবনের সব চাওয়া পাওয়ার হিসাব কষতে কষতে তাকিয়ে দেখলাম চাঁদটা খুব সুন্দর।

মেঘহীন আকাশে পূর্ণ চন্দ্রিমা, ঘুমের রাজ্যে ঢুলুঢুলু চোখ নিয়ে উপভোগ করতে লাগলাম। যেন কোনো মাদক নেশা ছড়িয়ে গেছে দেহে। অপার জোৎস্নালোকের মাঝে চাঁদ চলে এসেছিল হৃদয়ের কাছে। রনিন পাড়ার সেই চন্দ্রাহত জোৎস্নালোকে কোনো মায়াবতী এসে যেন আমার হাতটি ধরে বসে ছিল। কল্পনা আর ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরতে এবার আমার ঘুমাতে হবে। দলছুট হয়ে চলে এলাম কটেজে। গা’টা এলিয়ে দিলাম কাঠের ফ্লোরে। কিছুক্ষণ পর চলে গেলাম ঘুমের রাজ্যে।

ঘুম যখন ভাংগলো রাত বাজে ১০টা। এবার টনির ঘরে খাওয়ার ডাক পড়লো। খাওয়া পর্ব সেরে আবার কটেজে ফিরে এলাম। ভাবলাম রাতটা নির্ঘুম যাবে আমার অতীতের কথা ভেবে। অতীতের কথা ভাবতে ভাবতে ছিলাম আচ্ছন্ন, পাহাড়ের দেবতা কখন যে তার নিবিড় পরশে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল, টেরও পেলাম না।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তিনাপ সাইতার– এক রোমাঞ্চকর যাত্রা: ঘরে ফেরার বার্তা

তিনাপ সাইতার – এক রোমাঞ্চকর যাত্রা: পাহাড়ের রুক্ষতা