মেঘালয়ে মেঘবিলাস: ক্রাংসুরির উদ্দামতা

চা খেয়ে ঘোরাঘুরির পর সোজা হোটেলে। এটাই ছিল আমাদের শেষ রাত শিলং শহরে। ব্যাগ গুছিয়ে রাখলাম রাতেই কারণ খুব ভোরেই আমরা বেরিয়ে পড়ব আরেক স্বপ্ন ক্রাংসুরির উদ্দেশে। শিলং শহর থেকে ক্রাংসুরি যেতে ২- ২.৩০ ঘণ্টা সময় লাগে। পরদিন সকাল ৫টায় উঠে দেখি প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই গাড়িতে উঠে বসলাম।

ক্রাংসুরি ঝর্ণায় সরাসরি গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না। ৩০ মিনিটের ছোট্ট একটা ট্রেকিং করে পৌঁছাতে হয়। ট্রেকিংয়ের পুরো পথেই বৃষ্টি হচ্ছিল। পুরো পথটাও ছিল দেখার মতো। আর বৃষ্টির ফলে দূর থেকেই আমরা ঝর্ণার যে প্রবল গর্জন শুনছিলাম তাতে তাকে দেখার জন্য আরও বেশি উদগ্রীব হয়ে উঠলাম।

ট্রেকিং এর পথ ; ছবি কৃতজ্ঞতা : অর্ণব দাস

যতই এগোচ্ছিলাম ততই মনের মধ্যে কৌতুহল বেড়ে যাচ্ছিল। যখন দেখলাম তাকে দূর থেকে কী যে অনুভূতি হলো মনে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হয়তো পাহাড় আর ঝর্ণাকে ভালোবাসি বলেই বারবার ঘর থেকে বাহিরের পানে ছুটে আসা। এই ছুটে আসাটা তখনই সার্থক মনে হয় যখন চোখের সামনে এরকম কিছু দেখি।

উন্মত্ত ক্রাংসুরি ; ছবি কৃতজ্ঞতা : অর্ণব দাস

ক্রংসুরির উন্মত্ততা দেখে মুখের কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পৌঁছে গেলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। আহা, ক্রাংসুরি! তাঁর রূপ দেখে বিমোহিত সবাই, গর্জন এতই প্রবল ছিল যে সামনে দাঁড়ানো আরেকজনের কথা শোনা যাচ্ছিল না। অনেক ভিউ পয়েন্ট আছে এই রূপসীকে দেখার জন্য। আমরা একেকবার একেক জায়গা থেকে দেখছিলাম তাকে। সাধ মিটছিল না কোনোমতেই। পরে একটা পথ দেখলাম একেবারে ঝর্ণার নিচে চলে যাওয়া যায়। চলে গেলাম সেখানে। অনেক বড় একটা গুহার মতো দেখতে। সে কী পানির প্রবল স্রোত!

ক্রাংসুরি ঝর্ণা মূলত আমাদের দেশের নাফাখুমের মতো। কিন্তু পানির স্রোত যেদিকে, সেদিকে বড় করে বাঁধ দেয়ার ফলে পানি সমান্তরাল হয়ে নিচে পড়ে। এর ফলে ঝর্ণাটিকে অনেক বিশাল মনে হয়। আর বৃষ্টির কারণে তা উন্মত্ত আকার ধারণ করেছিল। প্রকৃতির ক্ষতি না করে তাকে আরও সুন্দর, দর্শনীয় কিভাবে করা যায় ক্রাংসুরি না আসলে তা বুঝতে পারতাম না। প্রকৃতি আর মানুষের মেলবন্ধন এই ক্রাংসুরি ঝর্ণা।

ক্রাংসুরির সৌন্দর্য দর্শন ; ছবি কৃতজ্ঞতা : রাজীব দাস

এই সুন্দরের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়া যায় অনায়াসে। আমরাও তাই করেছিলাম। সময়ের কোনো হিসেব ছিল না। যত দেখি তত বেশি থেকে যেতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু ফিরতে হবে, তাই বিদায় জানালাম ক্রাংসুরিকে। আমরা গিয়েছিলাম সকালে আর বৃষ্টির জন্য অন্য কোনো দর্শনার্থীও ছিল না। মনের সুখে ঘুরে বেরিয়েছি এই রূপসীর চারপাশে। গাড়ির কাছে আসতেই ক্ষিদে টের পেলাম। সকাল থেকে না খাওয়া। তখন বাজে প্রায় ১২টা। যেখানে গাড়ি ছিল ওখানে ছোট্ট একটা দোকান থেকে সিদ্ধ ডিম আর ইনস্ট্যান্ট ন্যুডলস দিয়ে পেটপূর্তি করলাম। তারপরের গন্তব্য সোনাংপেডেং গ্রাম। আবারও ২-২.৩০ ঘণ্টার পথ।

সোনাংপেডেং গ্রাম (Sonangpedeng Village):   

সোনাংপেডেং গ্রাম তামাবিল-ডাউকি বর্ডার থেকে একদম কাছেই। বর্ডার থেকে ১৫-২০ মিনিট লাগে এই গ্রামে যেতে। গ্রামটিতে টুরিস্টদের থাকার জন্য কটেজ আছে। ইচ্ছা করলে তাঁবুতেও থাকা যায়। এছাড়া উমংগট নদীতে বোটিং, কায়াকিং এসব করার ব্যবস্থা রয়েছে। উমংগট নদীর রূপ একেক ঋতুতে একেকরকম। শীতকালে নদীর পানি একদম পরিষ্কার। তখন টুরিস্টও বেশি থাকে। আর ভরা বর্ষায় নদীর পানি একদম ঘোলাটে। কিন্তু নদীর উন্মত্ত রূপ দেখতে হলে বর্ষাকালের কোনো বিকল্প নেই। আমরা গিয়েছিলাম বর্ষাকালে। পুরো নদীটি ছোট-বড় পাথরে ভরা। একটু এদিক-ওদিক হলেই সমস্যায় পড়তে হবে।

পাথুরে উমংগট নদী ; ছবি কৃতজ্ঞতা : আতিফ আসলাম

তারপরও আমরা নদীতে কায়াকিং করেছি। একটি বোটে ২ জন করে। বৃষ্টির কারণে বেশি দূর যেতে পারিনি। এরকম ভয়ংকর স্রোতে কায়াকিং করাটাও বেশ সাহসের ব্যাপার। এই পুরোটা দিন আমরা বলতে গেলে ভিজেই কাটিয়েছি।

উমংগট নদীতে কায়াকিং ; ছবি কৃতজ্ঞতা : অর্ণব দাস

যাই হোক, এখন বাড়ি ফেরার পালা। জীবনের কিছু সুন্দর দিন মেঘালয়ে কাটিয়েছি। স্বপ্নের হাতছানিকে উপেক্ষা না করে তার সাথে চলেছি। ফেরার পথে বর্ডারে বেশি সময় লাগেনি। তারপর রাতে সিলেট শহরে খাওয়া-দাওয়ার সাথে চলে মেঘালয়ের স্মৃতি রোমন্থন। সুন্দরকে দেখতে হলে সবার আগে মনের ইচ্ছাশক্তি প্রয়োজন। নইলে অনেকে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সুন্দরের দেখা পাওয়া যায় না। তাই একটি সুন্দর ঘোরার মন থাকলে আর হাতে কিছু জমলেই বেরিয়ে পড়ুন নতুনকে দেখার জন্য।

খরচ:

ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় ডলার নিয়ে গেলে ভাল। শিলং শহরে ডলারের রেট রুপিতে বেশ ভালোই পাওয়া যায়। প্রতিদিনের জন্য আলাদা করে গাড়ি ভাড়া না করে যে কদিন মেঘালয়ে থাকবেন পুরো সময়ের জন্য একটা গাড়ি ভাড়া নেবেন। এতে আপনার খরচ কমার সাথে সাথে যিনি গাড়ি চালান তার সাথেও বেশ ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠবে। ৭-৮ জনের জিপগাড়ির জন্য দিনভেদে খরচ পড়বে ৩,০০০-৪,০০০ রুপি। আর ৪ জনের গাড়ির জন্য পড়বে ২,০০০-২,৫০০ রুপি। আর থাকার ক্ষেত্রে শিলংয়ের পুলিশ প্লাজা বিখ্যাত। পুলিশ প্লাজার আশেপাশে অনেক হোটেল আছে। প্রতিদিনের জন্য ৭০০-১ম০০০ রুপির মধ্যে ভালো মানের হোটেল পাবেন এখানে। রুমভেদে ভাড়া একটু কম বেশি হতে পারে। আর দরাদরি করতে ভুলবেন না যেন!

ফিচার ইমেজ- অর্ণব দাস

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঈদের ছুটিতে মেঘ ছুঁতে যাই কালিম্পংয়ে

জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ দেখার গল্প