মেঘালয়ের নীলাভ্রতার রহস্য ও টাঙ্গুয়ার হাওরের উথাল-পাতাল ঢেউ

তাহিরপুর বাজারের যে ঘাট থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করতে হয়, সেই ঘাটের অবস্থা একদম নাজেহাল। আগের রাতে বৃষ্টি হওয়ায় প্যাঁচপ্যাঁচে কাদায় ঘাটে হাঁটা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। লোকালয়ের কাছে হওয়ায় এখানটায় হাওরের পানি একদম ঘোলা ছিল। এটা আসলে একটা খাঁড়ির মতো।

ঘরবাড়ির জন্য বিস্তীর্ণ হাওরের কিছুই দেখা যায় না ঘাট থেকে। অগ্রিম রিজার্ভ করে রাখা নৌকার ছাদে চটপট উঠে পড়লাম। নৌকা ছাড়ার পর ছাদে বসেই গল্প গুজব করছিলাম, কী একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতেই হুট করে থেমে গেল ইভানা। তাকিয়ে দেখি, আমার পিছনে কিছু একটার দিকে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হলো?’

আঙুল তুলে ঘরবাড়ির ফাঁকে নৌকা বেরুনোর একটা পথের দিকে দেখিয়ে দিল। তাকিয়ে দেখি, এক চিলতে খোলা জায়গা দিয়ে দূর মেঘালয়ের নীলাভ পাহাড়শ্রেণী দেখা যাচ্ছে। পাহাড়শ্রেণীর সেই অবয়বের সামনের অংশটুকু কেমন ঘোলাটে। যেন কুয়াশায় মুড়িয়ে রেখেছে। ও মুগ্ধ গলায় বললো, ‘একদম কাশ্মীরের ডাল লেকের ভিউ।’

চমকে উঠলাম আমি। কী বলে ও! ডাল লেক এরকম দেখতে? কদিন আগেই কাশ্মীর ঘুরে এসেছে ইভানা। বুঝতে পারলাম, এই ভ্রমণটা খুবই উপভোগ্য হতে চলেছে।

তাহিরপুর থানা। সোর্স: পাগলের দল

মাঝিমামা নৌকা ছেড়ে দিয়ে বললো, তাহিরপুর থানায় গিয়ে নাম এন্ট্রি করিয়ে আসতে হবে। নৌকা চালালো সেদিকেই। যেকোনো একজন গেলেই হবে। থানার ঘাটে এসে নৌকা ভিড়তেই কে যাবে, সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ কথা চালাচালি হলো, একজন কেবল আরেকজনকে দেখায়।

পরে আমি ইভানাকে বললাম, ‘চল, আমি আর তুই যাব।’ আমাদের পিছন পিছন পরে রুদ্রও এসেছিল।

নৌকা ছুটে চলেছে নীলাম্বুধি কেটে। সোর্স: পাগলের দল

তাহিরপুর থানাটি দেখতে বেশ সুন্দর। ঘাট থেকে ঢালাই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে থানায় ঢুকলাম। কোনো ঝামেলা নেই, কেবল একজনের সম্পূর্ণ ঠিকানা লিখে দিতে হয় থানার ডায়েরীতে। ইভানা ওর ঠিকানা লিখলো। এখানে ঢোকার আগে মাঝি ফিসফিস করে বলেছিলো, থানায় নাকি ১০০ টাকা দেওয়া লাগে।

আমরা ভেবেছিলাম, থানায় কর্মরত লোকটিকেই দিতে হবে টাকাটি। সিগনেচার করার পর টাকা সাধতে গেলে লোকটি ইশারায় বারণ করে আমাদের। তারপর বাইরে এসে বুঝতে পারলাম, এরা টাকা নেবে, কিন্তু সরাসরি না। মাঝির মাধ্যমে। ব্যঙ্গের হাসি হেসে মাঝিকেই টাকাটা ধরিয়ে দিয়ে আমরা নৌকায় এসে বসলাম।

নৌকা সেই সরু পথ দিয়ে সামনের খোলা হাওরে গিয়ে পড়লো। দূরে বিস্তীর্ণ মেঘালয় পর্বতের সারি এখন চোখের সামনে উন্মুক্ত। নৌকা যত পাড় ছেড়ে সামনে এগোচ্ছে, হাওরের পানি তত স্বচ্ছ হচ্ছে। মনে হচ্ছে দিগন্তবিস্তৃত হাওর জুড়ে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই! তবে আরো কিছুদূর এগোনোর পর দুয়েকটা ট্রলারকে দেখলাম ফিরতি পথ ধরেছে। আমাদের মধ্যে শাওন উকুলেলে আর মুন্না গিটার নিয়েছিল। গিটারের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে আমরাও গান ধরেছিলাম খোলা গলায়। আমাদের ট্রলার এগিয়ে চলছে ওয়াচ টাওয়ারের দিকে।

হাওরের জীবন। সোর্স: পাগলের দল

ভ্রমণ শুরু করার আগে গত রাতে হাওরে রাত কাটিয়েছে, এমন একটা দল আমাদের বলেছিল, ওয়াচ টাওয়ারে বেশি সময় কাটাতে। কিন্তু টাওয়ার দেখে আমরা হতাশ হয়েছি। কারণ ওয়াচ টাওয়ারটি মাত্র পাঁচ তলা উঁচু। টাওয়ারটির পাশে কিছু গাছ আছে। এগুলোও নিশ্চয়ই সোয়াম্প? গাছ দেখেই বোঝা গেল, এখানকার হাওরে জলের গভীরতা কম।

টাওয়ারের গায়ে নৌকা ভিড়তেই, পানির দিকে তাকিয়ে তাই-ই দেখলাম। নিচে একদম স্বচ্ছ জল। বড়জোড় বুক সমান পানি হবে নিচে। আমরা টপাটপ নেমে পড়লাম টাওয়ারের নিচ তলায়। সিঁড়ি বেয়ে একদম উপরের তলায় গিয়ে চারপাশে তাকাতেই মনটা ভালো হয়ে গেল। ওয়াচ টাওয়ারের তিন দিক দিয়েই রাশি রাশি জল। এই জলরাশিকে ঘিরে রেখেছে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নীলাভ মেঘালয়ের সারি।

ওয়াচ টাওয়ার। সোর্স: পাগলের দল

ওয়াচ টাওয়ারে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা মাঝিকে বললাম, গোসলে নামবো। মাঝি আমাদের টাওয়ার থেকে সরিয়ে একটু দূরে আরোও কিছু সোয়াম্পের সারির কাছে এনে নামতে বললো। এখানেও পানি বুক সমান। তাই কেউ সাঁতার না পারলেও দাপাদাপি করতে পারবে অনায়াসে। নিরাপত্তার খাতিরে লাইফ জ্যাকেট নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যারা সাঁতার পারে না, তারা লাইফ জ্যাকেট পরে পানিতে নেমে গেল।

আমি যেহেতু সাঁতার জানি, তাই আমার সেই ঝামেলা নেই। ওয়াচ টাওয়ারের উপর থেকে নিচের স্বচ্ছ জল দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ওখান থেকেই লাফিয়ে পড়ি। কিন্তু রিস্কি ভেবে তা আর করিনি। এখন অন্তত নৌকার ছইয়ের উপর থেকে তো লাফিয়ে পড়তে পারবো! সুযোগ পেতেই আর দেরি করলাম না। লাফিয়ে পড়েই সাঁতরাতে শুরু করলাম।

এখানকার পানিতে অনেকে দাপাদাপি করছে বলে, পানি ঘোলা হয়ে গেছে। তাই দূরে যাওয়ার জন্য সাঁতরাচ্ছি। সোয়াম্পের সারি পেরিয়ে সামনেই খানিকটা খোলা জায়গা। আমার লক্ষ্য ওখানে যাওয়া। সোয়াম্পের সারি পেরিয়ে একটু সামনে গিয়েই দেখি আর ঠাঁই নাই। তারমানে সোয়াম্পগুলো এক ধরনের সীমানা। গভীরতার মাপ বোঝা যাবে এগুলোর মাধ্যমে।

স্বচ্ছ হাওড়জল। সোর্স: পাগলের দল

ছোটবেলায় সাঁতার শেখার সুবাদে অনেক ধরনের জলাশয়েই সাঁতরানোর অভিজ্ঞতা আছে আমার। পুকুর, খাল, বিল, নদী, হ্রদ, সমুদ্র- এমনকি সহজে ঠাঁই পাওয়া যায় না যে লেকে, সেই বগা লেকেও সাঁতরেছি। কিন্তু এরকম অনুভূতি পাইনি কখনো। হাওরের পানি বদ্ধ হলেও এতে অদ্ভুত এক ধরনের ঢেউ তৈরি হয় বাতাসের টানে। এই ঢেউয়ের টানে জলরাশিগুলো পাহাড়ের গায়ে গিয়ে বাঁধা পায়, তারপর বিপরীত দিকে ফিরে আসে। তাই স্রোত না থাকলেও হাওরের পানি ক্রমাগত ঢেউয়ে ঢেউয়ে নাচতে থাকে।

নৃত্যরত এই পানিতে সাঁতার কাটা মোটেও সহজ নয়। স্থির হয়ে কিংবা চিৎ সাঁতার দিয়ে এতে ভেসে থাকা যায় না। নাকে, কানে পানি ঢুকে যায়। তাছাড়া এই উথাল-পাতাল ঢেউয়ের কারণে ভেসে থাকার জন্য খুব বেশি হাত পা নাড়তে হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সাঁতরানো বেশ কষ্টসাধ্য।

পানিতে দাপাদাপি। সোর্স: পাগলের দল

ক্লান্ত হয়ে সোয়াম্পের বনেই ফিরে আসতে হলো। পায়ের নিচে ঠাঁই পেয়ে জিরিয়ে নিলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু খোলা জায়গাটুকু আর এলোমেলো ঢেউগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাকে। ইচ্ছে হলো এই জায়গাটুকু সাঁতরে পেরিয়ে ওপাশের সোয়াম্পের বনে যাই।

মনের কথা বুঝতে পেরেই যেন মাঝি মামা চেঁচিয়ে উঠলো, ওদিকে যেন না যাই। ওখানে অনেক গভীর। কিন্তু মনের মধ্যে এই চ্যালেঞ্জিং হাওরে সাঁতরানোর যে আকুতি, ওটা কী করে দমাই? আমাদের মধ্যে আমি, রুদ্র, তাসমি আর মুন্না সাঁতার জানি। মুন্না খুব ভালো সাঁতারু। ও বললো, একাই নাকি ওপারে যাবে। লম্বা সময় ধরে সাঁতার কাটা হয়নি আমার। তাছাড়া পানিতে ডুবন্ত লোক যে কী ভয়াবহ হয়, সেই ব্যাপারে খুব ভালো ধারণা আছে। তাই কোনো রিস্ক নেওয়ার মধ্যে গেলাম না।

নৌকা থেকে লাইফ জ্যাকেট নামিয়ে উল্টো করে পরে নিলাম আমি, রুদ্র আর তাসমি। মুন্নাকেও বার বার চেঁচিয়ে বলেছিলাম, লাইফ জ্যাকেট পরুক আর না পরুক অন্তত সাথে নিয়ে নিক। যাতে ক্লান্ত হয়ে গেলে ওটার উপরে ভেসে বিশ্রাম নিতে পারে। শুনলই না ছেলেটা। চারজনে সাঁতরাতে শুরু করলাম। সত্যিই এখানে দীর্ঘক্ষণ সাঁতার কাটা খুব ক্লান্তিকর। এমনকি লাইফ জ্যাকেট পরেও। তাসমি আবার হাত পা না নেড়ে শুধু ভেসে ছিল, বাতাস আর ঢেউ ওকে টেনে অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।

এই পানিতে মুন্নার কোনো অবলম্বন ছাড়া সাঁতরাতে কষ্ট হচ্ছিল খুব। তাই ও তাড়াহুড়ো করে হাত পা চালিয়ে জলার বনের দিকে গেল, যাতে গাছ ধরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারে। ক্লান্ত শরীরে গাছ বাইতে গিয়ে বেচারা পা কেটে ফেলল। ওর সাথে আমরাও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম, তারপর আমাদের নৌকার দিকে সাঁতরাতে শুরু করলাম আবারো। কাছাকাছি গিয়ে শুনলাম, মাঝিমামারা নাকি খুব ডাকাডাকি করেছিল না যাওয়ার জন্য। এখানে দাপাদাপি করে, সাঁতরে যা বুঝলাম, দক্ষ সাঁতারুদেরও এই হাওরে ঝুঁকি নিয়ে সাঁতরানো উচিৎ নয়।

ওয়াচ টাওয়ার থেকে তোলা।  সোর্স: পাগলের দল

নৌকার ছোট ছইয়ের ভেতর কাপড় বদলানো আর যুদ্ধ জয় করা যেন সমান পরিশ্রমের! কষ্টেসৃষ্টে কাপড় বিন্যস্ত করে ছইয়ের উপরে এসে বসলাম। সারা সকাল খুব আরামে নৌভ্রমণ করেছি, রোদ ছিলো না বলে। এই বেলায় রোদ উঠলো, তাই আরাম করে ছইয়ের উপরে শুয়ে থাকা গেল না। নৌকা ছুটে চলেছে ট্যাকেরঘাটের দিকে।

যত সামনে যাচ্ছি, মেঘালয় ততই কাছে আসছে। কিন্তু সেই সাথে মেঘালয়ের নীলাভ্রতাও কমতে শুরু করেছে। তার জায়গায় ঠাঁই নিয়েছে শ্যাওলা সবুজ। তার মানে এই নীলিমা কেবল মাত্র দূর দৃষ্টিসীমাতেই দেখা যায়। কাছে এলে আর নীলিমটুকু পাওয়া যায় না। কিছু সৌন্দর্য দূর থেকেই সুন্দর। কিন্তু, তবুও সেই প্রশ্ন রয়েই যায়, দূর থেকে পাহাড়শ্রেণী কেন এত নীল দেখায়?

জলার বন। সোর্স: পাগলের দল

তবুও ট্যাকেরঘাট যতোই কাছিয়ে আসছে, মেঘালয়ের সৌন্দর্য অন্যরকম ভাবে ধরা দিচ্ছে। একটু আগে ভুল বলেছি। কিছু সৌন্দর্য দূর থেকে একরকম সুন্দর, কাছে এলে অন্যরকম। অদ্ভুত এক উত্তেজনা, শরীর আর মনে।

ট্যাকেরঘাটে আমাদের নৌকা যখন ভিড়লো, তখন বাজে বেলা বারোটা। আপাতত কিছুক্ষণের জন্য টাঙ্গুয়ার হাওরকে বিদায় জানিয়ে আমরা নেমে পড়লাম তীরে।

নৌকার গলুইয়ে বসে আছি। সোর্স: পাগলের দল

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বাসে সুনামগঞ্জ। তাহিরপুর যাবেন বললে, নতুনব্রিজ নামাবে। সেখান থেকে লেগুনায় তাহিরপুর। ৮০ টাকা ভাড়া। তাহিরপুর থেকে নৌকা ভাড়া করে হাওর ঘুরবেন। কেউ কেউ দিনে দিনে ফিরে আসে, তারা স্পিডবোট নিয়ে যায়।

ফিচার ইমেজ: পাগলের দল

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট মারমেইড বিচ রিসোর্ট

ভিজিট ভিসা নিয়ে সহজেই দুবাই ঘুরে আসুন