তাজমহল বাংলাদেশ: ভালোবাসার আরেকটি নিদর্শন

লোক মুখে শোনা যায়, সম্রাট শাহজাহান আগ্রায় তাজমহল নির্মাণ করার পর নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণকারী সকল শ্রমিকের হাত কেটে দেন এবং প্রকৌশলীকে অন্ধ করে দেন, যাতে তাদের সাহায্যে আর কেউ দ্বিতীয় কোনো তাজমহল বানাতে না পারে।

যদিও কথাটির সত্যতার প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে এটা অবশ্যই সত্য যে বিগত কয়েকশ বছর যাবত পৃথিবীর কোথাও দ্বিতীয় কোনো তাজমহল নির্মিত হয়নি। যা হয়েছে তা এই শতকে। যারা এর প্রতিরূপ তৈরি করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা আহসানুল্লাহ মণি ২০০৯ সালে এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন ।

আহসানুল্লাহ মণি নির্মিত এই স্থাপত্যটি ঢাকা থেকে ১০ মাইল পূর্বে পেরাব, সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি এটিকে প্রকৃত তাজমহলের হুবহু নকল বা রেপ্লিকা বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের দরিদ্র মানুষেরা যাদের আগ্রায় গিয়ে তাজমহল দেখার সামর্থ্য নেই মূলত তাদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে এই তাজমহল।

প্রবেশের স্থান; Source: সাঈদ রূপু

এটি আহসানুল্লাহ মণি তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে নির্মাণ করেছিলেন যার পরিমাণ প্রায় ৫৮ মিলিয়ন ডলার। এছাড়াও মূল তাজমহল নির্মাণ করতে যেখানে ২০,০০০ শ্রমিকের ২০ বছর লেগেছিল, মণির সেখানে সময় লেগেছে মাত্র ৫ বছর।

এই রেপ্লিকাটির মূল ভবন স্বচ্ছ ও দামী পাথরে মোড়ানো। আর তার ভিতরে সংরক্ষিত হয়েছে নির্মাতা চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক আহসানউল্লাহ মণি ও তার স্ত্রী রাজিয়া এই দু’জনের কবরের স্থান। ভবনটির চার কোণে চারটি বড় মিনার রয়েছে যার সম্পূর্ণটি টাইলস করা। এর সামনে পানির ফোয়ারা ও চারদিকে ফুলের বাগান রয়েছে এবং রয়েছে দুই পাশে দর্শনার্থীদের বসার স্থান।

বসার স্থান; Source: সাঈদ রূপু

এই ছায়া-নিবিড় পরিবেশে বসেও তাজমহলের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। কেউ কেউ আবার এখানে বসে প্রিয়জনদের সাথে গল্পে মেতে ওঠেন। কেউবা আবার মগ্ন হয়ে থাকেন আগ্রার তাজমহলের সৌন্দর্যের সাথে এই তাজমহলের তুলনায়।

বিশ্রামের স্থান থেকে তাজমহল; Source: সাঈদ রূপু

মণির বক্তব্য অনুসারে, তিনি এই তাজমহল নির্মাণ করার জন্য মার্বেল পাথর আমদানি করেছেন ইতালি থেকে, হীরা আমদানি করেছেন বেলজিয়াম থেকে এবং প্রায় ১৬০ কিলোগ্রাম ব্রোঞ্জ আমদানি করেছেন গম্বুজের জন্য, যদিও কিছু মানুষ তার এই দাবী স্বীকার করেননি। তাদের মতে, এই তাজমহলটি অসম্পূর্ণ।

তাজমহল বাংলাদেশের মূল ভবন; shamprotik.com

সে যাই হোক, তবে এটি সত্য যে সম্রাট শাহজাহান যেমন বিরহ-কাতর হয়ে তাজমহলের নির্মাণ করেছিলেন ঠিক তেমনই আহসানউল্লাহ মণিও তার বিরহ থেকেই এটি নির্মাণ করার উদ্দীপনা পেয়েছিলেন। যদিও আহসানউল্লাহ মণি সম্রাট শাহাজানের মতো প্রিয়তমার বিয়োগে শোকাহত হয়ে নয়, দেশের গরিব ভ্রমণপ্রিয় মানুষের জন্য বিরহ অনুভব করেছিলেন।

বিরহ যে মাধ্যমেই আসুক না কেন, সেটা তো প্রেমের কারণেই আসে, তাই না! সহজ কথায় শাহজাহান তাজমহল বানিয়েছিলেন তার স্ত্রীর প্রতি প্রেম-ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে। অন্যদিকে, মণি বানিয়েছেন বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের প্রতি প্রেম-ভালবাসা থেকে।

মণি বলেন, তার এই তাজমহল বানানো হয়েছে সম্রাট শাহজাহানের প্রতি ভালবাসা থেকে। এজন্য মণিকে আমি প্রেমিকই বলব। আর তাজমহল বাংলাদেশকেও বলব প্রেমের নিদর্শন; হোক তা নকল তবুও তা ভ্রমণপ্রিয় মানুষের প্রতি প্রেমের নিদর্শন। তাই বলা যেতে পারে, প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত সৌন্দর্য প্রিয় মানুষ ও সম্রাট সাহজাহানের প্রতি প্রেমের এক অপূর্ব নিদর্শন তাজমহল বাংলাদেশ, যা থেকে আপনি আগ্রার তাজমহল দেখার স্বাদ নিতে পারেন।

তাজমহল বাংলাদেশ প্রাচীন তাজমহলের আদলে নির্মিত হওয়ায় এবং প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত হওয়ায়, এ থেকে একই সাথে প্রাচীন বাংলার রাজধানী দেখা ও প্রাচীন সৌন্দর্য উপভোগের অনুভূতি লাভ করা যায়। এখানে তাজমহলের কাছাকাছি আরও পাবেন, পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম মিসরের পিরামিডের আদলে তৈরিকৃত স্থাপনা।

এটির নাম রাজমণি পিরামিড যা রাজমণি ফিল্মসিটির অন্তর্ভুক্ত। এখানে আছে কিছু পুরনো আমলের ফিল্মের ক্যামেরা, ককসিটের বেহুলার বাসর, পুরনো গাড়ি, ক্ষুদিরামের ফাঁসির মঞ্চ ও টিনের ঘর এবং চলচ্চিত্র উপভোগ করার জন্য রয়েছে সিনেমা হল। পিরামিডের ভেতরে প্রবেশের জন্য রয়েছে সিঁড়ি, যা বেশ খানিকটা উঁচু। নেমেই প্রথমে চোখে পড়ে কিছু মমির ডামি। এগুলো সাদা কাপড়ে মোড়ানো।

মিশরের পিরামিডের আদলে তৈরিকৃত স্থাপনা; shamprotik.com

তাজমহলের পাশে আরও রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য সহ ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি ভাস্কর্য। পাশেই রয়েছে, শুটিং স্পট সেখানে যেকোনো নাটক, সিনেমার সব ধরনের শুটিং করা যায়। এখানে খাবার-দাবার নিয়েও কোনো চিন্তা নেই, রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রাজমণি ফিল্ম সিটি রেস্তোরাঁ যেখানে উন্নতমানের খাবার-দাবার পাবেন।

এতসব আয়োজনের মাঝে নিজের স্মৃতিকে ফ্রেম বন্দি করতে চাইলে পেয়ে যাবেন ছবি তোলার মানুষও, যার ব্যবস্থা করে দিয়েছে রাজমণি ফিল্ম সিটি স্টুডিও। আপনি যদি ঐতিহ্য প্রেমী হন তাহলে আপনার জন্যেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। এখান থেকে আপনি কিনতে পারবেন বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রী, জামদানি শাড়ি, মাটির গহনাসহ আরও অন্যান্য পণ্য সামগ্রী।

ঢাকা থেকে কাছাকাছি হওয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন এখানে ভিড় করে দেশ-বিদেশ থেকে আগত দর্শনার্থী। তাজমহল প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এখানে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা। তাহলে আর দেরি কেন? ছুটির দিনে প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে আপনিও বেড়িয়ে আসতে পারেন প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও থেকে; দেখে আসতে পারেন এই অপূর্ব তাজমহল বাংলাদেশ।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে মাত্র ২৫ কিমি দূরত্বে হওয়ায় খুব সহজেই এখানে যাওয়া যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে কুমিল্লা, দাউদকান্দি অথবা সোনারগাঁ গামী যেকোনো গাড়িতে উঠে মদনপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে নামবেন। ভাড়া পড়বে ১৫ টাকা। সেখান থেকে সিএনজি বা স্কুটারে চড়ে সোজা চলে যেতে পারবেন পেরাব গ্রামের এই তাজমহলের আঙ্গিনায়। এখানে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৫০ টাকা।

এছাড়া অন্যভাবেও এখানে যাওয়া যায়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে বাসে উঠে বরপা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে নামতে হবে আর সেখান থেকেই সিএনজি বা স্কুটারে করে যেতে পারবেন তাজমহলে। এক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে, ২০+১০=৩০ টাকা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পাথর কেটে তৈরি করা কয়েকটি সমাধি ও মন্দিরের গল্প

অনন্য সৌন্দর্য ঘেরা আড়িয়াল বিল ভ্রমণের এখনই সময়