টংলু ভ্যালীর প্রেমে: সান্দাকফুর পথে

ধোত্রেতে সকালের নাস্তা শেষ করলাম বিফ মোমো আর স্যুপ দিয়ে। এরপর মেঘ কুয়াশার সাথে কিছুক্ষণের আন্তরিক আলিঙ্গন আর ছবি তুলে কিছু সুখের মুহূর্তকে নিজের কাছে ধরে রাখা। পাশেই একটি ম্যাপ আর সাইন বোর্ডে লেখা আছে সান্দাকফু/টংলু এই দিকে।

ধোত্রে থেকে পথচলা শুরু। ছবিঃ ashmitatrek.com

শুরু হল টংলুর দিকে ট্রেক। দু’পাশে ছোট ছোট পাহাড়ি বর্ণিল ঘর-বাড়ির ঝলমলে উপস্থিতি। পাহাড়ের রিজ ধরে যেন গড়ে তোলা হয়েছে সেগুলো, দুই পাশের বাড়িগুলোর বারান্দাই আমাদের ট্রেক রুট। খুব ধীর লয়ে উঠে গেছে আকাশের দিকে। এরপর আবার নেমে গেছে আকাশের সাথে মিশে থাকা অরণ্যের গভীরে। সে এক অদ্ভুত সমীকরণ আকাশ আর অরণ্যের। যেন দুজনে যুক্তি করে মিলেছে দুজনের সাথে।
পাহাড়ি বাড়ি ঘরের বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই একেবারে সমতলে গিয়ে পৌঁছালাম যেন আর ঠিক সেখানেই যে অরণ্যের শুরু সেটাই সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্ক। আহা দেখেই একটা বিদ্যুৎ চমক খেলে গেল মনে-প্রাণে। কারণ গত চার বছর ধরে এই গভীর অরণ্যের স্বাদ নেব বলে এঁকেছি কত না ছবি, করেছি কত না কল্পনা, দেখেছি কত না স্বপ্ন। আর আজ সেই অরণ্য, সত্যিকারের সিঙ্গালিলার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর আমরা। মনে মনে বললাম স্বপ্ন হলো সত্য প্রায়, বাকিটা তিনদিন পরে। যখন এই অরণ্য, তার মেঠো পথ, সবুজের চাদর সরিয়ে একদিন পৌঁছে যাবো অনেক কাঙ্ক্ষিত সান্দাকফুর চূড়ায়।
টংলু। ছবিঃ wikimedia.org

এই কথা ভাবতেই যেন নতুন উদ্যম পেলাম নিজের মাঝে। ব্যস, ব্যাগটাকে সেঁটে নিলাম বুকের সাথে, মুখে পুরে নিলাম একটি কফি চকলেট আর শুরু করলাম স্বপ্নের অরণ্য উপভোগ করতে করতে সামনের উঁচু উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে চূড়ায় ওঠার ট্রেক।
একটু এগোতেই, এই ক’ মিনিট হবে? ১৫/২০ মিনিটের মতো, পেলাম এক দারুণ সবুজের মখমলে মোড়ানো মিহি ঘাসের কয়েকটি টিলা। সেই অরণ্যর মাঝেই। এখানে একটু না বসলেই নয়। আর সাথে দুই একটি ছবি তো চাই-ই চাই। আর তাই-ই হলো, সাথে ট্রেকের প্রথম বিশ্রাম। আবার শুরু স্বপ্নারণ্যের পথ ধরে স্বপ্নের শেষ সীমানায় যাবার হাঁটা। দুই একটি ছোট ছোট পাহাড় পার হয়ে আর একটু উঁচু পাহাড়েই নিজেদের আবিস্কার করলাম অনেক ছবি দেখা, গল্প পড়া আর একদিন ছুঁয়ে দেখবো বলে ভেবে রাখা রডেনড্রনে বেষ্টিত পাহাড়ে সারি। ওয়াও বলে উঠলাম নিজের অজান্তেই। আর প্রথম বারের মতো একান্ত আন্তরিকতায় আলতো করে ছুঁয়ে দেখলাম ওর পাতায় পাতায়, রঙিন কুঁড়িতে কুঁড়িতে জমে থাকা রোদের ঝিলিক দিয়ে যাওয়া রূপালী শিশির বিন্দুগুলোকে।
টংলুর পথে পথে রোডোডেনড্রন। ছবিঃ walkopedia.net

আর এক একটা রডেডনড্রন গাছে ধরে আছে এক এক রকমের ফুলের কুঁড়ি। নাহ, ফুল নেই একটুও প্রস্ফুটিত। যা আছে সব কুঁড়ি। কারণ ফুলের সময় এই অক্টোবর নয়। সেই বর্ণিলতার খেলা দেখতে হলে যেতে হবে কোনো এক এপ্রিলে। তবে পাহাড়ে পাহাড়ে, রডেনড্রনের আশেপাশে, সবুজের গালিচা ছুড়ে ফুটেছিল নাম না জানা শত রকম আর রঙের ফুল। যার রঙগুলো খুবই অদ্ভুত রকমের কমলা-হলুদ-বেগুনী-গোলাপি আর নানা রঙের শেডের মিশ্রণ এক একটা ফুলে। তবে একদম কমন রঙ নেই একটিতেও। একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নতায় তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে এমন এক একটা রঙের ধরণ ছিল প্রতিটি ফুলের নিজস্বতা।
পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে, একটা সমতল ভ্যালীর মতো পেলাম, যেখানে আবার বিশ্রাম। পুরো ভ্যালীটাই অদ্ভুত রকমের সমতল, যার চারদিকেই পাহাড়ে পাহাড়ে ঘিরে ধরা, কাছে বা দূরে। বেশ কিছু হলুদাভ ঘাস বা নাম না জানা কোনো ফসলের গাছ পুরো ভ্যালী জুড়েই। দেখেই মনে হলো, ইস যদি ক্যাম্পিং করা যেত একদিন এখানে। এই কথা ভাবতে ভাবতেই আমাদের সাথে যোগ দিল আরো দুইজন, যারা তাদের অফিশিয়াল কাজ শেষ করে সময় মিলে যাওয়ায়, একটু ঝালিয়ে নিচ্ছেন পুরনো ট্রেকিংয়ের নেশার আর স্মৃতির জাবর কেটে সুখ পাচ্ছেন একান্ত ফেলে আসা সময়ের।
সবুজ টংলু। ছবিঃ wikimapia.org

কিছুক্ষণ বিশ্রাম, শুকনো খাবার, চকলেট, গ্লুকোজ আর পানি দিয়ে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মিটিয়ে চলার শুরু। সামনে তিনটা পাহাড়ের পরে যে চূড়াটা দেখা যাচ্ছে ওটাই টংলু। একজন বলে ফেললেন আরও তিনটা পাহাড়? জ্বী দাদা, আরও তিনটা পাহাড়। সেই সমতল ভ্যালী থেকে আবারো শুরু হলো পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা। এক চূড়া থেকে একটু নেমে, এঁকেবেঁকে আরেকটি চূড়ার পথ ধরা। এভাবে দুইটি চূড়া পেরোবার পরে পেলাম একটু অন্যরকম কাঙ্ক্ষিত চূড়া, যেখানে দুয়েকটি ছবি না তুললেই নয়। একদম স্বপ্নময় ছবির লোকেশন যেন। করাও হলো তাই। থেমে আর সেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে তোলা হলো ছবি। যদিও আকাশ বড় ধুম ধরে আছে সেই সকাল থেকেই। নেই কোনো নীলের দেখা বা দূরে কোনো বরফ মোড়া পাহাড়ের চূড়া, তবুও অভাবনীয় ছিল সেই মুহূর্তটুকু।
আর একটু পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেই টংলু। ১৫ মিনিট হবে হয়তো, পৌঁছে গেলাম টংলুতে। এটা তো কোনো চূড়া নয়, একেবারেই সমতল টেবিলের মতো এক ভ্যালী আবারো। যেটা স্নিগ্ধ সবুজের হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। এর উচ্চতা প্রায় ৯,০০০ ফুটের কাছাকাছি। এত উঁচু পাহাড়ও যে ভ্যালীর মতো সমতল হতে পারে ভাবতেই পারিনি। একটু এদিক সেদিক তাকিয়ে, হেঁটে দেখে বোঝা গেল যে এটা আসলেই এক পাহাড়ের চূড়া। কিন্তু অনেক বড় একটি পাহাড়ের অনেকটা বিস্তৃত এই চূড়া, তাই অনেকটা ভ্যালীর মতো লাগছে।
মেঘে ঢাকা ভ্যালী। ছবিঃ northbengaltourism.com

আর যে বাড়ি বা ঘরে বসবো আমরা হালকা কিছু নাস্তা আর চা খেতে, সেটা তো স্বর্গ থেকে তুলে এনে এই পাহাড়ের চূড়ায় বসিয়ে রেখেছেন স্বয়ং বিধাতা যেন। এতটাই নান্দনিক আর অপূর্ব সাজে সেজে অভিবাদন জানালো আমাদের অভিযাত্রী দলকে। কত রকমের আর রঙের ফুল যে ফুটে ছিল সেই বাড়িটির পুরো বেলকনি জুড়ে। আর ছোট্ট বাঁশের বেড়া দেয়া উঠোন তো যেন এক টুকরো সবুজ, স্বচ্ছ আর ঝকঝকে বিছানা। যেখানে পা রাখতেও শঙ্কা হয়, পাছে অভিমান করে ওর নিষ্পাপ শরীরে রেখেছি আমাদের ময়লা পা। এতটাই মিহি আর মায়ামাখা ছিল টংলুর সেই সবুজ চাদর বিছানো মুগ্ধ উঠোন।
আমি পুরোপুরি প্রেমে পড়ে গেছি টংলুর। ভালোবেসে ফেলেছি টংলুকে। ওর চারপাশের সবুজ পাহাড়ের মায়াবী চাহুনিকে। কাছে-দূরে আরও আরও সবুজের চাদর গায়ে বসে থাকা উঁচু-নিচু পাহাড়কে, কখনো মেঘ ছুঁয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যাওয়া মিহি আদরকে, আবার কখনো এক মুঠো রোদের আন্তরিক উষ্ণতাকে, রঙিন নাম না জানা পাখির গানকে, উড়ে বেড়ানো স্বাধীন বর্ণিল প্রজাপতিকে, শত রঙের ফুলে ফুলে সেজে থাকা পাথরের সেই বেলকনিকে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়েছিলাম আর যেন নিজের করে নিয়েছিলাম পুরো ট্রেকের সবচেয়ে ভালো লাগার টংলুকে।
টংলুর নির্জন ঘর। ছবিঃ wikimapia.org

আসলেই গভীর প্রেমেই পড়েছি টংলুর।
ফিচার ইমেজ- gotohz.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বপ্নের টুমলিং: সান্দাকফুর পথে

কলকাতা কালীঘাট: প্রাচীন এক ধর্মীয় তীর্থক্ষেত্রের ইতিকথা