পীর খান জাহান আলীর রাস্তার খোঁজে বাগেরহাটে

বাগেরহাটের কথা মনে আসলেই মনে আসে মসজিদের কথা আর মসজিদের কথা মনে আসলেই মনে আসে ষাটগম্বুজ মসজিদের কথা। তারপর লোকজন বন্ধুবান্ধব সবাই মিলে একদিন বাসে কিংবা ট্রেনে চেপে খুলনা হয়ে বাগেরহাট মসজিদের সামনে নামে। রাস্তার পাশের টিকেট কাউন্টার থেকে টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকে পড়ে। ষাটগম্বুজ মসজিদের প্রবল ভিড়ে অতিষ্ঠ হয়ে ঝটপট কয়েকটা ছবি তুলে পেছনের দিঘীর পাড়ে খানিকটা বসে জিরিয়ে নেয়। ইচ্ছা হলে দু একটা ডাব খায়। তারপর আবার ফিরতি বাসে প্যাভিলিয়নে।
আর যারা ধার্মিক মানুষ, খান জাহান আলীকে পীর মানে, তারা এর বাইরে খান জাহান আলীর মাজারে যায়। সিন্নি আর মোমবাতি চড়ায় কিংবা বড়জোর ওরসের সময় দিঘীতে দু একটা মুরগী ছুড়ে মারে। কিন্তু এর বাইরে বাগেরহাটে যে বিপুল ঐশ্বর্য ছড়িয়ে রয়েছে তা কে জানে?

ষাটগম্বুজ মসজিদ; চিত্রঃ লেখক

অথচ বাগেরহাট শহরটাকেই ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান বা World Heritage Site এর মর্যাদা দিয়েছে। এমন মর্যাদা শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই বিরল। তাই পরিকল্পনা করলাম, বাগেরহাট শহরটা ঘুরে দেখব। শহর বলতে আজকের ভ্যান, রিকশা, বাইক, চার চাকার গাড়িতে ঠাসা এই আধুনিক শহর নয়। আমি ঘুরে দেখব খলিফাতাবাদ শহরটাকে। যে শহরটা হারিয়ে গেছে। শুধু তার ফেলে যাওয়া কিছু চিহ্ন জানান দিচ্ছে, আমি ছিলাম। একদিন আমি ছিলাম। আমি হারিয়ে গেলেই বিশ্বাস করো, এখানেই ছিলাম আমি।
কিন্তু কোথায় খুঁজব তাকে? কোথায় পাব সেই শহরকে? খলিফাতাবাদের কী কী চিহ্ন আজো রয়েছে এই আধুনিক বাগেরহাটের আনাচে কানাচে? বিস্তর পড়াশোনা করে একটা তালিকা মতো করে একদিন বেরিয়ে পড়লাম। ২০১৬ সালের কথা। কী মাস ছিল সেটা? সম্ভবত গ্রীষ্ম বর্ষার মাঝামাঝি। বাংলাদেশ কোনো এককালে নাতিশীতোষ্ণ দেশ ছিল কিন্তু আজ আর নেই। এই বর্ষা তো এই গরম। আর সে তো যে সে গরম না। ব্রহ্মতালু পর্যন্ত মনে হয় গলে বেরিয়ে যাবে নাক আর কানের ফুটো দিয়ে। যাই হোক, এমন এক দিনে বাগেরহাটে পৌঁছালাম।
খানা জাহান আলীর মাজার; চিত্রঃ লেখক

পুরানো ঘরবাড়ি ঢের দেখেছি কিন্তু পুরনো আমলের রাস্তা দেখা হয়নি। আর সেই প্রাচীনত্ব যদি পাঁচশো বছরের হয়, তাহলে তো কথাই নেই। বাড়িঘর না হয় কোনোভাবে ঠেকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু রাস্তা? তা তো ক্ষয় হবেই। তাই প্রাচীন রাস্তাগুলোকে কোনোভাবেই পাওয়া যায় না। খলিফাতাবাদ ছিল একটি শহর। আর শহর থাকলে রাস্তা থাকবেই। খলিফাতাবাদেও রাস্তা ছিল। কিন্তু কালের অবশ্যম্ভাবী নিয়মে তা হারিয়ে গেছে। কিন্তু সবটুকুই কি হারিয়ে গেছে?
না, খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম কিছুটা নিদর্শন তার এখনো রয়েছে। এইখানেই রয়েছে। এই সুন্দর ঘোনা গ্রামের মধ্যেই রয়েছে সেই রাস্তা। শুনে আর তর সইলো না। আজ আর বাস থেকে নেমে ষাটগম্বুজ মসজিদের দিকে গেলাম না। আজতক না হয় বার দশেকবার দেখা হয়ে গেছে।
তাই এবার মসজিদকে পাশ কাটিয়ে সুন্দর ঘোনা গ্রামে নেমে গেলাম। গ্রামের মাঝ দিয়ে ইটের সরু রাস্তা। দু একদিন আগে হয়তো বর্ষা হয়েছে। পিচ্ছিল হয়ে রয়েছে। সাবধানে চলতে হচ্ছে। কিছুদূর গিয়ে দেখি এক মহিলা রাস্তার পাশে বসে গরুর গোবর দিয়ে জ্বালানির জন্য কাঠিতে মাখিয়ে তা শুকানোর জন্য মেলে দিচ্ছে। আমি জিজ্ঞাস করলাম, আচ্ছা চাচী, খাঞ্জালী পীরের রাস্তা কোনদিকে? উনি বললেন, সোজা চলে যান। তাহলেই পেয়ে যাবেন।
আমি আবার সামনে পা বাড়ালাম। চারপাশে ঘন গাছপালা। ছোটখাটো জঙ্গল হয়ে গেছে। পাখিরা ডেকে উঠছে। চারপাশে এক আশ্চর্য নীরবতা। যেন প্রগাঢ় শান্তি বিরাজিত চতুর্দিকে। তার মধ্য দিয়ে আমি এগিয়ে গেলাম।
কিছুক্ষণ পরেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছালাম। ছোট ছোট ইট দিয়ে তৈরি রাস্তা। বেশ চওড়া। সোজা এদিক থেকে ওদিকে চলে গেছে। বহুদিন মাটির তলায় পড়ে ছিল। ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। নতুন করে সংস্কার করে পুরাতন রূপ ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
পাচশো বছর আগের রাস্তার চলে গেছে সুদুরে; চিত্রঃ লেখক

ইতিহাসের বইতে পেলাম, খান জাহান আলীর নির্মিত রাস্তার মধ্যে সামন্তসেনা হতে পিলজঙ্গ পর্যন্ত ‘হাতি ধরার’ রাস্তা নামে একটি রাস্তা ছিল। এখনও সে রাস্তার চিহ্ন দেখা যায়। তাছাড়া ষাট গম্বুজ থেকে পশ্চিমমুখী সামন্তসেনা পর্যন্ত পাকা রাস্তার চিহ্ন এখনও আছে। এটাই খান জাহানের বৃহত্তম পাকা রাস্তা। এ ছাড়া ভৈরব নদীর তীরে তার আমলের রাস্তা এখনও বিদ্যমান।
এটি কি সেই রাস্তা? একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি উত্তর দিতে পারলেন না। এই ইতিহাস তার কোনো কাজে আসে না। তাই তিনি এটা জানার প্রয়োজন বোধ করেননি। আমি রাস্তার উপর গিয়ে দাঁড়ালাম। বামদিকে তাকাতে দেখলাম কিছুদূরে রাস্তা শেষ। বুঝলাম আমি রাস্তার এক মাথায় এসেছি। যেটুকু সংস্কার হয়েছে সেটুকু পেরিয়ে এলাম। এখন আমি মাটির উপরে। মাটি ফুঁড়ে ভাঙাচোরা ইট উঁকি দিচ্ছে। এগুলো সেই প্রাচীন রাস্তা। আমি রাস্তার পাশে নিচু হয়ে বসে একটুকরো ইট হাতে তুলে নিলাম। এ তো ইট নয়। এ হচ্ছে ইতিহাস। এই ইতিহাস জানতে হয় আমাদের। জানা উচিত। কারণ এই ইতিহাসেরই উত্তরপুরুষ আমরা।
আস্ত ইট গেথে তোইরি হয়েছিল এই রাস্তা; চিত্রঃ অমিতাভ অরণ্য

কীভাবে যাবেন?

ঢাকার সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ছেড়ে যায় অনেকগুলো বাস। এর মধ্যে রয়েছে বনফুল, আরা, বলেশ্বর, হামিম, দোলা। গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে পাবেন হানিফ, সোহাগ আর ইগলের মতো গাড়িগুলো। এগুলো আপনাকে পৌঁছে দেবে বাগেরহাট শহরে। সেখান থেকে রিকশা নিয়ে সহজেই চলে যেতে পারবেন ষাটগম্বুজ মসজিদে।
এছাড়া ঢাকা থেকে ট্রেনে করে যেতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে নামতে হবে খুলনা রেলস্টেশনে। তারপর সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ড থেকে কিংবা রূপসা ঘাট পার হয়ে বাসে সোজা ষাটগম্বুজ মসজিদ।

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. এটা না পড়লে রাস্তাটাও চোখে পড়তোনা আমার। কালকে দেখে আসলাম 🙂 ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চিলেদের সাথে ঘুরে আসুন তিনাপ সাইতার, চাইতালেংভা ও তিদংক্ষত

পেহেলগামের পাইন বনে ঘোড়ার রোমাঞ্চ