প্রথম সমুদ্র দর্শনের প্রথম পলক

অফিস থেকে ফিরেছি সবে মাত্র, মনটা বেশ বিক্ষিপ্ত, সামনে দুই দিনের ছুটি, কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। মেজাজ আরো খারাপ হলো, দিলাম দোস্তকে ফোন, “দোস্ত ভালো লাগছে না, চল কোথাও ঘুরতে যাই”। অপর প্রান্ত থেকে দোস্তর সম্মতি, “চল যাই”
আমার উত্তর, “তাহলে বেরিয়ে পড় এখুনি, তুই বিমান বন্দর স্টেশনে যা, আমি কমলাপুরে যাচ্ছি”, ঠিক আছে বের হই।

কমলাপুর স্টেশন। ছবিঃ flickriver.com

একটু পরে আবার ফোন দিলাম, “দোস্ত বের হইছো? আমি কিন্তু বের হইছি”। আসলে তখনও রেডিই হইনি। কারণ দোস্তর কোনোই ঠিক নেই, যে কোনো মুহূর্তে অফিস থেকে ফোন আসতে পারে। আর ফোন দিয়ে বলবে যে, না দোস্ত অফিসে জরুরী কাজ পড়েছে, সকালেই অফিসে যেতে হবে। তাই এই ভণ্ডামি। দোস্তর উত্তর, “আমি এই বের হচ্ছি, ব্যাগ গোছাচ্ছি”, “ঠিক আছে, তুই বের হয়েই আমাকে ফোন দিবি কিন্তু? মনে থাকবে?” হ্যাঁ থাকবে, দোস্তর উত্তর।
৩০ মিনিট পরে, দোস্ত ফোন দিল, “দোস্ত আমি বিমান বন্দরে পৌঁছে গেছি। তুই কই?” “দোস্ত আমি এই প্রায়, কমলাপুরে।” (আসলে তখনও বাসায়। পৌঁছে যাব বেশ দ্রুত, রাতে রাস্তা ফাঁকা থাকবে), এবার আমিও বের হলাম, আগে দোস্তর যাওয়াটা নিশ্চিত করে নিলাম।
কমলাপুর। ছবিঃ Daily Inqilab

কমলাপুরে পৌঁছে দেখি, মানুষ শুধু গিজগিজ করছে। কোনো টিকেট নেই, নেই দাঁড়িয়ে যাবার টিকেটও। কিন্তু মাথায় যখন অ্যাডভেঞ্চারের খেয়াল, রাখবে বেঁধে কে? সাধ্য আছে কার? বহু বছরের পুরনো অভিজ্ঞতার সঠিক ব্যবহার করলাম, উঠে পড়লাম খাবার গাড়িতে, আর উঠেই ম্যানেজ করে ফেললাম ওদের ম্যানেজারকে। ব্যস, বসার জায়গা তো পেলাম। আর কী চাই?
দোস্তকে ফোন দিলাম, “দোস্ত পার্টি অন।” মানে আমি আছি আর সব ঠিক আছে।
“তুই কই?”
“আমি স্টেশনে, তুই?”
“আমি ট্রেনে”।
স্টেশনে ট্রেনে। ছবিঃ TravelerBase

বিমান বন্দর থেকে দুই দোস্ত একসাথে হলাম, আর আমরা দুই দোস্ত একসাথে হলে, আমাদের আর কিছুই লাগে না। হৃদ্যতা এমনই। চলছি দুর্বার বেগে, তুর্না-নিশিথায় নিশাচর হয়ে। আমি তো বেজায় খুশি, যে দোস্ত অবশেষে আসতে পেরেছে, দোস্তও খুশি অনেক দিন ধরে যাব যাব করেও সময়-সুযোগ না মেলাতে হচ্ছিল না। অবশেষে এসে যাওয়ায় খুশি, কিন্তু মনে সামান্য অপূর্ণতা, সঠিক সিট না পেয়ে আরামের ব্যাঘাত ঘটছে আর নির্ঘুম রাত্রি যাপনের মৃদু আফসোসে।
সে সবকে তুচ্ছ করে, গল্পে গল্পে কাটছে প্রহর। পুরনো স্মৃতি, কলেজের বান্ধবী, প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়া, প্রেমিকার কালো চুলে হারিয়ে হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ফিকে হওয়া। তার চোখের কাজল হবার বাসনা হারিয়ে ফেলা। টোল পড়া গালে নিজেকে খুঁজে না পাওয়ার ব্যথা। ছোট্ট ঝুপড়িতে কেক আর কোকের ভাগাভাগিগুলোর স্রোতে ভেসে যাওয়া। আর চুরি করে সন্ধ্যার তীরে হাতে হাত ধরে হেঁটে যাওয়ার স্বপ্নগুলো চুরি যাওয়া। এক সময় ঘুমের কাছে নির্ঘুমতার পরিহাস, পরিত্রাণের পলাতক প্রয়াস। অবশ্যই ট্রেনের মেঝেতে। পেপার আর লুঙ্গি বিছিয়ে। ব্যাগ মাথায় দিয়ে।
ভোরের ট্রেন যাত্রা। ছবিঃ Kaler Kantho

আধো আচ্ছন্নতায়, কিছু তন্দ্রাচ্ছন্নতা, অন্যের গুঁতো, হকারের হাঁকডাক, পা দিয়ে মাড়িয়ে যাওয়া। মাছিদের বীভৎস ঘ্যানঘ্যানানি। বিড়ির উৎকট গন্ধ। আর বাসি খাবারের অসহ্য যন্ত্রণা। কিন্তু আরামের পরশ বুলানো ট্রেনের দুলুনি, যেন মায়ের কোলের ছোট্টবেলা। স্বপ্নে আর কল্পনায় ফিরে আসা। ট্রেনের ঝিকঝিকে, গল্পের গুনগুনাণী।
বেশ যাচ্ছি তো গন্ধে-যন্ত্রণায়। আরামে-আবেশে, আগামী দুই-তিন দিনের দিনের বর্ণিল বাঁধনে। কক্সবাজার আর সেন্ট মারটিনে, ফাগুনে আর ভালোবাসায়। কারণ আগামী দুই দিন ১লা ফাল্গুন আর পরের দিন ভালোবাসা দিবস। বাহ, রঙে রঙিন হবে, করবই, ফেলে আসা দিনের ফিকে হওয়া যাওয়া ধূসর স্বপ্ন।
ট্রেন থেকে জীবনের প্রথম পাহাড় দর্শন। ছবিঃTripmondo

সীতাকুণ্ডের শীতল বাতাসে, ঘুম কুমারীর ঘুমের শেষে, চোখ মেলেই বিস্ময়। ধুয়ে মুছে ধবধবে, গত রাতের নির্ঘুমতা। দূরের পাহাড়, সবুজ ভূমি, স্নিগ্ধ শিশির, অরুণের অরণ্য ভেদ করে, আকাশকে রঙিন আর বর্ণিল করে তোলে এক আবেগীয় ব্যাঞ্জনা। সেই স্বপ্নিল আবেশের রূপ গায়ে মেখে, চোখের আরামে, মনের সুখে, ভেসে এলাম চট্টলাতে।
হালকা নাস্তা সেরে, রিক্সা করে বাস স্ট্যান্ডে, কক্সবাজারের টিকেট কেটে বাসের সিটে, দুর্ভোগ, দুঃসহ যন্ত্রণা, মরতে মরতে বেঁচে যাওয়া দুর্ঘটনা, লোকাল বাসের অবিরাম থেমে থাকা, হাস-মুরগী, গরু-ছাগল, মাছ-মাংসের মাঝে যাত্রীদের সীমাহীন সেবা করা। ড্রাইভারের মাতাল হয়ে গাড়ি চালানো, হেল্পারের দাঁত না মাজা মুখের দুর্গন্ধে, যাত্রীদের অবিরাম জানালার বাইরে মুখ দিয়ে, পেটের খাবার উগড়ে দেয়া। আরও কত গা ঘিনঘিনে অসহ্যতা।
কক্সবাজার হাইওয়ে। ছবিঃ Wikimapia

একেকবার মনে হচ্ছিল নেমে ফিরে যাই। নাই বা গেলাম কক্সবাজারে। কী আর হবে সমুদ্র দেখে। এত কষ্ট করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। বেশী খারাপ লাগছিল, আমার দোস্তর কথা ভেবে, কারণ সে একটু আরাম প্রিয়, মা-বাবার আদরের ধন। একটু মিনমিনে আর সামান্য তুলতুলে প্রকৃতির। যে কারণে অপরাধ বোধও হচ্ছিল নিজের ভেতর। কিন্তু সেই সবকে মেনে নিয়েই, চলেছি চোখ-মুখ বন্ধ করে সেই অজানা, অচেনা আর নতুন গন্তব্যে।
কিন্তু সময় তো সরে না। রাস্তাও আর ফুরায় না। শরীরও আর বহে না। মন বিক্ষিপ্ত হতে হতে বিপর্যস্ত প্রায় ধৈর্যর বাঁধ। তিন ঘণ্টার জার্নি ৫ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। বাস না যেন বস্তি। মানুষ না যেন মুরগীর খামার, ওহ, আর অসহ্য। এই ভেবে সামনে তাকালাম একরাশ হতাশা, আশা ভঙ্গের বেদনা, মনের কোণে কালো মেঘের জমে যাওয়া আর ফিরে যাবার শেষ ভাবনা নিয়ে।
প্রথম সমুদ্র দর্শন। ছবিঃmyegy.to

থমকে গেলাম দুজনেই, দূর দিগন্তের দুই রূপ দেখে।
উপরে নীল, নীল আর নীল। নিচে সাদা, সাদা ফেনা।
নামছে-উঠছে, দুলছে, হাসছে-খেলছে নিজেদের নিয়ে। দুই দোস্ত তাকালাম দুইজনের দিকে, বিস্ময় আর প্রশ্ন নিয়ে।
কী ওগুলো? কী দেখছি? তবে কি পৌঁছে গেছি? ওটা কি সেই স্বপ্নের সমুদ্র? ওগুলো কি ঢেউ? উপরে কি আকাশ?
আর সাদা ফেনাগুলো যেখানে আছড়ে পড়ছে, সেটা কি বীচ? যাকে বলে, সি-বীচ?
আবার সামনে তাকালাম, এই বাস তো বোধহয় সমুদ্রেই নেমে যাচ্ছে। নাহ ডানে মোড় নিল। কিন্তু আমাদের দৃষ্টি বামেই পড়ে রইলো।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভারতীয় ট্রেন: ভ্রমণকারীদের জন্য কিছু টিপস

জীবিত অবস্থায় নির্মিত হাজী শাহবাজের মসজিদ ও মাজার