কাশ্মীরের অনন্ত কষ্ট!


কাশ্মীরকে আমরা পৃথিবীর স্বর্গ বলি। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে কাশ্মীর সত্যি সত্যিই পৃথিবীর স্বর্গ! এতে কোনো সন্দেহই নেই। তবে সেই স্বর্গ কার কাছে? আপনার-আমার কাছে? কাশ্মীরিদের কাছে? উভয়ের কাছে? নাকি কোনো এক পক্ষের কাছে?

২৩ জুন ২০১৭ থেকে ৩০ জুন ২০১৭, এই ৮ দিন কাশ্মীর থেকে, এর নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে, মানুষের সাথে অল্প অল্প কথা বলে বা মিশে, ড্রাইভার, হোটেল বয়, ম্যানেজার, বাজার আর রেস্টুরেন্ট সহ দুই চারজন সেনাবাহিনীর সদস্যর সাথে কথা বলে আমার যেটা মনে হয়েছে, কাশ্মীর ভূস্বর্গ শুধু আমাদের কাছে! মানে যারা সাময়িক সময়ের জন্য কাশ্মীর বেড়াতে যায় তাদের কাছে। কাশ্মীর কাশ্মীরিদের কাছে ভূস্বর্গ তো নয়ই, বরং এর চেয়ে উল্টো ধরনের কোনো কিছু!

স্বর্গীয় রূপ! ছবিঃ লেখক

কেননা, যখন আমরা শ্রীনগর থেকে গুলমার্গ, বিশেষ করে সোনমার্গ বা পেহেলগাম যাচ্ছিলাম, তখন মাঝে মাঝে জনমানবহীন, একদম প্রত্যন্ত অঞ্চল দিয়ে গিয়েছি কোনো কোনো সময়। কয়েক জায়গায় থেমেছি, কথা বলেছি, মূল কথা কাশ্মীরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে না গিয়ে, আমরা সাধারণ মানুষেরা ঠিক বুঝতে পারি না যে ওরা আদৌ স্বর্গে আছে কিনা? কয়েকটা কারণ বলি, বাস্তব অভিজ্ঞতা আর নিজের চোখে দেখে উপলব্ধি করার ভিত্তিতে। তারপর না হয় আপনিই বিবেচনা করে দেখবেন ওরা কোথায় থাকে আর আপনি আমি কোথায় থাকি।

চলুন তবে নিজের কিছু উপলব্ধির কথা তুলে ধরি।

স্বর্গ আসলে কী?

স্বর্গের এক অন্য রূপ। ছবিঃ লেখক

আমার কাছে স্বর্গের সংজ্ঞা হলো, ভালো থাকা, দুশ্চিন্তায় না থাকা, অযথা টেনশন না করা, সাধ্যের মধ্যে সুখে থাকা, সবাইকে নিয়ে কম খেয়ে হলেও সুস্থ থাকা, নিশ্চিন্তে ঘুমানো, ইচ্ছে হলেই হাঁটতে বের হওয়া, মনের আনন্দে গুনগুন করা, কখনো গলা ছেড়ে গান গাওয়া, মোট কথা নিজের মতো করে, নিজের সাধ্য অনুযায়ী সুস্থ থাকাই পৃথিবীতে স্বর্গের তুল্য।

যদি উপরের ওগুলোকে স্বর্গের সাথে তুলনা করি তবে আপনি-আমি বা আমরা কেমন আছি সেটা যে যার মতো করে হিসেব করে নেই, কী বলেন? কারণ একজন তো আরেকজনের ভেতরের অবস্থা জানি না। তবে আমি স্বর্গেই আছি বলে মনে হচ্ছে নিজের কাছে। অন্তত যদি সাধারণ কাশ্মীরিদের সাথে নিজেকে তুলনা করি। আর কাশ্মীর আমার কাছে স্বর্গের মতো নয়, পৃথিবীতেই যেন সত্যিকারের স্বর্গ! আমার এই পর্যন্ত ভ্রমণ অনুভূতি এমনই।

ঘোড়ার সওয়ারি আর ঘোড়ার পালকের চেহারাতেই কত ভিন্নতা! ছবিঃ লেখক

কিন্তু কোনো সাধারণ কাশ্মীরির কাছে জিজ্ঞাসা করুন তো? হ্যাঁ নিশ্চিত থাকুন সেও সেটাই বলবে যে কাশ্মীর পৃথিবীর স্বর্গই। কিন্তু সে নিজে কি সেটা উপভোগ করে? সেই সুযোগ কি তার আছে? পরিবেশ, পরিস্থিতি কি তাকে স্বর্গের সুখ দিতে পারছে? প্রতিদিনের জীবনযাপন, ভাবনা, বেঁচে থাকার অধিকার আর নিজের মতো করে গান গেয়ে, গান বাজিয়ে, উল্লাস করে সে কি অনুভব করতে পারছে স্বর্গীয় কাশ্মীর আর এর উপভোগ্যতা?

নাহ, পারছে না।

কিন্তু কেন?

ধরুন এমন যদি হয় যে আপনি যেখানেই যাচ্ছেন, আপনার উপর পুলিশি নজরদারি আছে। আপনার বাড়ির দরজার সামনে, দোকানে, হোটেলে, যে কোনো অফিস আদালতের সামনে, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে শুরু করে আপনার গতিবিধির এতটুকুও পুলিশ বা আর্মির নজরদারির বাইরে নেই!

তবে আপনি কি আপনার সাধারণ জীবন উপভোগ করতে পারবেন?   

আপনি যদি প্রাণ খুলে বন্ধুদের সাথে আড্ডাই দিতে না পারলেন, তবে কী আর উপভোগ করলেন ছোট এই জীবনের?

যে ছবি, যে মুখ স্বর্গ ভুমিতে বিসন্নতার প্রতিচ্ছবি! ছবিঃ লেখক

আপনি যদি একদিন উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে পাশের বাড়ির বিশেষ কারো মনোযোগই আকর্ষণ করতে না পারলেন, তবে রোমাঞ্চ কোথায় পেলেন?

আপনি যদি সাইকেলের টুংটাং ঘণ্টা বাজিয়ে বিকেলটায় দুরন্তপনা নাই করতে পারলেন, তবে আর কিসের কৈশোর?

আপনি যদি নিজের মতো আয় করে সচ্ছল হতে নাই পারলেন তবে কিসের সুখ আর আনন্দ?

আপনি যদি, তিন বেলা নিজে আর পরিবারের খাবার জোগাড় করতে নাই পারলেন, তবে কোথায় আর স্বর্গ খুঁজবেন?

আপনি যদি সারাক্ষণ হয় পুলিশ, নয় আর্মি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী বা মৌলবাদীদের ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে, নিজেকে লুকিয়ে রাখেন তবে কিসে আর প্রাপ্তি আপনার?

এই সবগুলো পরিস্থিতির শিকার কাশ্মীরের সাধারণ প্রতিটি মানুষ, অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে, কথা বলে, শুনে, দেখে, নিজের মতো করে উপলব্ধি করে।

যে কাশ্মীরি সুখ কাকে বলে জানে না! ছবিঃ রকি ভাই

সাত দিনে আমি কোনো কাশ্মীরিকে প্রাণ খুলে হাসতে দেখিনি! উঁচু স্বরে কথা বলতে দেখিনি, কোথাও কোনো আড্ডা দেখিনি, স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েদের হুল্লোড় দেখিনি, প্রাণবন্ত কোনো মুখ দেখিনি, কোনো সুন্দরীর আকুল চাহুনি দেখিনি, কোনো প্রেমিকের চোরা চাহুনি দেখিনি, কোনো কপোত-কপোতীর খুনসুটি দেখিনি, কোনো বাবার মুখে তৃপ্তি দেখিনি, কোনো মায়ের মুখে স্নেহের হাসি দেখিনি!

কীভাবে দেখবো? প্রতিটি সাধারণ কাশ্মীরি অনন্ত ৬ থেকে ৮ মাস কর্মহীন থাকে! কখনো আবহাওয়ার কারণে, কখনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদীর আক্রমণ, কখনো সরকারী নানা রকম নিষেধাজ্ঞা আর টুরিস্টদের জন্য অনন্ত অপেক্ষা!

আমাদের ড্রাইভারের কাছে শুনেছি গত বছর নাকি ওরা ৮ মাস তিন বেলা খেতেই পায়নি! আট মাস! আপনি-আমি কী চিন্তা করতে পারি যে আপনার-আমার বাচ্চারা একদিন-দুইদিন নয় টানা আটমাস কোনোদিন ঠিক মতো তিনবেলা খেতে পায়নি? কীভাবে সহ্য করতাম আপনার আমার এই অসহ্য, অব্যক্ত বেদনা?

ওদের মুখের দিকে তাকালেই দেখা যাবে স্বর্গের অন্য রূপ! নিদারুণ জীবনের ছবি। ছবিঃ লেখক

আমি কোনো সাধারণ কাশ্মীরিকে দেখিনি একটি ভালো কোনো টি-শার্ট, প্যান্ট বা ভালো কোনো জুতো পায়ে দিতে! হ্যাঁ আমি সাধারণ, খেটে খাওয়া কাশ্মীরির কথা বলছি, বনেদী আর বিত্তশালী কারো কথা নয়। সবাইকেই দুঃস্থ লেগেছে আমার কাছে, শুধু সুযোগ খুঁজেছে কীভাবে আর ১০০ রুপী বেশী আয় করা যায়? কীভাবে আরও এক বেলার খাবারের সংস্থান করে রাখা যায়? কীভাবে আসছে কর্মহীন মাসগুলোতে কিছু খেয়ে পরের মৌসুম পর্যন্ত বেঁচে থাকা যায়?

তার উপর আছে শীতের মৌসুমে টানা তিন-চারমাস চুপ করে বেকার ঘরে বসে থাকার মতো মানসিক সংকট। কোথাও যেতে পারবে না, কেউ আসতে পারে না, হয়তো বিদ্যুৎ নেই, ফায়ার প্লেস আছে, কিন্তু খাবার নেই, হয়তো খাবার আছে কিন্তু চিকিৎসা নেই, যোগাযোগের সহজ কোনো উপায় নেই, এমন আরো কত শত না বলা কথা, ব্যথা-বেদনা।

নদীর স্রোতের মতো অস্থির উত্তাল ওদের জীবন। ছবিঃ লেখক

মোট কথা সব সময়, সবার চোখে-মুখে একটা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, হাহাকার, একটু খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য, নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা।

এই হলো অন্য চোখে আর ভিন্নভাবে আমার দেখা কাশ্মীর যেটা আপনার-আমার কাছে ভূস্বর্গ কিন্তু সাধারণ কাশ্মীরিদের কাছে?

যতটা না ভূস্বর্গ তারচেয়ে অনেক বেশী……

অনন্ত কষ্টের!

সাধারণ কাশ্মীরিদের জন্য, কাশ্মীর আর এর সার্বিক পরিস্থিতি, অবস্থা, পরিবেশ সবকিছু মিলে কাশ্মীর, এক অনন্ত কষ্টের নাম!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তুক অ/দামতুয়া ঝর্ণায় অভিযানে একদল অভিযাত্রী

কার্জন হলে শেষ বিকেলে…