পাঞ্জাবের কমলা নিয়ে ভ্রমণ বিভীষিকা!

মানালি থেকে ফিরছি, সকাল ৭টায় রওনা হয়ে, বিকেল ৩:৩০ মিনিটে পাঞ্জাবের মধ্যখানে। মাঝখানে একবার শুধু মাত্র খাবারের বিরতি, ১ ঘণ্টা, সকাল ও দুপুর মিলিয়ে। সবাই বেশ ক্লান্ত, খুব ইচ্ছা ছিল, অনেক প্রিয় বিলাসপুরে কিছুক্ষণের জন্য থামবো, কিন্তু টিম লিডারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে, সেই প্রস্তাব আর দেয়া হলো না। সবকিছুই আমাদের অনুকূলে, ফুল টাইম জীপ আছে, থাকার জন্য হোটেল আছে, হাতে সময়ও আছে। কিন্তু তবুও, তার নির্দেশ, আজই দিল্লী পৌঁছাতে চায়। কী আর করার, বিলাসপুরের বাসনা ব্যথা বুকে বেঁধে রেখেই চলছি।

পাঞ্জাবের কমলা বাগান। ছবিঃ thebetterindia.com

সবাই ক্লান্তি দূর করার জন্য কিছু খাবে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছোঁয়া আছে এমন কোনো জায়গা খুঁজছি, হঠাৎ চোখে পড়লো রাস্তার দুই পাশে কমলার স্তূপ নিয়ে বসে আছে সারি সারি দোকানিরা, আর পেছনে সবুজের সমারোহ, যতদূর চোখ যায়। জীপ থামালাম, তাজা কমলার জুস খাব বলে। একগ্লাস জুস মাত্র ১০ রুপি, আর কিলো মাত্র ২০ রুপি। একদম তাজা কমলার পিওর জুস। প্রথম গ্লাস খাওয়ার পরে তো মাথাই নষ্ট। এত স্বাদ। নিমিষেই সকল ক্লান্তি উধাও। একে একে দুই, তিন, চার গ্লাস, কেউ কেউ এর চেয়েও বেশী উপভোগ করলো, সেই তাজা, ফরমালিনহীন কমলার অমৃত স্বাদ।
এবার শুরু বিড়ম্বনা, বিভীষিকা আর দুঃসহ কষ্টের। আমাদের টিমের সবচেয়ে নিরীহ, শান্তশিষ্ট, ধিরস্থির এবং বিলাসী ভ্রমণ সঙ্গীর ইচ্ছা হলো, এতদূরে এসেছি, এত কম দামের কমলা, এত চমৎকার স্বাদের, ওষুধ মুক্ত ফল, কিছু কিনে নিয়ে যাই না কেন বাড়িতে সবার জন্য।
কমলার স্তুপ। ছবিঃ http://bzupages.com

তার যুক্তি- আমাদের গাড়ি আছে, এরপরে ট্রেনে, ট্রেন থেকে নেমে ট্যাক্সিতে হোটেলে, হোটেল থেকে সরাসরি বাসে উঠবো। আর বাস থেকে নেমে রিক্সা বা সিএনজিতে করে বাসায়। ব্যাস, কোনো সমস্যা তো দেখছি না। টিম লিডার তার যুক্তি মেনে নিয়ে, কেনার অনুমতি দিল। তো তিনি টিম লিডারের অনুমতি পেয়ে আর কোনো চিন্তা না করে ১০ কিলো কমলা কিনে ফেললেন। জ্বী, ঠিক পড়ছেন, ১০ কেজি।
তো সে যখন কিনলই অন্যরা বাদ দেবে কেন? অন্যরাও ৮-১০ কিলো করে কমলা কিনল। সবচেয়ে বড় বিস্ময়, যিনি কেনাকাটার ঘোরতর বিরোধী তিনিই ১০ কিলো কিনে নিলেন। এবার, শুরু হলো আমার বিবেকের দংশন। সবাই যার যার বাড়ির জন্য কমলা কিনছে, ইচ্ছে মতো। আর আমি কিনা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। অবশেষে আমার প্রতিজ্ঞার বাঁধও ভাঙল। মানে, আমাকেও কমলা কেনার মিছিলে যোগ দিয়ে কমলা কিনতে হলো এবং ৫ কিলো। কারণ, এটা এখন আমার প্রেস্টিজ ইস্যু। ৮ কিলোর কমে কেউই কেনেননি। আমি কীভাবে ৫ কিলোর কম কিনি?
কমলার বিকিকিনি। ছবিঃ cdn4.techly.com.au

সুতরাং, মোট কমলার ওজন ছয়জনের সাকুল্যে? সেই সংখ্যা বলে, আমি এখন আর আমার বিভীষিকা বাড়াতে চাই না। আপনারাই অনুমান করে নিন। এর পরের ঘটনা যে কারো অনুমানের বাইরে। চরম বিভীষিকাময় তিনটি রাত। আর তিনটি দিন।
কিছুক্ষণ পরেই সবাই বুঝতে পারলেন, তারা সবাই কী ভুল করেছেন। দিল্লী তো বহু দূর কি বাত। গাড়িতেই যে জায়গা হয় না। পা আর নাড়াতে পারে না। বসার জায়গার সংকট দেখা দিল। এতক্ষণের ভ্রমন আনন্দ, বেদনা ও বিভীষিকায় রূপ নিল। কিন্তু কিনেই যখন ফেলেছি, কী আর করার, দেখাই যাক না, উদ্যোক্তার উত্তর। শুরু হলো একজনের কাঁধে আরেকজনের দোষ চাপানোর পুরনো চর্চা। বাদ শুধু আমি, সবার শেষে কিনেছি এবং সবচেয়ে কম কিনেছি বলে। যাই হোক, দিল্লী পৌঁছালাম, রাত ১০টায়। নির্ধারিত হোটেলে পৌঁছে সবাই যে যার মতো বাইরে চলে গেল।
পরদিন, কলকাতার ট্রেনের টিকেট কাটার পালা, কিন্তু কোথাও টিকেট নেই। যাই হোক শেষ পর্যন্ত, অনেক চড়াদামে, অপেক্ষামান টিকেট কাটা হলো। ট্রেনে ওঠার পরে দেখা গেল, আমাদের নামে বরাদ্দ কোনো সিটই নেই। এদিকে কমলার টন আমাদের সাথে। টিটিকে বুঝিয়ে, শুনিয়ে, কিছু উপরি দিয়ে কোনো রকম একটা কামরাতে উঠলাম, কিন্তু কমলা? আমাদের কমলা দিয়েই থ্রি টায়ার সিটের নিচের দু’পাশ ভরে গেল। যখন ওই দুই সিটের যাত্রীরা এলেন, সে আর এক চিত্র। যাই হোক, টিকেট সংক্রান্ত আমাদের  দুরাবস্থা যেনে উনাদের সামান্য দয়া হলো, তাই তেমন আর কিছু বললেন না। কিন্তু বসার জায়গা নেই। একরাত আর একদিন কমপক্ষে। এর উপর রয়েছে কুয়াশার নিদারুণ নিষ্ঠুরতা, সব ট্রেনই ৮-১০ ঘণ্টা দেরীতে চলছে। আমাদেরটাও তাই।
পাঞ্জাবের কমলা। ছবিঃ img.etimg.com

যেহেতু আমাদের আসন নির্ধারিত নয়, সেহেতু খাবারেরও বরাদ্দ নেই। তবুও যখন খাবার সরবরাহকারী এলো, আমাদের একজন বলে উঠলো আমাকে মাটনকারী।। সুতরাং আবারও সেই হিন্দি সিরিয়ালের চিত্র। যাই হোক, খাবার সরবরাহকারীও আমাদের নিদারুণ দুরবস্থার কথা জানত। তাই সামান্য় করুণা দেখাল এবং বলল আগে সবার খাবার দেয়া শেষ হবে, তারপর আপনাদের। সুতরাং অপেক্ষা আর অপেক্ষা। এবার খাবারের অপেক্ষা।
আমাদের উপর উপরওয়ালার বোধহয় কিছুটা দয়া ছিল, তাই যখন দাঁড়াবারও শক্তি শেষের পথে ঠিক তখনই থ্রি টায়ারের যে পাশে, দুটি সিটের ব্যবস্থা সেখানে দুই ভাই ছিলেন, যারা চাটগাঁর ছেলে, আমাদের অবস্থা দেখেশুনে উনারা উপরের এক সিটে চলে গেল এবং আমাদের বসতে দিল। কোনোভাবে এলাম কলকাতাতে, তখন বিকেল ৫টা। হোটেল ২১, আমাদের নিয়মিত ঠিকানা।
কমলা বাগান। ছবিঃ punjabitribuneonline.com

এদিকে দেশে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, অবরোধ, কোনো যানবাহন চলছে না। অগত্যা, আমাদেরকে ট্যাক্সি নিতে হলো। একটা না, দুটো। কারণ? ওই কমলার স্তূপ। যেহেতু তেমন টুরিস্ট বা অন্য যাত্রী যাওয়া-আসা করছে না, সেহেতু বর্ডারের কোনোপাশেই কমলা নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে।
এপারে এসে, ব্যাটারি চালিত রিক্সা নিতে হলো, একটি না, দুটি, কারণ? ওই কমলার স্তূপ? বাস তো যাবে না, সুতরাং রেল স্টেশনে চল, যে ট্রেন পাই, সেটাতেই উঠতে হবে। ট্রেন এলো, এটাতে ঈশ্বরদী পর্যন্ত যাওয়া যাবে, এখানে তেমন সমস্যা হয়নি, কারণ ট্রেন প্রত্যাশার চেয়ে ফাঁকা ছিল।
ঈশ্বরদী পৌঁছলাম, রাত ১১টা ৪৫ এ, জানলাম একটি ট্রেন আসবে রংপুর থেকে, কিন্তু সেটাতে উঠতে হবে চাটমোহর থেকে। চাটমোহর কতদূর? আমাদেরই একজনের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, কারণ তার বাড়ি এই এলাকাতেই। সে বলল, “এই ১৫-২০ মিনিট লাগবে।” কিন্তু যখন, ভ্যান ঠিক করতে গেলাম, জানলাম এখান থেকে চাটমোহর ভ্যানে যাওয়া যায় না। কারণ? অনেক, অনেক দূরে। যেতে হবে, সিএনজিতে করে। হায় কপাল! তাড়াতাড়ি যেতে না পারলে, ট্রেনও মিস হবে। এখন উপায়?
কমলার দোকান। ছবিঃ vegfru.com

সিএনজিকে ভাড়া জিজ্ঞাসা করতেই, চোখ কপালে, কারণ? ভাড়া চায় ১,০০০ টাকা। আমাদের তো ট্রেনের ভাড়াই ঠিক মতো নেই। আর কলার স্তূপের কী হবে? তবুও নিয়ে নিলাম সেই সিএনজি। কারণ ওখানে আর একটিও নেই। সে এক অসম্ভব ভয় ও অনিশ্চিত যাত্রা। ভেবে দেখুন, যেখানে এর আগে দুটো করে ট্যাক্সি লেগেছে, সেখানে এখন একটিই মাত্র, কমলার স্তূপ সহকারে। শুধু ব্যাগ আর কমলা। যাত্রীরা সব কমলার স্তূপের নিচে। পুরো ১ ঘণ্টা লেগেছে চাটমোহর আসতে, ওই অবস্থাতেই।
পরবর্তী ঘটনা, আরও ভয়াবহ। ট্রেনে যাত্রী ধারণেরই তিল ঠাঁই নেই। কমলা কীভাবে নেবে? এর পরের ঘটনা বর্ণনাতীত। অনুমান করে নিতে হবে।
যা বলতে চেয়েছি, ভ্রমণে কেনা কাটা করুন, বহন করার সামর্থ্যের উপর, তাতে দামে যতই সস্তা হোক না কেন।
ফিচার ইমেজ- c1.staticflickr.com

Loading...

2 Pings & Trackbacks

  1. Pingback:

  2. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঈদের ছুটিতে ঝর্ণাদের টানে!

E T B এর ইভেন্ট: কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়ায় ইটিবির সাথে ভ্রমণ