সেন্ট মার্টিনসের স্মরণীয় রাত

সেন্ট মার্টিনস পৌঁছেছিলাম বিকেল তিনটায়। একটু ফ্রেশ হয়ে আর মাছ ভাজা দিয়ে ভাত খেয়ে আর পানির পরিবর্তে ডাবের পানি দিয়ে তৃষ্ণা মিটিয়ে বের হব, এমন সময় একজন বিলাসী ভ্রমণসঙ্গী বলে বসলেন তিনি এখন দুই ঘণ্টা ঘুমাবেন।
অন্য কারো কি মনে হয়েছে জানি না, আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। বলে কি সেন্ট মার্টিনস এসে কেউ একবেলা ঘুমিয়ে কাটানোর কথা কীভাবে ভাবতে পারে? যদি না হয় ভীষণ বিলাসী কোনো পর্যটক অথবা বেশ দুর্বল বা অসুস্থ। কিন্তু তিনি একগুঁয়ে জেদ ধরেছেন, একটা ভাত ঘুম না দিয়ে কিছুতেই বের হবো না রুম থেকে। ওদিকে বাইরে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর সেই ঢেউয়ের কান ফাটানো গর্জনে রুমে বসে বা শুয়ে থাকা দায়।
সে যাই হোক, সবাই একসাথে বাইরে না গেলে আর সমুদ্র না দেখলে আবার সমুদ্রের সঠিক মজাটা পাবো না বলে থেকে যেতেই হয়েছিল কিছু সময়ের জন্য। তবে সেটা বোধহয় শেষে ভালোই হয়েছিল, এমন স্মরণীয় আর অনেক রোমাঞ্চকর একটা সমুদ্র বিলাস পেয়েছিলাম বলে।

সেন্ট মার্টিনস। ছবিঃ লেখক

তো সেই বিলাসী পর্যটকের সাথে একটু বিশ্রাম নিয়ে তার ইচ্ছামতো বের হলাম প্রায় শেষ বিকেলে। অন্য সবাই মিলে তাকে আরামের পুরো শোধ তোলার জন্য ঠিক করলাম আজ এই অবকাশের বীচ থেকে ডান দিক ঘুরে হাঁটা শুরু করবো আর আবার অবকাশের এই বীচে এসেই থামবো পুরো সেন্ট মার্টিনস পায়ে পায়ে ঘুরে এসে।
বীচ-বালি আর ঢেউয়ের তালে তালে। তাতে যত সময় লাগে লাগুক। তিনি নিম রাজী হয়েই আমাদের সাথে পিছনে পিছনে পথ ধরেছিলেন। এবার শুরু হলো আমাদের পুরো সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ হেঁটে হেঁটে পরিভ্রমণের পালা।
সন্ধ্যা তখনো নামেনি ধরায়, সমুদ্রে তখন ভাটার টান, রঙিন কাঁকড়াগুলো মেতে উঠেছিল বাঁধ ভাঙা উল্লাসে, পেয়ে অবারিত বালির সৈকত, পানি নেমে গিয়ে বিস্তৃত করেছিল ওদের চরাচর আর অবাধ অবাধ্যতা। নীল-সাদা ঝিনুকেরা চিকচিক করে উঠছিল পেয়ে সূর্যের শেষ আলোর আবরণ। সাদা বালিতে শেষ রোদের ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছিল, এমনকি সমুদ্রের পানিরও ছিল শত রকমের রঙ আর উচ্ছ্বাস। আর আকাশ? আকাশ যে সেজেছিল কত রঙে সেটা অবর্ণনীয়। সেন্ট মার্টিনসের সেই গোধূলি লগ্নটা এমনই ছিল।
শেষ বিকেলে। ছবিঃ লেখক

ডান পাশ থেকে বীচ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মূল ঘাট পেরিয়ে যখন ছেঁড়া দ্বীপে যাবার মাঝখানে পৌঁছালাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। এবার একটু দ্রুত পথ চলতে শুরু করলাম। কারণ পূর্ব থেকে পশ্চিম বীচে যখন হাঁটবো তখন সন্ধ্যা থেকে রাত নামবে, আকাশে চাঁদের দেখা তখনো নেই। তাই কিছুটা চিন্তিত, তবে রোমাঞ্চও ছুঁয়েছিল সবাইকে। কারণ রাতের অন্ধকারে কোনো সমুদ্রের বীচ ধরে কখনো হাঁটা হয়নি। আর সেই সাথে যদি থাকে উত্তাল ঢেউয়ের প্রাণ পাগল করা আহ্বান। তো কথাই নেই।
ছেঁড়া দ্বীপের প্রবেশ মুখে বা সেন্ট মার্টিনসের শেষ বিন্দুতে যখন পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। পুব আকাশে চাঁদের আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছে। কারণ কয়েকদিন আগেই পূর্ণিমা তার পূর্ণ যৌবনের মাদকতা শেষ করেছে, তাই চাঁদ আজ একটু দেরি করেই উঠেছে। তবে সে তার পূর্ণ আলো তখনো বিলাতে শুরু করেনি।
আর এগোনো যাচ্ছে না। সামনে জঙ্গল। কীভাবে যাবো ওপাশে? ছয়জন তিন ভাগে ভাগ হয়ে রাস্তা খুঁজতে লাগলাম। তিন চার মিনিট কেটে যাওয়ার পরেও কোনো রাস্তা না পেয়ে একটু ভয় ভয় করতে লাগলো। সবাই আবার এক সাথে হয়ে ফিরে যাবো কিনা যে পথে এসেছি সেই পথেই, এমন ভাবনা ভাবতে লাগলাম। প্রায় তেমনই মনস্থির করে ফেলেছি, শেষ চেষ্টা হিসেবে আর একবার দেখতে চাই?
নীল জলের হাতছানি। ছবিঃ লেখক

কারণ আমাদের দুই জনের টিম যেদিকে গিয়েছিলাম সেদিকে গাঢ় অন্ধকার আর গভীর বনের ফাঁক দিয়ে দূরে সামান্য সাদা বা ক্ষীণ অন্ধকার চোখে পড়েছিল বলে মনে হয়েছিল, তবে ভ্রমও হতে পারে ভেবে চলে এসেছিলাম। তাই আর একবার দেখতে চাই। এবার সবাই মিলে সেদিকেই গেলাম। মাত্র ৪০ সেকেন্ড বেশী গেলাম আগের জায়গার চেয়ে। আর গিয়ে হাত দিয়ে কেয়ার কিছু পাতা সরাতেই ওপাশে চিকচিক করে ঝিলিক মারলো চোখের মণিতে। ব্যাপার কী? কীসের আলো? নাহ, কোনো আলো তো নেই আসলে, তবে কী এবারও ভ্রম?
সবাই মিলে সেই পাতা সরিয়ে ওপাশে যেতেই আহম্মকের মত “থ” হয়ে গেলাম। কারণ এপাশেই আর এক সমুদ্র, পূর্বের চেয়ে অনেক বেশী উত্তাল আর মাতাল করা। অনেক বড় বড় ঢেউ আর অনেক বেশী গর্জন তোলা, গ্রাস করে ফেলা সব আছড়ে পড়া ঢেউ। আর সেই ঢেউয়ের উপরে পুব আকাশের চাঁদের আলো পড়ে ঝলমল করে উঠছিল। যেটা আমি বা আমরা আগেই দেখে গিয়েছিলাম। ভয়ে বা আতঙ্কে সেটা তখন বুঝতে পারিনি।
নতুন সমুদ্র আর অন্যরকম উত্তাল ঢেউ দেখে সবাই ভীষণ উচ্ছ্বসিত। সেই সাথে রাতের তারা ভরা আকাশ আর প্রায় পূর্ণিমার ঝকঝকে চাঁদ। পাশে বিশাল বিশাল উত্তাল ঢেউয়ের আছড়ে পড়া, বেশ বড় বড় পাথর আর ধারালো কোরালের মাঝ দিয়ে হেঁটে যেতে হয়েছিল অনেক অনেকটা পথ। হাঁটছি হাঁটছি আর হাঁটছি, পথ যেন আর শেষ হতে চায় না কোনোভাবেই। সবাই বেশ ক্লান্ত। কারণ অন্ধকারে অনেক বেশী চড়াই-উৎরাই করতে হয়েছে বড় বড় পাথর আর ধারালো কোরালের মধ্য দিয়ে।
গোধূলি বেলা। ছবিঃ গুগল

সমতল, মিহি বালির শীতল বীচে সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউয়ে পা ভেজাতে ভেজাতে এক সময় দূরে চোখে পড়লো কৃত্রিম নিয়ন আলো। তার মানে মানুষের আবাস আছে একটু দূরেই। ওখানে গিয়েই না হয় একটু বিশ্রাম নেয়া যাবে। রাত তখন প্রায় ৮টা। সামনে আর কতটা পথ পেরুলে অবকাশ বা এর আশেপাশের হোটেল বা কটেজের দেখা মিলবে সেটাও জানি না আমরা কেউই। কারণ সবাই সেবারই প্রথম এমন করে পুরো সেন্টমারটিন হেঁটে হেঁটে ঘুরে আসার মিশনে নেমেছিলাম।
আরও প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পরে অবকাশের বিল্ডিং, জেনারেটরের আলো আর মানুষের বীচে চলাচল বুঝতে পেরেছিলাম। এবং ভেসে ছিলাম অনেক অনেক আনন্দে। অদ্ভুত, অসাধারণ আর একেবারেই অন্যরকম একটা অর্জনের আনন্দে। ভিন্ন আঙ্গিকে আর অনন্য স্বাদে রাতের চাঁদের আলোতে আর গর্জনে ফেটে পড়া ঢেউয়ের উচ্ছ্বাসে উপভোগ করা সমুদ্র ও সেন্ট মার্টিন্সকে।
অবকাশে পৌঁছানোর সাথে সাথে তাজা ডাবের পানি দিয়ে আপ্যায়ন চলল। সাথে ভেটকি (কোরাল) আর রূপচাঁদার বারবিকিউয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি। সেটাও একদম বীচে বসে। বালিশে হেলান দিয়ে। আর গল্প-আড্ডা-গানে হারিয়ে গিয়ে। কতক্ষণ জানি না, তবে শরীরের সবটুকু শক্তি আর জেগে থাকার সামর্থ্যের শেষ বিন্দু পর্যন্ত। শেষে এই গানে গানে রুমে ফিরেছিলাম।
সোনালী সন্ধ্যা। ছবিঃ তাহসিন

“এই রাত অক্ষয় হোক, দেখ অধরের তৃষ্ণায় মরেছে অধর।”
“দু চোখে মরেছে দুই চোখ, এই রাত অক্ষয় হোক।”

সেন্ট মার্টিনসের সেই রাত আজও অক্ষয়। স্বপ্নময় চোখের পাতায়, মনের বর্ণিল আঙিনায় আর কল্পনার রুপালি আকাশে।
ফিচার ইমেজ- busy.org

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

উভচর বিমানে সুন্দরবনের উপকণ্ঠে (ভিডিও)

লালাখাল: জনশূন্যতা, বিস্তৃত প্রকৃতি এবং নিখাদ প্রশান্তি