মুক্তেশ্বরের মুগ্ধ পথে

নৈনিতাল যাওয়ার আগে, পরে বা পৌঁছে কখনোই মুক্তেশরের নাম আমি শুনিনি। যে কারণে নৈনিতালের দ্বিতীয় দিনটি আমরা বরাদ্দ রেখেছিলাম নৈনিতালের লোকাল বা শহরের কাছাকাছি কমন স্পটগুলো ঘুরে দেখার জন্য। কিন্তু রাতে খেয়ে আর মল রোডে অলস সময় কাটিয়ে যখন রুমে ফিরছিলাম, হোটেলের রিশেপসনে একটু ওয়াইফাই ব্যবহারের জন্য ঢুকেছিলাম। মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহারের ফাঁকে পাসপোর্ট ফেরত নেয়ার মধ্যেই হোটেলের ম্যানেজারের সাথে টুকটাক কথা বলছিলাম পরের দিনের প্ল্যান নিয়ে।

হোটেল ম্যানেজার আমাদের পাসপোর্ট ফেরত দিতে দিতে নিজে থেকেই বলল আপনারা যেহেতু বাংলাদেশ থেকে এসেছেন মন্দির বা এই ধরনের স্থাপনা নিশ্চয়ই দেখতে চাইবেন না বলে মনে হচ্ছে। আমরা কিছুটা সম্মতি জানাতে তিনি আমাদেরকে বললেন, এখানে মন্দির ছাড়া আর যে পাহাড় চূড়া, দূরের যে হিমালয়ের বরফের চূড়া দেখে সময় নষ্ট করবেন, তারচেয়ে ভালো হবে যদি সরাসরি এখান থেকে মুক্তেশ্বর চলে যান। কেননা সেখান থেকে হিমালয়ের নানা রকম পর্বত চূড়াগুলো প্রায় হাত ছোঁয়া দূরত্বে দেখতে পাবেন!

মুগ্ধ পথের মুগ্ধতার শুরু। ছবিঃ লেখক

আর নৈনিতাল থেকে মুক্তেশ্বর যাবার পুরো পথটুকুও দারুণ উপভোগ্য ও মনে রাখার মতো। দূরত্বও বেশি নয়, মাত্র ৬০ কিলোমিটার। মানে যাওয়া আসা ১২০ কিলোমিটার। চার ঘণ্টাতে হয়ে যাবে আর যতটুকু সময় থাকবেন সেই সময় বাদ দিয়ে ফেরার পথেই দেখে নিতে পারবেন নৈনিতালের কয়েকটি আকর্ষণীয় স্পট অনায়াসে। হোটেল ম্যানেজারের এই প্রস্তাব আমাদের সবার দারুণ মনে ধরেছে। যে কারণে সবাই ঠিক করলাম পরদিন সকালে আশেপাশে কোথাও ঘুরে সময় নষ্ট না করে সোজা মুক্তেশ্বর চলে যাবো। ফেরার পথে যা যা পড়বে আর যতটুকু সম্ভব ততটুকু দেখে নেব। পরদিন একেবারেই নতুন আর অজানা অচেনা কোনো গন্ত্যব্যে যাবার রোমাঞ্চ নিয়েই ঘুমোতে গেলাম সবাই।

সকালে ঘুম থেকে উঠে, ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে ড্রাইভারকে ফোন দিলাম। ১০ মিনিটের মধ্যেই ড্রাইভার চলে এলো। গাড়িতে ওঠার পরে ড্রাইভারকে মুক্তেশ্বর যাবো জানাতেই ড্রাইভারের মুখ নিমেষেই কালো হয়ে গেল। কারণ তিনি এই পথে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন না। যদিও কারণ তিনি বলেননি কিন্তু আমি কারণটা জানি। আর সেটা হলো, নৈনিতালে ঘুরলে ওনার গাড়ি কম চলবে, তেল খরচ কম হবে, তার নিজের বিশ্রাম হবে আর বাড়তি কিছু আয় হবে। কারণ নৈনিতালের আশেপাশে যে কয়টি জায়গা কমন সেগুলো ঘুরতে সবমিলে তিন ঘণ্টার বেশি লাগে না কিছুতেই। আর তারপরই সে ফ্রি হয়ে গিয়ে লোকাল ভাড়া খেটে কিছু বাড়তি আয় করতো। এটা সবাই করে থাকে।

ঢেউ খেলানো মসৃণ পথ! ছবিঃ লেখক

যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রস্তাব শুনে তিনি নিমরাজি হয়েই রওনা দিলেন। কারণ তার ওদিকে না যাওয়ার কোনো যুক্তি নেই। পুরো পাঁচদিনের জন্য গাড়ি আমাদের। যখন, যেথায় আর যেভাবে খুশি আমরা সেটা ব্যবহার করতে পারি। সেভাবেই চুক্তি করা হয়েছে। অবশেষে চললাম মুক্তেশ্বরের উদ্দেশ্যে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা আর ঢেউ খেলানো পথে পথে। প্রাথমিক শহুরে কিছু পথ তেমন আনন্দের ছিল না। বেশ এবড়ো থেবড়ো পথ, ধুলো বালি আর গাড়ির চাপ ছিল। সেই সাথে একটু দেরি করে বের হওয়াতে সবার ক্ষুধা পেয়ে যাওয়ায় হুট করেই একটা ধুলোময় বাজারের মধ্যে থেমে গিয়ে কোনোরকমে কিছু নাস্তা খেয়ে আর নিয়ে গাড়িতে ওঠা হয়েছিল ধড়ফড় করে।

বাজারের ধুলোময় পথ শেষ করে একটু উপরে উঠে বামে মোড় নিতেই পাহাড়ি ঢেউ খেলানো পথ আমাদের মুগ্ধ করতে শুরু করলো একে একে তার নানা রঙের রূপ দিয়ে। এদের মধ্যে প্রথম যে মুগ্ধতা সবার নজর কেড়েছিল সেটা হলো ঢেউ খেলানো আঁকাবাঁকা আর অনেক উঁচুনিচু পথ হওয়া সত্ত্বেও কোনো রকম ঝাঁকুনি বা রাস্তার মাঝে কোনো রকম ভাঙাচোরা ছিল না একদমই। একদম মসৃণ, পিচ ঢালা পাহাড়ি পথে মিহি করে এগিয়ে যাচ্ছিল আমাদের গাড়ি। গাড়ি যেন নয় বেশ ধীর লয়ে চলা কোনো শব্দহীন যানে করে পাহাড় বেয়ে যেন আকাশের পানে উঠে চলেছিলাম।  

পথের মাঝেই উচ্ছ্বাসের গড়াগড়ি! ছবিঃ লেখক

দ্বিতীয় মুগ্ধতা ছিল পথের দুই পাশের সবুজ পাহাড়ের অনন্য রূপ। কোথাও কোনো ধুলোবালি নেই, সবুজ আর সবুজ। যেন সবুজের ঢেউ খেলে যাচ্ছিল যতদূর চোখ যায়। চোখের দারুণ আরামবোধ করা এক অদ্ভুত সবুজের বিস্তার ছিল কাছে দূরের সকল পাহাড়ের সবটুকু জুড়ে।

তৃতীয় মুগ্ধতা বা এই পথের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল পথ চলতে চলতে পাহাড়ের ফাঁক দিয়েই সবাইকে হতভম্ব করে দেয়া বরফ জড়ানো পর্বতের চুড়ার দেখা পাওয়া। অল্প বা একটি দুটি পর্বতের দেখা নয়। অগণিত বরফে মোড়ানো পর্বতের চুড়া দেখা যাচ্ছিল বিস্তীর্ণ আকাশের অনেক অনেকটা জুড়ে। হিমালয় পর্বতের একটা শ্রেণী চোখে সামনে ভেসে উঠছিল ক্ষণে ক্ষণেই। আর তাই দেখে সমস্বরে সবার উচ্ছ্বাসের চিৎকার। এইসব দেখে দেখে, মুগ্ধ পথের স্বাদ নিয়ে সামনে যেতে যেতে একটি জায়গায় থামা হলো কিছুক্ষণ বিশ্রামের জন্য। একটু পানি আর শুকনো কিছু খেয়ে নিতে।

অপূর্ব সেই নীলের দেখা। ছবিঃ লেখক

যে পাহাড়ি বাঁকে, ঢেউ খেলানো মিহি পিচ ঢালা পথে নামার পরেই আমরা পেয়েছিলাম এই মুগ্ধ পথের অন্যতম সৌন্দর্যের দেখা। পেয়েছিলাম পাহাড় আর পর্বতের চূড়াগুলোকেও ছাড়িয়ে যাওয়া মুগ্ধতার দেখা। হ্যাঁ এখানে আমরা পেয়েছিলাম একই সাথে অনেক কিছুর মুগ্ধতা ছড়ানো অবাক উপহার। পেয়েছিলাম এক মেঘমুক্ত, ঝকঝকে অদ্ভুত আকর্ষণীয় নীল আকাশের দেখা। এমন আকাশ আমরা কেউ আগে কোনোদিন দেখেছি বলে মনে করতে পারিনি।

এখানে আমরা পেয়েছিলাম নীল আকাশের সাথে বিশাল বিশাল সবুজ পাহাড়ের মিতালী, এখানে আমরা পেয়েছিলাম উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচের গভীর খাঁদ দেখার ভীতিকর রোমাঞ্চের স্বাদ, এখানে আমরা পেয়েছিলাম আকাশ, পাহাড় আর সবুজের মাঝে অনন্ত সময় কাটানোর এক অবাক পথের বাঁক। যেখানে শুয়ে, বসে, হেঁটে, আয়েশ করে, অলসভাবে কাটিয়েছিলাম অনেকটা সময়।

আকাশ, পাহাড় আর অরণ্যর রূপ। ছবিঃ লেখক

কারণ এটাও ঘুরে বেড়ানোর, উপভোগ করার, নিজেদের সময়টাকে দারুণ আনন্দঘন করার একটা উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল আমাদের সবার কাছেই। সবার একটাই প্রকাশ ছিল, এমন নীলের নিচে, এমন সবুজের মাঝে, এমন ঝকঝকে হাসি ছড়ান আদুরে রোদের মাঝে, এমন ঝকঝকে আর চকচকে মসৃণ পাহাড়ি পথের বাঁকে, এমন ঝিরঝিরে বাতাসের মাঝে তো চাইলেই সময় কাটানো যায় না।

এমন করে তো প্রার্থিত সবকিছুর সমন্বয় চাইলেই ঘটানো যায় না। এমন করে তো সব কিছুই একই সাথে পাওয়ার মতো ভাগ্য আর ভাগ্যবান সবাই হতে পারে না। তাই থাকি না আরও কিছুটা সময়, কাটাই না আরও একটু অলস অবসর, অবাক হই না আর একটু সবকিছু একই সাথে পাবার বিস্ময়ে।

অখণ্ড অবসরের অলস সময়। ছবিঃ লেখক

মুক্তেশ্বরের এই মুগ্ধতা মেশানো, আয়েশ ছড়ানো, আবেশে জড়ানো, মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলা মুগ্ধ পথের মাঝে, পাহাড়ের বাঁকে, নীলের নিচে, সবুজের আচ্ছাদনে।

আমরা তাই-ই করেছিলাম। অনেকটা অলস, অবসর আর অনবদ্য কিছু সময় কাটিয়েছিলাম আর ভীষণ তৃপ্তি পেয়েছিলাম মুক্তেশ্বরের মুগ্ধ পথে।

Loading...

One Ping

  1. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লিডার নদীর প্রেমে!

রেলস্টেশন রিটায়ারিং রুমের নানা সুবিধা