তিনাপ সাইতার – এক রোমাঞ্চকর যাত্রা: পাহাড়ের রুক্ষতা

বাংলাদেশের বৃহত্তম জলপ্রপাতের কথা আসলেই মনে পড়ে যায় তিনাপ সাইতারের নাম৷ কত জল্পনা কল্পনা তিনাপকে ঘিরে৷ রোজার ঈদে খুমের রাজ্যে ঘোরার পর কোরবানি ঈদে এসে বান্দরবানে যাবার পিপাসা আরও বেড়ে গেল৷ এবারের গন্তব্য তিনাপ সাইতার৷ বম ভাষায় সাইতারের অর্থ ঝর্ণা, তিনাপ অর্থ নাকের সর্দি৷ কী অদ্ভূত তার নাম!

কিন্তু বিধিবাম বেরসিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তিনাপ যাবার রূটের পারমিশন বন্ধ করে দিল। পারমিশন দিব দিব করে এক লুকোচুরি খেলা শুরু হলো। গাইড প্রশাসনের লোকদের মাঝে বৈঠক হয়৷ কিন্তু ফলাফল শূন্য। পুরো ট্যুর ঝুলে আছে কোনো ধূসর প্রান্তরে যেখানে ধু ধু বালুচর ছাড়া কিছুই দেখা যায় না৷ এর মধ্যে আমাদের দুজন ট্যুর ম্যানেজার ঈসমাইল আর ফয়সাল ভাই ক্রমাগত পাতুং বম, টনি বমের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছে.। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। তরী তীরে এসে ডুবে গেল। ঈদের আগের দিনও জানতে পারলাম পারমিশন নেই।

কোথাও কুল নেই, ঠাই নেই। বান্দরবানের টিকেট কাটা। আমতা আমতা করতে করতে ১৩ জনের বিশাল প্ল্যাটুন হয়ে গেল৷ প্রথমদিকে ৫ জনও কর্নফাম ছিল না। টিকেট সেল করে দেবার গুঞ্জনও উঠেছিল৷ এর মধ্যে টনি বম জানালো ২৪-৩০ পর্যন্ত তিনাপ যাওয়া যাবে পারমিশন ছাড়া, ক্যাম্প ফাঁকি দিয়ে৷ ঈদের কারণে বিশেষ ছাড় দিয়েছে রনিনপাড়া আর্মি ক্যাম্প৷ যেতে পারবো কি পারবো না এ দোটানায় পড়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল পুরো প্ল্যাটুন। টনির একটা কথার উপর ভরসা করে ঈদের পরের দিন রাতে রওনা দিলাম অনিশ্চিত যাত্রার পথে৷

বোটে মহাযাত্রা শুরু। ছবিঃ লেখক।

শ্যামলী (এস.পি) আরামবাগ বাস স্ট্যান্ডে দেখা হলো চান মিয়া, রুবেল, মনা, ঈসমাইল ভাইয়ের সাথে৷ আমাদের আর একটা ৮ জনের গ্রুপ অন্য বাসে যাচ্ছে সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ড থেকে। বান্দরবান শহর থেকে এক সাথে মার্জ করবো। সে গ্রুপের ম্যানেজার ফয়সাল ভাই। ঈদের চাপে ঢাকা কাঁপে। আর এখন ফাঁকা ময়দানে গোল দিতেও শ্যামলী কাপে। ১১টার বাসের দেখা নাই। দেরি হবে।

১১.৩০ এর দিকে কাউন্টারম্যান বললো আপনাদের আর২ কোচের গাড়ী সায়েদাবাদ থেকে ছাড়বে, আর১ দিয়ে সায়েদাবাদ চলে যান। এতক্ষণ পর ঘুম ভাংগানিয়া গান শুনে সেফুদার মতো ট্রস ট্রস করে মারতে গিয়েও সামলে নিলাম। আর১ এ করে এসে পড়লাম সায়েদাবাদ। সায়েদাবাদ থেকে আমাদের বাস ছাড়তে ছাড়তে রাত ১২টা। বাসের পাইলট মামার চেহারা দেখে ভাবলাম- ছো, এ আর কি গাড়ী চালাবে? খালি রাস্তা পেয়ে উনি চালালেন পক্ষীরাজ ঘোড়া। সারারাত ওটির খেলা দেখতে দেখতে এলাম। আধো ঘুম আর আধো জাগরণের মাঝে কেরানীরহাট এসে একটা হার্ড ব্রেকে ঘুমখানা পিছনের জানলা দিয়ে পালালো। তখন অনুমানিক সাড়ে পাঁচটা বাজে।

চোখটা কচলিয়ে চান মিয়ার দিকে তাকালাম। সে বলছে, কি মিয়া? পিছে আমাদের রানা ভাই বসে আছে, দেখেন নাই? আমি ভাবলাম, কোন রানা ভাই? লুংগী নাকি মটর রানা? পিছে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের প্রাণপ্রিয় বড় ভাই লুংগী রানা। লুংগীর ব্র‍্যান্ড এম্বাসেডর বসে আছেন। ভাই যাবে ধুপপানি, আমরা যাব তিনাপ সাইতার। উঠেছেন সাতকানিয়া থেকে। উনার থেকে জানতে পারলাম বান্দরবান থেকে কাপ্তাই লেক খুব সহজেই যাওয়া যায় দেড় ঘন্টার রাস্তা। উনার সাথে সুখ দুঃখের প্যাচাল পাড়তে পাড়তে চলে এলাম বান্দরবান শহর৷ ফয়সাল ভাইয়ের টিমের সাথে মিট করে ইউসুফ ভাইকে বিদায় দিয়ে আমাদের প্রথম দিনের যাত্রা হলো শুরু।

দূরে দেখা যায় টেবিল পাহাড়। ছবিঃ লেখক।

প্রথম দিনঃ
(বান্দরবান শহর – রোয়াংছড়ি – পাইক্ষ্যংপাড়া – রনিনপাড়া)

ফয়সাল ভাইদের পুরো গ্রুপের সাথে পরিচয় পর্ব সেরে নিলাম সবার আগে। নাদিম, বাবু, ওলী, শাহীন, জাবের, পাবেল, জুয়েল ভাইসহ আমরা ৫ জন। বিশাল বড় গ্রুপ, আনলাকি থারটিন। গাইড আগে থেকে ঠিক না থাকায় আমরা আগে টনির সাথে যোগাযোগ করলাম। সে বললো রোয়াংছড়িতে আছে। তাকে আমরা কর্নফাম করে দিলাম। টনিকে ফোন করার পর পাতুং বম ফোন দিল। গাইড ঠিক করে ফেলেছি শুনে তাকে রোয়াংছড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করলো। চান্দের গাড়ী ঠিক করে সকালের নাস্তা সারলাম।

চান্দের গাড়ী বড়ুয়ারটেক থামলো পাতুং বমকে ওঠানোর জন্য৷ পরবর্তীতে তার আর আমাদের সাথে যাওয়া হলো না৷ আর একজন ক্লায়েন্ট ধরবে বলে সে বড়ুয়ারটেক রয়ে গেল৷ তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারলাম গ্রুপ ছোট হলে চান্দের গাড়ী ম্যানেজ না করতে পারলে বড়ুয়ারটেক থেকেও মোটর বাইকে রোয়াংছড়ি যাওয়া যায়৷ এবার নেই কোনো বাধা। চলছে গাড়ী রোয়াংছড়ির পথে।

রনিনপাড়া। ছবিঃ লেখক।

পাহাড়ী আঁকাবাকা পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় ৩০-৪০ মিনিটের মাঝে আমরা পৌঁছে গেলাম। সেখানেই অপেক্ষা করছিল আমাদের গাইড টনি বম। টনি আর একজন গাইড জুয়েলকে সাথে নিল। সব কিছু পাকা করে দুই দিনের বাজার সদাই করে আমরা চললাম রোয়াংছড়ি ট্রলার ঘাটের দিকে৷ জন প্রতি ১০০ টাকা দিয়ে চড়ে বসলাম ট্রলারে৷ রোয়াংছড়ি খাল দিয়ে পানি, মেঘ, পাহাড় আর চারদিকে সবুজ অরণ্যের মিতালী দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম একটা খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে। এখান থেকে আমাদের ট্রেকিং ট্রেইল শুরু।

ঘড়িতে বাজে সকাল ১০টা, ততক্ষণে গনগনে রোদ নিয়ে হাজির হয়েছে মাঝ আকাশে সূর্যটা। যেন আগুনের গোলা ছুড়ে মারছে আমাদের দিকে। টনি বমকে জিজ্ঞেস করলাম রনিনপাড়া যাওয়া পর্যন্ত কি কোনো ঝিরিপথ আছে। টনির ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে হাসি দেখা গেল। মৃদু হেসে বললো, কোনো ঝিরি নেই। এখন শুধু উঠতে থাকবেন আর উঠতে থাকবেন। শুনে তখনই কম্প জ্বর উঠে গেল। শুরু হলো আমাদের উপরে ওঠার এক মহাযাত্রা।

একটানা উপরে উঠে চলেছি। খানিকটা দূর যাবার পর দেখলাম গ্রামের মেঠো পথের মতো রাস্তা। সূর্য মামার মৃদু আদরে সবার জান ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। পানির অপর নাম জীবন আর সেই পানিই এনেছি আমরা অপর্যাপ্ত। উত্তেজিত হয়ে করেছি কি মহা ভুল, ছিড়তে ইচ্ছে করছিল চুল। একটু দূরে দেখতে পারলাম ধান চারার মাঝ দিয়ে উঁকি দিচ্ছে জুম ঘর৷ হাঁটার স্পীড বাড়িয়ে দিলাম৷ সবার আগে গিয়ে জুমঘরে বসলাম। দেখতে পেলাম পানির দুইখানা বোতল। আধা লিটারের বোতলের পানি নিজে খেয়ে ট্যুরমেটদের দিলাম। কী সুন্দর পাহাড়ী বাতাস, মনে শান্তির পরশ বয়ে যাচ্ছে।

যাবার সময় বোতল খানা চক্ষুদান করে দিলাম। এই চুরিতে নেই কোনো পাপের বোঝা। আশা, সামনে কোনোপাড়া পেলে পানি রিফিল করে নেব। সূর্য মামার আদরে আস্তে আস্তে গায়ের ইনার খুললাম এরপর টিশার্ট খুললাম৷ অর্ধনগ্ন হয়ে পাক্কা ২ ঘণ্টা হাঁটার পর এসে পড়লাম পাইক্ষ্যংপাড়া৷ তখন পিছে তাকিয়ে দেখলাম অর্ধনগ্নের লিস্টে আর ৫-৬ জন ঢুকে গেছে৷ মোবাইলে সেলফি অপশন খুলে দেখলাম নিজেদের পাগলা দাশু অবস্থা। দুই-তিনটা ক্লিক দিয়ে বসে পড়লাম পাড়ায় ঢোকার প্রথম চায়ের দোকানে৷

রনিনপাড়ার সেই চার্চ। ছবিঃ লেখক।

চায়ের দোকানে বসে দিদির বানানো লেবু চা খেয়ে মনটা আবার চাংগা হয়ে গেল। এ রকম অসাধারণ চা আমি শেষ কবে খেয়েছি মনে নেই। টং দোকানের চা মানে তিতকুটে, চিনি কম, পাতি কম ব্যাপার থাকে৷ কিন্তু দিদির চা’টা ছিল ওয়েল ব্যালেন্সড৷ আমাদের এই করুণ দশা দেখে দাদা-দিদি দু’জনেই মৃদু হাসছে৷ বিশাল বপু আর নিজেদের ঢোল সাগর ভাসিয়ে বসে আছে অদ্ভূত অভিযাত্রীর দল। খানিকটা জিরিয়ে পাইক্ষ্যংপাড়ার পথ ধরে আবার হাঁটতে লাগলাম। সামনে এগিয়ে দেখতে পেলাম পাহাড়ীদের গ্রাম। গ্রামে ঢুকে পানির ব্যবস্থা হয়ে গেল। যে ক’টা বোতল আছে ভরে নিলাম। এই ভর দুপুরে পাহাড়ের পুত্ররা ফুটবল নিয়ে মেতে আছে, কন্যারা ধরেছে গানের কলি।

পাইক্ষ্যংপাড়া থেকেই গাড়ীর রাস্তা শুরু। নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। আরও উপরে ওঠো। ওঠার মাঝে হঠাৎ করে নামার পথ আসে চমক হিসাবে। এই রকম রুক্ষ ট্রেইল এই জীবনে ক’টা দেখেছি মনে পড়ে না। গাছগুলো তার উচ্চতা দিয়ে সূর্যের রুদ্র রূপ ঠেকাতে পারছে না। দুপুর ১টার দিকে এসে শরীর আর চলে না। টাক ফাটা রোদে ২০ মিনিট হাঁটি তো ১০ মিনিট বসি। এভাবে প্রায় দেড় ঘণ্টা হেঁটে চলে এলাম এক যাত্রী ছাউনির কাছে। তখন ঘড়িতে প্রায় আড়াইটা বাজে।

পাইক্ষ্যংপাড়ায় ফুটবলের ক্ষুদে ভক্ত। ছবিঃ লেখক।

টনি বলে উঠলো এখানে একটু রেস্ট নেন এখন শুধু নামা হবে৷ এখান থেকে নামলেই রনিনপাড়া। যাত্রী ছাউনি থেকে দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুতুড়ে পাহাড়। এর মাথাটা সমান করে কাটা। এ ধরনের পাহাড়গুলোকে সাধারণত টেবিল পাহাড় বলে। মনমুগ্ধভাবে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। বান্দরবান সব সময় অন্য রকম সুন্দর। যেন কোনো এক মাদক নেশা ধরিয়ে দেয় সারা শরীরে৷ এবার নামার পালা। খাড়া সরু রাস্তা ধরে নিচে নামতে হবে। প্রায় ১ ঘণ্টা নামার পর সমতল ভূমির ছোঁয়া পেলাম। এবার টনি আমাদের সাবধান করলো সামনে আর্মি ক্যাম্প আছে, আপনারা কোনো আওয়াজ করবেন না। হেঁটে চলেছি, পথের নেই শেষ। পা আমার সাথে বিদ্রোহ করে বসলো। আর তো চলে না। আর্মি ক্যাম্প, একটা খ্রিস্টান কবরস্থান পার করার পর অবশেষে আমাদের কাঙ্ক্ষিত রনিনপাড়ার দেখা পেলাম।

বান্দরবানের অন্য সব পাড়ার মতো নয় রনিনপাড়া। বেশ বড় সাজানো গোছানো। ঢোকার পরেই বুঝলাম এখানে ছাগলের প্রজনন বেশ ভাল হয়। টনির বাড়ি পাড়ার একেবারে শেষ মাথায়। শেষ হয়েও যেন হয় না শেষ। টনির বাসায় পৌছানোর পর সবাই গোসল করার লাইন ধরলাম হাউজের সামনে। সুশৃঙ্খল লাইন মেইনটেইন করে গোসল করে এসে কটেজে ঢুকে হাত পা ছেড়ে শুয়ে পড়লাম। আধা ঘণ্টা পর খাবার এল। খাওয়ার পর্ব সারার পরই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির পানি সুমধুর ধ্বনি তোলে। সেই ধ্বনির সুরে চলে গেলাম ঘুমের রাজ্যে।

রাত ৯টার দিকে একবার ঘুম ভাংগলো। রাতের খাবার খেয়ে হাল্কা গল্প গুজব করতে করতে চোখের পাতায় আবার ঘুম চলে আসলো। এবারের ঘুমে চলে গেলাম একবারে স্বপ্নরাজ্যে। খুব ভোরে যখন ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠলাম তখন আমার চিন্তা চেতনা ছিল বিচ্ছিন্ন৷ আমি এখন কোথায়?

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তিনাপ সাইতার- এক রোমাঞ্চকর যাত্রা: তিনাপের পথে

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকাঃ বিউটি বোর্ডিং