বাংলাদেশের বর্ষার রানী সিলেট ভ্রমণের বিস্তারিত

এ বছর বর্ষা শুরু হয়েছে একটু আগেই। অনেকেই বর্ষা আসলে ঘোরাঘুরি স্থগিত রাখেন। কারণ এ বৃষ্টির মধ্যে যাওয়ার মতো ভালো জায়গা খুঁজে পান না। এদিক থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম পর্যটন গন্তব্য সিলেট। হাতে যদি দু’দিন সময়ও থাকে, আর বৃষ্টি যতই হোক ঘুরে আসতে পারেন বাংলাদেশের বর্ষার রানী সিলেট জেলা। প্রকৃতি এসময় দু’হাত ভরে সাজিয়ে দেয় সিলেটকে। বৃষ্টির ছাট উপেক্ষা করেই তাই ঘুরে আসতে পারেন সিলেট।

আলী আমজাদের ঘড়ি-ছবি জুয়েল রানা

সিলেটে ঘোরার জায়গার তালিকা বেশ বড়। তাই আপনার হাতে কতটুকু সময় আছে সেটার উপর ভিত্তি করে ভ্রমণের পরিকল্পণা করবেন। একটা নমুনা ট্যুর প্ল্যান এখানে দিলাম। নিজেদের সময়, বাজেট, অন্যান্য বিষয় চিন্তা করে নিজের মতো কাস্টমাইজ করে নিতে পারেন।

নমুনা ট্যুর প্ল্যান

রাতের বাসে/ট্রেনে রওনা দিয়ে সিলেট পৌঁছাবেন খুব ভোরে।
প্রথম দিন: হোটেলে ব্যাগ রেখে চলে যেতে পারেন বিছানাকান্দি ও পান্থুমাই। সেগুলো ঘুরে এসে বিকেলে রাতারগুল জলাবন দেখে শহরে ফিরবেন।
দ্বিতীয় দিন: সকালে উঠে চলে যাবেন জাফলং। আসার পথে সারী ঘাট নেমে লালা খাল ঘুরে আসতে পারেন।
তৃতীয় দিন: যেতে পারেন খাদিম নগর জাতীয় উদ্যান। এছাড়া ঘুরে আসতে পারেন মালনীছড়া ও লাক্কাতুরা চা বাগান। আর শহরের মধ্যে ক্বীন ব্রীজ ও আলী আমজাদের ঘড়ি দেখে আসতে ভুল করবেন না। সন্ধ্যায় যেতে পারেন সুরমা নদীর উপর রিভার ক্রুজেও।

বিছানাকান্দি:

বিছানাকান্দি-ছবি লেখক

মেঘালয়ের কোল ঘেঁষা সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত বিছানাকান্দি মূলত একটি পাথরের কোয়ারী। মেঘালয়ের পাহাড়গুলোর ঝর্ণা থেকে আসা শীতল পানি আর ভেসে থাকা নানা আকৃতির পাথরের কারণে জায়গাটা যে কোনো পর্যটকের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য। হাদারপার থেকে নৌকা নিয়ে বিছানাকান্দি যাওয়ার পথটাও অনেক সুন্দর। পথের দু’পাশে সবুজের ছড়াছড়ি আর দূরে মেঘালয়ের পাহাড়গুলো যেন মাথায় ছুঁয়ে থাকা মেঘের হাতছানি। আর একবার বিছানাকান্দি পৌঁছালে পানি থেকে উঠতে ইচ্ছে করবে না। মনে রাখবেন, যেখানে পাথর নেই সেখানে নদী বেশ খরস্রোতা, সাঁতার জানলে ভেসে গিয়ে বড় ধরনের বিপদে পড়তে পারেন।

কীভাবে যাবেন:

বিছানাকান্দি যাবার রাস্তা বেশ খারাপ। ভালো হয় আম্বরখানা থেকে সিএনজি নিয়ে গেলে। প্রতি সিএনজি ৪৫০-৫০০ টাকা নেবে হাদার পাড় পর্যন্ত। সেখানে নেমে নৌকা রিজার্ভ করবেন। পান্থুমাই আর বিছানাকান্দি একসাথে রিজার্ভ করলে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা নিবে। নৌকায় ১০ জনের মতো উঠতে পারবেন।

পান্থুমাই:

বড়হিল ঝর্ণা-ছবি জুয়েলা রানা

মেঘালয়ে ঝর্ণার কোনো অভাব নেই। তারমধ্যে বিখ্যাত একটি ঝর্ণা হচ্ছে বড়হিল ঝর্ণা। মজার ব্যপার হচ্ছে সীমান্তবর্তী এ ঝর্ণা বাংলাদেশ থেকে দেখা যায় কিন্তু ঝর্ণায় নামা যায় না। আর মেঘালয় গেলে ঝর্ণায় নামা যায় তবে এরকম সুন্দর ভিউ পাওয়া যায় না যেটা বাংলাদেশ থেকে পাওয়া যায়। নৌকা ভাড়া করে একটু দূর থেকে হলেও ভালোভাবেই দেখতে পারবেন বিশাল এ ঝর্ণা। বড় বড় পাথরের মধ্য দিয়ে নেমে আসা জলরাশি আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

কীভাবে যাবেন:

আলাদাভাবে না গিয়ে বিছানাকান্দির জন্য ভাড়া করা নৌকায় করে ঘুরে আসলেই সেটা সাশ্রয়ী হয়।

রাতারগুল জলাবন:

রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট-ছবি লেখক

হিজল গাছের কাণ্ডের প্রায় সবটাই পানিতে ডুবে আছে আর ডালপালা সহ বাকি অংশ পানির উপরে, এরকম অসাধারণ দৃশ্য শুধু রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টেই দেখা সম্ভব। ইঞ্জিন ছাড়া বৈঠা বাওয়া নৌকা দিয়ে এ বনে প্রবেশ করতে হয়। জলে ডুবে আছে গাছ, আর তার পাশ দিয়ে নৌকা নিয়ে যেতে হয়। কোনো কোনো জায়গায় মাথায় উপর পুরো ছাদের মতো ঢেকে রাখে জলাবন। এ সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। হরেক রকম পাখি ছাড়াও ভাগ্য ভালো থাকলে দেখতে পারেন সাপও। মনে রাখবেন জলাবন একটি সংরক্ষিত বন, এখানে কোনো রকম হৈ হুল্লোড় করবেন না, অপচনশীল কোনো দ্রব্য পানিতে নিক্ষেপ করবেন না। বনের মধ্যে একটি ওয়াচ টাওয়ার আছে সেখানে উঠে উপর থেকে বনটা দেখতে পারবেন।

কীভাবে যাবেন:

সিলেট শহরের যেকোনো জায়গা থেকে মোটরঘাট সিএনজি নিয়ে আসবেন। মোটরঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে বনে যাবেন। প্রতি নৌকা ৬০০ টাকা ভাড়া নিবে, বসতে পারবেন ৪ জন করে।

জাফলং:


সিলেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা জাফলং। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করে জাফলংয়ে। মেঘালয়ের ডাউকি থেকে নেমে আসা পিয়াইন নদীর অববাহিকায় জাফলংয়ের অবস্থান। স্বচ্ছ শীতল পানি, মেঘালয়ের পাাহাড় আর নদী দিয়ে ভেসে আসা জাফলংয়ের সৌন্দর্যই অন্যরকম। দু:খের বিষয় হচ্ছে অতিরিক্ত পাথর তোলার কারণে দিন দিন সৌন্দর্য হারাচ্ছে জাফলং। তবে এখনও এটি দেখার মতো একটা জায়গা। নৌকা নিয়ে ঘুরতে পারেন, ডাউকির পাশটায় বাংলাদেশের অংশে ঘুরে দেখতে পারবেন।

কীভাবে যাবেন:

সিলেট থেকে প্রায় ৫৫ কিমি দূরে জাফলং। চাইলে সিএনজি নিয়েও যেতে পারেন। সময় লাগবে দু’ ঘণ্টার মতো। ভাড়া নেবে প্রতি পথে ৫০০ টাকার মতো। এছাড়া লোকাল বাসও চলে।

লালা খাল:

লালা খালের সৌন্দর্য-ছবি লেখক

সিলেটের অন্যতম সুন্দর নদী সারি নদী। সারি নদের একটা অংশ লালা খাল নামে পরিচিত। রৌদ্রোজ্জ্বল দিন থাকলে লালা খালের পানি অসাধারণ সবুজাভাব নীল দেখায়। কোথাও কোথাও পানি এত স্বচ্ছ থাকে যে নদীর তলদেশও দেখা যায়। লালাখালের শেষ দিকে রয়েছে বালির সৈকত। সেখানে নেমে কিছুক্ষণ সময় কাটাতে পারেন।

কীভাবে যাবেন:

জাফলং থেকে ফিরে আসার সময় সিলেট তামাবিল রোডে সারিঘাট ব্রীজের কাছে নেমে নৌকা ভাড়া করে ঘুরে আসতে পারেন লালা খাল। ভাড়া নেবে ৪০০-৫০০ টাকা।

খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান:

খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানে রয়েছে এরকম ঝিরিপথ-ছবি লেখক

সিলেট শহরের খুব কাছেই এ সংরক্ষিত বন। শহরের এত কাছে এ ধরনের অক্ষত বন দেখতে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যপার। এ বনে ঢুকতে ২৩ টাকা দিয়ে টিকেট কাটতে হয়। বনের মধ্যে বেশ কয়েকটি ট্রেইল রয়েছে। যে কোনো একটি ট্রেইল ধরে ঘুরে আসতে পারবেন। এ বনে ২০০ এর বেশি প্রজাতির গাছ ও ৮০টির বেশি প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে অজগরও আছে। বর্তমানে খাদিমনগরে ক্যাম্পিং করার সুব্যবস্থাও আছে। খরচও নামে মাত্র, ৩০০ টাকা প্রতি তাঁবু, যেটা সেখান থেকেই ভাড়া নিতে পারবেন। এছাড়া ট্রি এডভেঞ্চার ও জিপ লাইনও রয়েছে, ‍দুটোরই খরচ ১০০ টাকা করে।

কীভাবে যাবেন:

শহর থেকে সিএনজি নিয়েই যেতে পারেন। অথবা শাহ পরান গেট থেকেও সিএনজি নিয়ে ঢুকতে পারেন বনে। সিএনজি ভাড়া ২০০ টাকার মতো।

মালনীছড়া ও লাক্কাতুরা চা বাগান:

চা বাগানের অভাব নেই সিলেটে-ছবি লেখক

সিলেট আসবেন আর চা বাগান দেখবেন না সেটা কীভাবে হয়? সিলেটের আশেপাশে প্রচুর চা বাগান রয়েছে। তবে সহজে ঘুরে আসার জন্য যেতে পারেন মালনীছড়া ও লাক্কাতুরা চা বাগান। উপমহাদেশের প্রাচীনতম চা বাগা এ মালনীছড়া চা বাগান। চা বাগানের চা গাছের মধ্যে মধ্যে রয়েছে বড় বড় গাছ, যা চা বাগানের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকগুণ। তবে চা বাগানের মধ্যে সাবধানে ছবি তুলবেন যাতে কোনো গাছ নষ্ট না হয় এবং জোঁকে না ধরে।

কীভাবে যাবেন:

আম্বরখানার পরে বিমানবন্দরের রাস্তায় পড়বে এ চাবাগানগুলো। সহজেই রিকশা/সিএনজি নিয়ে চলে যেতে পারেন।

ক্বীন ব্রীজ ও আলী আমজদের ঘড়ি:

সিলেটের ঐতিহ্য-ক্বীন ব্রীজ-ছবি জুয়েল রানা

সিলেট নগরীর কেন্দ্রে সুরমা নদীর উপর লৌহ নির্মিত ক্বীন ব্রীজ রয়েছে। ১৯৩৬ সালে উদ্বোধন হওয়া এ ব্রীজটি সিলেটের অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। আসামের তদানীন্তন গভর্নর মাইকেল ক্বীনের নামানুসারে এ ব্রীজের নামকরণ করা হয়েছে। নদীর পাড়টা চমৎকার করে বাধাই করা আছে, আর দেখার জন্য রয়েছে আলী আমজদের ঘড়ি। ১৮৭৪ সালে কুলাউড়ার পৃত্থিমপাশার জমিদার আলী আমজদ ঘড়িটি নির্মাণ করেন।

কীভাবে যাবেন:

সিলেটের যে কোন জায়গা থেকে সিএনজি বা রিকশাকে ক্বীন ব্রীজের কথা বললেই নামিয়ে দিবে।

যোগাযোগ:

ঢাকা থেকে সিলেটের ট্রেন, বাস ও বিমান যোগাযোগ বেশ ভালোভাবেই আছে। নন এসি বাসের মধ্যে ইউনিক, এনা, হানিফ, শ্যামলী অন্যতম। ভাড়া: ৪৭০ টাকা। আর এসি গাড়ীর মধ্যে রয়েছে এনা, গ্রীনলাইন, ভাড়া ১,২০০ টাকা।

ট্রেন:

বেশ কয়েকটি আন্তনগর ট্রেন সিলেট যায়। এগুলো হচ্ছে পারাবত, জয়ন্তীকা, উপবন ও কালনী এক্সপ্রেস। আগে টিকেট কাটতে পারলে যেতে পারেন ট্রেনেও। ভাড়া পড়বে শ্রেণী ভেদে ৩২০ টাকা থেকে শুরু করে ৬৯০ টাকা।

কোথায় থাকবেন:

শুকতারা রিসোর্ট-ছবি লেখক

সিলেটে থাকার জন্য অনেক অপশন রয়েছে। আপনার যদি বাজেটে সমস্যা না থাকে তবে থাকতে পারেন শুকতারা বা নাজিমগর রিসোর্টে। ভাড়া পড়বে প্রতি রাত ৬,০০০ টাকার বেশি। এছাড়া অসংখ্য হোটেল রয়েছে। কম বাজেটে থাকে হলে দরগা গেটে খোঁজ করবেন, সেখানে ৮০০-১,০০০ টাকায় ডাবল রুম পেয়ে যাবেন।

নাজিমগড় রিসোর্ট-ছবি লেখক

খাবার:

দুপুর বা রাতে খাবারের জন্য চমৎকার সব রেস্তোরাঁ আছে সিলেটে। খরচও সাধ্যের মধ্যে। সবচেয়ে বিখ্যাত রেস্তোরাঁর নাম পানসী। এছাড়া পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্টেও খেয়ে দেখতে পারেন।

বাজেট:

খুব কম খরচে ঘুরতে চাইলে ৪/৫ জনের দল হলে জনপ্রতি ৪,০০০ টাকার মধ্যেই ভালোভাবে সিলেটে ৩ রাত ২ দিন থেকে আসতে পারবেন। আর রিসোর্টে থাকলে, গাড়ি ব্যবহার করলে এ খরচ পৌঁছে যাবে ১০,০০০ টাকায়।

সতর্কতা:

বর্ষায় পর্যটনের অধিকাংশ গন্তব্যে পানি থাকবে। তাই সাঁতার না জানলে সংগে লাইফ জ্যাকেট নিয়ে যাবেন। এছাড়া বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য রেইনকোট/ছাতা ও মূল্যবান সামগ্রী রক্ষা করার জন্য ড্রাই ব্যাগ বা জিপলক ব্যাগ ব্যবহার করতে পারবেন। এ ধরনের সবকিছুই পাবেন ঢাকার পিক৬৯ শপে।
ফিচার  ইমেজ: বাবলি

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

একদিনে চন্দ্রনাথ পাহাড় ট্রেকের চন্দ্রকথন

বান্দরবানের স্বপ্নকথন: গন্তব্য বগালেক