স্বপ্নের টুমলিং: সান্দাকফুর পথে

স্বপ্নের সান্দাকফু ট্রেকে যাত্রা শুরু করার আগেই মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম কোনো কারণে যদি সান্দাকফুর চূড়া বা কাছাকাছি যেতে না পারি, তাহলে অনেক দিনের স্বপ্নের, কল্পনার আর রঙিন টুমলিংয়ে শুয়ে, বসে, হেঁটে বা গড়িয়ে দুই একটি দিন কাটিয়েই নাহয় ফিরে আসবো এবারের মতো। পরে অন্য কোনো একদিন নাহয় আবার যাওয়া যাবে। সেই ভাবনা নিয়েই পথ চলার শুরু করেছিলাম স্বপ্নের সান্দাকফুর পথে যেতে প্রিয় টুমলিংয়ের পথে। পুরোটা না হোক, স্বপ্নের কিছুটা তো অন্তত পূরণ হোক, তাতেই আমি খুশি।
টুমলিং, কী সুন্দর মিষ্টি-আদুরে আর আহ্লাদি একটা নাম! অন্তত আমার কাছে তো তাই-ই। প্রথম যখন এই নামটার কথা শুনি, ভেবেছিলাম কোনো পাখির বা পাহাড়ি ফুলের নাম। আর এই নামটা প্রথম শুনি মাহমুদ ভাইয়ের সান্দাকফু অভিযানে। পরে পড়তে গিয়ে জানলাম এটা একটা পাহাড়ি পাড়া বা গ্রামের নাম।

স্বপ্নের টুমলিং। media-cdn.tripadvisor.com

কিন্তু প্রথম কাউকে দেখে যেভাবে ভালো লাগা, ভালোবাসা বা প্রেমে পড়া যায়, ঠিক তেমনি প্রথমবার এই নামটি শুনেই ভালো লেগেছিল খুব। আর একটা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল একদিন এই পাহাড়ি পাড়া বা গ্রামে যাবো, হাঁটব-বসব কিছুটা সময় কাটাব একান্তে। অনেকটা না দেখে, নাম শুনেই প্রেমে পড়ার মতো!
লেখা পড়ে প্রথম ভেবেছিলাম একদম পাহাড়ের আড়ালে, গাছে-গাছে, সবুজ অরণ্যে আচ্ছাদিত একটি জায়গা হবে। মানসপটে তেমনই একটি ছবি আঁকা হয়েছিল টুমলিংয়ের। আর তাই যখন টংলু থেকে টুমলিংয়ের পথে পাহাড়ের রিজ লাইনের উপরে বিছানো পাথরের পথ ধরে যাচ্ছিলাম, এক পাশে খাড়া পাহাড়, এক পাশে গভীর পাহাড়ি খাদের কিনার ধরে, যার ওপাশে আবার রয়েছে বড়-বড় আরো পাহাড়, আরো দূরে হিমালয়ের পাহাড় সারি। মনে মনে খানিকটা রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম কল্পনায় আঁকা টুমলিংয়ের ছবিটার কথা ভেবে। এখান থেকে টুমলিং মাত্র এক থেকে দেড় কিলো।
মেঘ-কুয়াশার টুমলিং। ছবিঃ c1.staticflickr.com

একটু একটু করে এগোচ্ছি, আর একটু একটু করে শিহরিত হচ্ছিলাম টুমলিংকে দেখতে পাবো বলে। আর সেই রোমাঞ্চ আরও বেড়ে গিয়েছিল যখন আমাদের নেপালি বন্ধু জানালো আজ আমরা টুমলিংয়েই রাত্রি যাপন করবো। এটা ভাবতেই পারিনি। শুধু যেখানে টুমলিংয়ে কিছু সময় কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলাম, দেখানে একটি দুপুর থেকে বিকেল, সন্ধ্যা এমনকি রাতেও থাকা হবে ভাবিনি। তাই পাহাড়ে ৪ ঘণ্টা হাঁটার ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে গিয়েছিল সেই আকস্মিক আনন্দে।
একটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠতেই দূরে দেখা গেল, সেই কল্পনার জাল বোনা টুমলিংয়ের পাহাড়ি পাড়া বা গ্রাম। ওই যে চোখের সামনেই। তবে নামতে হবে এই পাহাড় থেকে, যেতে হবে দুই পাহাড়ের একবারে কোলের মধ্যে। হ্যাঁ আসলেই তাই টুমলিংটা ঠিক কোনো পাহাড়ের চূড়া নয়, নয় কোনো পাহাড়ের পিঠ বা পাদদেশ, এটি ঠিক দুই পাহাড়ের মিলন ঘটিয়েছে! যার নিচে নেমে গেছে বেশ কয়েকটি পাহাড়। আর কাছে-দূরে পাহাড়ের সিঁড়ি সারি সারি, সে তো আছেই অপলক চেয়ে ওই টুমলিংয়ের দিকে। যেন অনেক পাহাড় মিলে দিচ্ছে পাহারা, প্রিয় টুমলিংয়ের রঙিন ফুল আর বর্ণিল ঘর-বাড়িগুলোকে।
মেঘময় টুমলিং। ছবিঃ মাহমুদ ফারুক

পাথরের পথ ধরে ধীরে ধীরে, ছবি তুলতে তুলতে নেমে পড়লাম পাহাড়ের কোলে, টুমলিংয়ে। গিয়েই চারদিকের পাহাড়ের দিকে দৃষ্টি দিলাম। এখানে পাহাড়ের আচরণ এমন যেন, পিছনে ফেলে আসা পাহাড়ের চূড়া আপনাকে বিদায় জানাবে ওর মেঘ আর কুয়াশা দিয়ে, আর সামনের পাহাড়গুলো আপনাকে স্বাগত জানাবে একটুখানি রোদের মিষ্টি হাসি দিয়ে। আর সাথে দেবে খানিক দমকা হাওয়া, আপনাকে মেঘে মেঘে ভাসিয়ে নিতে। ফুলেরা দেবে তাদের নানা রঙ ঢেলে আপনার ক্লান্তি দূর করে সতেজ করে দিতে! সত্যিই কী তাই? গিয়েই দেখুন না।
টুমলিং পৌঁছেই একটি থাকার জায়গা ঠিক করে, সেখানে ব্যাগ রেখে, বেরিয়ে এলাম এক দৌড়ে, রুমে বসে থাকার প্রশ্নই নেই। সে বাতাস আর ঠাণ্ডা যতই হোক। এরপর টুমলিংয়ের কোলে দুলে দুলে, দোল খেয়ে, চুমুক দিলাম ধোঁয়া ওঠা কফিতে। আহ, টুমলিংয়ের মেঘ, ঘিরে ধরা কুয়াশা, ধোঁয়া ওঠা কফি আর চোখ, মন-প্রাণ জড়ানো সবুজ পাহাড়ের হাতছানি। যেন কোনো এক স্বর্গের সীমানায় বসে আছি, তুমি-আমি আর আমি-তুমি।
টুমলিংয়ের পথে। ছবিঃ farm2.staticflickr.com

যেখান থেকে পা নড়ে না, পা নড়লে, প্রাণ সরে না আর প্রাণ সরলেও মন নড়ে না। এক অদ্ভুত মায়া, আর আবেগের আচ্ছন্নতায় ঘিরে ধরা স্বপ্ন আর কল্পনার বাস্তবে এসে পাশে বসে, কাঁধে হাত রেখে, আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে, শিহরিত করে যাওয়া।

যেভাবে যাওয়া যায়:

সান্দাকফু না গিয়েও শুধু টুমলিংও যাওয়া যেতে পারে দুই একদিন চুপচাপ পাহাড়ের বিশালতা উপভোগ করতে। টুমলিং যেতে চাইলে দু’ভাবে যাওয়া যেতে পারে। এক, শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি জীপে মিরিক হয়ে মানেভাঞ্জন। মানেভাঞ্জন থেকে পাসপোর্ট এন্ট্রি করিয়ে, সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কের টিকেট কেটে, গাইড বা জীপ নিয়ে টুমলিং চলে যাওয়া যাবে। ট্রেক করে গেলে ৬-৮ ঘণ্টা আর জীপে গেলে ১-২ ঘণ্টা। তবে মনে রাখতে হবে শিলিগুড়ি থেকে প্রতিদিন একটা শেয়ার জীপ ছাড়ে মানেভাঞ্জনের উদ্দ্যেশ্যে।
এছাড়া শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং, আর দার্জিলিং থেকেও মানেভাঞ্জন যাওয়া যায় লোকাল শেয়ার জীপে। টুমলিংয়ে থাকার জন্য আছে ট্রেকারদের জন্য লজ আর হোমস্টে। মোটামুটি ৫০০-৭০০ টাকার মধ্যে একজনের একদিনের থাকা-খাওয়া হয়ে যাবে নিশ্চিন্তে।
ফিচার ইমেজ- bigmountainadventure.asia

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
  1. শিলিগুড়ির কোথা থেকে শেয়ারের গাড়ি ছাড়ে কখন?

    • জংশন যেখান থেকে জীপ ছাড়ে। জিজ্ঞাসা করলেই যে কেউ দেখিয়ে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

E T B এর ইভেন্ট: মহামায়ায় কায়াকিং এবং বোয়ালিয়া ট্রেইলে ঝর্ণাভিযান

টংলু ভ্যালীর প্রেমে: সান্দাকফুর পথে