নেওরা ভ্যালির গহীন অরণ্যের রোমাঞ্চ

প্রকৃতি যারা ভালোবাসে, অরণ্য তাদের কাছে এক অন্যতম আকর্ষণ। আর সেই অরণ্য যদি হয় চারদিকে পাহাড় বেষ্টিত কোনো জায়গায় তবে সেই অরণ্যর রোমাঞ্চ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। নেওরা ভ্যালি ন্যাশনাল ফরেস্ট এমনই এক পাহাড়ময় ঘন অরণ্যর সমাহার। যার অবস্থান ভারতের কালিম্পং জেলায়, বিস্তার প্রায় ৮৮ কিলো জুড়ে।
কালিম্পং থেকে লাভা যেতেই একটু পরে জীপ চলতে শুরু করলো এই অরণ্যের মধ্য দিয়ে, পাহাড়ের পিঠ কেটে বানানো রাস্তা ধরে। তবে এই অরণ্যের মূল রোমাঞ্চ পেতে হলে লাভা বাজার থেকে রিশপ যেতে হবে পাহাড়ি রাস্তা আর গহীন অরণ্যের পথ ধরে। আমি সেটাই করেছিলাম।

গভীর অরণ্যে একাকী হেঁটে যাওয়া! ছবিঃ সংগ্রহ

লাভা থেকে পাহাড়ি অরণ্যের পথ ধরে রিশপের দূরত্ব মাত্র ৪ কিলোমিটার। খুব ধীরে-ধীরে হেঁটে-হেঁটে, আয়েশ করে যেতে চাইলেও সময় লাগবে ১:৩০ থেকে ২ ঘণ্টা। আমার ১:৩০ ঘণ্টা লেগেছিল মাত্র।
তবে এই মাত্র ১:৩০ থেকে ২ ঘণ্টাতেই আপনি পেতে পারেন গভীর অরণ্যের পূর্ণ রোমাঞ্চ। যেখানে আপনি একা একা হেঁটে যেতে চাইলেও পারবেন না। আপনার সঙ্গী হবে লাভার বিশ্বস্ত কুকুর! হ্যাঁ তাই-ই আমি একা একা যেতে চেয়েও পারিনি, সাথী হয়েছিল দুটি কুকুর। পুরো পথ জুড়ে আপনাকে আগলে রাখবে কুকুর বন্ধু হয়ে, যেন পথ হারিয়ে না যান, ওই অচেনা, অজানা গভীর অরণ্যে।
লাভা বাজার থেকে বাঁয়ের উঁচু রাস্তা ধরে কিছুটা এগোতেই পাইন ও নানা পুরনো গাছে ছেয়ে থাকা পাহাড়ের সারি চোখে পড়বে। আর কিছুটা এগোতেই চোখে পড়বে মাথার সিঁথির মতোো মিহি পাহাড়ি সবুজ পথ, কোথাও দুয়েকটি কাঠের সিঁড়ি সংযুক্ত, যেন বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ি পথে পিছলে না যান, প্রথম পদক্ষেপেই।
অরণ্যের মাঝে অপরূপ রাস্তা। ছবিঃ সংগ্রহ

তো এবার শুরু করুন ১:৩০ থেকে ২ ঘণ্টার দুর্দান্ত রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা। যে অভিযাত্রায় আপনি অনন্তকাল মনে রাখার মতো, গল্প করার মতো আর স্মৃতির সুখ সাগরে হারিয়ে যাবার মতো অভিজ্ঞতা। সিঁড়ি বা মিহি পথ ধরে পাহাড়ের উপরে যেতে শুরু করতেই আপনাকে পড়তে হবে পথ নিয়ে বিড়ম্বনায়! অরণ্যে যেটা আবশ্যক, সঠিক রোমাঞ্চ পেতে। একটু হাঁটার পরেই আপনার সামনে দুই-তিনটা পাহাড়ি পথের রেখা পড়বে, আপনি কোন পথে যাবেন এবার, যদি সাথে কেউ না থাকে?
হ্যাঁ, এই সময়ের সাথী হতেই কুকুর আপনাকে সহযোগিতা করবে বন্ধুর মতো। ওরা আপনাকে সঠিক পথ দেখিয়ে সামনে এগোতে সাহায্য করবে। ঘন ঘাস, বিশাল বিশাল পাইনের সারি, নানা রকম বুনো পশুপাখির ডাক, ছোট ছোট শিয়াল বা অন্য কোনো নাম না জানা পশুর হুটহাট রাস্তা পেরিয়ে যাওয়া, আপনাকে শিহরিত আর রোমাঞ্চিত করে তুলবে নিমেষেই।
অরণ্যের মাঝে চলতে পেয়ে যাবেন এমন অপার্থিব জলধারা! ছবিঃ সংগ্রহ

হাঁটতে হাঁটতে এতটাই নীরব আর নির্জনতা আপনাকে ঘিরে ধরবে, যে এক ফোঁটা শিশিরের ঝরে পড়ার শব্দও আপনাকে চমকে দেবে, কী হলো বা কী পড়লো ভেবে! এতটাই নীরব আর সুনসান চারদিক। এমনকি হঠাৎ শিউরে উঠতে পারেন গায়ের বা হাতের উন্মুক্ত অংশে পেয়ে কোনো শীতল কিছুর স্পর্শ! হতে পারে সেটা জোঁক বা অন্য কোনো প্রাণী! আমি ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিলাম, গলার কাছে ভেজা আর নরম কিছুর স্পর্শ পেয়ে! চোখ বন্ধ করে হাত দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেখি একটা বেশ বড় জোঁক আঁকড়ে ধরেছিল আমায়! যদিও সাপ ভেবে আমি ভেতরে ভেতরে মরেই গিয়েছিলাম প্রায়!
একপাশে খাড়া পাহাড়, এতটাই উঁচু যে মাথা পুরো খাড়া করে তাকাতে হয়, আর অন্যপাশে সেই উঁচু পাহাড়ের চেয়েও গভীর খাদ, যেখান থেকে একবার কোনো অসাবধানতাবশত পড়ে গেলে, আপনাকে খুঁজে পাওয়াই হবে দুরূহ নয় শুধু অনেকটা অসম্ভবই! কখনো সামনেই পড়বে পাহাড় থেকে গাছ ভেঙে, দাঁড়িয়ে থাকবে বাঁধা হয়ে রাস্তার মাঝখানে, তখন গাছ-ডাল-লতা-পাতা কেটে, ভেঙে, সরিয়ে আপনাকে নিজ হাতে রাস্তা করে নিতে হতে পারে।
গভীর অরণ্যের রোমাঞ্চ! ছবিঃ সংগ্রহ

কখনো সামনে পড়বে পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা ছোট ছোট ঝর্ণা, কিন্তু আপনার সামনে দিয়ে আরও নিচের পাহাড়ে গড়িয়ে পড়তে পড়তে সেটা রূপ নেবে ভয়াবহ বীভৎসতায়! শব্দের বিকটতায় ঠাঁয় দাড়িয়ে থাকবেন কিছু সময়, ভেবে পাবেন না কীভাবে এত ছোট ছোট ঝর্ণা ধারা, এতটা বিকট রূপ নিতে পারে? আসলে হয়েছে কী, পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে নামতে কয়েকটা ঝর্ণার মিলনে এমন বীভৎসতা পেয়েছে ওর চলায়, ঝরে পড়ায় আর নদীর সাথে সঙ্গমে!
আর কিছুদূর এগোলে হয়তো চোখে পড়লেও পড়তে পারে দুই-একজন পাহাড়ি মানুষ, যারা জীবিকার সন্ধানে ঢুকে যাবে আরও গহীন অরণ্যে, হাতে একটি ধারালো দাঁ আর পিঠে কোনো ঝুড়ি নিয়ে। এরপরেই শুরু হবে এক স্বর্গীয় পথের, রিশপ এক পাহাড়ি স্বর্গ ভূমির অভ্যর্থনা।
রঙিন পাহাড়ি পাথর দিয়ে বাঁধা রাস্তা! আসলে বাঁধা নয়, পাথর ফেলে অমন করা হয়েছে, চারদিকে রঙবেরঙের ফুলের সমারোহ পাহাড়ের গায়ে গায়ে, পায়ে-পায়ে আর পুরো শরীর জুড়ে! নাম না জানা অচিন পাখির ভীষণ মনকাড়া মিষ্টি-মধুর সুর, যা আপনাকে নিয়ে যাবে এক অন্য জগতে, যেখানে বসে থাকতে ইচ্ছে হবে অনন্তকাল।
অরণ্যের অপার্থিব সৌন্দর্যে! ছবিঃ সংগ্রহ

যতদূর চোখ যাবে শুধু পাহাড়ের সিঁড়ি, কোথাও নিচু থেকে উঠে গেছে নীল আকাশ ছুঁতে, কোথাও আকাশ থেকে পাহাড় নেমেছে কোনো অজানা নদীর পানিতে অনেক দিনের তৃষ্ণা মেটাতে। পাহাড়ি পাইনের ভেতরে একে অন্যকে আঁকড়ে ধরে আছে মেঘ আর কুয়াশা। কখনো মেঘে ঢেকে অন্ধকার করে দেবে পুরো রাস্তা, পাহাড় আর অরণ্য। কখনো কুয়াশার চাদর জড়িয়ে দেবে আপনার জাগতিক সত্ত্বাকে, আবার কখনো হুট করে আপনাকে ভিজিয়ে দেবে এক পশলা অবাধ্য বৃষ্টি।
আবার পর মুহূর্তেই হয়তো সামনের পাহাড়ের মেঘ-কুয়াশারা দূরে গিয়ে হেসে উঠবে নীল রঙে রেঙে থাকা আর সাদা মেঘের মাধুর্য নিয়ে এক খণ্ড আকাশ। এরপরেই নিজের অজান্তেই পৌঁছে যাবেন এক পাহাড়ের স্বর্গভুমি রিশপে। সেই গল্প অন্যদিন।
গভীর অরণ্যে মেঘ-কুয়াশার মাখামাখি! ছবিঃ সংগ্রহ

তো যদি নিতে চান, এমন রোমাঞ্চের আস্বাদ, পেতে চান, গা ছমছমে কিছু অনুভূতি, শিউরে ওঠার মতো ক্ষণ, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার মতো কিছু অপার্থিব মুহূর্ত, যেখানে একই সাথে পাবেন, গহীন অরণ্য, পাহাড়ের সারি, ঝর্ণার গান, পাখিদের কলতান, ফুলের পরশ, মেঘ-কুয়াশার মিতালী আর নদীর কলরব, বেড়িয়ে আসতে পারেন, অল্প সময় আর সংক্ষিপ্ত খরচের নেওরা ভ্যালি ন্যাশনাল ফরেস্টে।

যেভাবে যেতে হয়:

ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি, শিলিগুড়ি থেকে কালিম্পং হয়ে লাভা। মূলত কালিম্পং থেকে লাভা যেতেই এই অরণ্যর দেখা মেলে, তবে অল্প সময়ে ট্রেক এর এই পুরো রোমাঞ্চ পেতে হলে, যেতে হবে লাভা থেকে রিশপের পাহাড়ি অরণ্য পথ ধরে। তবে গ্রুপ করে গেলে আনন্দ বেড়ে যাবে বহুগুণ।
সব সময় পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন।
ফিচার ইমেজ- wikipedia.org

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সোনাইমুড়ীর বাঘপাঁচড়া গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীনের স্মৃতিচিহ্ন

ফিফা অফিসিয়াল ফ্যান ফেস্ট ভ্রমণের গল্প