সমুদ্রের প্রথম পলক

অফিস থেকে ফিরেছি সবে মাত্র, মনটা বেশ বিক্ষিপ্ত, সামনে দুই দিনের ছুটি, কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। মেজাজ আরো খারাপ হলো, দিলাম দোস্তকে ফোন,

“দোস্ত ভালো লাগছে না, চলো কোথাও ঘুরতে যাই”।

অপর প্রান্ত থেকে দোস্তর সম্মতি- “চল যাই”।

আমার উত্তর, “তাহলে বেরিয়ে পড় এখুনি, তুই বিমান বন্দর স্টেশনে যা, আমি কমলাপুরে যাচ্ছি”।

“ঠিক আছে বের হই”।  

কমলাপুর রেলস্টেশন। ছবিঃ লেখক

একটু পরে আবার ফোন দিলাম, “দোস্ত, বের হয়েছো? আমি কিন্তু বের হয়েছি”। আসলে তখনও রেডিই হইনি! কারণ দোস্তর কোনো ঠিক নেই, যে কোনো মুহূর্তে অফিস থেকে ফোন আসতে পারে! আর ফোন দিয়ে বলবে যে, না দোস্ত অফিসে জরুরী কাজ পড়েছে, সকালেই অফিসে যেতে হবে! তাই এই ভণ্ডামি!

দোস্তর উত্তর, “আমি এই বের হচ্ছি, ব্যাগ গুছাচ্ছি”।

“ঠিক আছে, তুই বের হয়েই আমাকে ফোন দিবি কিন্তু? মনে থাকবে?”

হ্যাঁ থাকবে- দোস্তর উত্তর।

৩০ মিনিট পরে, দোস্ত ফোন দিল, “দোস্ত আমি বিমান বন্দরে পৌঁছে গেছি! তুই কই?”

“দোস্ত আমি এই প্রায়, কমলাপুরে!” (আসলে তখনও বাসায়! পৌঁছে যাব বেশ দ্রুত, রাতে রাস্তা ফাঁকা থাকবে), এবার আমিও বের হলাম, আগে দোস্তর যাওয়াটা নিশ্চিত করে নিলাম!

সমুদ্রের সন্ধানে। ছবিঃ সংগ্রহ

কমলাপুরে পৌঁছে দেখি, মানুষ শুধু গিজগিজ করছে! কোনো টিকেট নেই, নেই দাঁড়িয়ে যাবার টিকেটও! কিন্তু মাথায় যখন অ্যাডভেঞ্চারের খেয়াল, রাখবে বেঁধে কে? সাধ্য আছে কার? বহু বছরের পুরনো অভিজ্ঞতার সঠিক ব্যবহার করলাম। উঠে পড়লাম খাবার গাড়িতে। আর উঠেই ম্যানেজ করে ফেললাম ওদের ম্যানেজারকে! ব্যস বসার জায়গা তো পেলাম! আর কী চাই? দোস্তকে ফোন দিলাম,

“দোস্ত পার্টি অন!” মানে আমি আছি আর সব ঠিক আছে! “তুই কই?”

“আমি স্টেশনে, তুই?”

“আমি ট্রেনে”।

বিমান বন্দর থেকে দুই দোস্ত একসাথে হলাম। আর আমরা দুই দোস্ত একসাথে হলে, আমাদের আর কিছুই লাগে না! হৃদ্যতা এমনই। চলছি, দুর্বার বেগে। তূর্ণা-নিশিথায় নিশাচর হয়ে! আমি তো বেজায় খুশি, যে দোস্ত অবশেষে আসতে পেরেছে, দোস্তও খুশি অনেক দিন ধরে যাব যাব করেও সময়-সুযোগ না মেলাতে হচ্ছিল না। অবশেষে এসে গেল যাওয়ার খুশি। কিন্তু মনে সামান্য অপূর্ণতা, সঠিক সিট না পেয়ে আরামের ব্যাঘাত ঘটছে আর নির্ঘুম রাত্রিযাপনের মৃদু আফসোসে!

ট্রেনে তুমুল ভিড়! ছবিঃ লেখক

সেসবকে তুচ্ছ করে, গল্পে গল্পে কাটছে প্রহর। পুরনো স্মৃতি, কলেজের বান্ধবী, প্রেমে ছ্যাকা খাওয়া, প্রেমিকার কালো চুলে হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ফিকে হওয়া! তার চোখের কাজল হবার বাসনা হারিয়ে ফেলা! টোল পড়া গালে নিজেকে খুঁজে না পাওয়ার ব্যথা! ছোট্ট ঝুপড়িতে কেক আর কোকের ভাগাভাগিগুলোর স্রোতে ভেসে যাওয়া! আর চুরি করে সন্ধ্যার তীরে হাতে হাত ধরে হেঁটে যাওয়া স্বপ্নগুলো চুরি যাওয়া! 

একসময় ঘুমের কাছে নির্ঘুমতার পরিহাস! পরিত্রাণের পলাতক প্রয়াস! অবশ্যই ট্রেনের মেঝেতে! পেপার আর লুঙ্গি বিছিয়ে! ব্যাগ মাথায় দিয়ে! তাই ঘুম, নির্ঘুম! আধো আচ্ছন্নতায়, কিছু তন্দ্রাচ্ছন্নতা, অন্যের গুঁতো, হকারের হাকডাক, পা দিয়ে মাড়িয়ে যাওয়া! মাছিদের বীভৎস ঘ্যানঘ্যানানি! বিড়ির উৎকট গন্ধ! আর বাসী খাবারের অসহ্য যন্ত্রণা!

স্বপ্নের সমুদ্রে! ছবিঃ ছবিঃ সংগ্রহ

কিন্তু আরামের পরশ বুলানো ট্রেনের দুলুনি, যেন মায়ের কোলের ছোট্ট বেলা! স্বপ্নে আর কল্পনায় ফিরে আসা! ট্রেনের ঝিকঝিকে, গল্পের গুনগুনানী। বেশ যাচ্ছি তো গন্ধে-যন্ত্রণায়! আরামে-আবেশে, আগামী দুই-তিন দিনের বর্ণিল বাঁধনে! কক্সবাজার আর সেন্ট-মারটিনে, ফাগুনে আর ভালোবাসায়! কারণ আগামী দুই দিন ১লা ফাল্গুন আর পরের দিন ভালোবাসা দিবস! বাহ, রঙে রঙিন হবে, করবই, ফেলে আসা দিনের ফিকে হয়ে যাওয়া ধূসর স্বপ্ন!

সীতাকুণ্ডের শীতল বাতাসে, ঘুম কুমারীর ঘুমের শেষে, চোখ মেলেই বিস্ময়! ধুয়েমুছে ধবধবে, গত রাতের নির্ঘুমতা! দূরের পাহাড়, সবুজ ভূমি, স্নিগ্ধ শিশির, অরুণের অরণ্য ভেদ করে, আকাশকে রঙিন আর বর্ণিল করে তোলা এক আবেগীয় ব্যঞ্জনা। সেই স্বপ্নিল আবেশের রূপ গায়ে মেখে, চোখের আরামে, মনের সুখে, ভেসে এলাম চট্টলাতে।

ট্রেন থেকে সবুজ প্রকৃতি। ছবিঃ সংগ্রহ

হালকা নাস্তা সেরে, রিক্সা করে বাস স্ট্যান্ডে। কক্সবাজারের টিকেট কেটে বাসের সিটে। কিন্তু তারপর দুর্ভোগ, দুঃসহ যন্ত্রণা, মরতে-মরতে বেঁচে যাওয়া দুর্ঘটনা, লোকাল বাসের অবিরাম থেমে থাকা, হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল, মাছ-মাংসের মাঝে যাত্রীদের সীমাহীন সেবা করা! ড্রাইভারের মাতাল হয়ে গাড়ি চালানো, হেল্পারের দাঁত না মাজা মুখের দুর্গন্ধে, যাত্রীদের অবিরাম জানালার বাইরে মুখ দিয়ে, পেটের খাবার উগড়ে দেয়া! আরও কত গা ঘিনঘিনে অসহ্যতা! একেকবার মনে হচ্ছিল নেমে ফিরে যাই! নাই বা গেলাম কক্সবাজারে!

কী আর হবে সমুদ্র দেখে? এত কষ্ট করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে! বেশী খারাপ লাগছিল, আমার দোস্তর কথা ভেবে, কারণ সে একটু আরাম প্রিয়, মা-বাবার আদরের ধন! একটু মিনমিনে আর সামান্য তুলতুলে প্রকৃতির। যে কারণে অপরাধ বোধও হচ্ছিল নিজের ভেতর। কিন্তু সেই সবকে মেনে নিয়েই চলেছি চোখ-মুখ বন্ধ করে সেই অজানা, অচেনা আর নতুন গন্তব্যে।

কক্সবাজার হাইওয়ে। ছবিঃ সংগ্রহ

কিন্তু সময় তো সরে না, রাস্তাও আর ফুরায় না, শরীরও আর বহে না! মন বিক্ষিপ্ত হতে-হতে বিপর্যস্ত প্রায় ধৈর্যর বাঁধ! তিন ঘণ্টার জার্নি ৫ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। বাস না যেন বস্তি। মানুষ না যেন মুরগীর খামার! ওহ, অসহ্য! এই ভেবে সামনে তাকালাম একরাশ হতাশা, আশা ভঙ্গের বেদনা, মনের কোণে কালো মেঘের জমে যাওয়া আর ফিরে যাবার শেষ ভাবনা নিয়ে!

থমকে গেলাম দুজনেই দূর দিগন্তের দুই রূপ দেখে!

নীল নীল জলরাশি আর সাদা ফেনার ঢেউ। ছবিঃ সংগ্রহ

উপরে নীল, নীল আর নীল। নিচে সাদা, সাদা ফেনা! নামছে-উঠছে, দুলছে, হাসছে-খেলছে নিজেদের নিয়ে! দুই দোস্ত তাকালাম দুইজনের দিকে, বিস্ময় আর প্রশ্ন নিয়ে! কী ওগুলো? কী দেখছি! তবে কি পৌঁছে গেছি? ওটা কি সেই স্বপ্নের সমুদ্র? ওগুলো কি ঢেউ? উপরে কি আকাশ? আর সাদা ফেনাগুলো যেখানে আছড়ে পড়ছে, সেটা কি বীচ? যাকে বলে, সি-বীচ?

স্বপ্নিল বীচ। ছবিঃ সংগ্রহ

আবার সামনে তাকালাম, এই বাস তো বোধহয় সমুদ্রেই নেমে যাচ্ছে! নাহ ডানে মোড় নিল। কিন্তু আমাদের দৃষ্টি বামেই পড়ে রইলো।

ফিচার ইমেজ- সংগৃহীত

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নেপালের হিমালয় ঘুরতে যা যা জানা প্রয়োজন

নামিবিয়ার বিখ্যাত যত ল্যান্ডস্কেপ