চুপিচুপি টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার রুদ্ধশ্বাস রূপ অবলোকন

টাইগার হিলের অপার্থিবতা! ছবিঃ makemytrip.com

আজ দার্জিলিং ভ্রমণের শেষ দিন, মনটা বড্ড মেঘলা। ফিরে যাবার জন্য নয়, এজন্য যে টাইগার হিল যাওয়া হলো না। ভ্রমণ সঙ্গীরা সবাই তৃপ্ত তাঁদের এবারের ভ্রমণ নিয়ে, সুতরাং আর কোথাও যেতে চায় না, কেউই না। অথচ সবাইকে বোঝালাম যে যাব তো সকালে, জীপ নিজেদের, শিলিগুড়ি যাবার পথেই তো পড়বে, একটু আগে বের হতে হবে এই যা।

কিন্তু অত ভোরে কেউই এই হিম ঠাণ্ডা শীতের সকালে লেপের উষ্ণতা ভেঙে বের হবে না। আমার মনের ভেতর খচখচ করছে, প্রথমবার দার্জিলিং এলাম অথচ এত জনপ্রিয় টাইগার হিলে গেলাম না। সেটা কী মেনে নেয়া যায়? সমস্যা হলো আমার কাছে আর অবশিষ্ট কোনো রুপিই নেই। সুতরাং একা একা যে যাব, সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

রাতে ডিনার করে মনের মধ্যে একটা অব্যক্ত বেদনা নিয়ে ঘুমোতে ঢুকলাম। লেপের তলায় শরীর ওম হয়েছে ঠিকই কিন্তু মনে ওম নেই! কখন যেন ঘুমিয়ে গেলাম। একসময় ঘুম ভাঙল, স্বাভাবিক নিয়মে মধ্যরাতের শেষে। আবার বিছানায় যাব, এমন সময় চোখ গেল রুমের দেয়াল ঘড়ির দিকে, রাত ৩:৩০ পার হয়ে গেছে। মনে পড়লো আরে যারা টাইগার হিল যায়, এই সময়ই তো বের হয়।

দার্জিলিং থেকে টাইগার হিল ও কাঞ্চনজঙ্ঘা। ছবিঃ imgc.allpostersimages.com

রোমাঞ্চের বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীর, মন ও মাথায়! বেরিয়েই দেখি না, যদি কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি বা গ্রুপ পাওয়া যায়, একটু নিয়ে যাবে দয়া করে। বহু মানুষই তো যাবে, কাউকে না কাউকে নিশ্চই পাওয়া যাবে! আমার মন বলছে যেতে পারবো। সুতরাং বেরিয়েই দেখি না কী হয়? মনকে তো বোঝাতে পারবো যে চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। যেই ভাবা, সেই কাজ। প্রস্তুত হলাম নতুন ও নিজস্ব অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় মাতাল হয়ে! ডেকে তুললাম আরেকজনকে, যে না গেলেও অন্তত বাধা দেবে না। আমার প্রস্তুতি আর উদ্যম দেখে সেও উঠে গেল এবং তৈরি হয়ে নিল।

৪টা বাজে, দুজন হোটেল বয়কে ডেকে গেট খুলে বের হলাম। চারিদিকে রাতের শেষ অন্ধকারের হাতছানি, একটু অজানা আশংকা অচেনা অন্ধকার। সামান্য গা ছমছমে শিহরণ। সব মিলে একটা কেমন কেমন অনুভূতি, অব্যক্ত, গুমোট, খিটখিটে মোট কথা সুখকর নয় আদৌ। হোটেলের নিচু থেকে উপরে রাস্তায় উঠে মনের বিসন্নতা বিলীন হয়ে গেল এক নিমেষেই! এত রাতে চারদিকের কোলাহল আর কলকাকলি দেখে।

সেই সাথে হাজারো জীপের বহর দেখে, আলোয় আলোয় আলোকিত পুরো রাস্তা, আগে-পিছে, দূরে যতদূর চোখ যায়, আলো আর আলো! ঝলমলে চারিদিক দেখে এবার মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। সম্ভাবনা নিশ্চয়ই আছে, সুযোগ পাবই, এই ভেবে!

টাইগার হিল, দার্জিলিং। ছবিঃ i.ytimg.com

দুজন মিলে অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও তেমন কারো মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হলাম। সবাই ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে, অন্য কোনোদিকে কারো খেয়াল করার সময় কোথায়? আর সবচেয়ে বড় কথা সব গাড়িই ভরপুর। কাউকে অনুরোধ করার কোনো সুযোগই নেই!

এবার আমার সঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করলাম, তার কাছে কোনো রুপি আছে কিনা? নেই! একদমই নেই। আর কোথাও যাওয়া হবে না জেনে গতকাল রাতেই সব খরচ করে ফেলেছে! শুধু টাকা আছে মাত্র ৫০০। আর আমার কাছে তো শুরু থেকেই নেই, আমার কাছেও আছে মাত্র ৫০০ টাকা! কিন্তু অদম্য ইচ্ছা আর চেষ্টা থাকলে বিধাতা যে কাউকেই নিরাশ করেন না তারই প্রমাণ হলো আবারো এবং দারুণ নাটকীয়তায়! বলি সেই গল্প।

দুজনে বিরস বদনে বসে বসে দেখছি অন্যদের দুর্বার যাত্রা! মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই উক্তির মতো, “দুই ক্ষুধার্ত কুকুর! সুখ পাচ্ছে অন্যদের খাওয়া দেখে!” আসলে টাইগারহিল দেখতে যাওয়া দেখে! পেছন থেকে গাড়ির আওয়াজ, আমাদেরকে সরে যাবার ইশারা করছে, গাড়িটি আমাদের ক্রস করে যেতে যেতে আবার থেমে গেল। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ যুবক, ছোট একটি কার নিয়ে যাচ্ছে, আমাদের উদেশ্যে তার জিজ্ঞাসা- টাইগারহিল যাব নাকি। আমরা বিস্মিত, আরে বলে কী? এই ভেবে, হ্যাঁ যাব কিন্তু রুপি নেই, তার উত্তর ডলার তো আছে? নাহ! আছে বাংলাদেশী টাকা। যাবে?

শেষ রাতের দার্জিলিং। ছবিঃ aff.bstatic.com

সে দ্বিধান্বিত, আসলে তার বাবা কলকাতা গেছে, গাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে, এইজন্য কিছু বাড়তি উপার্জনের আশায় বেরিয়েছে, কাউকে না জানিয়ে। সে যেতে চায় কিন্তু বাংলাদেশি টাকার মান নিয়ে তার ধারণা নেই। তাকে বোঝালাম যে মান প্রায় কাছাকাছি, ভারতের ১০০ টাকা আমাদের ৭৫ টাকার চেয়েও বেশী, সুতরাং সে ১,০০০ টাকায় যেতে পারে, এতে তার ৭৫০ টাকা হবে। সে একটু অনিশ্চয়তা আর কিছুই না পাওয়ার চেয়ে অল্প পাওয়া ভালো এইসব ভেবে ভেবে শেষ পর্যন্ত সম্মত হলো। আর আমাদের আনন্দ, সে ছিল সীমাহীন। আরও একবার নিজেকে নিজে সাধুবাদ জানালাম, অদম্যতা আর হার না মানার সাহসিকতার জন্য, শেষ দেখে ছাড়া মানসিকতার জন্য এবং জয়ী হবার সম্ভাবনার জন্য।

আমরা চলছি ভীষণ দ্রুত গতিতে, যেহেতু বেশ দেরি হয়ে গেছে, সূর্যোদয়ের মুহূর্ত উপভোগ করতে না পারলে তো আর কোনোই লাভ নেই। চলছি আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের একপাশে গভীর খাদ, একপাশে খাড়া পাহাড়ের ছোট রাস্তা ধরে, ঘুম স্টেশন পেরিয়ে দুটো বা তিনটা পাহাড় ডিঙ্গানোর পরেই শুরু হলো জ্যাম। সারি সারি গাড়ি পুরো রাস্তা জুড়ে। যেহেতু ছোট গাড়ি, জায়গা খুবই কম লাগে, সেহেতু সেইসব গাড়ির সারি ভেদ করেই চলছে আমাদের টগবগে যুবক, অতিরিক্ত সামান্য অর্থের সন্ধানে আর আমাদের শেষ রোমাঞ্চের স্বাদ দিতে।

প্রত্যুষে দার্জিলিং থেকে কাঞ্চন! ছবিঃ res.cloudinary.com

এভাবে আরও ২০ মিনিট চলার পরে আর কোনোভাবেই যাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু আর বেশি দূরেও না। সুতরাং নেমে গেলাম কার থেকে, যুবকের নাম্বার নিয়ে এবার শুরু পাহাড় চড়ার পালা। পাগলের মতো উঠছি, পাহাড়ের লতাপাতা, গাছের শিকড়, ইট-পাথর উপেক্ষা করে। রাস্তা ধরে গেলে দেরি হবে, তাই শর্টকাট করে, ট্রেকিং পদ্ধতি অনুসরণ করে। সারা গায়ে ধুলো-বালি, কাদা, হাতের ছিলে যাওয়া সব জয় করে পৌঁছে গেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত চূড়ায়, টাইগার হিলের শীর্ষে!

ভিড় আর ভিড়, মানুষ আর মানুষ! যেন মেলা বসেছে বছর শুরুর! আবারো সবকিছু উপেক্ষা আর বকাবকি তুচ্ছ করে চলে গেলাম সামনে। সূর্যি মামা শুধু আমাদের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল, শুধুই আমাদের জন্য।

টাইগার হিলের সেই অপার্থিব মুহূর্ত! ছবিঃ http://blog.sterlingholidays.com

কাঞ্চনজঙ্ঘার রুদ্ধশ্বাস রূপে আরও হাজারো রঙে রাঙিয়ে দিয়ে রঙিন হয়ে উঠছে সূর্য তার সকল সৌন্দর্য নিয়ে! কত যে রঙের খেলা, কত যে খেয়ালি কাঞ্চনজঙ্ঘা আর কী যে এক অব্যক্ত অনুভূতি যার প্রকাশ ভাষায় অসম্ভব! এ শুধু গিয়ে, দেখে নিজের মতো করে অনুভবের, আমার ভাষায় বর্ণনা অসাধ্য, সে ভাষাই যে নেই! দারুণ সার্থক ও শতভাগ আনন্দের ভ্রমণ পুরোপুরি পূর্ণতায় পরিসমাপ্ত।

Loading...

One Comment

Leave a Reply

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    দিল্লীর দালাল থেকে সাবধান!

    চন্দ্রনাথ,পাতালকালি মন্দির, সুপ্তধারা সহস্রধারা,গুলিয়াখালি ভ্রমণ