বিশ্বের সেরা কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির

বৌদ্ধ ধর্ম, গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত একটি ধর্ম বিশ্বাস এবং জীবন দর্শন। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দিতে গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল। বুদ্ধের পরিনির্বাণের পরে ভারতীয় উপমহাদেশ সহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার হয়। ধর্মীয় পবিত্র অনুভূতি থেকে অসংখ্য বৌদ্ধ মন্দির তৈরি হয়েছে বিশ্বে।
বৌদ্ধ মন্দিরগুলো অত্যন্ত সুন্দর। শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুভূতি ও উপাসনার জন্যই সেসব মন্দিরগুলোতে গিয়ে থাকেন সকলে, ঠিক তেমনটা নয়। পবিত্র ও সুন্দর এসব স্থানে ভিন্ন ধর্মের মানুষদেরও ভিড় দেখা যায়। তারা উপভোগ করতে যান একেকটি মন্দিরের অসাধারণ সৌন্দর্যকে।
বিশ্বের অসাধারণ সব বৌদ্ধ মন্দির সম্পর্কে জানতে চান? কখনো ইচ্ছে হয়েছে সেসব মন্দিরগুলো ঘুরে দেখতে? তবে জেনে নিন, বিশ্বের কয়েকটি বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির সম্পর্কে।

১. হৈয়েনসা মন্দির, দক্ষিণ কোরিয়া:

হৈয়েনসা মন্দির; source: ourtourplan.com

হৈয়েনসা (দক্ষিণ সাগরে প্রতিফলন ফেলা একটি মন্দির) দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। অত্যন্ত সুন্দর এই মন্দিরটি প্রথমে ৮০২ সালে নির্মিত হয়েছিল। ১৮১৭ সালে মন্দিরটি আগুন লেগে পুড়ে গিয়েছিল। তারপর উনবিংশ শতকের দিকে হৈয়েনসা মন্দিরটিকে পুনরায় নির্মাণ করা হয়।
দারুণ কারুকাজ ও সুন্দর ডিজাইনের এই মন্দিরটির সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল এই মন্দিরে সংরক্ষিত বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের ৮১,২৫৮ ওয়ার্ডব্লকের একটি ত্রিপিটক বই। আগুন লেগে যদিও মন্দিরটির অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, তবে সৌভাগ্যবশত টিকে ছিল এই ত্রিপিটক বইটি। মন্দিরটি অনেক বেশিই সুন্দর। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন দক্ষিণ কোরিয়ায় এই মন্দিরটিকে দেখতে।

২. ওয়াট আরুন, থাইল্যান্ড:

ওয়াট আরুন; source: www.touropia.com

থাইল্যান্ডের বেশ পুরনো ও বেশ জনপ্রিয় একটি মন্দির ওয়াট আরুন। এই মন্দিরটি স্থাপন করা হয়েছিল হিন্দু দেবতা অরুনের স্মারক হিসেবে। ওয়াট আরুন মানে ভোরের মন্দির। ব্যাংককের ইয়াই জেলার চাও ফারায়া নদীর তটে অবস্থিত এই মন্দিরটি। পাশের চাও ফারায়া নদীটি বেশ পবিত্রতার বার্তা নিয়ে বয়ে চলেছে ওয়াট আরুনের পাশ দিয়ে, এমনটাই মনে করেন পর্যটক ও ধর্মীয় টানে এ মন্দিরটিতে ছুটে আসা মানুষেরা। তাদের কাছে ওয়াট আরুনের চারপাশ বেশ স্নিগ্ধতা ও পবিত্রতা বহন করে।
ওয়াট আরুনের কেন্দ্রীয় চূড়াটি ৮৫ মিটার মানে ২৮০ ফুট উঁচু। মন্দিরটি বৌদ্ধ মহাজাগতিকতার কেন্দ্র ও এটি মাউন্ট মেরুর একটি স্থাপত্য উপস্থাপনা। নামের সাথে মিল রাখা এই মন্দিরটির সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য দেখা যায় সন্ধ্যায়, যখন সূর্যটি মন্দিরের পেছন দিক থেকে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নিচের দিকে তলাতে থাকে। মূলত এই অসাধারণ ও নৈসর্গিক দৃশ্যই মন্দিরটিকে এত জনপ্রিয় করে রেখেছে এবং এ কারণেই প্রত্যেক বছর মন্দিরটি দেখতে এত পর্যটকের আগমন ঘটে থাইল্যান্ডে।

৩. ফা দেত লুং, লাওস:

ফা দেত লুং; source: www.touropia.com

ফা দেত লুং ভিয়েতনাম, লাওসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্দির। মন্দিরটি ১৬ শতকের পূর্বে নির্মাণ করা হয়। ১৮২৮ সালে সন্ত্রাসীদের আক্রমণ দ্বারা এটিকে ধ্বংস করা হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৩১ সালে ফরাসি কর্তৃক এটি আবার পুনরায় নির্মাণ করা হয়। লাওসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভও এই মন্দিরটি।
এই মন্দিরটির বেশ কিছু ছাদ রয়েছে যার প্রত্যেকটি স্তর বৌদ্ধ ধর্মের আলোকবর্তিকার একেকটি ভিন্ন ভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। মন্দিরটির সবচেয়ে নিচের স্তর এই বিশ্বের উপাদানের প্রতিনিধিত্ব করে আর মন্দিরের সর্বোচ্চ স্তরটি তুলে ধরে এই বিশ্বের শূন্যতা। মন্দিরটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র একটি স্থান। এ মন্দিরটি পরিদর্শনে শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নয়, বিশ্বের সকল ধর্মের পর্যটকরাই আসেন।

৪. জোখাঁং মন্দির, লাসা:

জোখাঁং মন্দির; source: www.touropia.com

লাসার তিব্বতে অবস্থিত এই জোখাঁং বৌদ্ধ মন্দিরটি। এটি তিব্বতের সবেচেয়ে আকর্ষণীয় মন্দির। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী ভ্রমণ করতে আসেন এই মন্দিরটি। তীর্থযাত্রী ছাড়াও মন্দিরটি দেখতে ভিড় জমান ভ্রমণ প্রিয় মানুষেরা। তবে তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে পবিত্র একটি স্থান।
সপ্তম শতাব্দীর কাছাকাছি, রাজা সংসান গাম্পো কর্তৃক এই জাখোঁং মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। এই অসাধারণ বৌদ্ধ মন্দিরটি ২৫ হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে। মঙ্গোলরা বিভিন্ন সময়ে অসংখ্যবার জোখাঁং মন্দিরটিকে বরখাস্ত করার চেষ্টা করলেও মন্দিরের দালানটি আজো টিকে আছে।

৫. টাডাজি (গ্রেট ইস্টার্ন টেম্পল), জাপান:

টাডাজি; source: www.touropia.com

জাপানের নরাতে অবস্থিত টাডাজি বা গ্রেট ইস্টার্ন টেম্পলটি ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জাপানের বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর মধ্যে একটি। অষ্টম শতাব্দীতে সম্রাট শমু কর্তৃক জাপানের সমস্ত প্রাদেশিক বৌদ্ধ মন্দিরের প্রধান মন্দির হিসেবে এই টাডাজি মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়। এ মন্দিরটিতে জাপানের সবচেয়ে পুরাতন বুদ্ধ মূর্তিগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম কাঠের বিল্ডিং বা বৌদ্ধ মন্দিরও বলা যায় এই মন্দিরটিকে। যদিও এটির মূল কাঠামোর আকার মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ।

৬. বোরোবুদুর মন্দির, ইন্দোনেশিয়া:

বোরোবুদুর মন্দির; source: wikimedia.com

শৈলেন্দ্র রাজবংশের শাসনকালে খ্রিস্টীয় ৯ম শতাব্দীতে বরোবুদুর মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়। বোরোবুদুর ইন্দোনেশিয়া রাষ্ট্রের মধ্য জাভার মাগেলাঙে অবস্থিত একটি মহাযান বৌদ্ধ মন্দির। বোরোবুদুর মন্দিরে ২,৬৭২টি খোদাই চিত্রের প্যানেল ও ৫০৪টি বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে। মন্দিরটির মূল গম্বুজটির চারদিকে রয়েছে ৭২টি বুদ্ধ মূর্তি। প্রত্যেকটি মূর্তি একটি স্তুপের গায়ে ছিদ্রাকার গর্তে রাখা আছে।
বোরোবুদুর বিশ্বের বৃহত্তম বৌদ্ধ মন্দির। এছাড়াও এই মন্দিরটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ স্মারক। ইন্দোনেশিয়ার বৌদ্ধরা বছরে একবার এই মন্দিরে বৈশাখ উৎসব উদযাপন করেন। সেসময় এই মন্দিরে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের পর্যটকরাও ভিড় জমায়। এই মন্দিরটি ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করা পর্যটন কেন্দ্র। এই মন্দিরের চত্বরটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত।
ফিচার ইমেজ- Muhammad Hossain Shobuj

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সিলেট ভ্রমণের ইতিবৃত্তান্ত: প্রথম দেখায় শ্রীমঙ্গলের মাধবকুণ্ড

সোনায় মোড়ানো সোনামার্গের পথে পথে