টেকেরঘাটে স্বর্গবিলাসের ইতিবৃত্ত

টাঙ্গুয়ার হাওরে হয়তো আপনাদের অনেকেই গিয়ে থাকবেন। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম হাওরের আদিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশির মোহনীয় সৌন্দর্য উপেক্ষা করা নিঃসন্দেহে অসম্ভব। বাড়তি পাওনা হিসেবে আছে মেঘালয়ের পাহাড়গুলোর হাতছানি। বর্ষার সময় পাহাড়ের গা ঘেঁষে জমে থাকা আবছা শুভ্র মেঘ আপনাকে উন্মাতাল করবেই। টাঙ্গুয়ার হাওরে নৌকা ভাড়া করে ওয়াচ টাওয়ার পর্যন্ত গিয়ে অনেকেই আবার ঘাটে ফিরে আসেন। টেকেরঘাট নামের জায়গাটা দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যায়। এবং সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়, পুরো দেশের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে অসাধারণ, সবচেয়ে আকর্ষণীয় তিনটি জায়গার মধ্যে টেকেরঘাট থাকবেই, রাখতেই হবে। গত সেপ্টেম্বরে আমাদের পনেরো জনের বিশাল বহর নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম সেখানে। টেকেরঘাটে আমরা যা যা করেছি সেটাকে সরাসরি “স্বর্গবিলাস” বলাটাই যৌক্তিক হবে। জ্বি ঠিকই দেখছেন। টেকেরঘাট এই দেশের বুকেই ছোট এক টুকরো স্বর্গ।

মেঘালয়ের পাহাড় আর মেঘ, ছবিঃ প্রান্ত রায়

প্রথমেই সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে নেমে আমরা নাস্তা সেরে ফেললাম। এরপর লেগুনা নিয়ে চলে গেলাম সাহেববাজার ঘাটে, যেখান থেকে নৌকা ভাড়া করবেন। দামাদামি করে একটা স্টিমার এর কাছাকাছি বড়সড় ধরনের নৌকা ঠিক করে ফেললাম এক দিনের জন্য। পরদিন সকাল ১০টায় আমাদের নৌকা ছাড়তে হবে। রাতে আমরা নৌকাতেই থাকছি, তাই বাজারে গিয়ে আয়োজন করে বাজারটাও সেরে ফেলা হলো। মাঝিরাই আমাদের খাবার রান্না করার দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। সকাল ৯টায় আমাদের নৌকা চলতে শুরু করল টাঙ্গুয়ার বুকে। ১২টার মধ্যে ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছে গেলাম। টাওয়ারে উঠে চারপাশে তাকালেই বুঝতে পারবেন আপনি স্বর্গের দুয়ারের খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন!
টাঙ্গুয়ায় দাপাদাপি! ছবিঃ ফারজানা ফাহমী

 
২টার মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম টেকেরঘাটের ঘাটে। ঘাটের কাছেই আছে বিজিবি ক্যাম্প। এখানেই নোঙর ফেলা হলো। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
 
নীলাদ্রিতে নৌকা ভ্রমণ, ছবিঃ জামিল রহমান

 
আমাদের কল্পনাতেও ছিল না বাংলাদেশের ভেতরেই এমন দম বন্ধ করা সুন্দর জায়গা থাকতে পারে! নৌকার জানালা দিয়ে পাহাড় আর মেঘ দেখছিলাম, বাইরে খানিকটা বৃষ্টিও হচ্ছিল। প্রকৃতির এই রূপ দেখতে দেখতে ধোঁয়া ওঠা ভাত, মুরগী আর আলু ভর্তা দিয়ে দুপুরের খাবারটা সেরে ফেললাম। মাঝিদের রান্নাটা একটু বেশি মাত্রায় ভালো ছিল, এক কথায় অমৃত। স্বর্গের সাথে অমৃতের ব্যাপারটা বেশ মানিয়ে যায়!
 
সেই জায়গা যেখানে বসে থাকবেন চুপচাপ! ছবিঃ জামিল রহমান

বৃষ্টি কমলে নৌকা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথম গন্তব্য নীলাদ্রি লেক। এই লেকের সাথে আশা করি সবারই কম বেশি পরিচয় আছে। তাই বিস্তারিত বর্ণনায় যাচ্ছি না। নৌকায় করে লেকটা ঘুরে দেখতে পারবেন। লেকের ভেতরে চারিদিকে পানি দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটা জায়গা আছে। সেখানে বসেই খুব কাছ থেকে দেখতে পাবেন মেঘালয়ের পাহাড়, পাহাড় কেটে বানানো রাস্তা আর ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতার। পুরো জায়গাটা জুড়ে একটা ধীর, অদ্ভুত নিস্তব্ধতা কাজ করে। এখানে বসে অন্তত আধা ঘণ্টা সময় অবশ্যই কাটাবেন। কারো সাথে কোনো কথা না বলে বসে থাকবেন চুপচাপ। যে অনুভূতির মধ্য দিয়ে আপনি যাবেন সেটার জন্য আমাকে এসে ধন্যবাদ দিতে আপনার ভুল হবে না আশা করি!
মেঘালয়ের খুব কাছে! ছবিঃ জামিল রহমান

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য লাকমাছরা। লেকটা ঘুরে, নৌকায় আবার এই পাড়ে চলে এসে পশ্চিম দিকে সোজা হাঁটতে থাকুন। স্থানীয় বাসিন্দারাই আপনাকে পথ চিনিয়ে দেবে। ২০ মিনিট হাঁটলেই পেয়ে যাবেন লাকমাছরা। জায়গাটার সাথে বিছানাকান্দির বেশ ভালো একটা সাদৃশ্য আছে। এখান থেকেও পাথর উত্তোলন করা হয়। সময় কাটানোর মতো সুন্দর একটা জায়গা এটা। লাকমাছরা থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমরা নৌকায় ফিরে গেলাম। সন্ধ্যা গড়িয়ে নামলো রাত। সেই সাথে শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি।
ব্যস্ত ফটোগ্রাফার, ছবিঃ জামিল রহমান

বৃষ্টির মধ্যেই সকাল ১০টায় আমরা নৌকা ছেড়ে দিলাম। এবারের গন্তব্য বাজাইছরা, বারিক্কা টিলা, জাদুকাটা নদী আর শিমুল বাগান। সবগুলো জায়গা ঘুরে দেখার জন্য আমরা পনেরো জন আটটা বাইক ঠিক করে ফেললাম। বৃষ্টি থামার কোনো নামগন্ধ নেই। আরো বেড়ে গেল উল্টো। সেই সাথে শুরু হলো আমাদের চার ঘণ্টার “ডেমন রাইড”!
হারিয়ে যাবেন সবুজের মায়ায়! ছবিঃ জামিল রহমান

প্রথমেই চলে গেলাম বাজাইছরায়। একদম ছোট একটা ঝর্ণা। দেখে আপনি হেসেই ফেলবেন! কিন্তু যাওয়ার পথটা বেশ সুন্দর। একটা টিলা বেয়ে উপরের দিকে উঠতে হবে আপনাকে। আরো উপরের দিকে উঠতে থাকলে ঝর্ণাটার উপরের স্টেপগুলো চোখে পড়বে আপনার। তবে বেশি উপরে উঠতে পারবেন না।
বাজাইছরা, ছবিঃ জামিল রহমান

আপস্ট্রিমের বেশিরভাগটাই পড়েছে আমাদের প্রতিবেশী দেশের ভেতরে। বাজাইছরা দেখে আবার বাইকে উঠে পড়লাম।
লাকমাছরা, ছবিঃ জিম  

এবার যাচ্ছি বারিক্কা টিলায়। বাইক আপনাকে একদম বারিক্কা টিলার উপরেই নামিয়ে দেবে। এখান থেকে জাদুকাটা নদীর রূপ দেখতে পাবেন।
বিছানাকান্দির সাথে আছে চোখে পড়ার মতো মিল! ছবিঃ সিজান আহমেদ

ওইদিন পুরোটা সময় ধরেই বৃষ্টি হচ্ছিল। একবারের জন্যও থেমে যায়নি। নদীতে তাই প্রচুর পানি ছিল। আর মেঘালয়ের পাহাড়গুলোর গায়ে ঝর্ণাগুলো দেখা যাচ্ছিল একদম স্পষ্টভাবেই।
লাকমাছরায় আমরা ! ছবিঃ জিম

মেঘ তো সাথে আছেই। টিলার খানিকটা পাশেই নোম্যান্স ল্যান্ড। ভারতের সীমান্ত যেখান থেকে শুরু হয়, সেটার পাশে দাঁড়িয়ে ছবিও তুলে নিতে পারেন, পাহারা দেয়ার জন্য কেউ নেই। ভারত ভ্রমণ হয়ে যাবে বিনা খরচে। বারিক্কা টিলা আপনাকে মুগ্ধতা উপহার দেবে, চোয়াল ঝুলে পড়ার মতো মুগ্ধতা, কোনো সন্দেহ নেই!
বারিক্কা টিলা, পাহাড় আর জাদুকাটা নদী! ছবিঃ লেখক

এরপর আবারো উঠে পড়লাম বাইকে। গন্তব্য শিমুলবাগান। বর্ষার সময় বাগানে আসলে ফুল থাকে না। এসময় না যাওয়াটাই শ্রেয়। এত কাছে এসেও না দেখে ফিরে যাবো? ব্যাপারটা কেমন হবে? এই চিন্তা থেকেই গিয়েছিলাম আমরা। তাছাড়া সুনামগঞ্জ শহরে ফিরতে হলে আমাদের শিমুলবাগানের ভেতর দিয়েই যেতে হতো। বৃষ্টির কারণে সব রাস্তা সেদিন ছিল পানির নিচে। বাইকগুলো আমাদের সাথে তাই যেতে পারলো না।
বিনা খরচে ভারতে! ছবিঃ প্রান্ত রায়

শিমুলবাগান গিয়ে সেখান থেকে অটো নিয়ে, নৌকা নিয়ে পানি পার হয়ে, চোখের সামনে অন্য একটা নৌকার ডুবে যাওয়া দেখতে দেখতে মূল রাস্তায় উঠে লেগুনায় করে ফিরে এলাম সুনামগঞ্জ শহরে। শেষ হলো আমাদের বৃষ্টি মাখা স্বর্গবিলাস!

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বাসে করে সুনামগঞ্জ শহর। লেগুনা বা অটো নিয়ে সেখান থেকে তাহিরপুরের সাহেববাজার ঘাট। এরপর নৌকা ঠিক করে টেকেরঘাটের ঘাট।

খুঁটিনাটি:

নৌকা ঠিক করার সময় অবশ্যই দামাদামি করে নেবেন। আমরা ৮,০০০ টাকায় বিশাল নৌকা পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেতরে দুটো বাথরুমও ছিল। দল বড় হলে এ ধরণের নৌকাই নিয়ে নেবেন। দল ছোট হলে ছোট নৌকা। ছোটগুলো ২,০০০-৩,০০০ টাকায় পেয়ে যাবেন। অবশ্যই ঘাটের বাজার থেকে বাজার করে ফেলবেন। নৌকায় থাকতে না চাইলে টেকেরঘাটে হাওর বিলাসে (০১৭৩৫৪৬৪৪৮১) থাকতে পারেন। যাওয়ার আগে ফোনে কথা বলে নিতে পারেন। বাইক ঠিক করার সময় জেনে নেবেন তারা কোন কোন স্পটে আপনাদের নিয়ে যেতে চায়। সেই সাথে আপনারাও যে স্পটগুলো ঘুরে দেখতে চান সেগুলোর নাম বলে রাখবেন। ৭৫০ টাকায় আমরা সবগুলো স্পট ঘুরেছিলাম।

বিশেষ অনুরোধ:

টেকেরঘাট অসাধারণ পরিচ্ছন্ন একটি জায়গা। এমনটা সাধারণত এই দেশে দেখা যায় না। বিস্ময়কর ব্যাপারটা হলো আমরা রাস্তায় একটা সিগারেটের ফিল্টার পর্যন্ত পড়ে থাকতে দেখিনি! নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন বিশেষ অনুরোধটা কী হতে পারে!
ফিচার ইমেজ- সিজান আহমেদ 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নড়াইল নলামারা পদ্মবিল ভ্রমণ: প্রথম পর্ব

মৃত্যুর জন্য যে শহরে ভিড় জমে মানুষের!