জোতলাং অভিযানের আদ্যপান্ত

কেন পাহাড়ে চড়েন? এত কষ্ট করে পাহাড়ে যাওয়ার কী মানে হয় ইত্যাদি প্রশ্নগুলো কতবার যে শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। যারা নিয়মিত পাহাড়ের সন্নিকটে যান, তারা হরহামেশায় এসকল প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। আসলে যে কখন পাহাড়ে যায়নি তাকে এই উত্তর দেওয়া কঠিন। যাকে পাহাড়ের নেশা পেয়ে বসেছে, সে-ই কেবল জানবে কী ভয়ংকর এই নেশা!

জোতলাং এর চূড়ায়; ছবি- কামরুন নাহার ইতি

নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে খুঁজতে থাকি এবার কোন পাহাড়ে যাওয়া যায়। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম আনঅফিসিয়ালি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া জোতলাং। এবারের অভিযানের গল্প জোতলাংকে ঘিরে।

রেমাক্রির উদ্দেশ্যে যাত্রা; ছবি- সাইমুন ইসলাম

শুরু হলো আমাদের কাঙ্খিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া অভিযান। একদম সকালে বান্দরবান শহরে বাস থেকে নেমে হালকা নাস্তা সেরে থানচির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের লকরঝকর মার্কা বাস। পাহাড়ের গায়ে চক্কর কেটে পৌঁছে যায় থানচিতে। ফ্রেস হয়ে পুলিশ-বিজিবির পারমিশন নিয়ে ট্রলারে করে যাই রেমাক্রির দিকে। বরাবরের মতো এবারও আমাদের গাইড হারুন ভাই।

রেমাক্রি থেকেই ট্রেকিং শুরু। রেমাক্রি থেকে ৫/৬ ঘণ্টা হাঁটলে দলিয়ান পাড়া। দুপুর ১টা নাগাদ দলিয়ান পাড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করি। প্রচণ্ড গরমে যখন সেদ্ধ হবার অবস্থা প্রায়, তখন স্বচ্ছ নিটল ঝিরির পানিতে গা ভেজাতেই শান্তি। আবার সাপের মতো পাহাড়ী রাস্তার চড়াই উৎরাই করতে করতে সামনের দিকে এগোতে গিয়ে কলিজা যখন গলার কাছে এসে পৌঁছায় তখন মনে হয়, এখানেই হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ি। এভাবেই গুটিগুটি পায়ে সন্ধ্যার আগেই দলিয়ান পাড়ায় পৌঁছে যাই।

দলিয়ান পাড়া; ছবি – মাজহারুল জিয়ন

এটাই এখন আমাদের বেসক্যাম্প। কারবারির ঘরে হাজিরা দিয়ে আমরা আমাদের পূর্ব নির্ধারিত ঘরে ঢুকি। সবাই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। রাতের খাবার খেয়ে চাঁদের আলোয় বেশ কয়েকজন মিলে পাড়ায় ঘুরতে বের হই। তখন ঢাকা থেকে আগত পরিচিত মুখগুলোর দেখা পেয়ে বেশ কিছুটা সময় আড্ডায় মেতে উঠি। সম্বিৎ ফিরে পেতেই ঘুমানোর জন্য ঘরে ফিরে যাই। কারণ খুব ভোরে উঠে জোতলাংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে।

ঝিরি আর বোল্ডারে ঘেরা পথ; ছবি- সাইমুন ইসলাম

ভোর পাঁচটায় টীম লিডার ঘুম থেকে তুলে দেয়। সুপ-নুডুলস দিয়ে নাস্তা সেরে জোতলাংয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা। আগের রাতে পাড়ার কারবারিকে বলে পাড়া থেকে লোকাল গাইডের ব্যবস্থা করে রাখা হয়।

ঠাণ্ডা ঝিরিতে পা ভিজিয়ে আর বড় বড় পাথুরে বোল্ডারে ঘেরা আঁকাবাঁকা রাস্তায় ঘণ্টাখানিক হাঁটার পর পোঁছে যাই ‘ওয়াই’ জংশনের কাছে। রাস্তা দুই ভাগ হয়ে দুই দিকে চলে যাওয়ায় নাম দিয়েছে ‘ওয়াই’ জংশন। হাতের ডানে গিয়েছে জোতলাং আর বামে বাংলাদেশে ৪র্থ চূড়া যোগী হাফং।     

ক্যাসকেড; ছবি- সাইমুন ইসলাম

‘ওয়াই’ জংশনের ডান দিক দিয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকি। অপূর্ব সুন্দর পাথরের বোল্ডার দিয়ে সাজানো-গোছানো রাস্তা। ছোট ছোট ক্যাসকেডের বয়ে যাওয়া পানির কুলকুল শব্দ আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে। রাস্তার দু’পাশে সবুজে সমারাহে ঘেরা। চোখের সামনেই প্রকৃতি তার চারপাশের দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। ৩ ঘণ্টা ট্রেকিংয়ের পর জোতলাংয়ের পাদদেশে।

জোতলাং এর পাদদেশে; ছবি- সাইমুন ইসলাম

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে এবার পাহাড় বেয়ে ওঠার পালা। হাচড়ে-পাচড়ে পিঁপড়ার মতো উঠতে থাকি। কখনো গাছের শিকড় ধরে, আবার কখনোবা বাঁশের সাহায্যে ঝুরঝুরে মাটি বেয়ে উঠছি। পথ যেন আর শেষ হতে চাইছে না! আরও ঘণ্টাখানেক ধরে বাঁশের ঝাড় হাতড়ে পৌঁছে যাই আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত চূড়ায়!

গাছের শিকড় ধরে পাথুরে দেয়াল বেয়ে ওঠা; ছবি- সাইমুন ইসলাম

আরেকটা স্বপ্নের বাস্তবরূপ যেন চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠলো। ছায়ায় বসে ঐ দূরের দৃশ্য দেখলে ৩,৩৩৫ ফিট বেয়ে ওঠানামার পরিশ্রম নস্যি বলে মনে হবে। সামনের দিকে তাকালে খাড়া পাহাড় নেমে গেছে মায়ানমারে দিকে। পুরো পাহাড়ের চূড়াকে ঘিরে রেখেছে বাঁশ ঝাড়।

মদক তং রেঞ্জের রিজ লাইন; ছবি- সাইমুন ইসলাম

জোতলংয়ের চূড়া থেকে দেখা যাচ্ছে মদক তং রেঞ্জের রিজ লাইন। জোতলাং আবার মদক মোয়াল নামেও পরিচিত। বাংলাদেশ-মায়ানমারের বর্ডার লাইন হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়টি।

সামিট নোট লিখে বোতলে ভরে রাখা হয়; ছবি- সাইমুন ইসলাম

সামিট নোট লিখে কিছু ছবি তুলে এবার নামার পালা। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগে এই বুনো ট্রেইল থেকে বের হতে হবে।

চূড়া থেকে নিচের দিকে নামতেই খাড়া বাঁশের ঝাড়টা কোনোমতে পার হয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসে একটু জিরিয়ে নেই। আর সাথে আনা শুকনো খাবারগুলো গোগ্রাসে গিলছে সবাই।

গাছের শেকড় ধরে বোল্ডার পাড়ি দেওয়া; ছবি- সাইমুন ইসলাম

জোতলাং ১০/১২ ঘণ্টার ট্রেইল হলেও খুব বেশি কষ্ট হয়নি আমাদের। পুরো পথ সবুজ গাছপালায় ঘেরা। ঝিরি আর ক্যাসকেড থাকায় পানির কষ্ট করতে হয়নি। তবে একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, পাহাড়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা আর যথেষ্ট ট্রেকিং করার ইচ্ছা না থাকলে এরকম বুনো ট্রেইলে না যাওয়াই ভাল।

সূর্য পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে; ছবি- সাইমুন ইসলাম

পাড়ার খুব কাছাকাছি ঝিরিতে গা ডুবানোর সাথে সাথে শরীরের সকল ক্লান্তি এক নিমেষেই ধুয়ে-মুছে গেল। পশ্চিম আকাশে সূর্য পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়ার পর আমরা পাড়ায় ঢুকলাম। পাছে বিজিবি দেখে ফেলে, সেই ভয়ে দেরি করে পাড়ায় ঢুকি।

পাড়ায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন টীম লিডার জিয়ন ভাই। আমাদেরকে দেখে সারাদিনের বৃত্তান্ত শুনে খাবারের ব্যবস্থা করতে যায়। পেট ততক্ষণে রাক্ষস হয়ে আছে। জুমের চালের খিচুড়ি আর পাহাড়ি মুরগী দিয়ে পেট নামক রাক্ষসকে শান্ত করি। পাহাড়ি চাঁদের আলোয় আড্ডা বসলো একদল শহুরে মানুষের।


দলিয়ান পাড়া থেকে নাফাখুম ফেরার পথে এই পাড়া পরবে; কেচিং পাড়া নাম।
ছবি- সাইমুন ইসলাম

পরদিন যোগী হাফং যাবার কথা থাকলেও যেতে পারিনি। ঐদিন রবিবার থাকায় পাড়া থেকে কোনো গাইড বাইরে যায় না। রবিবার ওদের প্রেয়ার ডে। এজন্য তারা কোনো কাজ করে না। তাই অগত্যা আমাদের প্ল্যান পরিবর্তন করতে হয়। ঠিক করা হলো রেমাক্রি গিয়ে আমরা একদিন ল্যাটাব (বিশ্রাম নেব)। সেই অনুসারে আমরা পাড়া থেকে বের হই। নাফাখুম হয়ে রেমাক্রি যেতে হবে।

মনের দুঃখে নাফাখুমে ভেলা চালাই; ছবি- মাজহারুল জিয়ন

বেলা ১২টা নাগাদ নাফাখুমে। সেখানে ডুবাডুবি, ঝাপাঝাপি করে পড়ন্ত বিকালে রেমাক্রির দিকে হাঁটতে থাকি। সবারই মন খারাপ যোগী হাফং সামিট করতে না পেরে। এত কাছে এসেও ফিরে যেতে হচ্ছে আমাদের। দুঃখ ভারক্রান্ত মন নিয়ে রেমাক্রি পৌঁছাই। রেমাক্রি খালের পানির কুলকুল শব্দে মন ভালো হয়ে যায় সবার। পানিতে ঝাপাঝাপি, দাপাদাপি করে শান্ত হই।

রেমাক্রি ফলস; ছবি- সাইমুন ইসলাম

রেমাক্রি পাড়ায় থাকার ব্যবস্থা হয় আমাদের। যে যার মতো আড্ডা দিচ্ছে। খাবার সময় হলে সবাইকে ডাকা হয়। জুমের চালের ভাত, আলু ভর্তা, ডাল আর রেমাক্রি খালের মাছ দিয়ে নৈশভোজ শেষ করি।

রেমাক্রি ফলস; ছবি- সাইমুন ইসলাম

মিলিয়ন স্টারের নিচে শুয়ে আরও একবার মনে হলো জীবনটা আসলেই অনেক বেশি সুন্দর। আর এই সুন্দরের খোঁজে বার বার ফিরে আসতে চাই এই পাহাড়-পর্বতে।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বান্দরবন

ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে হানিফ, ইউনিক, শ্যামলি ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দরবানে যায়। ভাড়া জনপ্রতি নন-এসি ৬২০ টাকা।

বান্দরবন থেকে থানচি

সকালে বান্দরবান শহর থেকে লোকাল বাস থানচি যায়। লোকাল বাস/ জীপ রিজার্ভ নিয়ে যেতে পারেন। জীপ ভাড়া ৬,০০০ থেকে ৬,৫০০টাকা।

থাকা-খাওয়া ও গাইড

গাইডের নাম হারুনুর রশিদ হারুন। গাইডের নাম্বার- ০১৮৪৯৫৫৬৩৪০। আগে থেকে গাইডের সাথে কথা বলে রাখা ভালো।

অবশ্যই মনে রাখবেন

*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন। 

*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।

*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পেহেলগামের স্বর্গীয় স্বর্গ প্যালেস!

টাঙ্গুয়ার টানে শরতের একদিন