বান্দরবানের গোলাপি গোধূলি, রুপালী রাত ও সোনালী সকালের গল্প

২০১৪ সালের একদম শেষ। সদ্য এমবিএ শেষ করার ফলাফল পেয়েছি। অফিসও বেশ কিছুদিন বন্ধ আছে। এই ছুটি আর ব্যস্ততাহীন অবসরে কোথাও না কোথাও যেতে হবে। তাই ঠিক করলাম, কেওক্রাডং যাবো। বান্দরবান বেশ কয়েকবার যাওয়া হলেও, কীভাবে কীভাবে যেন কেওক্রাডংয়ে যাওয়া হয়ে ওঠেনি একটি বারও। যে কারণে ঠিক করলাম এবার তবে কেওক্রাডংয়ের চূড়াতেই উপভোগ করা হোক বছরের শেষ সূর্যাস্ত আর আসছে বছরের প্রথম সূর্যোদয়।
সেভাবেই ঢাকা থেকে এক রাতে বাসে উঠে বসা হলো একা একাই। যদিও বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে আর একজন পরিচিত এবং বাসের ভেতরে প্রায় একই গন্ত্যব্যের আরও কয়েকজনের সাথে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম। পরদিন সকালে যথাসময়ে বাস বান্দরবান পৌঁছে গিয়েছিল। সবাই মিলে রুমা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সকালের নাস্তা শেষ করে হেলেদুলে রুমার বাসে উঠে বসলাম। তখন সকাল ৯টা। বেলা ১১টার কিছু পরে রুমা বাজারের এপারে বাস নামিয়ে দিল। নৌকা করে সাঙ্গু পেরিয়ে রুমা বাজারে পৌঁছালাম।

বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

আর্মির অনুমোদন, চাঁদের গাড়ি ঠিক করা, গাইড নিয়ে বগালেকের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হতে ১২টা পেরিয়ে গেছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উত্তাল ঢেউ খেলানো রাস্তার রোমাঞ্চ পেরিয়ে বগা লেকে পৌঁছালাম ঠিক মধ্য দুপুরের দিকে। বগালেকে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে প্রায় এক ঘণ্টার বিশ্রাম শেষে যখন কেওক্রাডংয়ের দিকে ট্রেক শুরু করলাম তখন দিনের সূর্য হেলে পড়তে শুরু করেছে। বগালেকের সবুজ পানি তখন কালচে রঙ ধারণ করেছে, শেষ দুপুরের দমকা বাতাস হুহু করে পাহাড়ে পাহাড়ে, গাছে গাছে ছুটে ছুটে শীতের আগমনের সাথে সন্ধ্যাকে স্বাগতম জানাতে শুরু করেছে।
চিংড়ি ঝর্ণা পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা। তার মানে কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় আর বছরের শেষ সূর্যাস্ত উপভোগ করা হলো না। সূর্য অস্ত গেলে পথ চলতে অসুবিধা হবে ভেবে বেশ দ্রুত পা চালাতে শুরু করলাম। সূর্য যখন অস্ত যাবে যাবে করছে, পাহাড়ের আড়ালে নিজেকে নিমজ্জিত করছে তখন দার্জিলিং পাড়া থেকে বেশ কিছুটা দূরে। সন্ধ্যা যেহেতু হয়েই গিয়েছে, সেহেতু বেশ সময় নিয়ে, পাহাড়ের কোলে ঢলে পড়া লাল টকটকে সূর্যের অস্ত যাওয়া উপভোগ করেছিলাম পাহাড়ের পিঠে বসে, গাছের সাথে হেলান দিয়ে।
দূরে সবুজ পাহাড়ের আড়ালে টকটকে লাল সূর্য ছোট থেকে বড় আকার ধারণ করছিল। সবুজ পাহাড়ের গাছে গাছে টুকরো মেঘেদের ওড়াউড়ি, দূরের কোনো পাহাড়ি পাড়ায় আগুনের উত্তাপ ছড়ানো ধোঁয়া ওঠার সংকেত, স্বচ্ছ আকাশে সন্ধ্যা তারার উপস্থিতি, মধ্য আকাশে খণ্ড চাঁদের হাসি। ধীরে ধীরে সূর্য পাহাড়ের আড়ালে চলে যাচ্ছে একটু একটু করে। বেশ লাগছিল দেখতে। সবুজ পাহাড়ের সাদা মেঘ, কালো গাছ আর ধুসর ধোঁয়ার খেলা, পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যের বসে থাকা, খণ্ড চাঁদের বাঁকা হাসি, সন্ধ্যা তারার লুকোচুরি, গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে।
বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

পাহাড়ের সূর্যাস্ত বেশিক্ষণ উপভোগ করা হলো না। দেরি হয়ে যাচ্ছে, রাতের অন্ধকার নামবে একটু পরেই, পৌঁছাতে হবে কেওক্রাডংয়ে। আবারো কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করতে বাধ্য হলাম। বেশ দ্রুত পা চালাতে বাধ্য হলাম শেষ ডিসেম্বরের, পাহাড়ি শীতের আক্রমণ থেকে বাঁচতে। যদিও কেওক্রাডং পৌঁছাতে আরও প্রায় দুই ঘণ্টা লেগেছিল। ভীষণ ঠাণ্ডার কারণে চূড়ায় উঠেও বেশিক্ষণ থাকা হয়নি, সবাই যার যার মতো খেয়ে ঘুমোতে চলে যাওয়ার জন্য।
অনেক রাতে একবার ঘুম ভেঙে গেল, বাইরে শো শো শব্দের তোড়ে ঘুম ভেঙে গেল। বেশ কিছুটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম বাইরে ভীষণ ঝড় উঠেছে ভেবে। কারণ পাহাড়ের চূড়ায় টিনের ঘরটা তখন রীতিমত কাঁপছে, নড়ছে আর মাঝে মাঝেই দোলা দিয়ে যাচ্ছে! যেন বাইরে সাইক্লোন উঠেছে! কিন্তু শেষ ডিসেম্বরের এই শীতে তো এমন ঝড় ওঠার কথা নয়, তাহলে?
খুব কষ্টে, কিছুটা আতংক নিয়ে লেপের তলা থেকে মুখ বের করতেই হা হয়ে গেলাম, ঘরের ভেতরের রূপ দেখে, কারণ এত রাতে অন্ধকারের পরিবর্তে ঘর ভর্তি পূর্ণিমার আলোয় আলোকিত! টিনের ও বাসের বেড়ার যেখানে যতটুকু ফাঁকা পেয়েছে, চাঁদের আলো তার সব সবটুকু ভেদ করে অন্ধকার ঘরে একটা অপার্থিব আলো আঁধারির, একটা মায়াময় জগত তৈরি করে রেখেছে! এমন অসম্ভব সুখের রাত এই জীবনে তখন পর্যন্ত আর আসেনি। পুরো ঘরে জ্যোৎস্নার অন্য রকম এক সুখের খেলা চলছিল। এমন অপার্থিব রাতের রূপ দেখতে একটু বাইরে বের হতে খুব ইচ্ছা করছিল, কিন্তু কিছুটা ভয় আর শঙ্কা ঘিরে রাখাতে সাথে সাথে বের হতে পারিনি।
বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

তবে এমন জ্যোৎস্না আর তার রূপের আকর্ষণে বেশিক্ষণ বিছানায়ও থাকতে পারিনি। ঝড়ো বাতাসের ভয় উপেক্ষা করেই যা যা গরম কাপড় ছিল সব পরে বাইরে বের হলাম। ভাগ্যিস বেরিয়েছিলাম, নইলে অনন্তকাল এমন পাহাড়ের চূড়ায় প্রথমবারের মতো সাদা সমুদ্র দেখা থেকে বঞ্চিত থেকে যেতাম! বাইরে বেরিয়ে একটু পাহাড়ের কিনারায় যেতেই ভয়, শঙ্কা সব নিমেষেই উধাও হয়ে গেল পাহাড়ের মাঝে এক বিশাল সাদা ধোঁয়া ওঠা নদী দেখে! এখানে যে এত বড় কোনো নদী আছে পাহাড়ের খাঁজে সেটা তো জানতাম না।
অনেকক্ষণ বসে বসে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে বয়ে যাওয়া ধোঁয়া ওঠা নদীতে রুপালী চাঁদের আলোর বিচ্ছুরণ দেখছিলাম, দেখছিলাম পাহাড়ের গাছের ফাঁকে ফাঁকে জোনাকির জ্বেলে যাওয়া নীল আলোর রোশনাই, আকাশে লক্ষ তারার মিটমিট জ্বলে থাকা, স্বচ্ছ আকাশের কোথাও কোথাও মেঘেদের চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা, আবার কোথাও মেঘেদের দল বেঁধে ছুটে যাওয়া। এক সময় শীত, বাতাস আর একাকি থাকাটা আর বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে দিল না। তাই বাধ্য হয়েই উঠে পড়লাম। বিছানায় গিয়ে আর ঘুম আসে না। কখন সকাল হবে সেই প্রতীক্ষায়।
কোনোভাবেই আগামী সকালের সোনালী রোদ, ঘাসে জমে থাকা শিশির বিন্দু, পাহাড়ের গায়ে গায়ে জড়িয়ে থাকা সাদা মেঘ, কুয়াশার আলিঙ্গন, প্রথম সূর্যের উষ্ণ পরশ কিছুতেই মিস করতে চাই না। কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ঠিক ঠিক মোরগ ডাকার সাথে সাথে ঘুম ভেঙে গেল। পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরে বেরিয়ে পড়লাম। কেওক্রাডংয়ের উপরে প্রথম সূর্যোদয় দেখার জন্য।
বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

আহ কী ছিল সেই সকালটা, কোথায় তাকাবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পূব আকাশে আলো ফোটার অপেক্ষায় পাহাড়দের অধীর আগ্রহ, পাহাড়ে পাহাড়ে মেঘেদের জড়াজড়ি, কুয়াশার মাখামাখি, আকাশে আকশে কত যে রঙের খেলা, যতদূর চোখে যায় শুধু পাহাড়ের উঁচু-নিচু প্রান্তর। একপাশে পাহাড়ের ঝোপঝাড়, পাখিদের কিচিরমিচির, পাহাড়ি মোরগের ডেকে যাওয়া, অন্যপাশে মেঘেদের সমুদ্র! রাতে সেটাকে নদী ভেবেছিলাম, সকালে জানলাম ওটা আসলে নদী নয়, দুই পাশের পাহাড়রাজীর মাঝে অনেক বড় একটা ফাঁকা জায়গা থাকায় বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা জুড়ে মেঘ জমে নদীর মতো লাগে। শুধু আমি নই অনেকেই নাকি ওই মেঘের জমে থাকাকে নদী বলে ভুল করে!
চারদিকের পাহাড়ে পাহাড়ে মেঘ আর কুয়াশার অবিচ্ছেদ আলিঙ্গন। পাহাড়ের চূড়ায় সবুজ ঘাসে ঘাসে জমে থাকা শিশিরের কণা। কোথাও লজ্জাবতীর লাজুক হাসি, শিশির ঝরে পড়তেই শরমে ঘোমটার আড়ালে মুখ লুকানো! এসব দেখতে দেখতেই সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করলো আকাশ জুড়ে। ধুসর আকাশ জুড়ে তখন রঙ-বেরঙের খেলা। সূর্যের আলো পড়াতে পুরো কেওক্রাডং জুড়ে যেন এক সোনালী সকালের আবির্ভাব ঘটলো। চারদিকে সোনা ছড়ানো রোদের হাসি, গাছের পাতায় সোনালী রোদের ঝিলিক, ঘাসের শিশিরে সোনালি রোদের আভা। চারদিকে যেন সোনায় মোড়ানো একটা সকাল। যেদিকেই তাকাই সব জায়গায় যেন সোনা ছড়ানো রোদ্দুরের আহ্বান, আকর্ষণ আর আরাম।
গোলাপি গোধূলি, রুপালী রাত আর সোনালি সকালের অপার্থিবতা।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভালুকা থেকে মুক্তাগাছা হয়ে গৌরীপুর: একদিনে ময়মনসিংহ ভ্রমণের আদ্যন্ত

রোজ গার্ডেন প্যালেসের সৌন্দর্য ছুঁয়ে দেখা