বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্গাপূজার সন্ধানে

দুর্গাপূজা- হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান। পাঁচদিন ব্যাপী এই মাতৃ আরাধনা শুরু হয় আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠীতে। চলে পাঁচদিন পর্যন্ত তারপর দশমীর দিনে মায়ের পূজা সমাপ্ত হয় যা বিজয় দশমী নামে আখ্যায়িত। পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায়, রামচন্দ্র লঙ্কারাজ রাবণের সাথে যুদ্ধের সময় দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। দুর্গাপূজা বাংলাদেশ সহ ভারত, নেপাল ছাড়াও বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে পালিত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে বেশ ধুমধাম করেই দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ঢাকেশ্বরী মন্দির, রামকৃষ্ণ মঠের পূজাও খুব আড়ম্বরের সাথে হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক বছরে বাগেরহাটের শিকদার বাড়ির দুর্গাপূজা সারাদেশের মনোযোগ কেড়েছে। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় পূজা আয়োজনের খেতাব ধরে রেখেছে এই শিকদার বাড়ির পূজা। সে এক এলাহি কাণ্ড।

সমস্ত পুরাণকে যেন উঠিয়ে আনা হয়েছে। এই শিকদার বাড়ির পূজাকে তুলে ধরব আজকের লেখায়। উল্লেখ্য, এই অভিজ্ঞতা ২০১৬ সালের। তবে পূজার বহর প্রতিবছর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে- সুতরাং এ লেখায় যতটুকু পাবেন, আপনি স্বচক্ষে তার চেয়ে বেশি বই কম পাবেন না।

একটি দুর্গাপূজা; চিত্রঃ অমিতাভ অরণ্য

বাগেরহাট জেলার সদর থানার খানপুর ইউনিয়নের সবুজ শ্যামলিমার পরিপূর্ণ একটি গ্রাম হাকিমপুর। এই গ্রামেরই লিটন শিকদার নামের একজন ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০১০ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে এই পূজা। আজ ছয় বছর রয়েছি খুলনা শহরে। খুলনা থেকে এক ছুটের দূরত্ব বাগেরহাট। অথচ এত কাছে থেকেও কিনা আমার দেবী দর্শন হলো না। এ দুঃখ রাখি কোথায়?

এবার তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, মায়ের আশীর্বাদ থাকলে বাগেরহাট গিয়ে তার দর্শন করেই আসব।
বন্ধুবান্ধবেরা ছুটি পেয়ে সবাই বাড়ির পানে রওনা দিয়েছে, আমি একা পড়ে রয়েছি খুলনায়। হাতে অঢেল সময়। কিন্তু পাশে কেউ নেই। নির্বান্ধব আমার চারপাশে যারা ছিল, তারা নানা কারণে রণে ভঙ্গ দিল। শেষমেশ উদীয়মান লেখক আর্য মিঠুনদাকে পাকড়াও করলাম।

দুজনেই শিকদার বাড়ি যাব বলে ঠিক হলো। কিন্তু কবে গেলে ভালো হবে? লেখক সাহেব বুদ্ধি দিলেন, অষ্টমীর দিন সবচেয়ে লোকসমাগম হবে। আনন্দ, হৈ হুল্লোড়ও বেশি হবে।

আমি চট করে বলে বসলাম, তাহলে ওদিন বাদে যেতে হবে। সবচেয়ে ভালো হবে ষষ্ঠীর দিন গেলে। লেখক সাহেব আশ্চর্য হয়ে বললেন, কিন্তু কেন? আমি উত্তর দিলাম, কারণ আমরা জাঁকজমক নয়, দেবী দর্শন করতে যাব। সুতরাং ভিড় যত কম হয় তত ভালো।

রূপসা নদী ও রূপসা ব্রিজ; চিত্রঃ অমিতাভ অরণ্য

যেই কথা সেই কাজ। ষষ্ঠীর দিনে সকাল বেলা রূপসা ঘাট পার হয়ে গিয়ে যাত্রাপুরের বাস ধরলাম। তারপর পথে নেমে হাকিম পুরের শিকদার বাড়ির ভ্যানে উঠলাম। দূর থেকেই গাড়িঘোড়ার বহর দেখে বুঝতে পারলাম আমরা শিকদার বাড়ির চৌহদ্দিতে এসে পড়েছি। ভেতরে ঢোকার আগেই ডানপাশের এক আশ্চর্য সুন্দর ভাস্কর্য মুখের রা কেড়ে নিলো।

সেখানে বিশাল এক পুকুরের মাঝে আস্ত এক পর্বত ভাসছে- পর্বতের উপর বসে আছেন মহাদেব শিব। নিচে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা। আর রামচন্দ্রের পরম ভক্ত হনুমানও আছেন সসম্মানে। পেছনে নীল আকাশের পটভূমিতে সাদা পর্বতটি যেন বরফে ঢাকা হিমালয়ের কৈলাস পর্বত। সামনের পুকুরে পড়েছে সেই পর্বতের প্রতিবিম্ব- সেখানে ভাসছে পদ্মফুল। পদ্মফুলের ফাঁকে ফাঁকে আবার চড়ে বেড়াচ্ছে শ্বেত হংস।

রাম, লক্ষ্মণ, সীতা ও হনুমান; চিত্রঃ অমিতাভ অরণ্য

সব মিলিয়ে দারুণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে হর-পার্বতীর কাহিনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিল্পী দিব্য তনু দাসের নেতৃত্বে ১০ জন আর্টিস্টের হাতের ছোঁয়ায় মনোরম রূপ পেয়েছে ৪০ ফুট উঁচু এই বিশাল আয়োজন। আমরা এগিয়ে গেলাম।

একপাশে একটি টিভি চ্যানেল লাইভ সম্প্রচারের বন্দোবস্ত করছে। গেট দিয়ে হুড়হুড় করে লোক ঢুকছে। আমরাও তাদের সাথে পা বাড়ালাম। চোখে একরাশ মুগ্ধতা। মনে কৌতূহল। না জানি আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে!

ভেতরে ঢুকতেই চোখ ছানাবড়া। পুরাণকে যেন প্রতিমাতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। দুর্গা মায়ের যে কত রূপ- এখানে এসেই জানতে পারলাম। এর পরেই রয়েছে দশাবতার- মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, কৃষ্ণ, বলরাম ও কল্কি এবং তাদের লীলা অদ্ভুত দক্ষতায় জীবন্ত করে তোলা হয়েছে মৃন্ময় মূর্তির মাঝে।

ভগবান বিষ্ণুর অনন্তশয্যা; চিত্রঃ অমিতাভ অরণ্য

আরো এগোতেই শিব পার্বতী তাদের শান্ত সৌম্য রূপে দর্শনদান করলেন। যতই এগোই ততই নানাবিধ দৃশ্য অভিভূত করে তোলে আমাদের। রাম লক্ষ্মণ এবং সুগ্রীব বাহিনীর হাতে দৈত্যরাজ রাবণের পরাজয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নিপুণ কারুকার্যে।

দেবরাজ ইন্দ্র, বরুণ-অর্যমা, সূর্যদেবের ধ্যান দেখতে দেখতে আমরা এগোই। পাঁচটা গ্যালারীর তিন আর চার নম্বর শ্রী চৈতন্যদেবের প্রেমভক্তি আন্দোলনের নানাবিধ ঘটনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাঁচ নম্বর গ্যালারী হরিচাঁদ ঠাকুরের মতুয়াবাদকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সবার শেষে মূল মণ্ডপ- অপূর্ব।

নৃসিংহ অবতার কর্তৃক হিরণ্যকশিপু বধ; চিত্রঃ অমিতাভ অরণ্য

শিকদার বাড়ি পূজা মণ্ডপের এই অনন্যসাধারণ প্রতিমাগুলো যার হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় প্রাণ পেয়েছে তিনি হলেন ভাস্কর বিজয় কৃষ্ণ বাছাড়। তার বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলার হাতিয়ার ডাঙ্গা গ্রামে। তিনি আরো ১৪ জন সহকারী নিয়ে গত পাঁচ মাস ধরে এই মণ্ডপের প্রতিমাগুলো তৈরি করেছেন। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেম-ভক্তি-আন্দোলন প্রভৃতি বিষয়কে কেন্দ্র করেই ভাস্কর্যগুলো বিকশিত হয়েছে।

রাম-রাবণের যুদ্ধ; চিত্রঃ অমিতাভ অরণ্য

শিকদার বাড়ির পূজা আরম্ভ হয় ২০১০ সালে। সেবার মোট প্রতিমার সংখ্যা ছিল ৩০১টি। গতবছর মোট প্রতিমার সংখ্যা ছিল ৪০১টি। সব মিলিয়ে এবার মোট প্রতিমার সংখ্যা ৬০১টি। এর মধ্যে যে সকল থিম গুরুত্ব পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- ক্ষীরোদ সাগরে অনন্ত শয্যায় নারায়ণের বিশ্রাম, শ্রীকৃষ্ণের পাগলা হস্তি বধ, বকাসুরের কাহিনী, কুরুক্ষেত্রে বিশ্বদেবের যুদ্ধ পরাজয়ের কাহিনী, রাহুর অমৃত নিয়ে পলায়নের সময় বিষ্ণুর চক্রে তার মাথা কর্তন, মহাদেব শিবের গরল পান, সুগ্রীব-বালির দ্বন্দ্বযুদ্ধ, রাম কর্তৃক রাবণ বধ প্রভৃতি।

মায়ের প্রতিমার সামনে আমি; চিত্রঃ আর্য্য

শিকদার বাড়ির এই পূজাতে এলাকার ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মেতে ওঠে আনন্দে। এ যেন এক মহা মিলন মেলা। শিকদার বাড়ি পূজা দেখে যখন ফিরে আসছি, তখন মনে মনে ভাবছি- এভাবে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হোক বাংলাদেশে।

কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে করে খুলনা আসবেন। খুলনার রূপসা নদীঘাট পার হলে বাস পাবেন। পুজোর সময় অনেক গাড়ি রিজার্ভ পাওয়া যায়, যা সরাসরি আপনাকে শিকদারবাড়ি নিয়ে যাবে। মায়ের পুজো সামনে আসছে। সুতরাং তৈরি হয়ে যান।
আর থাকার জন্য খুলনা কিংবা বাগেরহাটে অনেক হোটেল রয়েছে। সুতরাং চিন্তা কী?
Feature Image: Amitav Aronno

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল

পরিবারের সবার সাথে ফ্যান্টাসি কিংডমে একদিন