সিলেট: জাফলংয়ের ঝর্ণা-পাহাড়, রাতারগুলের নিস্তব্ধতা আর বিছানাকান্দির মায়ার রাজ্য!

আমরা নয় বন্ধু ভোর সাড়ে চারটায় সিলেট পৌঁছে যখন বাসস্ট্যান্ডে নেমে গেলাম, তখন থেকেই শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কোনোমতে দুটো অটো পেয়ে গেলাম। অটোতে করে সোজা চলে এলাম পানসী রেস্তোরাঁয়। ভোর পাঁচটায় পানসী খোলা পেয়ে আমরা সবাই খুশি। পানসীর বিখ্যাত খিচুড়ি দিয়ে সবাই নাস্তা সেরে ফেললাম ঝটপট। এরপর ছাউনির নিচে চা হাতে আরাম করে দেখতে বসলাম আকাশ ভেঙে পড়তে থাকা বৃষ্টি। এমন অঝোর ধারার বৃষ্টি শেষ কবে দেখেছি মনে করতে পারছিলাম না। শুধুমাত্র এই বৃষ্টিটুকু দেখার জন্য হলেও সব সংশয় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নির্দ্বিধায় সিলেটে চলে আসা যায়! বৃষ্টিতে ভিজেই কিছুক্ষণের মাঝে পৌঁছে গেলাম সরকারি ডাকবাংলোয়। খানিকটা বিশ্রাম নিয়েই আবার বেরিয়ে পড়লাম। বৃষ্টি থামার কোনো নাম গন্ধ নেই দেখে মাথায় পেঁচিয়ে নিলাম পলিথিন! এবার গন্তব্য জাফলং।
সবাই মিলে জাফলংয়ের লোকাল বাসে উঠে পড়লাম। বাস কিছুক্ষণের মধ্যেই চলতে শুরু করলো। কিছুদূর সামনে এগোতেই চোখে পড়লো পাহাড়। পাহাড়গুলো খুব বেশী উঁচু নয়, যেমনটা দক্ষিণের পার্বত্য এলাকায় দেখা যায়। কিন্তু এই পাহাড়ের আবেদন পুরোপুরি অন্যরকম! পাহাড়গুলোর একদম নিচুতেই মেঘ জমে গিয়েছে। গাছপালাগুলো গাঢ় সবুজ। কালো রঙের বড় বড় পাথর লেগে আছে পাহাড়ের গায়ে, আর আছে ঝর্ণা! হ্যাঁ, একসাথে অনেকগুলো ঝর্ণা দেখা যায় পাহাড়ের ওপরে, নিচে, আশেপাশে। এই ঝর্ণাই সিলেটের পাহাড়কে দিয়েছে এমন প্রশান্তি মাখানো জীবন্ত রূপ!

জাফলং জিরো পয়েন্ট , ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

বাস থেকে নেমে ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে চলে এলাম জাফলং জিরো পয়েন্টে। নদীর কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানিতে হাঁটু ডুবিয়ে যখন পাহাড়গুলো দেখবেন, তখন অসাধারণ এক অব্যক্ত অনুভূতি চারদিক থেকে আপনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে, যেটার কোনো তুলনাই হয় না। শব্দের পর শব্দ বসিয়ে সেই অনুভূতি প্রকাশ করা একদমই সম্ভব নয়! যেটুকু সময় সেখানে ছিলাম, বারবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। আনন্দে কাঁদার মাঝেও আনন্দ আছে!
সংগ্রামপুঞ্জী ঝর্ণায় আমরা! ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

জিরো পয়েন্ট থেকে কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণার। জাফলং গিয়ে কোনোভাবেই এই ঝর্ণাটা না দেখে ফিরে আসবেন না, এটা অনুরোধ!
জাফলং থেকে এবার আমরা চললাম লালাখালের দিকে। নৌকা নিয়ে লালাখালের ভেতরের দিকে যেতে থাকলে ঘোলাটে পানির রঙ বদলে গিয়ে নীল হতে শুরু করে। জাফলং থেকে ফিরতে খানিকটা দেরি হওয়ায় নৌকা নিয়ে লালাখালের ভেতরে যাওয়া হলো না আমাদের, ঘাট থেকে খালটা দেখেই খুশি থাকতে হলো। জাফলং আর লালাখাল একই পথে পড়ে। তাই চেষ্টা করবেন বেলা ১২টার মধ্যে জাফলং ঘুরে লালাখালের দিকে রওনা দিতে।
লালাখালের ঘাট, ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

লালাখাল থেকে ফিরে এলাম সিলেট শহরে। পাঁচ ভাই রেস্তোরাঁর ভাত, ভর্তা, ভাজি দিয়ে রাতের খাবার সেরে কিন ব্রিজের নিচে আড্ডা জমলো বেশ। আমরা এসেছি আগস্ট মাসের একেবারে শেষদিকে। প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে এখানে, রাতেও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি নামছে। সেইসাথে মুহূর্তগুলো একটু বেশিই উপভোগ্য হয়ে উঠছে।
পরদিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম রাতারগুল আর বিছানাকান্দির উদ্দেশ্যে। আম্বরখানা থেকে সিএনজি ঠিক করে প্রথমে চলে গেলাম মোটরঘাট। সেখান থেকে নৌকা নিয়ে ঢুকে পড়লাম দেশের একমাত্র স্বাদু পানির সোয়াম্প ফরেস্টের ভেতরে। নৌকা খানিকটা গভীরে প্রবেশ করতেই রাতারগুলের বিশেষত্ব টের পেলাম। জলের ভেতরে বনের মাহাত্ম্যকে ছাপিয়ে যাওয়া সেই বিশেষত্বটি হচ্ছে এর বিস্ময়কর নৈঃশব্দ! একটা সময় মনে হচ্ছিল পাশে বসে থাকা বন্ধুর হৃৎস্পন্দনও হয়তো শুনে ফেলবো! রাতারগুলের ওয়াচ টাওয়ার থেকেও পুরো জায়গাটার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
রাতারগুল ওয়াচ টাওয়ার, ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

রাতারগুলের পর সিএনজিতে উঠে এগিয়ে যেতে থাকলাম বিছানাকান্দির ভয়ংকর ভাঙাচোরা পথ ধরে। হাদারপাড়া ঘাটে পৌঁছে এবার নৌকা নিয়ে এগোনো শুরু হলো। দেড় ঘণ্টার এই নৌকাযাত্রাটা ভালোই লাগবে আপনার। নদীর দুই ধারের প্রকৃতি আর গ্রামীণ জীবনের রূপ দেখে মুগ্ধ হবেন, নিঃসন্দেহে!
সন্ধ্যার বিছানাকান্দি, ছবিঃ সিজান আহমেদ

বিছানাকান্দি পানি, পাথর আর পাহাড় মিলিয়ে অপূর্ব একটা জায়গা। মেঘালয়ের অনেকগুলো পাহাড়ের মিলনস্থল হচ্ছে এই বিছানাকান্দি। বড় বড় পাথরের ফাঁকে গা এলিয়ে শুয়ে পড়বেন, পানির শীতল ধারা আপনাকে সেখানেই আটকে রাখতে চাইবে!
বিছানাকান্দি, ছবিঃ লেখক

নিয়মিত বর্ডার হাট বসে এখানে। ভারতীয় চকলেট, বডি স্প্রে, সাবান, লোশন, বিস্কুট থেকে শুরু করে অনেককিছুই এখান থেকে কিনতে পারবেন সাশ্রয়ী মূল্যে।
পানি, পাথর আর পাহাড়, ছবিঃ সিজান আহমেদ

বিছানাকান্দি থেকে সিলেট শহরে ফিরতে ফিরতে রাত ৯টা বেজে গেল। পানসীতে খেয়ে পরদিন শহর ঘোরার পরিকল্পনা করে ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই।
সিলেট শহরটাও যথেষ্ট সুন্দর। পরিচ্ছন্ন, নিরিবিলি, সাজানো গোছানো। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল(রাঃ) এর মাজার, লাক্কাতুরা চা বাগান ঘুরে বেশ ভালো লেগেছে। লাক্কাতুরার ভেতরে উঁচু একটা টিলা আছে। এটায় উঠলে পুরো সিলেট শহরের একটা সুন্দর ভিউ পাবেন। চা বাগানে ঢোকার সময় সেখানকার কর্মচারীদের কাউকে গাইড হিসেবে নিতে পারেন, বাগানের গেটের কাছেই তারা থাকেন। পুরো বাগান খুব কম খরচে গাইডই আপনাকে ঘুরে দেখাবে। চা বাগান থেকে তাজা চা পাতা কিনে নিতে পারেন।
পানসী রেস্তোরাঁর পাশেই আছে হাছন রাজাকে নিয়ে একটি ছোটখাটো জাদুঘর। এই জাদুঘর দেখা যেন কোনোভাবেই বাদ পড়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। ইতিহাসকে জানার পাশাপাশি আপনাকে খানিকটা বিনোদনও যোগাবে এই জাদুঘর!

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে করে সিলেট। জাফলং যাওয়ার জন্য পাবেন বাস এবং সিএনজি। মাইক্রোবাস বা প্রাইভেট গাড়িও ভাড়া করতে পারবেন। রাতারগুল আর বিছানাকান্দি যাওয়ার জন্য আম্বরখানা থেকে সিএনজি ঠিক করে সকাল সকাল রওনা দেবেন। রাতারগুলের প্রত্যেক নৌকার ভাড়া ৫০০ টাকা। বিছানাকান্দির নৌকা ১,৫০০-২,০০০ টাকায় পেয়ে যাবেন, ৮-৯ জন একসাথে উঠতে পারবেন।

খুঁটিনাটি:

সিএনজি ঠিক হয়ে গেলেও আরও দুই একটা সিএনজির ফোন নাম্বার সাথে রাখবেন। মাঝ রাস্তায় এসে আপনার সিএনজি বিকল হয়ে যেতে পারে, যেটা প্রায়ই হয়ে থাকে।
আমাদের দুই রাত তিন দিনের খরচ পড়েছিল ৩,৬০০ টাকা।
ফিচার ইমেজ- ওয়াহিদা জামান 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মেক্সিকোর ক্যাবো সান লুকাসের যে ৭টি জায়গায় আপনার যাওয়া চাই

মারায়ন তংয়ের চূড়ায় ক্যাম্পিং এবং গ্যালাক্সি দর্শন