পাথর কেটে তৈরি করা কয়েকটি সমাধি ও মন্দিরের গল্প

Tour to Abu Simbel from Aswan by private vehicle

প্রাচীন সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি অসংখ্য নির্মাণ আমরা পেয়েছি। তার কিছু যেমন সাধারণ, তেমনি কিছু নির্মাণ অত্যন্ত অসাধারণ ও বিস্ময়কর। পাহাড় কেটে তৈরি করা সমাধি, নগরী ও মন্দিরগুলো তেমনি একেকটি নির্মাণ। এসব সমাধি ও মন্দিরগুলোতে কৃত্রিমতা নেই, সবটাই প্রকৃতির ছোঁয়ায় মোড়ানো।

জেনে নেয়া যাক, পাহাড় কেটে তৈরি করা বিখ্যাত কয়েকটি সমাধি ও মন্দিরের কথা।

১. রাজাদের সমাধি (টোম্ব অব দ্য কিংস), জেরুজালেম

সাইপ্রাসের দক্ষিণ-পশ্চিমে পাফোসের কাছাকাছি টোম্ব অফ দ্য কিংস খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর একটি বৃহৎ উপদ্বীপ। সমাধির স্থানটি কঠিন শিলা থেকে তৈরি করা হয়েছে এবং এর পুরো অংশ ডোরিক কলামের মাধ্যমে সজ্জিত।

রাজাদের সমাধি; source: www.visitcyprus.com

টোম্ব অফ দ্য কিংস কিংবা রাজাদের সমাধি নাম হওয়া সত্ত্বেও এ স্থানে কোনো রাজ প্রতিনিধিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তীকালে অসাধারণ সুন্দর এই জায়গাটি ছিল টলেমাইক ধনীদের এবং উচ্চ কর্মকর্তাদের বিশ্রামের একটি স্থান।

২. লুইসিয়ান সমাধি, তুরস্ক

লুইসিয়া প্রাচীন শহরের একটি সংস্থান ছিল যা বর্তমানে তুরস্কের তুর্কি প্রদেশের আন্টালিয়া ও মুগলে অবস্থিত। লুইসিয়ান সমাধি শিলা মুখের পাশ ঘেঁষে রয়েছে, সাধারণভাবে বলতে গেলে সমাধিগুলো একটি খাড়া বাঁধের মধ্যে। প্রায় প্রত্যেকটি কবরই লুইসিয়ান ঘরগুলোর মত করে সজ্জিত।

লুইসিয়ান সমাধি; source: www.ancientpages.com

ধনী লুইসিয়ানরা শিলা কেটে অসাধারণ সৌন্দর্য তৈরি করে থাকে সমাধিগুলো ঘিরে। শিলা-কাটা সমাধিগুলোর বেশ কিছু অংশ বাহির থেকে মৃত ব্যক্তির নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য এবং মৃত্যুর সময়কালের প্রধান ঘটনাগুলো তুলে ধরার মতো করে সাজানো হয়ে থাকে।

৩. পেট্রা, জর্ডান

প্রাচীন পেট্রা নগরী অবস্থিত দক্ষিণ জর্ডানের বেলেপাথরে তৈরি খাড়াই পাহাড়ের গায়ে। পাথর কেটে পাহাড়ের মাঝে মানুষ তৈরি করে অলঙ্কৃত গুহা আর সেখানেই গড়ে তোলে সমৃদ্ধ এক সভ্যতা। আরব্য যাযাবর নাবাতিয়ান জাতির মানুষের তৈরি করা মন্দির, সমাধি, হল, বেদি অ্যাকুয়াডাক্ট রয়েছে এখানে।

পেট্রা নগরী; source: wikimedia.commons

২০ হাজার নাবাতিয়ানের এই শহরে ছিল পানির সঙ্কট। এ কারণেই তারা পাথর কেটে তৈরি করে পানি সরবরাহের এই অ্যাকুয়াডাক্ট। পুরো নগরীটিই মূলত পাথর কেটে তৈরি করা। পাথর কেটে তৈরি করা এখানকার মন্দির ও সমাধিগুলো অনন্য এক নিদর্শন।

৪. আবু সিম্বেল, মিশর

এটি মিশরের দক্ষিণাংশে অবস্থিত একটি পুরাতাত্ত্বিক স্থাপনা, যা দুটি বিশাল পাথর-নির্মিত মন্দির নিয়ে গঠিত। এটি আসওয়ানের ২৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে লেক নাসেরের পাড়ে অবস্থিত। এ স্থাপনাটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেছে।

আবু সিম্বেল; source: www.egypttoursportal.com

আবু সিম্বেলসহ সম্পূর্ণ এলাকাটি নুবিয়ান মনুমেন্টস নামে খ্যাত। মন্দির দুটি শুরুতে তৈরি করা হয়েছিল পাহাড়ের গা খোদাই করে। বর্তমানে স্থাপনাটি আসওয়ান বাঁধ এলাকার অনেক উপরে একটি কৃত্রিম পাহাড়ের উপরে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আবু সিম্বেল মিশরের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা।

৫. ভ্যালি অব দি কিংস, মিশর

ভ্যালি অব দি কিংস নীল নদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত একটি উপত্যকা। স্থানটি প্রাচীন মিশরের শাসকবর্গের সমাধি ক্ষেত্রের জন্য বিখ্যাত। মিশরের প্রাচীন সম্রাটের সমাধিস্থল থিবস নগরের অদূরবর্তী ভ্যালি অব দি কিংস আজ সারা পৃথিবীর টুরিস্টদের লীলাভূমি।

ভ্যালি অব দি কিংস; source: mapsofworld.com

জায়গাটি ভ্রমণ করতে বিশ্বের নানা দেশ থেকে ছুটে আসেন ভ্রমণপ্রিয়রা। পাহাড় কেটে তৈরি করা চমকপ্রদ এই সমাধি দেখতে সারা বছরই পর্যটকদের ভিড় থাকে।

৬. ভ্যালি অব দি কুইন্স, মিশর

কুইন্স উপত্যকা, মিশরের একটি জায়গা যেখানে ফেরাউনের স্ত্রীদের প্রাচীনকালে কবর দেওয়া হতো। উপত্যকায় থিবসের পাশে নীল নদের পশ্চিম তীরে, বিখ্যাত ভ্যালি অব দি কিংস উপত্যকার কাছাকাছি অবস্থিত এই ভ্যালি অব দি কুইন্স।

ভ্যালি অব দি কুইন্স; source: wikimedia.org

পশ্চিম পাহাড়ের এই বর্বর এলাকাটি তার আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এবং প্রাচীন মিশরীয় রাজধানীর নিকট হওয়ার কারণে নির্বাচিত হয়েছিল রানীদের সমাধি নির্মাণের জন্য। সমাধিস্থলটি ৭০টি শিলা-কাটা সমাধিসৌধ ধারণ করে, যা বেশিরভাগ আড়ম্বরপূর্ণ এবং মনোরমভাবে সজ্জিত।

৭. মাদাইন সালেহ, সৌদি আরব

সৌদিতে একটিমাত্র স্থান দেখার সুযোগ থাকলে প্রায় সবাই এ স্থানটিতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকবেন। মরুর অপার সৌন্দর্যের সঙ্গে বহু পুরাতন ইতিহাস এ স্থানে উপভোগ করতে পারবেন।

মাদাইন সালেহ; source: saudi-archaeology.co.

আরবের বিভিন্ন স্থানের বাণিজ্য, হজ্ব কাফেলা, অভিযাত্রী এবং সৈন্যদের চলাচলের ক্রসরোড ছিল মাদাইন সালেহ। পাহাড়ের গায়ে অপূর্ব নির্মাণশৈলী নিয়ে এ স্থানটিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন নাবাতায়েন সমাধিসৌধ। পেট্রার পরে এটিই পাহাড় কেটে নির্মাণ করা সবচেয়ে বৃহৎ নগরী।

৮. মোগাও গ্রটোস, চীন

মোগাও গ্রটোস বা মোগাও গুহাকে বলা হয় হাজার বুদ্ধের গুহা। দুনহাং গুহা এখানকার সবচেয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক অর্থে মূল্যবান গুহা। বৌদ্ধ চিত্রকর্মের বিশাল ভাণ্ডার পাওয়া যায় এ গুহায়। খনন করে আবিষ্কৃত হয়েছে ১ হাজারেরও বেশী মন্দির, যার মধ্যে সবচেয়ে প্রচীনটি নির্মিত হয় ৩৬৬ অব্ধে।

মোগাও গ্রটোস; source: http://www.china-tour.cn

এখনও ৪৯২টি মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে এবং তাদের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যগুলো সংরক্ষিত হচ্ছে যত্নের সাথে। মন্দিরগুলোয় রং করা স্থাপত্যের সংখ্যা ২ হাজারেরও বেশী। গুহাগুলো ৫০,০০০ ধর্মগ্রন্থ, নথিপত্র, টেক্সটাইল এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ধ্বংসাবশেষের আর্কাইভ।

৯. লালিবেলা

লালিবেলা ইথিওপিয়ার উত্তর অঞ্চলের সাধারণ একটি এলাকা হলেও এটি খ্রীষ্ট ধর্মালম্বিদের কাছে বেশ পবিত্র একটি শহর। কেননা এই শহরে আছে শিলা কেটে বানাবো সেন্ট জর্জ গীর্জা।
এই গীর্জাটি তৈরি করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রতিটি বিষয় অন্যান্য গীর্জা থেকে একে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছে।

লালিবেলা; source: www.vogue.com

অন্যান্য গীর্জার মতো এটি মাটির উপর না বানিয়ে বানানো হয়েছে মাটি খুঁড়ে। অগ্নিয়গিরির জমে যাওয়া লাভা কেটে বানানো হয়েছে এই গীর্জা ঘর। আর পুরোটাই একটি মাত্র শিলা খণ্ড। এ স্থানে শিলা কেটে তৈরি করা আরো কিছু গীর্জা রয়েছে। এটি ইউনেস্কো দ্বারা স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে সংরক্ষিত।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপোতাক্ষের তীরে: মাইকেলের বাড়ি সাগরদাঁড়িতে

তাজমহল বাংলাদেশ: ভালোবাসার আরেকটি নিদর্শন