বিয়াসের মনমাতানো আহ্বানে

মানালির সকাল। না খেয়েই জীপে করে চলতে শুরু করেছিলাম সোলাং ভ্যালীর উদ্দেশ্যে। কিন্তু একটু পরেই ক্ষুধা জেঁকে বসলো, জীপে ওঠা মাত্রই। বরফের প্রেমে মশগুল ছিলাম বিধায় ক্ষুধা অনুভূত হয়নি সেই ভোর থেকেই। কিছুদূর গিয়েই মানালির লোকাল একটি ছাপরা ধরনের হোটেলে সকালের খাবার খেতে ঢুকলাম। কিন্তু দারুণ খেলাম সবকিছু মিলিয়ে। আলু পরাটা, ডিম আর ঘন দুধের জিভে স্বাদ জড়িয়ে থাকা চা।

আবার জীপে উঠে সোলাংয়ের দিকে গেলাম। লোহার ব্রিজ পেরিয়ে উঠে যাব, এমন সময় চোখ গেল, রূপে ভরপুর,  কিঞ্চিৎ কপোল, ক্ষণিকের এক চোখের দৃষ্টি মেলা, বাতাসের এলো চুল, এক হাতের ইশারায়, অর্ধ-ঘোমটার আড়াল থেকে আহ্বান করা গাঁয়ের মিষ্টি মেয়ের মতো বিয়াসের দিকে।

কারণ বিয়াস তখন পূর্ণ রূপে নয়। শীতের জমে যাওয়া জল আর ক্ষীণ, ধীর লয়ে গড়িয়ে আসা মৃদু স্রোতে বিয়াসের আহ্বান, যা উপেক্ষা করা কঠিনই নয়, অসম্ভবও বটে। ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলে নেমে পড়লাম। ছোট-বড়-মাঝারি পাথর ধরে নেমে যাচ্ছি বিয়াসের বুকে, অমোঘ আকর্ষণে, পূর্ণতার আগের মুহূর্তের সুখের খোঁজে।

পাথরের খাঁজে-খাঁজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আঁচলা পানির আধারগুলো জমে নরম তুলতুলে বরফ হয়ে যাওয়া। হাত দিলেই হাত ডুবে যায়! হাতের তালুতে নিলেই লাজে গলে-গলে, ঝরে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা, টুপটাপ।

চলার পথে বহমান বিয়াস। ছবিঃ googleapis.com

হাত ভিজে থেকে যায় শুধু সুখের ভেজা-ভেজা রেশ। মুছতে মন চায় না! থাক না ভেজাই, সুখের পরশ হয়ে, গালে ছোঁয়াই, সেই হিম শীতল ঠাণ্ডা হাত। উহ, একটা সুখের শিহরণ জাগে সারা শরীর জুড়ে। ইশ, উঠে যেতে মন চায় না।

একটু সামনেই, কয়েকটি পাথর পেরুলেই জমে না যাওয়া জল। ধীরে-ধীরে ঐ উঁচু পাহাড়দের জড়িয়ে ধরা বরফ। রোদের কিরণ মেখে কিছুটা উষ্ণতা পেয়ে চুঁইয়ে-চুঁইয়ে নেমে এলো এই দুই পাহাড়ের মাঝে।

বরফ জমা শুভ্র বিয়াস। ছবিঃ indiamike.com

অসংখ্য ছোট-বড়-মাঝারি পাথরের ভাজ-খাঁজ আর মাঝে মৃদু জলের, শান্ত আর স্থির বয়ে চলার কুলকুল কলরব। নিয়ে নিলাম এক আজলা পানি। ছিটিয়ে দিলাম চোখে-মুখে-গলায়! যদিও ভীষণ ঠাণ্ডা, হিম-হিম; তবুও এই সুখ, এই আনন্দ, এই আকুলতা, এই আবেগ, এই আকর্ষণ, এই আহ্বান পাব কোথায়? কার কাছ থেকে? আবার কবে? কীভাবে? কেন? তাই এই ইচ্ছাকৃত কালক্ষেপণ। সেই হিম শীতল সুখের ভেজা পরশ মেখে উঠে এলাম অবশেষে। আবার চলছি সোলাং ভ্যালীর দিকে।

বিয়াসের সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল মানডিতে। যেখানে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম শেষ দুপুরে। একদম ঠিক বিয়াসের সাথে লাগোয়া এক সবুজ পাহাড়ের বেলকনিতে বসে। কিন্তু তখন ওকে এভাবে চোখে পড়েনি মানালি যেতে বেশি রাত হয়ে যেতে পারে সেই শঙ্কাতে। এরপর আবার তার সাথে দেখা হয়েছিল কুল্লু গিয়ে। সেখানে যখন পৌঁছাই তখন ভর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। চারদিকের পাহাড় থেকে অন্ধকারেরা নেমে এসেছিল কুল্লু আর বিয়াসের বুকে। তাই সেভাবে আর দেখা হয়ে ওঠেনি তখন। তবে যেখানেই ওকে দেখা গেছে নানা রকম সুরে তার বয়ে চলার ছন্দ, সুর আর সঙ্গীতে আমাদের ঠিকই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

বিয়াসের পাগল করা রূপ। mapsofindia.com

এসব ভাবছিলাম এক পাথরে বসে। সবার তাড়া খেয়ে জীপে এসে বসলাম। জীপ চলছে, হেলে-দুলে। যেন মৃদু ঢেউয়ের মাঝে পাল তুলে! রাস্তার এমনই বাঁক, পাহাড়ের পিঠ ধরে-ধরে। এবার পাহাড়ের ভিন্ন রূপ। নেই গাছ-ঘাস-জঙ্গল-সবুজ বন বা বনানীর কোনো কিছু। তার পরিবর্তে আছে পাথর-কংক্রিট-কয়লার মতো কালো-কালো নিরেট কিন্তু তবুও আকর্ষণের কমতি নেই এতটুকু।

আর যাই হোক পাহাড় তো? পাহাড় প্রেমী মানেই ভালো লাগবে, সে যেমনই হোক। ওই যাকে ভালো লাগে, তারও সবই তো ভালো লাগে, তাইনা? তার মন্দ বা খারাপ বা অসুন্দর, তাও চোখে পড়ে না, গায়ে লাগে না, মাথায় আসে না, ঠিক সেই রকম।

অনেক নিচে, গভীরে, বাম পাশে বয়ে চলা বিয়াস। জলের বয়ে যাওয়া ঝংকার বিয়াসের ওপারে অবারিত আপেল বাগান, ফুল-ফল বা পত্রহীন। শুধু সাদা-সাদা তুষারের আবরণে ঢাকা বস্ত্রহীন লজ্জা! মাঝে মাঝে এক বা দুইতলা স্বপ্ন কুটির। বিয়াসের কোল ঘেঁষে, বরফের বুক জুড়ে, পাহাড়ের শরীর জড়িয়ে।

বিয়াসের তীরে আপেলের অরণ্য! ছবিঃ imgcld.yatra.com

চারদিক সাদায় সাদায় সত্যিকারের শুভ্রতায় মোড়া। দিগন্ত বিস্তৃত আপেল গাছের তামাটে শরীর। বাগানের মাঝে-মাঝে রঙ-বেরঙের স্বপ্নময় স্বপ্নিল কুটির। যতদূর চোখ যায় পাহাড়ের অসম্ভব আহ্বান আর গা ছুঁয়ে বয়ে চলা বিয়াসের আকুলতা। কোনটা নেবেন? কোনটা ছাড়বেন? কোনটা দেখবেন? কতগুলো ছবি তুলবেন?

অসম্ভব অসম্ভব, এড়ানো এই সম্মোহিত সম্ভাষণ। হারিয়েই যাবেন নিজের মাঝে, নিজের কাছে নিজেই। সুখের আবেশে, সব-সব-সব ভুলে, ব্যথা-বেদনা-না পাওয়া- সব কিছুই।

রাস্তা এবার দুই দিকে যাবে। ডানে উপরের দিকে রোথাং পাস আর একটু নেমে আবার উপরের দিকে সোলাং ভ্যালী। কিছু এগিয়ে থামতে হবে, কারণ সামনে সুখের ঠিকানায় যাওয়ার আগের কিছু বিশেষ প্রস্তুতি নেবার জন্য। মানে আইস স্কেটিংয়ের কাপড় আর অন্যান্য সরঞ্জাম ভাড়া নিতে হবে।

বাধ্যতামূলক নয় যদিও কিন্তু প্রথম বেলায় তাই মনে হবে। তো নিয়ে নিলাম যা যা দরকার।এই মুহূর্তের সেরা রোমাঞ্চ ছিল, আইস স্কেটিংয়ের সরঞ্জামগুলো। এতদিন শুধু সিনেমায়ই দেখেছি, এই প্রথম হাত দিয়ে, ছুঁয়ে ছুঁয়েই স্কেটিংয়ের রোমাঞ্চ অনুভব করেছি।

পাথরে জলে মিতালী। ছবিঃ jdmagicbox.com

ইশ, আর কতক্ষণ? আরো একটু এগোতেই গাড়ির সারি, অসংখ্য গাড়ি দাঁড়ানো, একটি ছোট লোহার ব্রিজ পেরুবে বলে। আবার বিয়াসের হাহাকার তোলা বুকের উপর দিয়ে, অন্য পারে যাওয়া, আবারো আহ্বান, কাছে যাওয়ার, পাশে বসার, ছুঁয়ে দেখার, হাতে হাত রেখে সময় কাটানোর, নিমগ্ন হবার।

ওর রূপের জাদুতে, জলে, নুড়িতে, পাথরে, পাহাড়ে, জমে থাকা তুষারে, আপেল গাছের ঝুলে থাকা জমাট বরফে, পাইনের পাতায়-পাতায় মেখে থাকা শুভ্রতায়, নীল আকাশ পানে তাকিয়ে থাকার প্রশান্তিতে, জল ছিটিয়ে খেলা করার কিশোরতায়, দূরের পাহাড় দেখার একাত্মতায়।

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
    • যাওয়া যাবে যে কোন সময়ে। তবে এমন বরফ আর বরফ গলা নদী পেতে চাইলে শেষ ডিসেম্বর বা জানুয়ারি ভালো। ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে দিল্লী। দিল্লী থেকে দিল্লী থেকে বাস বা জীপে মানালি। খরচ ২০ হাজারের মত লাগবে একটু ভালো ভাবে যাওয়া আসা আর থাকা খাওয়া করলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাজেক: মেঘের রাজ্যে Traveler's Cafe -র সাথে

ঢাকার প্রাণ, বুড়িগঙ্গায় ভ্রমণ