এক সপ্তাহে ঘুরে আসুন সিঙ্গাপুরের দুর্দান্ত সব ভ্রমণস্থান থেকে

আমরা কমবেশি সবাই ঘুরতে পছন্দ করি। এই ভ্রমণ করার অভ্যেস মানুষের আজকের নয়, বহু প্রাচীন এই রীতি চলে আসছে পৃথিবী সৃষ্টির প্রাক্কাল থেকে। তখন মানুষ অজান্তেই এমন সব জায়গা আবিষ্কার করেছে যাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। সেই ভবঘুরে ভ্রমণ থেকে দিনে দিনে উন্নতি লাভ করে মানুষ আজ পরিকল্পনার মাধ্যমে ভ্রমণ করে। তবে পরিকল্পনা ছাড়া এবং পরিকল্পনা করে ভ্রমণ করার মাঝে বেশ তফাৎ এবং দুটোর অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। এখন ঘুরতে বের হওয়ার আগে সবাই দেখে নেয় কোথায় ঘুরতে যাচ্ছে, আদৌ ঘুরে শান্তি পাওয়া যাবে কিনা এসব।
দেখেশুনেই হোক আর না দেখেই, বিশ্বের পথে পথে হাঁটতে কার না ইচ্ছে করে। আমাদের দেশ থেকে প্রতিবছর প্রচুর মানুষ সিঙ্গাপুর ঘুরতে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার বেশ ধনী দেশ হিসেবে খ্যাত সিঙ্গাপুর আয়তনে বেশ ছোট একটি দেশ। মালয়েশিয়ার একদম পাশ ঘেঁষে অবস্থিত সিঙ্গাপুর বেশ জমকালো একটি দেশ। রাতে এবং দিনের জাঁকজমকে বিরাট তফাৎ সিঙ্গাপুরে। আয়তনে ছোট বলে পুরো সিঙ্গাপুর ঘুরতে খুব বেশি দিন লাগে না, এক সপ্তাহ যথেষ্ট তার জন্য। চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক সিঙ্গাপুরের কোথায় কোথায় ঘুরবেন সেই এক সপ্তাহে।

ম্যারিনা বে স্যান্ডস

সিঙ্গাপুরের বেফ্রন্ট এভিনিউয়ের মধ্যমণি হিসেবে খ্যাত ম্যারিনা বে স্যান্ডস মূলত একটি রিসোর্ট বিশেষ। রিসোর্টটি বিভিন্ন নামীদামী ব্র্যান্ডের মল, হোটেল, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুন্দর একটি জলাশয়, ডাবল হেলিক্স ব্রীজ, আর স্কাইপার্কের সমন্বয়ে গঠিত।

ম্যারিনা বে স্যান্ডস, ছবিঃ correctphilippines.org

যারা প্রথমবার সিঙ্গাপুর ঘুরতে যাবেন তাদের জন্য এই এক ম্যারিনা বে স্যান্ডসই যথেষ্ট পুরো সিঙ্গাপুরের সামগ্রিক একটা চিত্র তুলে ধরার জন্য। অনেক উঁচুতে অবস্থিত হোটেলের ছাদে স্কাইপার্কে বসে কফির স্বাদ নিতে নিতে কখন সিঙ্গাপুরের মোহনীয় নাগরিক সৌন্দর্যে হারিয়ে যাবেন টের পাবেন না। পুরো কমপ্লেক্সটির স্থাপত্যশৈলী এতটাই অসাধারণ যে সকাল, বিকেল, রাত যেকোনো সময়ই চলে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসতে ইচ্ছে হবে। এই কমপ্লেক্সে একটি জাদুঘরও আছে যা “আর্টসাইন্স জাদুঘর” নামে পরিচিত।

সিঙ্গাপুর ফ্লাইয়ার

যদি ম্যারিনা বে স্যান্ডসের স্কাইপার্কের দৃশ্যে আপনার মন না ভরে তবে খোদ সিঙ্গাপুরই আপনার জন্য তৈরি করে রেখেছে ম্যারিনা বে স্যান্ডসের বিকল্প পথ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় চাকতি আকৃতির নাগরদোলা যাকে ফ্লাইয়ার বলা হয় সেটা অবস্থিত সিঙ্গাপুরেই।

সিঙ্গাপুর ফ্লাইয়ার, ছবিঃ greentourism.site

সকাল থেকে রাত অবধি অবিরাম চলে এই বিশালাকৃতির নাগরদোলাটি। প্রতিটি ভ্রমণের সময়কাল ৩০ মিনিট আর বিভিন্ন প্যাকেজে বিভক্ত এই ভ্রমণ। এই ফ্লাইয়ারে চড়ে সিঙ্গাপুরের সৌন্দর্য তো বটেই, দেখা যাবে ইন্দোনেশিয়ার স্পাইস আইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার স্ট্রেইটস অফ জহর। একবার ভাবুন তো একদেশের এক নাগরদোলায় বসে আপনি চোখ বুলাচ্ছেন অন্য দুইটি দেশের বাঘা বাঘা দুইটি ভ্রমণস্থানে! সিঙ্গাপুরের ঐতিহ্য এই ফ্লাইয়ার, তাই এর রক্ষণাবেক্ষণে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

গার্ডেনস বাই দ্য বে

ম্যারিনা বে স্যান্ডস থেকে যে বিশাল সবুজ প্রান্তর দেখা যায় সেটি হলো গার্ডেনস বাই দ্য বে। ম্যারিনা বে স্যান্ডস থেকে যদি দেখা হয়েই যায় এই বাগানের রূপ, তবে খুব বেশিক্ষণ নিজেকে আটকে রাখা যায় না এখানে আসা থেকে।

গার্ডেনস বাই দ্য বে, ছবিঃ www.lokopoko.trave

সিঙ্গাপুরের দালান-কোঠায় ভর্তি নাগরিক কোলাহল থেকে পালাতে প্রচুর পর্যটক ছুটে আসে এখানে। এখানকার “বে ঈস্ট গার্ডেন” এ দেখা মিলবে গাছেদের অস্বাভাবিক সুন্দর জীবনধারা যা যেকোনো পর্যটকের মনোযোগ ধরে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আপনি নিশ্চয়ই সেখানে গিয়ে “সুপার ট্রি গ্রোভ” দেখা হাতছাড়া করতে চাইবেন না কারণ পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে সেখানে বানানো আছে এমনই দুর্দান্ত কিছু স্থাপত্য যা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কীভাবে পরিবেশের ক্ষতি না করেও আমরা টিকে থাকার চরম লড়াইয়ে নাগরিক উন্নয়ন করে যেতে পারি। এখানে আরো আছে “ক্লাউড ফরেস্ট ডোম” যেখানে জীববৈচিত্র এক অন্য পর্যায়ে চলে গিয়েছে এবং এখানে আছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ঘরোয়া জলপ্রপাত।

বোটানিক গার্ডেনস

গার্ডেনস বাই দ্য বের সাথে ভুলেও মিলিয়ে ফেলবেন না একে, সিঙ্গাপুরের বোটানিক গার্ডেন নিজেই সবুজের প্রকাণ্ড এক স্বর্গরাজ্য। সিঙ্গাপুর তার প্রথম ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মনোনয়ন পায় বোটানিক গার্ডেনসের জন্যই।

বোটানিক গার্ডেনস, ছবিঃ travelsuvidha.co.in

সিঙ্গাপুরের শহরের অলিগলি ধরে ঘুরতে ঘুরতে মনে হতেই পারে কোথায় এসে পড়লাম? চারদিক শুধু কৃত্রিমতা আর কংক্রিটের জঞ্জালে ভরা। ঠিক এই চিন্তা থেকেই সিঙ্গাপুরে সকল বয়স্ক গাছের প্রজাতি দিয়ে গড়ে উঠেছে বোটানিক গার্ডেন। কৃত্রিমতার ভারে নুয়ে পড়া চোখের পাতা তড়িৎ গতিতে সজাগ হতে বাধ্য এখানকার জীববৈচিত্র আর হাজার গাছের সাম্রাজ্য দেখে। এখানে ঘুরতে আসলে অবশ্যই জাতীয় অর্কিড গার্ডেন ঘুরে যাবেন, বিশ্বের বিরল কিছু অর্কিড প্রজাতির বাসস্থান এই বাগান। মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে আরো আছে ইকো-লেক, ইকো-গার্ডেন, বনসাই গার্ডেনসহ আরো বেশ কয়েকটি নামকরা বাগান।

চায়না টাউন

আপনি যদি কখনো চীনে গিয়ে থাকেন তবে সিঙ্গাপুরের এই চায়না টাউন আপনাকে প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে চীনের অলিগলির কথা মনে করিয়ে দেবে। এখানকার অলিগলি থেকে শুরু করে বাড়িঘর, খাবার-দাবার সবই চাইনিজ আদলে তৈরী।

চায়না টাউন, ছবিঃ asiawebdirect.com

মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে চাইনিজ হেরিটেজ সেন্টার, শ্রী মারিয়াম্মান হিন্দু টেম্পল এবং খুব সুন্দর দৃষ্টিনন্দন বুদ্ধ টুথ রেলিক টেম্পল। যদি আপনার ভোরে ওঠার অভ্যেস থেকে থাকে, তবে ভোর চারটায় এই চায়না টাউনে শুরু হওয়া “মর্নিং ড্রাম সেরিমনি” এর সাক্ষী হতে পারবেন। আর যদি ঘুম একান্তই না ভাঙে এত সকালে তবে বিকেলে বুদ্ধ টুথ রেলিক টেম্পল দেখা শেষে সকালে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের সমাপ্তি পর্বটুকু দেখতে পারবেন। সিঙ্গাপুরের এ অংশটি শুধু সিঙ্গাপুরের উপর চীনের প্রভাবই প্রকাশ করে না বরং জায়গাটি বেশ উন্নত এবং সকলের জন্য উচ্চগতি সম্পন্ন ফ্রি ওয়াই-ফাই সম্বলিত। পর্যটকদের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর গুরুত্ব বোঝাতে চাইনিজ, জাপানিজ আর ইংরেজীতে বিবরণ লেখা আছে স্থাপনাগুলোর সামনে।

সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানা

জীববৈচিত্র্য ভালো লাগে না এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে দুনিয়া জুড়ে। বিশেষ করে বিরল প্রজাতির প্রাণীদের প্রতি আমাদের কৌতুহলের শেষ নেই। তেমনি বিরল প্রজাতির প্রাণীদের এক আবাস্থল হলো সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানা। বিশ্বের সবচেয়ে অসাধারণ রেইনফরেস্ট চিড়িয়াখানা এটি। প্রচুর ওরাংওটাংয়ের বাস এই চিড়িয়াখানায়।

সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানা, ছবিঃ thousandwonders.net

আরো আছে শিম্পাঞ্জি, মিরক্যাট, মোল র‍্যাট, জেব্রা, কমোডো ড্রাগন, ক্যাংগারুর বিশাল পরিবার। চিড়িয়াখানার বিশাল জীববৈচিত্র যদি আপনার পশুপাখি দেখার তেষ্টা মেটাতে না পারে তবে আপনার জন্য আছে নাইট সাফারি, রিভার সাফারি যেটায় জায়ান্ট পান্ডা ফরেস্ট সাফারি অন্তর্ভুক্ত। এত কিছুতেও যদি মন না ভরে তবে লুফে নিন চিড়িয়াখানার সবচেয়ে দুর্দান্ত প্রস্তাব, ওরাংওটাংয়ের সাথে সকালের নাস্তার প্রস্তাব। হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন, সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানা আপনাকে দেবে ওরাংওটাংয়ের সাথে সকালের নাস্তা করার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সুযোগ, সে সুযোগ কাজে লাগানোর দায়িত্ব অবশ্য সম্পূর্ণ আপনার কাঁধে বর্তায়।

সিঙ্গাপুর ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য:

বাংলাদেশ থেকেই ভিসা করিয়ে সিঙ্গাপুর যেতে হবে। ভিসা কীভাবে করবেন সেই তথ্য সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের ওয়েবসাইটে (www.mfa.gov.sg/content/mfa/overseasmission/dhaka/visa_information/visa_application.html) পেয়ে যাবেন। ভিসা ফি প্রায় ২,৬০০ টাকার মতো। বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার উড়োজাহাজের ইকোনমি শ্রেণীর রিটার্ন টিকেট (যাওয়া+আসা) মূল্য প্রায় ২৫,০০০ টাকার মতো। তিন-চার মাস আগে বিমানের টিকেট কেটে রাখলে আরো কমে যাবে ভাড়ার পরিমাণ।

অর্কার্ড রোড, ছবিঃ concordehotelsresorts.com

বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর যেতে চার ঘণ্টার মতো সময় লাগে। সিঙ্গাপুরে কম খরচে থাকার হোটেল পাওয়া যাবে ভিক্টোরিয়া স্ট্রিটে। ভাড়া পড়বে ৮-৯ হাজার টাকার মধ্যে। সিঙ্গাপুরে ঘোরার জন্য টুরিস্ট বাস পাওয়া যায়, প্রথমবার যারা সিঙ্গাপুর যাবেন তাদের জন্য এটাই হবে সর্বোত্তম বিকল্প তাছাড়া সারা শহর জুড়ে মেট্রো রেল তো আছেই। কেনাকাটা করার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে অর্কার্ড রোড। খাওয়া-দাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে বে ফ্রন্ট এভিনিউ, ম্যারিনা বে স্যান্ডস রিসোর্টের সামনের অংশটুকু।
সিঙ্গাপুর ছোট দেশ। ছোট দেশ হওয়া সত্বেও এর অসাধারণ উন্নতি চোখে পড়ার মতো। চারপাশে ঘেরা সমুদ্র, সামুদ্রিক জাহাজের ব্যবসা আর আধুনিক জীবনযাত্রা সিঙ্গাপুরের শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য। এক সপ্তাহে বেশ ভালো ভ্রমণ হয়ে যাবে সিঙ্গাপুরে। ভ্রমণ হোক প্রাঞ্জল এবং সুন্দর।
ফিচার ইমেজ- modernwingstours.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তেরো পুকুর আর ইমারতে ফেনীর দাগনভূঞায় প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি

টাইগার নেস্ট ট্রেকিং আর পারো ভ্রমণের আদ্যোপান্ত