বিলুপ্ত প্রায় সাদা বাঘের খোঁজে সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায়

বেশ কয়েকদিনের লম্বা ট্যুরের পর ভাবলাম কয়েকদিন শুয়ে বসে বিশ্রাম নেব। কিন্তু কপালে তখনও আমার বিশ্রাম নেই। এক সপ্তাহ না যেতেই সবাই গো ধরল শ্রীমঙ্গল যাবে। যেই কথা সেই কাজ। ৯ জন মিলে কমলাপুর থেকে রাতের ট্রেনে চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে যাত্রা।

শ্রীমঙ্গলে আগে থেকে রিসোর্ট বুক করা ছিল। স্টেশনে তারাই সিএনজির ব্যবস্থা করে রেখেছে। রাত ৩টায় স্টেশনে নেমে নাস্তা করে সোজা রিসোর্টে চলে যাই। জার্নির ধকল সইতে না পেরে রিসোর্টে পৌঁছানো মাত্র গা এলিয়ে দেই। সারাদিন রিসোর্টে গড়াগড়ি করে কেটে গেল। বিকেলের দিকে মাধবপুর লেকে সূর্যাস্ত দেখে রিসোর্টে ফিরি।

মাধবপুর লেক; ছবি- সাইমুন ইসলাম

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি শ্রীমঙ্গল। যে দিকে চোখ যায় সেই দিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। দিগন্ত বিস্তৃত সুনীল আকাশ আর ছোট ছোট টিলায় সাজানো গোছানো চা বাগানের মিলন মেলা শ্রীমঙ্গল। চা বাগানের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে শ্রীমঙ্গলের জুড়ি নেই। ‘শ্রী অর্থ সুন্দর আর ‘মঙ্গল’ অর্থ শান্তি। অর্থাৎ সুন্দর আর শান্তির দেশ বলা হয় শ্রীমঙ্গলকে। দেশের বৃষ্টি প্রধান অঞ্চল হিসেবেও শ্রীমঙ্গল সুপরিচিত। প্রাণী বৈচিত্র্যের সমাহার আছে এই শ্রীমঙ্গলেই।

সকালের প্রথম আলোয় শ্রীমঙ্গল; ছবি- সাইমুন ইসলাম

মিডিয়ার কল্যাণে সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা সম্পর্কে জানি। প্রথমবার যখন গিয়েছিলাম সময়ের অভাবে তখন যাওয়া হয়নি এই চিড়িয়াখানায়। মূলত আগ্রহ হয়েছিল সাদা বাঘ নাকি আছে সে কারণেই। এবার হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকায় চলে যাই সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায়।

সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানার বর্তমান নাম বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।

শ্রীমঙ্গল শহর থেকে এক কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা শ্রীমঙ্গলে একমাত্র সমৃদ্ধ চিড়িয়াখানা। সিতেশ বাবুর নিজ বাসস্থান শ্রীমঙ্গলের মিশন রোডে অবস্থিত ছিল এই চিড়িয়াখানাটি। বর্তমানে ১.৮০ একরের মৎস্য খামারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে চিড়িয়াখানাটি।

চশমা পরা বানর; ছবি- সাইমুন ইসলাম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে সিতেশ বাবুর বাবার তত্ত্বাবধানে নিজ বাড়িতে গড়ে ওঠে মিনি চিড়িয়াখানা। তৎকালীন সময়ে সিতেশ বাবু শিকারি হিসেবে বেশ পরিচিত ঐ অঞ্চলে। শহরের বিভিন্ন জায়গায়ার আহত বন্য প্রাণী রক্ষণাবেক্ষণ করতে তার জুড়ি নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধে মিনি চিড়িয়াখানা ধ্বংস করে দেয় পাক হানাদার বাহিনী।

পরবর্তীতে সিতেশ বাবুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুনরায় গড়ে ওঠে চিড়িয়াখানা। বর্তমানে এই চিড়িয়াখানার নাম বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন হলেও লোকে সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা হিসেবেই চিনে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে বন্য প্রাণীর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা সিতেশ বাবু নিজ উদ্যোগে করে আসছেন।

লজ্জাবতী বানর; ছবি- সাইমুন ইসলাম

সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা এখন আরও বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে। দিনে দিনে চিড়িয়াখানায় সংরক্ষিত প্রাণীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সকল সংরক্ষিত প্রাণীর মধ্যে আছে- বিলুপ্তপ্রায় সাদা বাঘ, বিরল প্রজাতির সোনালী বাঘ, সোনালী হনুমান, সজারু, হিংস্র মেছো বিড়াল, চারপাশে আতপ চালে গন্ধ ছড়ানো গন্ধগোকুল, পাহাড়ি বক, নিশি বক, সোনালী কচ্ছপ ও অসংখ্য বিরল প্রজাতির পাখি। এছাড়াও আছে লজ্জাবতী বানর। এই বানরকে যতই ডাকাডাকি করুন না কেন কোনোভাবেই তারা মুখ দেখায় না। এই জন্য এই বানরের নাম লজ্জাবতী বানর।

উড়ন্ত কাঠবিড়ালি, অজগর সাপ, হনুমান, মায়া হরিণ সহ প্রায় দেড়শ প্রজাতির জীবজন্তু। রয়েছে কালো-হলুদ ডোরাকাটা ত্রিভুজাকৃতির বিলুপ্তপ্রায় শাঁকিনী সাপ (শংক্ষীণি)। আর আছে ভাল্লুক। আছে হিমালয়ান সিভিটকেট, মথুরা, সোনালি কচুয়া, বন্য খরগোশ, বন্য রাজহাঁস, লেঞ্জা, বালিহাঁস, প্যারিহাঁস, কোয়েল, লাভবার্ড, চিত্রা হরিণ, বনরুই, বিভিন্ন রঙের খরগোশ, সোনালি খাটাশ, গুইসাপ, ধনেশ, হিমালয়ান টিয়া, ময়না, কাসে-চড়া, কালিম, বাজিরিক, শঙ্খচিল, তোতা, সবুজ ঘুঘু, হরিয়াল প্রভৃতিও।

টিকিট মূল্য ২০টাকা।

চিড়িয়াখানাটি বর্তমানে পরিচালনা করেন সিতেশ রঞ্জন দেবের ছেলে সজল দেব। এ চিড়িয়াখানায় ঢুকতে ২০ টাকার টিকিট কিনতে হয়। প্রবেশ পথের সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে বন্যপ্রাণী সেবা কেন্দ্র (চিড়িয়াখানা)।

খাঁচা থেকে বের হবার জন্য ছটফট করছে এই ভাল্লুক।

টিকিট কিনে সোজা ভেতরে প্রবেশ করি। মাথার মধ্যে সাদা বাঘের ছবি ঘুরছিল। শুনেছি, পৃথিবীতে সাদা বাঘ আছে গুটি কয়েক। তার মধ্যে একটি সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায় আছে। এ বাঘটি প্রায় আড়াই ফুট দীর্ঘ আর উচ্চতায় প্রায় দেড় ফুট। হিংস্র প্রকৃতির এ বাঘটি মাংস খায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো বাঘটির চোখ ক্ষণে ক্ষণে বদলায়: কখনও হলুদ, কখনও সাদা, কখনও লাল হয়ে ওঠে চোখের রং। তাই চিড়িয়াখানায় ঢুকে প্রথমেই আমার চোখ দুটো খুঁজছিল সাদা বাঘকে। কিন্তু দেখতে না পেয়ে দায়িত্বরত যারা ছিল তাদের কাছে জানতে চাই কিন্তু তারও সাদা বাঘ সম্পর্কে কিছু বলতে পারলেন না।

বিলুপ্ত প্রায় ধনেশ পাখি; ছবি- সাইমুন ইসলাম

বিলুপ্ত প্রায় সাদা বাঘকে দেখতে না পেয়ে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এরপর একে একে দেখতে থাকলাম সব। সজারুর কথা মার মুখ শুনেছি। সারা গায়ে কাঁটা যুক্ত প্রাণী দেখে আবার উৎসাহিত হলাম। এই প্রাণী সচরাচর চোখে দেখা যায় না। আগে মাঠে ঘাটে নাকি ধনেশ পাখির দেখা পাওয়া যেত। এখন এই প্রাণী প্রায় নেই বললে চলে। প্রথমবার ধনেশ পাখি দেখেছিলাম যোগী হাফং যাওয়ার পথে। বেশ লম্বা ঠোঁট। সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায় দেখি সেই ধনেশকে।

অজগর সাপ ; ছবি- সাইমুন ইসলাম

পায়ে পায়ে পুরো চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখে ফেলি। অন্যদিকে সাইমুন তার ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক করেই চলেছে। তবে একটা জিনিস লক্ষণীয় যে অন্যান্য চিড়িয়াখানা থেকে এটি বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ছোট এই শহরে সমৃদ্ধ এবং বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীর সংরক্ষণ দেখে বেশ মুগ্ধ হয়েছি।

সময়ের স্রোতে এবং কালের বিবর্তনে অনেক প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে দেখানোর জন্য হলেও এই সকল বিলুপ্ত প্রায় প্রাণী সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা জরুরী।

চিতা বিড়াল; ছবি- সাইমুন ইসলাম

যাওয়া-আসা:

ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলের সরাসরি বাস রয়েছে। সারাদিনই কিছুক্ষণ পর পর বাস ছাড়ে। যেতে পারবেন রাতেও। চাইলে ট্রেনে করেও যেতে পারবেন। তবে রাতে গেলে আগেই হোটেল বুক করে রাখবেন। কারণ শেষ রাতের দিকে পৌঁছে যাবেন শ্রীমঙ্গলে। শ্রীমঙ্গল থেকে অটোরিকশায় যেতে পারবেন সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায়।

অবশ্যই মনে রাখবেন
*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

*** ফিচার ইমেজ- সাইমুন ইসলাম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কোনো এক সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখার লোভে বাঁশবাড়িয়া সৈকতে

গোমুখ অভিযান: গোমুখের পথে ট্রেক শুরু