থিম্পু: অচেনা শহর চেনা লোকজন

সকালের নাস্তা করার সাথে সাথেই আমাদের গাড়ির ড্রাইভার (তাকে ড্রাইভার বললে ভুল হবে, আমাদের গাইড প্লাস বন্ধু) এম্বো গাড়িতে লাগেজ উঠাতে লাগলো। ৯টার দিকে আমরা পারো থেকে থিম্পুর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। এদিন আমরা পারোর কিছু দর্শনীয় জায়গা ঘুরে থিম্পুতে যাই। প্রথমে আমরা যাই ভুটান মিউজিয়ামে। সেখানে ভেতরে কোনো কিছু নিয়ে ঢোকা নিষেধ, তাই আমরা ছবি তুললে পারিনি। কিন্তু বাইরে যে চমৎকার ভিউ ছিল তা দেখার মতো।
আমি আমার মন প্রাণ উজাড় করে দু’চোখ ভরে দেখতে লাগলাম। ক্যামারায় ছবি বন্দি করা যায় কিন্তু মন আর চোখ দিয়ে যা উপলব্ধি করা যায় তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। শুধু যে দেখবে সেই বুঝবে, যদি তার মন আর চোখ থাকে বোঝার। সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম পারো জংয়ে। এই পারো জং দিনের থেকে রাতের বেলা দেখতে অনেক সুন্দর লেগেছে। পারো শহর থেকেই এটা দেখা যায়। এর মধ্যে ঘটে গেল একটা সুন্দর ঘটনা।

ভুটান মিউজিয়ামের পাশে; ছবি- রেজা ভাই

আমাদের সাথের একজন ছোট ভাই, সোহান, বলল সে মানিব্যাগ ফেলে এসেছে মিউজিয়ামের ওয়াশরুমে। তাই আমরা সেখানে রওনা হলাম। পথেই আমরা সেখান থেকে ফোন পেলাম। সোহান যাওয়ার সাথে সাথেই তারা ছবির সাথে মিলিয়ে মানিব্যাগ ফিরিয়ে দিল। আমরা আবার চলতে লাগলাম। আর আমি ভাবছি এই শহর আর দেশের মানুষের শিষ্টাচারের কথা, যা কখনো কখনো ছোটকে বড় করে দেখতে শেখায়।
এরপর গেলাম পারো এয়ারপোর্ট যা আমি আমার প্রথম লেখায় লিখেছি। এম্বো আমাদের জানালেন এখন আমরা যাচ্ছি থিম্পুতে । থিম্পু শহরটি ৭ হাজার ৩৭৫ ফুট থেকে ৮ হাজার ৬৮৮ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। পারো থেকে এর দুরত্ব ৫০ কি.মি.। পথেই আমরা নেমে পড়লাম পাহাড়ি নদীর ধারে। পাহাড়ি নদী মানেই সৌন্দর্যের পসরা, তা অজানা ছিল না। রাইদাক নদীর কথা বলছি, স্থানীয়রা একে ওয়াং চু বলে। ‘চু’ শব্দের অর্থ ‘জল’। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ওয়াং চু হলো ব্রহ্মপুত্র নদের উপনদী। আমাদের বেশ কিছুক্ষণ ফটোসেশন চলল। এরপর আমরা থিম্পু গেট পার হয়ে থিম্পু শহরে প্রবেশ করলাম।
বুদ্ধ পয়েন্টের ল্যান্ডস্কেপ; ছবি- লেখক

দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেছে আর পরের দিন যেহেতু পুনাখা যাব তাই আমাদের গ্রুপ লিডার এখানে এক ঘণ্টার একটা ব্রেক দিলেন। আমরাও শহরটার আশেপাশে ঘুরতে লাগলাম। এই অচেনা শহরের লোকজনকে বড় বেশি চেনা মনে হতে লাগলো শুধুমাত্র তাদের আচার আচরণের কারণে। অসম্ভব সুন্দর সাজানো গোছানো শহর যত দেখি ততই ভালো লাগে আর বিস্মিত হই। তবে যেহেতু আমরা সমতল দেশের মানুষ সেদিন দুপুরের খাবার নিয়ে আমরা কমবেশি সবাই বিড়ম্বনায় পড়েছি, শুধুমাত্র অভ্যস্ত নই বলে।
যাই হোক, এখান থেকে এবার গন্ত্যবস্থল বুদ্ধা পয়েন্ট। থিম্পু থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরত্বে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। সাপের মতো আঁকাবাঁকা খাড়া পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি। রাস্তার পাশে ফুটে রয়েছে অসংখ্য নাম না জানা জংলি ফুল আর সারি সারি রডোড্রেন্ডনের সমারোহ। রডো মানে ‘রোজ’ আর ড্রেন্ডন মানে ‘ট্রি’। আক্ষরিক অর্থে গোলাপ গাছ হলেও দেখতে মোটেও গোলাপের মতো নয়। তবে তার সৌন্দর্য গোলাপকেও ছাড়িয়ে গেছে। আশপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে কখন যে বুদ্ধা পয়েন্ট বা ডর্ডেনমা চলে এসেছি, তা বুঝতেই পারিনি।
বুদ্ধ পয়েন্ট; ছবি- লেখক

এখান থেকে পুরো থিম্পু শহরটাকে মনে হচ্ছে পাহাড়ের পাদদেশে খুব যত্ন করে বানানো অসংখ্য খেলনাবাড়ি। ‘বুদ্ধা পয়েন্ট’ থিম্পু শহরের সব জায়গা থেকেই কমবেশি দেখা যায়। ১৬৯ ফুট উঁচু মূর্তিটি (প্রায় ১৭ তলা ভবনের সমান) একটি সিংহাসনের উপর বসানো । আর এই সিংহাসনটি  তিনতলার সমন্বয়ে গঠিত একটি মেডিটেশন হল। মূর্তিটি ব্রোঞ্জ নির্মিত হলেও এতে রয়েছে সোনার প্রলেপ আর দৃষ্টিনন্দিত কারুকার্য। মেডিটেশন হলের বাইরে খোলা আকাশের নিচে বড় পরিসরে আরও অনেক সোনালি মূর্তি। এটি মহান সক্যমুনি বুদ্ধের সবচেয়ে বড় উপবিষ্ট মূর্তি (সক্যমুনি বুদ্ধের অন্যতম নাম)। এর আশেপাশের ল্যান্ডস্কেপ অসম্ভব সুন্দর।
চতুর্থ রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াংচুকের (আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ) ৬০তম জন্ম বার্ষিকী উদযাপনে উপলক্ষ্যে ভুটানের রাজধানী থিম্পুর কুয়েসেলফোদরং পাহাড়ে এই বিশালাকায় মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান; ছবি- লেখক

এখানে ঘুরতে ঘুরতে আমদের গ্রুপ লিডার ঘোষনা দিলেন রানীর অতিথি হিসেবে আমরা বিকালে একটা কালচার প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতে পারবো। তাই আমরা তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরে রেডি হয়ে কালচার প্রোগামের জন্য বেরিয়ে গেলাম। এখানে বলে রাখা ভালো যে থিম্পু শহরে শুধু ঐ জায়গায়টায় আমি শব্দ বা আওয়াজ শুনেছি আর কোথাও এইরকম শুনতে পাইনি।
কালচার প্রোগ্রামটা উপভোগ্য ছিল। সেখানে সবাই বাটার টি নামে এক চায়ের সাথে পরিচিত হয় যদিও এর স্বাদ আমি গ্রহণ করিনি, তবে অন্য সবার কাছ থেকে মিশ্র অনুভূতি পেয়েছি। প্রোগ্রামের শেষে সবাই এক সাথে তাদের সাথে মিলে নাচে অংশগ্রহণ করে। সেটা ছিল দেখার মতো বিষয়।
পেয়ালাতে বাটার টি; ছবি- লেখক

সন্ধ্যায় আমরা হোটেলে ফিরে এসে এদিক সেদিক কিছুক্ষণ ঘুরে রাত ৯টার দিকে ডিনারে চলে যাই। ডিনারটা আমরা বেশ সময় নিয়ে করি। আমাদের গ্রুপ লিডার সবার টেবিলে টেবিলে এসে তদারকি করতে থাকেন- কারো কিছু লাগবে কিনা বা কোনো অসুবিধা থাকলে জানতে চেয়েছেন। তার এই আচরণ আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। এরইমধ্যে পরেরদিন খুব ভোরে পুনাখাতে যাব তার এলান দিলেন তিনি। তাই সকালের নাস্তা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে সেরে নিয়ে তৈরি থাকতে বললেন। আরেকটা কথা থিম্পুতে আমরা হোটেল ৮৯ এ উঠেছিলাম। দারুণ হোটেল সাজানো গুছানো। ঘুমটা ভালো হয়েছিল।
ফিচার ইমেজ- bhutan.travel

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
  1. ধন্যবাদ, ভুটান সম্পর্কে জানলাম। বিবরণে সক্যমুনি বুদ্ধ লেখা হয়েছে, শব্দটি হবে শাক্যমুনি বুদ্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধ নগরী লন্ডনের যা কিছু অবশ্যই দেখা উচিৎ-(পর্ব ২)

বর্ষায় বান্দরবানে পারিবারিক ভ্রমণ