আবারো ফিরে আসা ঘুপচি গলির শহর কলকাতায়

পরিবার নিয়ে ভারত ভ্রমণে বের হয়েছি কিছুদিন হলো। উদ্দেশ্য বাবা-মাকে তীর্থস্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখানো। এর মধ্যে গয়া এবং বেনারস ঘোরা শেষ করে আমরা এখন কলকাতার পথে। বেনারস থেকে হাওড়া যাওয়ার বিভূতি এক্সপ্রেসের টিকেট কেটেছিলাম। ট্রেন আসার কথা ছিল সন্ধ্যা ছয়টায়। স্টেশনে এসে শুনি ট্রেন লেট।

কথায় আছে লেটের ট্রেন লেটে চলে। ট্রেনটি সন্ধ্যা ছয়টার বদলে আসলো রাত তিনটায়। আগামীকাল সকাল সাতটায় যেখানে হাওড়া পৌঁছে যাওয়ার কথা সেখানে হাওড়া পৌঁছাতে পৌঁছাতে পরের দিন রাত সাড়ে আটটা বাজলো। এই একটা দিন মাটি গেল আমাদের, পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম সকাল সকাল পৌঁছে সেদিনই কলকাতাটা ঘুরে নিয়ে পরশু দেশে ফিরে যাবো। তা আর হয়ে ওঠেনি।

ট্রেন ঢুকছে হাওড়ায়, ছবিঃ লেখক

হাওড়ায় নেমে স্টেশন থেকে বের হয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করার লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। এই ব্যাপারটা নতুন শুরু হয়েছে। ওলা, উবারের যুগে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী হলুদ ট্যাক্সি হারিয়ে যাবে এমনটা তো হতে পারে না। তাই ভাড়া ন্যায্য ধরে স্টেশনের ট্যাক্সিগুলোকে সরকারি কমিশনের আওতায় আনা হয়েছে। কলকাতার যত জায়গায় যাওয়া যায় সবকটিতেই যায় ট্যাক্সিগুলো, রাতের ভাড়া সর্বোচ্চ তাও আবার মাত্র ১৪৫ রুপি প্রতি ট্যাক্সি।

টিকেট কেটে উঠে পড়লাম ট্যাক্সিতে, গন্তব্য মারকুইস স্ট্রিট। আমরা ৫ জন ছিলাম বলে অতিরিক্ত ৫০ রুপি দিতে হয়েছে ট্যাক্সিওয়ালাকে, ট্যাক্সির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা চারজন কিনা। মারকুইস স্ট্রিটে আগে থাকা হয়নি কখনো, এত রাতে হোটেল পাওয়া যাবে নাকি তাও জানি না। মারকুইস স্ট্রিটে নেমে একটু হেঁটে এগিয়ে গেলাম, সাথে তিনটা ভারী ব্যাগ নিয়ে। কস্তুরী রেস্টুরেন্টের ঠিক পাশেই সবুজ গেটওয়ালা একটা হোটেল নিলাম, প্রতিরুম ৭০০ রুপি করে দুইরুম। রুমগুলোও বেশ ভালো ছিল।

দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির, ছবিঃ লেখক

সারাদিন পেটে তেমন কিছু পড়েনি, ভারতীয় ট্রেনের বিচ্ছিরি থালি আমার গলা দিয়ে ঢোকে না। হোটেলে উঠেই তাই চটজলদি গোসলটা সেরে বাইরে থেকে খেয়ে-দেয়ে আসলাম সবাই। সেদিনকার মতো ভ্রমণে ইতি টেনে তলিয়ে গেলাম ঘুমের রাজ্যে। পরদিন সকাল সকাল উঠতে হলো বাবার ডাকে। সবাই নাকি রেডি হয়ে বসে আছে মন্দির দর্শনে যাওয়ার জন্য।

আলসেমির কারণে বের হতে হতে নয়টা বাজলো। নাস্তা করে কিছু বাংলা টাকা ভাঙিয়ে নিলাম। বলে রাখা ভালো, বর্ডার থেকে এখানে টাকার রেট কম পাবেন। টাকা ভাঙিয়ে একটা ক্যাব ঠিক করলাম দক্ষিণেশ্বর কালী বাড়ি, শ্রীরামকৃষ্ণের বেলুর মঠ, বিরলা মন্দির, কালীঘাট, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখিয়ে আবার হোটেলের সামনে নিয়ে আসবে ১,৩০০ রুপিতে। চারজন হলে ১,০০০ রুপিতেই সম্ভব, ৫ জন হওয়ায় আর রিস্ক নিলাম না।

বেলুর মঠে রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠ, ছবিঃ লেখক

কলকাতা মূল শহর থেকে দক্ষিণেশ্বর বেশ দূরে, ২০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ। বলে রাখা ভালো দক্ষিণেশ্বর আর বেলুর মঠ ঠিক দুপুর ১২টায় বন্ধ হয়ে যায় আবার দুপুর তিনটায় খোলে, বেনারসেও একই নিয়ম দেখেছি। আমাদের রওনা দিতে দিতে বেশ দেরী হয়ে গেল, সকাল দশটায় রওনা দিয়ে পৌনে এগারোটায় দক্ষিণেশ্বর পৌছালাম।

দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি মন্দিরের এলাকা বিশাল জায়গা জুড়ে বানানো। ভেতরে মোবাইল নিয়ে ঢুকতে দেয় না কর্তৃপক্ষ। তাই রক্তজবার মালা আর প্রসাদ কিনে নিয়ে ঢুকে গেলাম ভেতরে। আমার মতে উপাসনালয়গুলোতে মোবাইল নিয়ে না ঢুকতে দেয়াই শ্রেয়, এতে পরিবেশ এবং পবিত্রতা দুটোই রক্ষা হয়।

বেলুর মঠের মূল ফটক, ছবিঃ লেখক

দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের বেলুর মঠের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলাম সাড়ে এগারোটার দিকে। বেলুর মঠে যাবার ইচ্ছেটা আমাদের সবার থেকে আমার মায়ের বেশি ছিল। দক্ষিণেশ্বর থেকে গাড়ি হাকিয়ে যখন বেলুর মঠের মূল ফটকে পৌঁছাই তখন ঘড়িতে বারোটা পনেরো বাজছে, দারোয়ান বললো বন্ধ হয়ে গেছে আপাতত। আবার খুলবে বিকেল সাড়ে তিনটার পর। মা খুব কষ্ট পেলেন মনে হলো। উনাকে খুশি করতে ক্যাবটা দিয়ে চলে গেলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখে হয়তো ভালো লাগবে এই আশায় নিয়ে গিয়েছিলাম সবাইকে। কিন্তু মনেই ছিল না দিনটা ছিল সোমবার। গেটে গিয়ে শুনি শুধু পার্ক খোলা আছে, জাদুঘর বন্ধ। যারা পরিবার নিয়ে যাবেন তাদের জন্য একটি ফ্রি উপদেশ, কখনোই ভিক্টোরিয়ার পার্কে যাবেন না, গেলে সোজা জাদুঘরে। দিনেদুপুরে এমন কিছু দেখতে পাবেন যার জন্য আপনি বা আপনার পরিবার প্রস্তুত বা অভ্যস্ত নন। আমি ভাবলাম পার্কের সাইডটা বাদ দিয়ে অন্য দিকটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসবো, কিন্তু সব জায়গায় একই অবস্থা। জাদুঘরটা দেখানোর খুব শখ ছিল আমার, হয়ে উঠলো না।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ছবিঃ লেখক

ভিক্টোরিয়া থেকে বের হয়ে ক্যাবে উঠে চলে গেলাম কালীঘাট মন্দিরে। মাঝখানে ড্রাইভার কাকুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বেলুর মঠ যাওয়া যায় নাকি আবার, উনি বললেন ৫ জন নিয়ে ওদিকটায় ট্যাক্সি চালালে ঝামেলা আছে। তাই আর যাবেন না বললেন। কালীঘাট মন্দিরে গিয়ে মা পূজো দিবেন বললেন, ফুল-প্রসাদ দিয়ে পাঠালাম সবার সাথে।

এখানেও হালকা-পাতলা প্রতারণা চলে। মন্দির বন্ধ হয়ে গেছে বলে অনেকেই ২০/৩০ রুপি চায় পূজো করিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে। মন্দিরের বাইরে মেলা বসে। পূজার বিভিন্ন জিনিস আর চন্দন কাঠ বিক্রি হয় সেখানে। চন্দন কাঠ কিনে যখন গাড়িতে ফিরি তখন ঘড়িতে তিনটা বাজছে। আরেকটি মন্দির বাকি আছে, বিরলা মন্দির।

বিরলা মন্দির, ছবিঃ তীর্থ বণিক

বিরলা মন্দির ভারতের অন্যতম ধনী ব্যাক্তি শ্রীকৃষ্ণ কুমার বিরলা আর তাঁর স্ত্রী মনোরামা বিরলার সংযুক্ত উদ্যোগে বানানো বিশাল কৃষ্ণ মন্দির। বিরলা মন্দিরে এসে মনে হলো বেশ সুন্দর বড়সড় কোনো মন্দিরে এলাম এই প্রথম। ঘড়িতে তখন সাড়ে তিনটা বাজছে। দারোয়ান বললো, মন্দির এখন বন্ধ আছে খুলবে সাড়ে চারটার পরে।

আরো বললেন, “আপনার চাইলে সামনে বিরলা মিউজিয়াম আছে, ঘুরে আসতে পারেন।” হাতে যেহেতু এক ঘন্টার মতো সময় আছে তাই হাঁটতে লাগলাম একই গলি দিয়ে, ৫০০-৬০০ মিটার সামনে গিয়ে হাতের বামের গলিতে বিশাল এক জাদুঘরের দেখা পেলাম। নাম “বিরলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড টেকনোলজিক্যাল মিউজিয়াম” যার সংক্ষিপ্ত রুপ বিআইটিএম।

বিআইটিএম মূল ফটক, ছবিঃ লেখক

জনপ্রতি ৪০ রুপি করে টিকেট কিনে নিয়ে ঢুকে পড়লাম বিআইটিএমে। সত্যি বলতে প্রথম দেখায়ই বিআইটিএম ভালো লেগে যায়, বাহ্যিক সাজসজ্জাই বলে দিচ্ছিলো আমার মতো প্রযুক্তি প্রেমীদের জন্য এটা স্বর্গের চেয়ে কম কিছু না। ভেতরে গিয়ে ধাপে ধাপে অবাক হলাম। বিজ্ঞানের একদম গোড়াজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানিয়ে রাখা হয়েছে এখানে, সাথে কীভাবে কী কাজ করে সবকিছু লিখে দেয়া হয়েছে।

হাই ভোল্টেজ শো এর প্রাক্কালে, ছবিঃ লেখক

পুরো বিজ্ঞানটাকে যেন সহজ ভাষায় সংজ্ঞা এবং উদাহরণসহ উপস্থাপন করা হয়েছে বিআইটিএমে। এখানে আসার পর সময় কীভাবে চলে গেল টেরই পাইনি। দুটো শো দেখেছিলাম আমরা, টেলিভিশন শো আর হাই ভোল্টেজ শো। কীভাবে টেলিভিশনে গ্রাফিক্সের কাজ করে, আলাদিনের জাদুর গালিচা উড়ায় তার মূল রহস্যটা দেখালো টেলিভিশন শোতে।

হাই ভোল্টেজ শোতে তৈরী করে দেখানো হলো প্রায় এক লাখের কাছাকাছি ভোল্টেজ। সারাদিনের ক্লান্তি যেন বিআইটিএমে আসার পর উড়ে গেল। আগে জানলে এখানে অন্ততপক্ষে তিন ঘণ্টা হাতে নিয়ে আসতাম।

বিআইটিএম, ছবিঃ লেখক

এদিকে ড্রাইভার কাকু ফোনের পর ফোন দিচ্ছে, ভাড়া বেড়ে যাবে বলে মিনমিনে গলায় প্রতিবাদও করছে। আমরা তাই বেশি দেরী করলাম না। বিরলা মন্দির খুলে গেছে এতক্ষণে, হেঁটে পৌছালাম মন্দিরে। মন্দির দর্শন করতে গিয়ে মনে হলো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে যত্নে রাখা মন্দিরটি দেখছি আমি যার পুরো এলাকাটিই বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এখানেও মন্দিরের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ। তবে ভারতের ইতিহাসে বিরলা পরিবারের যে অসীম অবদান তা বিরলা মন্দির আর বিআইটিএম দেখলেই বোঝা হয়ে যাবে।

রাতের কলকাতা, ছবিঃ তীর্থ বণিক

সুষমভাবে মন্দির ঘোরা শেষে হোটেলে ফিরে গেলাম আমরা। আজ ভারতে শেষ দিন, তাই ভালমন্দ খেতে হবে। হোটেলের খুব কাছেই রয়েছে ধানসিঁড়ি রেস্তোরাঁ। ব্যক্তিগত অভিমত থেকে বলছি মারকুইস স্ট্রিটের এই ধানসিঁড়িতে একবার হলেও খাবেন নিশ্চয়ই, প্রতিবেলাই তাহলে এখানে খেতে ইচ্ছে করবে।

ভরপেট খেয়ে-দেয়ে একটু সামনে হেঁটে হাতের বামে যে বিগ বাজার আছে সেখান থেকে কিছু কেনাকাটা করে হোটেলের পথ ধরলাম। ভারতের শেষ রাত আর কলকাতার ২য় রাত বেশ জীবন্ত মনে হচ্ছে। এই রাতগুলোতে আটকে রাখার কোনো উপায় থাকতো, বাক্সবন্দি করে আটকে রাখতাম আর স্মৃতিচারণে স্মৃতিকাতর হতাম।

ফিভার ইমেজ- তীর্থ বণিক

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. ভুলেও মিউজিয়াম এ যাবেন । টিকেট বিদেশিদের জন্য ৫০০ রুপি। ভিতরে মমির অবস্থা ভয়াবহ। শরির থেকে মাথা আলাদা রাখা আছে। শুধুই কংকাল। তারপরেও পরিবার নিয়ে গেলে সবাই না গিয়ে একজন গিয়ে দেখে পরে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বাকিদের জন্য টিকেট নেবেন কিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলো যাই মেঘ পাহাড়ের দেশ সাজেক ভ্যালীতে

এক নজরে একটি জেলা: রাজশাহীর পুঠিয়ায় যত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন