কোণার্ক সূর্য মন্দিরে…

ইশ, এখানে না এলে কী ভুলটাই না করতাম! এই ছিল কোণার্ক সূর্য মন্দিরের সবুজ গালিচায় পা রাখার পরে আমার প্রথম অনুভূতি। ঝকঝকে সবুজের মাঝে চকচকে পথ। শেষ দুপুরের অলস বাতাস গায়ে যেন কোনো মাধুরী মিশিয়ে দিয়েছে এখানে। এতটাই সবুজ, শান্ত, ঝকঝকে আর মনোমুগ্ধকর চারপাশ যে আমি দিব্যি খালি পায়েই পথ চলতে শুরু করলাম। ইচ্ছেই হলো না অটো থেকে জুতো নিয়ে পড়তে।

দুইপাশে সবুজের মিহি গালিচা, মাঝে বর্ণীল পথ পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। একবার এক সবুজ মখমলে পা রেখে একটু নরম ঘাসের ছোঁয়া নেব বলে রাস্তা বাদ দিয়ে সবুজের মধ্যে পা রাখতেই দূর থেকে নিরাপত্তা কর্মীর সতর্ক বাঁশি। সেদিকে চোখ তুলে তাকাতেই বুঝতে পারলাম এখানের সবুজ শুধু চোখ দিয়ে দেখে, মন দিয়ে উপভোগ করার জন্য। আর এই পুরো প্রাঙ্গণের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য। ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে, অলস সময়ে গড়াগড়ি করে কাটানোর জন্য নয়। সেজন্য সূর্য মন্দিরের একদম ভিতরে বিস্তীর্ণ সবুজের বিছানা বেছানো রয়েছে সবার জন্যই।

কয়েক শতকের পুরনো স্থাপত্য। ছবিঃ লেখক

আরও কিছুটা এগিয়ে যেতেই দূর থেকে সূর্যের আলোক রশ্মির মাঝ থেকে চোখে পড়ল আকাশ ছুঁতে চাওয়া কোনো এক কালচে স্থাপনা। দূর থেকেই তার উচ্চতা, প্রাচীন ঐতিহ্য জানান দিচ্ছিল। একজনের পরামর্শমতো ৪০ রুপী করে টিকেট করে নিলাম মূল প্রাঙ্গণে ঢোকার জন্য। তার আগে একটু মিউজিয়াম আর থিয়েটার হলের প্রবেশ মুখে ঢুকে আলোকসজ্জা ও প্রাচীন ইতিহাসের নানা দিক তুলে ধরার প্রয়াস দেখে সময়ের অভাবে বেড়িয়ে এলাম। সরাসরি মূল প্রাঙ্গণে যাবো বলে।

এখানে একটা কথা বলে রাখি। ইতিহাস বা ঐতিহাসিক পটভূমি লিখতে আমার ভালো লাগে না। ওসব লিখে আমি নিজে এবং অন্যকে বিরক্ত করতে আমার ইচ্ছা হয় না, আর সেসবের জন্য তো উইকিপিডিয়া আছে, গুগল আছে। যে কারণে আমি যে কোনো জায়গায় গিয়ে কী দেখলাম, কেমন দেখলাম, কেমন অনুভূতি হলো আর কতটা আচ্ছন্ন হয়েছি সেই জায়গার প্রতি এসব লিখতে ভালো লাগে, ভালোবাসি।

স্ব মহিমায় দাঁড়িয়ে, প্রাচীন ঐতিহ্য। ছবিঃ লেখক

তো সে যাই হোক। কোণার্ক সূর্য মন্দিরের প্রাথমিক প্রাঙ্গণ থেকে সনাতনি পথের এপার থেকে ওপার গিয়ে মূল ফটকে ঢুকে পড়লাম। সামনেই বিশাল ধূসর কালো পাথুরে স্থাপত্য। পুরো স্থাপত্যের চারপাশে সবুজের মিহি চাদর বিছানো আছে সবার জন্য উন্মুক্ত, মাথা তুলে উপরে তাকালেই ঘন নীল আকাশ, আকাশের এখানে সেখানে দুষ্ট ছেলে মেয়েদের মতো ছোটাছুটি করছে কিছু কোমল সাদা মেঘ দল, পুরো সবুজ গালিচা জুড়ে বিশাল বিশাল গাছের ছায়া আর একদম সেই প্রাচীন স্থাপনা আঙিনায় রয়েছে এক মহীরুহ, বটবৃক্ষ যে তার ছায়া, শেকড়, বেদী সবার জন্য করে রেখেছে এক আরাম আয়েশের আয়োজন, ক্লান্ত পথিক ও পর্যটকের জন্য প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল।

প্রথমে একটু সবুজে গড়িয়ে, নীল আকাশ দেখে চোখ জুড়িয়ে, সাদা মেঘেদের সাথে গল্প করে আর বটের ছায়ায় শান্ত হয়ে ধীরে ধীরে প্রাচীন স্থাপত্যের দিকে পা বাড়ালাম। দেখেই বোঝা যাচ্ছে প্রায় হাজার বছর আগের এই স্থাপনা তার রঙ হারালেও ঐতিহ্য, আভিজাত্য, জৌলুস আর নিজের অহমিকা জানান দিতে ভুল করছে না এতটুকুও। প্রতিটি পাথরে পাথরে প্রাচীন কাম ও কলার কারুকাজ মুগ্ধ নয়নে উপভোগ করতে বাধ্য হবে যে কেউ। আর কেউ যদি হয় কবি প্রকৃতির তবে তো আমার মনে হয় হাজার খানেক কবিতার রসদ পেয়ে যাবে পাথরে পাথরে খোদাই করা প্রাচীন শিল্প দেখেই।

মিহি সবুজ গালিচা। ছবিঃ লেখক

আমি একটু একটু করে উঠছি, নীল কালচে ধূসর প্রাচীন পাথুরে স্থাপত্যে খোদাই করা প্রেম, ভালোবাসা, ভালো লাগা, আবেগ, অনুভূতি, রঙ, রস, রূপের জাদুতে মুখরিত হচ্ছি একটু একটু করে, কিন্তু সেই পাথুরে স্থাপনার ক্ষয়ে যাওয়া পিলার, স্তম্ভ, ভাঙা চৌকাঠের ফাঁকফোঁকর দিয়ে দারুণ বিরক্ত করে চলেছিল ক্ষণে ক্ষণে উঁকি দেয়া নীল আকাশ। আকাশ যেন প্রাচীন প্রেম আর প্রেমের সাথে শিল্পের যে মিশ্রণ ঘটিয়েছে তার মাঝে আমি লুপ্ত হতে না পারি সেই সন্ধি করেছে মেঘ আর সূর্যের কাছে। তাই তো ক্ষণে ক্ষণে সুযোগ পেলেই ছোবল দিয়ে যাচ্ছিল চোখেমুখে।

কিন্তু সত্যি বলতে কি, আমি পাথরে পাথরে খোদাই করা প্রাচীন প্রেম, কাম আর রূপ রসের কাছে ততক্ষণে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি অকাতরে। নাহ এরপর আমি আর দেখিনি নীল আকাশ, চোখ রাখিনি সবুজ গালিচায়, ভেসে যাইনি কোমল মেঘে, গায়ে অনুভব করিনি মিহি বাতাস। আমি শুধু পাথর দেখেছি, পাথরের স্থাপত্য দেখেছি, পাথরে পাথরে খোদাই করা প্রাচীন ইতিহাসের মাঝে হারিয়ে গিয়েছি। অবাক বিস্ময়ে শুধু দেখেছি আর ভেবেছি কতটা অধ্যবসায়, কতটা প্যাশন, কতটা আবেগ আর কতটা পরিশ্রমের একাত্মতা থাকলে এমন স্থাপনার কথা ভাবা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করা যায় আর এত এত কঠিন পাথরকে কীভাবে সহস্র বছরের ইতিহাসের সাক্ষী করে তোলা যায়।

ঐতিহাসিক স্থাপনায় কারুকাজ। ছবিঃ লেখক

একদম উপরে উঠে চারদিকে তাকিয়ে দারুণ বিমোহিত হতে হলো। ধূসর পাথুরে স্থাপনার উপরে দাঁড়িয়ে, ভঙ্গুর পাথুরে বিমে হেলান দিয়ে নিচের সবুজ চত্বর দেখছিলাম। সেখানেও রয়েছে পাথুরে নানারকম অনিন্দ্য স্থাপনা। আস্ত পাথর কেটে বানানো হয়েছে হাতির পায়ের ধাপ, একটা পাথুরে হাতিই যেন দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। আরও যে কত রকমের পাথুরে ছোট বড় নানা রকম স্থাপনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো সবুজ প্রাঙ্গণের আনাচে কানাচে যে সব একই সাথে ঘুরে দেখতে হলে আর প্রাণ ভরে উপভোগ করতে হলে একবেলা মোটেই যথেষ্ট নয়।

এক ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম অদূরেই সংস্কার কাজ চলছে সূর্য মন্দিরের মূল ভবনে। যার ভিতরে যাওয়া সেসময় সম্ভব ছিলোনা সেটা বন্ধ বা সাময়িক পর্যটকদের জন্য খোলা না থাকায়। তবে ঘেরা দিয়ে রাখা সেই বিশাল পাথরের সূর্য মন্দিরের চারপাশ ঠিকই ঘুরে দেখা গেছে অল্প বিস্তর। দূর থেকে দেখেই উপভোগ করেছি যতটা পেরেছি। এরপর ঘুরে ঘুরে পুরো প্রাঙ্গণ দেখে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় আবারো আশ্রয় নিতে হয়েছিল সেই সবুজের গালিচায়, নীল আকাশের নিচে, সাদা মেঘেদের মাঝে আর ঝিরঝিরে বাতাসে। দারুণ একটা বিকেল কাটিয়েছিলাম এমন অপূর্ব আর অনিন্দ্য পাথুরে প্রাচীন স্থাপনায়, সূর্য মন্দিরের ঐতিহাসিক আভিজাত্যে আর নানা রকম কারুকাজের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম অনায়াসে।

অপূর্ব স্থাপত্যে রোদের ঝিলিক। ছবিঃ লেখক

কোণার্ক সূর্য মন্দিরের অবস্থান, ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের পুরীতে। যদিও পুরী শহর থেকে আরও প্রায় ৩৫ কিলোমিটার যেতে হয় সড়ক পথে। হাজার বছরের ঐতিহ্য দর্শনে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গের সাম্প্রতিক ভার্সন!

১০ রুপির বিড়ম্বনা!