রাজসিক রাজশাহী ভ্রমণের গল্পগাথা

রাজসিক শব্দটার মধ্যে এক ধরনের আভিজাত্য, গাম্ভীর্য, নীরব সৌন্দর্য আর আতিথেয়তা বিদ্যামান। আর এই সবকিছু শুধু রাজশাহীতেই পাওয়া সম্ভব। রাজশাহী এই দেশের এমন একটি শহর যেখানে নীরবে, নিভৃতে, নির্ঝঞ্ঝাটে একান্তে কিছু সময় কাটানোর এক আদর্শ স্থান হতে পারে।
সব সময় কি আর পাহাড়ের কঠোরতা ভালো লাগে? নাকি ভালো লাগে সারাক্ষণ সমুদ্রের গর্জন অথবা গভীর অরণ্য, বা সবুজের সমুদ্র? হ্যাঁ আমি আমাদের পাহাড়ি অঞ্চল, সমুদ্র আর চা বাগানের কথা বলেছি। কখনো কখনো মনে হয় না যে নাগরিক জীবনের কোলাহল ছেড়ে কোনো নগরের মধ্যেই কাটিয়ে আসি কয়েকটা দিন। যেখানে সকল নাগরিক সুবিধাই থাকবে, ইচ্ছে হলেই পাওয়া যাবে প্রয়োজনীয় সবকিছু হাতের নাগালে। কিন্তু থাকবে না কোনো কোলাহল, ধুলো-বালি বা কালো ধোঁয়ার অসহ্যতা, বাস-ট্রাকের অবিরত হর্ন, থাকবে না শিল্প-কারখানার বর্জ্য দূষণের অবিরাম নিঃসরণ, যেখানে থাকবে না নিরন্তর জ্যামে বসে থেকে সময়কে অসময়ের হাতে ছেড়ে দেয়ার অনিচ্ছাকৃত মন খারাপ।

আমের শহরে। ছবিঃ static.panoramio.com

ঠিক এমন করেই যদি কোনো বেড়ানোর জায়গা পেতে চান তো নির্দ্বিধায় চলে যেতে পারেন রাজসিক রাজশাহীতে। অনন্য সৌন্দর্যের কী কী পাবেন রাজশাহীতে? চলুন সেগুলো জেনে নেই একটু একটু করে।
কোনো শহরের মাঝেই পেতে চান অবিরাম বয়ে যাওয়া কলকল ধ্বনিতে মুখরিত, ঢেউয়ের দোলায় মনকে দুলিয়ে যাওয়া কোনো নদী? পাবেন পদ্মার তীরে গড়ে ওঠা রাজশাহীতে, ভরা বর্ষায় অসীম জলের অবিরাম ঢেউ, ঝিরঝিরে বাতাসে বসে থাকবেন টি বাঁধ নামক পাথরের বাঁধের স্বচ্ছ কোনো পাথরের উপরে বা সবুজ ঘাসের উপরে।
শরতে পাবেন নদীর পাড় জুড়ে কাশফুলের এক নরম আর অসম্ভব আকর্ষণীয় সাম্রাজ্য। কাছে দূরে জেগে থাকা ছোট-বড় বালুচর আর ক্ষুদ্র বনভূমি। চাইলে সেখানেও, সেই তপ্ত বালুচরেও খুঁজে পেতে পারেন এক অন্য রকম ভ্রমণ আনন্দ, একেবারেই ভিন্ন স্বাদের কোনো রোমাঞ্চ।
পদ্মা পাড়ে। ছবিঃ wikimedia.org

আর শীতে পাবেন দেশের মধ্যে মরুভূমির পূর্ণ স্বাদ! নদী তখন পানিহীন এক ধু-ধু মরুভূমিসম। যতদূর চোখ যায় শুধু শুকনো নদী, বালুচর আর তপ্ত রোদের উত্তাপ। হেঁটে বেড়িয়ে পেতে পারেন যে কোনো মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ানোর সত্যিকারের রোমাঞ্চ। গিয়েই দেখুন না একবার।
এরপর রয়েছে রাজসিক রাজশাহীর সবচেয়ে আকর্ষণ, বনভূমি আর অরণ্যে আচ্ছাদিত অসম্ভব নান্দনিক সাজে সব সময় সেজে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ছাড়া আর তেমন কোনো কিছুই চলে না, সেও দিনে দুই বা তিনবার। আর আছে একমাত্র বাহন রিক্সা। যে রিক্সাতে চড়ে বা পায়ে হেঁটেই দেখে নিতে পারেন পুরো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে, যদি সারাদিন বা অন্তত একটা বেলা বরাদ্দ রাখেন এই স্বর্গীয় অরণ্যে ঘেরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের শুরুতেই সবুজের গালিচা মোড়া জুবেরি ভবনের বিস্তীর্ণ মাঠ। সেই মাঠ পেরিয়ে কয়েক মিনিট হেঁটে ওপারে গেলেই স্বনামধন্য প্যারিস রোড, যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও কোনো বাঁক নেই বা নেই এতটুকু আঁকাবাঁকা রাস্তা, একদম সোজা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। যার দু’পাশে দাঁড়িয়ে আপনাকে অভিবাদন জানাবে বিশাল বিশাল রেইন ট্রি, কেওড়া, কৃষ্ণচূড়া, দেবদারু আর পাতা বাহারের সারিবদ্ধতা। রাস্তার প্রতিটি সংযোগ সড়ক যা অন্যান্য ভবনের সাথে সংযুক্ত ৯০ ডিগ্রী কোণে দুই পাশে দুটি কালভার্ট বা ছোট্ট ব্রিজ বসার জন্য।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ছবিঃ wikimedia.org

প্রতিটি ভবনের সামনে আর পেছনে সুবিশাল আর সুস্বাদু আম বাগান। প্যারিস রোডের একদম শেষে পৌঁছে ডানে গেলেই এক আধুনিক ভবন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন। পাশেই মুক্তিযুদ্ধের স্বাক্ষর রেখে যাওয়া ভাস্কর্য সাবাস বাংলাদেশ স্বচ্ছ আর বিসৃত যার উন্মুক্ত মঞ্চ, ঝকঝকে সিঁড়ি, যেখানে রাত কাটে কতশত দুঃখ আর আনন্দ মাখা মুখের হাজারো শিক্ষার্থীর। বিশাল মাঠের চারপাশে দেবদারুদের দাঁড়িয়ে থাকা, হয়ে থাকে প্রেমিক-প্রেমিকার আবেগের সাক্ষী।
এমন বিশাল আর উন্মুক্ত মাঠ আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক অনেকগুলো। আছে নির্ধারিত আর সব সময়ের ধুলো উড়িয়ে যাওয়া বাস স্ট্যান্ড, আছে অন্যতম কাজী নজরুল ইসলাম মিলানায়তন, অনিন্দ্য সুন্দর লাইব্রেরী, বোটানিক্যাল গার্ডেন, নীরব আর নিরীহ রেল লাইন আর তার পাশের চারুকলা, আছে অদ্ভুত সুন্দর এক পুকুর, যে পুকুর কাটা হয়েছে ঠিক বাংলাদেশের ম্যাপের অবিকল অনুসরণে! ভীষণ আকর্ষণীয় একটা জায়গা সেটা। কিছু দূরে পায়ে হেঁটে বা রিক্সায় চড়ে পেছনে গেলেই পাবেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বধ্যভূমি, যেখানে গেলে মন ভালো আর খারাপ দুটোই হবে নিমেষে। শহীদদের জন্য মন খারাপ আর উন্মুক্ত পৃথিবী দেখে মন ভালো হয়ে যাবে।
প্যারিস রোড, রাবি। ছবিঃ steemitimages.com

এই তো গেল রাজশাহী শহর আর তার অনিন্দ্য সুন্দর আর সেরা জায়গা বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া শহরের ভেতরেই একদম সাহেব বাজারে প্রাচীন রাজশাহী কলেজের ঠিক উল্টো পাশেই রয়েছে দেশের সবচেয়ে প্রাচীন বরেন্দ্র জাদুঘর যেখানে আছে অনেক অনেক পুরাকীর্তি, যা প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার জন্য অনন্য সংরক্ষণ।
রাজশাহী শহরের অদূরেই রয়েছে নাটোরের বিখ্যাত রাজবাড়ি। বনলতা সেন আর তার কবিতা, রয়েছে দেশ জোড়া খ্যাতি প্রাপ্ত কাঁচাগোল্লা, পুঠিয়া রাজবাড়ি, আম বাগানের স্বর্গের ছায়া, লিচু বাগানের আমন্ত্রণ। আর একটু দূরে গেলে দেখতে পাওয়া যাবে অনেক প্রাচীন সোনা মসজিদ। যেটার অবস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। তবে নাটোর বা চাঁপাই যেখানেই যাবেন দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসা যাবে অনায়াসে। আছে অনেক অনেক পুরনো পুঠিয়া রাজবাড়ি।
আর রাজশাহীর খাবারের মধ্যে দেশ শুধু নয়, উপমহাদেশ জোড়া খ্যাতি রয়েছে নানা রকমের আম, লিচু আর আছে কাঁঠালের। রাজকীয় শহরের রাজকীয় ব্যাপার, মধু মাসের মধুর সমারোহ রাজশাহীর প্রতিটি আনাচে-কানাচে। আর আছে শীতের অন্যতম আকর্ষণ একদম মৌলিক একটা খাবার কালাই রুটির সাথে বেগুনের ভর্তা আর টক-ঝাল চাটনি। যার স্বাদ এক কথায় অমৃত।
টি বাঁধ, রাজশাহী। ছবিঃ steemitimages.com

সংক্ষেপে এই হলো রাজশাহী। যেখানে পাহাড় নেই, সমুদ্র নেই, চা বাগান নেই, লেক নেই, অরণ্য নেই, তবে সুখ আছে, শান্তি আছে, আতিথিয়তা আছে, ঐতিহ্য আছে, আদর আছে, আপ্যায়ন আছে, ফুল-ফলের সমারোহ আছে, আর আছে নিখাদ সরলতা মাখা শত মানুষের সত্যিকারের সমাদর।
তো ঘুরে আসবেন নাকি একবার, রাজসিক এই রাজশাহীতে?
ফিচার ইমেজ- bp.blogspot.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নজরুলের চুরুলিয়া: প্রিয় যাই যাই বলো না

স্বপ্নপুরী ইতালি: শীর্ষ সব ভ্রমণস্থানের গল্প