ভারত ভ্রমণের আগেই যে কাজগুলো সেরে ফেলতে হবে

বাংলাদেশি হিসেবে যে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি যাওয়া হয় আমাদের তা হলো পাশের দেশ ভারত। সড়ক পথে যাওয়ার সুবিধা আর অল্প খরচে বাঘা বাঘা জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ বরাবরই ভারত ভ্রমণকে বাংলাদেশিদের কাছে করে তুলেছে আকর্ষণীয় আর স্বাচ্ছন্দ্যময়। তবে প্রথমবার যে কোনো জায়গায় গেলে পর্যাপ্ত পরিমাণ অনুসন্ধান আর তথ্যের অভাবে ভুলের পরিমাণ সাধারণত বেশি হয়ে থাকে।

প্রথমবার কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে তাই ভালো করে পড়াশোনা করে নেওয়াটা খুব জরুরী। ভারত ভ্রমণের আগে বেশিরভাগ বাংলাদেশি খুব সাধারণ কিছু ভুল করে থাকেন যার জন্য ভারতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ঝক্কি পোহাতে হয়। ছোট ছোট এমন কিছু কাজ আছে যা আগেই বাংলাদেশ থেকে একটু দায়িত্ব নিয়ে শেষ করে রাখলে ভারত ভ্রমণে ঝুট-ঝামেলার পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়।

আমাদের আজকের আয়োজন থাকছে তেমনই কিছু ছোট কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে যা ভারত ভ্রমণের আগে শেষ করে রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

১. দেখে নিন কোথায় কোথায় ঘুরবেন আর কীভাবে ঘুরবেন

ছবি: www.topnews.in


ইন্টারনেটের যুগে মানুষ এক দেশে থাকা অবস্থাতেই আরেক দেশের নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে পারে। তাই যে জায়গায় যাবেন তার ম্যাপটি অফলাইনে ডাউনলোড করে নিন আপনার মোবাইলে। দেখে নিন কী কী বিখ্যাত জায়গা আছে দেখার মতো সেখানে।

সেসব জায়গা সম্পর্কে ব্লগ পড়ুন, মানুষের অভিজ্ঞতা পড়ুন। জেনে নিন সব কয়টি জায়গা ঘুরতে ঠিক কোন যানবাহন ব্যবহার করা লাগবে, সেটা হতে পারে চার বাই চার ল্যান্ড রোভার, হতে পারে জীপ অথবা সিটি বাস।

২. খরচের খসড়া করে নিন আগেভাগেই

ছবি: bhandardaracamping.com


এক্ষেত্রে প্রথমেই ঠিক করে নিন মোট কয়টি জায়গা ঘুরবেন। সেসব জায়গার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ঘেঁটে বের করুন কোথা থেকে যাত্রা শুরু করলে সবচেয়ে লাভজনক হয়। প্রতিটি ধাপে কত খরচ হতে পারে তা সেসব ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে বের করে ফেলুন আর টুকে রাখুন। প্রতিটি ধাপে দীর্ঘ যাত্রা কয়টি আছে তার হিসেবও করে ফেলতে হবে। তাহলে পুরো ট্যুরটি শেষ করতে মোট কয়দিন সময় লাগবে তা নিমেষেই বের হয়ে যাবে।

এই দিনের হিসেবটা দরকার হোটেলের রুম নেয়ার জন্য আর খাবার খরচের হিসেব করার জন্য। প্রতিদিন প্রতিজনের কমপক্ষে একটা খাবার খরচ নিজের চাহিদা অনুযায়ী ধরে নিয়ে দিনের সংখ্যা দিয়ে গুণ করলেই একজনের মোট খাবারের খরচ বের হয়ে আসবে। কোথায় কত খরচ হবে তার একটা সূক্ষ্ম ধারণা থাকলে বাইরের দেশে গিয়ে কখনোই ঠকতে হবে না আপনাকে।

৩. হোটেল ঠিক করে রাখুন পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে

ছবিঃ travelvisabooking.com

ভারতের একটা নির্দিষ্ট সময়ে হোটেল রুমের খুব চাহিদা দেখা যায়, সেটা হলো দূর্গাপূজার সময়। যদি দূর্গাপূজার সময় কোনো উপায়ে আপনার কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের কোনো শহরে থাকার প্রয়োজন হয় তবে হোটেলের রুম বুক করে রাখুন আগেভাগেই। রি বুকিংয়ের কাজটি এতই সোজা যে মাত্র পাঁচ মিনিটেই সেরে ফেলা সম্ভব। যাদের এন্ড্রয়েড আছে তারা প্লেস্টোর থেকে “Booking.com” অথবা “Makemytrip” অথবা “Trivago” এর মধ্যে যে কোনো একটি অ্যাপ ডাউনলোড করে নিতে পারেন।

আর কম্পিউটার দিয়ে সরাসরি ওয়েবসাইটে গিয়ে হোটেল বুক করা যাবে। এইসব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বুকিং দেয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আপনাকে বুকিং দিতে কোনো টাকা খরচ করতে হবে না, কোনো এডভান্স দিতে হবে না। যেদিন হোটেলে যাবেন সেদিনই ক্যাশ রুপির মাধ্যমে আগে থেকে বুক করা হোটেলের ভাড়া পরিশোধ করতে পারবেন। এর আরেকটি সুবিধে হলো হোটেলের থাকার তারিখের ঠিক দুইদিন আগ পর্যন্ত ফ্রিতে বাতিল করে দিতে পারবেন বুকিংটি।

৪. ট্রেনের বা উড়োজাহাজের টিকেট কাটুন এক মাস আগে

ছবিঃ mensxp.com


মনে রাখতে হবে ভারত প্রায় ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ। তাই হুট করে ভারতে ঢুকে যে কোনো স্টেশনে গিয়ে দূরপাল্লার এক ট্রেনের টিকেট চেয়ে বসবেন আর পেয়ে যাবেন এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। যদি উড়োজাহাজেও যাবার চিন্তাভাবনা থাকে তবুও টিকেট কাটতে হবে কমপক্ষে এক মাস আগে। এজন্য প্রথমেই জানতে হবে কোন কোন ট্রেন আপনার গন্তব্যে যায়, সবদিন চলে কিনা সেই ট্রেনগুলো, গতি কেমন আর দাঁড়ায় ঠিক কতটি স্টেশনে। ট্রেন নির্বাচন হয়ে গেলে দেখে নিন ট্রেনের সিট আছে কিনা।

ভারতীয় ট্রেনের কামরা কয়েক ধরনের হয়, যেমন- স্লিপার, থ্রি টায়ার এসি, টু টায়ার এসি ইত্যাদি। দূরপাল্লার ট্রেনগুলোর ক্ষেত্রে স্লিপারের ভাড়া সাধ্যের মধ্যে। যথেষ্ট সিট আছে কিনা আর ভাড়া দেখার জন্য “Trainman” নামের একটি অ্যাপ আছে প্লেস্টোরে, ডাউনলোড করে নিতে পারেন। ভারতীয় ট্রেনের টিকেট কাটতে হয় “www.irtc.com” থেকে। তবে সেখানে একাউন্ট থাকতে হয় যা ভারতীয় মোবাইল নম্বর দ্বারা যাচাই করে নিতে হয়। বাংলাদেশীয় নম্বর দিয়েই একাউন্ট খোলা যাবে, তবে সেক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড থাকতে হবে আপনার।

একাউন্ট খোলার চার্জ হিসেবে ১৩৫ রুপির সমপরিমাণ টাকা কেটে নেয়া হবে প্রথমবার। যদি এত ঝামেলার মধ্যে দিয়ে না যেতে চান তবে যে কোনো ট্রাভেল এজেন্সীর মাধ্যমে টিকেটিংয়ের ব্যাপারটি সেরে ফেলতে পারেন। অথবা পরিচিত কেউ যদি আপনার যাত্রার এক-দেড় মাসের মধ্যে ভারতে যায় তাকে দিয়েও করিয়ে নিতে পারবেন টিকেট সরাসরি রেলস্টেশন থেকে। উল্লেখ্য যে, ভারতের যে কোনো রেলস্টেশন থেকে যে কোনো ট্রেনের যে কোনো দিনের যে কোনো গন্তব্যের টিকেট কাটা যায়।

৫. ভ্রমণ কর দিয়ে পরিশোধ করুন আশেপাশের সরকারী ব্যাংকে

ছবিঃ sinbadkonicks.com

অধিকাংশ ভারত ভ্রমণকারীদের বর্ডারে গিয়ে ঝাক্কি পোহাতে হয় এই ভ্রমণ কর তথা ট্রাভেল ট্যাক্স নিয়ে। বর্ডারে প্রতিদিন প্রায় কয়েকশ, কোনো কোনো দিন হাজারের উপর মানুষ পার হয় এক দেশ থেকে অন্য দেশে। ভারত ও বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ট্রাভেল ট্যাক্স ৫০০ টাকা দেয়ার জন্য বর্ডারের ছোট একটা কাউন্টারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ।

এত কষ্ট করে বর্ডারে সময় নষ্ট না করে একটু আশেপাশের সরকারী ব্যাংকগুলোতে যান পাসপোর্ট আর ৫০০ টাকা নিয়ে। সোনালি ব্যাংকের একটি আলাদা সেকশনই আছে ভ্রমণ কর পরিশোধের জন্য। খুব বেশি হলে ১৫ জনের একটি লাইনে একদম পিছনে দাঁড়িয়েও যে সময়ে আপনি এই ভ্রমণ কর পরিশোধ করে ফেলত পারবেন তা বর্ডারের নষ্টকৃত সময়ের দশ ভাগের এক ভাগ সময় মাত্র।

৬. ডলার এন্ডোর্সমেন্ট করে নিন যাত্রার আগে

ছবিঃ লেখক

আগে শুধু ভিসা করানোর কাজে ডলার এন্ডোর্সমেন্ট লাগতো। এখন বর্ডার পার হতে গেলে অধিকাংশ বর্ডারে ডলার এন্ডোর্সমেন্ট নিয়ে ঝামেলা করে। “ডলার এন্ডোর্সমেন্ট” শব্দ দুটোর সাথে যারা পরিচিত নন তাদের জেনে রাখার জন্য, ডলার এন্ডোর্সমেন্ট মানে হল বাংলা টাকা বৈধ উপায়ে ডলারে রুপান্তরিত করা। এই এন্ডোর্সমেন্ট যে কোনো বেসরকারী ব্যাংক, ভালো মানি এক্সচেঞ্জার থেকে করানো সম্ভব।

এক্ষেত্রে অবশ্যই যে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে তা হলো, অনু্মোদিত সংস্থা থেকে ডলার এন্ডোর্স করালে পাসপোর্টের একদম পেছনের দিকের পাতাগুলোয় তারা একটি সীল দিয়ে দেবে আর লিখে দেবে কত ডলার এন্ডোর্স করা হলো। যদি কোনো মানি এক্সচেঞ্জার বা ব্যাংক উক্ত সুবিধাটি দিতে ব্যর্থ হয় তবে কখনোই সেখান থেকে ডলার কেনা উচিত নয় কারণ বর্ডারে ডলারের সাথে এন্ডোর্সমেন্টের সেই সীলটিও দেখবে।

৭. ডলার রুপিতে পরিবর্তনে সতর্কতা অবলম্বন করুন

ছবিঃ লেখক

ইদানিং ভারতীয় কাস্টমস বাংলা মুদ্রা পরিবহনের ব্যাপারে নিয়মকানুনে বিশাল পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশ থেকে এন্ডোর্সকৃত ডলার আপনি ভারতে গিয়ে যেখানেই রুপিতে পরিবর্তন করুন না কেন মানি এক্সচেঞ্জারের কাছ থেকে রসিদ নিতে ভুলে যাবেন না। এই রসিদেও ভারত সরকার ৪৫ রুপি চার্জ আরোপ করেছে যার অধের্ক যাবে কেন্দ্রীয় কোষাগারে আর বাকি অর্ধেক যাবে অঙ্গরাজ্যের কোষাগারে।

এই রসিদ ফিরে আসার সময় ভারতীয় কাস্টমসে চাইবে, তাই মনে করে সংগ্রহে রাখুন রসিদটি। উল্লেখ্য যে যত সংখ্যক পাসপোর্টে ব্যাংক এন্ডোর্সমেন্ট থাকবে রসিদ লাগবে ঠিক ততখানি।

ফিচার ইমেজ- www.whatsuplife.in

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রায়-চৌধুরি পরিবারের রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি ও মন্দির

পুণ্যস্থান গয়া কাব্য: প্রথম দিনের নগর ভ্রমণ