সিলেট ভ্রমণের ইতিবৃত্তান্ত: রাতারগুলের জলজঙ্গলের কাব্য

বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম বর্ষের প্রথম ট্যুর সিলেট ট্যুর। এই ট্যুরের কথা মনে পড়লেই অন্যরকম এক আবেগ কাজ করে। আগের দুটো লেখায় সিলেটে কাটানো দুই দিনের বর্ণনা লিখেছি, মাধবকুণ্ড আর হামহামের গল্প ছিল আগের লেখাগুলোতে। সিলেট বিভাগে প্রথম দুদিন কাটিয়ে আমরা এখন ৩য় দিনে পদার্পণ করেছি। গত তিন দিন দুই রাত ধরে থাকছি বন্ধু হাসিবের চাচাতো ভাইয়ের বাসায়। অন্যরকম আদর-আপ্যায়ন চলছে আমাদের, থাকা-খাওয়া-ঘোরার কোনো চিন্তা নেই। সাথে আছে চাচাতো ভাইয়ের দেয়া চান্দের গাড়ি, চান্দের গাড়ির ড্রাইভার আর আমাদের সবার প্রিয় সামাদ ভাই যিনি নিজে দায়িত্ব নিয়ে পুরো সিলেট ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন আমাদের।

গন্তব্য রাতারগুল, ছবিঃ সৌনক চাকমা

৩য় দিন সকালে একটু তাড়াতাড়িই উঠে গেলাম ঘুম থেকে। আজকের পরিকল্পনা রাতারগুল যাওয়ার। রাতারগুল থেকে ফিরেই ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিবো। সকালে তাড়াতাড়ি বের হলেও রাস্তায় সামাদ ভাইয়ের কাজ পড়ে যাওয়ায় একটু দেরী করেই রওনা দিলাম রাতারগুলের উদ্দেশ্যে। আমাদের যেহেতু পিক-আপ ছিল তাই কোন দিক দিয়ে কোথায় যাচ্ছি এত কিছুর হিসেব ছিল না, ড্রাইভারই নিয়ে যাচ্ছিল। তবে রাতারগুল যাওয়ার অনেক রাস্তা আছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সহজ পথটি হলো ওসমানী বিমান বন্দরের পেছনের সড়ক ধরে সোজা রামনগর চৌমুহনী পর্যন্ত রাস্তাটি।
জলজঙ্গলের রাতারগুল, ছবিঃ রাশিক রহমান

রাতারগুল যাওয়ার জন্য প্রথমে আসতে হবে সিলেট শহরে, আম্বরখানা বা শাহজালাল মাজার থেকে মালনীছড়ার পথে লোকাল অটো রিকশা পাওয়া যায় সাহেববাজার বা চৌমুহনী পর্যন্ত। ভাড়া ৩৫ থেকে ৪৫ টাকার মতো। যদি রিজার্ভ নিয়ে যাওয়া হয় তবে ভাড়া লাগবে আড়াইশো থেকে তিনশো টাকার মতো। রামনগর চৌমুহনীতে নেমে সেখান থেকে হাতের বাঁয়ে এক কিলোমিটার হেঁটে গেলেই দেখা মিলবে রাতারগুলের। যারা রাতারগুল সম্পর্কে জানেন না তাদের জেনে রাখা দরকার রাতারগুল বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট যেখানে ঘন জঙ্গলের সব গাছের গুড়ি নিমজ্জিত হয়ে আছে অগভীর পানিতে। এরকম জঙ্গলকেই সোয়াম্প ফরেস্ট নামে অভিহিত করা হয়।
টিমের একাংশ, ছবিঃ রাশিক রহমান

রাতারগুল পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমাদের দুপুর হলো। আমরা একদম চান্দের গাড়ি নিয়ে বামের পথ ধরে চলে গেলাম রাতারগুলে। সিলেট থেকে রাতারগুল যেতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগে। রাতারগুল হলো জলের সাম্রাজ্য, চারিদিকে শুধু থৈ থৈ জলের খেলা। জল-সৌন্দর্যকে বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে রাতারগুলের জলে অর্ধ নিমজ্জিত কাণ্ডঝরা সব বৃক্ষ। সোয়াম্প ফরেস্টটি সম্পূর্ণ ঘুরতে আমাদের থেকে প্রতি নৌকা হিসেবে ৬০০ টাকা নিয়েছিল। সাধারণত এই ভাড়া ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা হয়, তবে মূলত নির্ভর করে ঠিক কতটুকু অবধি যেতে চাচ্ছেন তার উপর। যাওয়ার পথে একটি ওয়াচ টাওয়ার পড়বে, যদি গন্তব্য হয় সেই ওয়াচ টাওয়ার তবে ভাড়া কমে যাবে, তবে আসল সৌন্দর্য সেই ওয়াচ টাওয়ার ছাড়িয়ে আরো দূরে বিস্তৃত।
ছবিঃ রাশিক রহমান

আমরা আটজনের গ্রুপ প্রতি নৌকায় চার জন করে ভাগ হয়ে গেলাম। বৈঠা টানা নৌকা, নেই কোনো ইঞ্জিনের বিকট শব্দ অথবা যান্ত্রিকতার কালো ধোঁয়া। নির্মলানন্দে নৌকা আস্তে আস্তে এগোতে লাগলো ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। আশেপাশের সৌন্দর্য ছিল চোখে পড়ার মতো, কী অপার্থিবতায় গাছগুলো অর্ধেক জলে আর অর্ধেক স্থলে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে! জলজঙ্গলের সে চমৎকার দৃশ্য সিলেটে কেবল রাতারগুলেই পাওয়া যাবে। যতই দেখছিলাম ততই মুগ্ধ হচ্ছিলাম। বিকেলের সোনালি রোদের আভা গাছগুলোর ফাঁক-ফোঁকর খুঁজে নিয়েছে সন্তর্পণে। সোনালি সে আভার স্তম্ভ সরাসরি এসে পড়েছে রাতারগুলের পানিতে। কী যে মন্ত্রমুগ্ধ সে দৃশ্য, চাক্ষুষ না দেখলে বোঝা বড়ই কঠিন।
ছবিঃ রাশিক রহমান

ধীরে ধীরে বৈঠা টানছে মাঝি। বাঁক নিচ্ছে এদিক সেদিক, গাছেদের অলিগলি হয়ে। নৌকাভ্রমণ আমার বরাবরই পছন্দের, উপরি পাওনা হিসেবে এখানে পেলাম পানিতে নিমগ্ন বৃক্ষরাজি। রাতারগুলের সে ঘন পানির জঙ্গলে আকাশ দেখার কোনো মানা নেই, মাথার উপর প্রকাণ্ড নীল আকাশ আর অসংখ্য মেঘের ভেলা দেখতে পাওয়া যাবে উপরে তাকালেই। তবে রাতারগুলের পানিতে বিষধর সাপের আস্তানা প্রচুর, তাই পানিতে নামার ইচ্ছেটা জলাঞ্জলি দিতেই হবে। ২০ মিনিটের মধ্যে আমরা রাতারগুলের ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছে গেলাম।
স্থানীয়দের রাতারগুল, ছবিঃ সৌনক চাকমা

ওয়াচ টাওয়ার হলো এমন এক স্থাপনা যা সাধারণত পুরো এলাকাকে এক জায়গায় বসে নিরীক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রায় ৬ তলা উঁচু এ ওয়াচ টাওয়ার থেকে পুরো রাতারগুলের বিস্তীর্ণ প্রান্তর মন ভরে উপভোগ করা যায়। উপর থেকে নিচে তাকালে কয়েকটি নৌকা, বিশাল সবুজ বন আর রাতারগুলের জলরাশি চোখে পড়বে যা থেকে চোখ সরানো এক কথায় অসম্ভব। ভ্রমণপিপাসু মানুষেরা প্রকৃতির ছোট ছোট দিকেই বিমোহিত হয়ে অপলক হয়ে চেয়ে থাকে আর এখানে তো বিস্ময়ের পুরো রাজ্য বানানো। আমরা সিঁড়ি বেয়ে একদম উপরে উঠে গেলাম, আহা কী শান্তির বাতাস। উচ্চতার এই একটা জিনিস আমার সবসময় ভালো লাগে, একটু উঁচুতে উঠে গেলেই বাতাসের কোনো কমতি নেই। পুরো রাতারগুলকে চোখের সাহায্যে মস্তিষ্কে ধারণ করতে লাগলাম ইচ্ছেমতো।
ওয়াচ টাওয়ার থেকে তোলা, ছবিঃ সৌনক চাকমা

ওয়াচ টাওয়ারে বেশ কিছুক্ষণ ছিলাম আমরা, ভালো লাগলো উঁচু থেকে পুরো এলাকাটি দেখে। সত্যি বলতে এই প্রথম ওয়াচ টাওয়ার দেখছিলাম আমরা, এমন কিছু হতে পারে তার ধারণাই ছিল না। তাই ভালো লাগার পরিমাণ আরো বেশি ছিল। ওয়াচ টাওয়ার থেকে একটু পায়ে হেঁটে উঠে গেলাম আবার নৌকায়। নৌকা আরো ভেতরে যাবে আমাদের। সব মিলিয়ে এই নৌকা ভ্রমণটা অসাধারণ লাগছিল। হ্যাণ্ডিক্যামটা চালু করে সবার মেকি সাক্ষাৎকারে সময় কেটে যাচ্ছিল। তখনকার দিনগুলো এক একটা সোনায় মোড়ানো দিন ছিল। তারুণ্য আর প্রকৃতি দেখার, দুনিয়া ঘোরার এক অমোঘ নেশা ছিল চোখে মুখে। বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে যখন পৃথিবীর অসীম সৌন্দর্যের দিকে তাকালাম তখনই বুঝলাম জীবনের আসল মানে কী। আজকে সিলেট বিভাগে আমাদের ট্যুরের শেষ দিন। তাই সময় কেটে যাচ্ছিল ঝড়ের বেগে।
বিস্তৃর্ণ সবুজ বনপ্রান্তর, ছবিঃ রাশিক রহমান

রাতারগুল থেকে ফেরার পথে অসাধারণ এক গোধূলীর সাক্ষী হলাম, সেই রক্তিম লালীমায় কোনো খাদ ছিল না সেদিন। সন্ধ্যার একটু আগে আগে আমরা যেখান থেকে নৌকায় উঠেছিলাম সেখানে পৌঁছে গেলাম। মাঝিদের টাকা-পয়সা বুঝিয়ে দিয়ে উঠে গেলাম চান্দের গাড়িতে। গাড়ি চলছে বাতাসের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে শ্রীমঙ্গলের দিকে। অবশেষে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ট্যুর শেষের পথে, তবুও দুঃখ নেই কোনো। কারণ গত তিনটা দিন যে কী পরিমাণ ভালো গেছে তা কেবল আমরাই জানি।
শ্রীমঙ্গলে পৌঁছে গেলাম রাত আটটার দিকে, ঢুকে গেলাম বাসায়। বাসার সবার সাথে ডাইনিং টেবিলে আমরা সবাই বসে গেলাম বিশাল এক আড্ডায়। হাসিবের চাচাতো ভাইয়ের আতিথেয়তা দেখে সত্যিই মুগ্ধ এবং একই সাথে কৃতজ্ঞ ছিলাম আমরা। পরদিন সকালে বাসার সামনে থেকে উঠে গেলাম ঢাকার বাসে। বাস ছুটে চলছিল আপন বেগে, পেছনে ফেলে যাচ্ছিল আমাদের অসংখ্য স্মৃতি আর ভালো লাগার সব মুহূর্ত। স্বপ্নময় সিলেট ট্যুরের সমাপ্তি এখানেই।
ফিচার ইমেজ- রাশিক রহমান

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রহস্যময় দ্বীপ মাদাগাস্কারের অজানা তথ্য

যে ১২টি জায়গায় প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের সাথে প্রকৃতি মেতে ওঠে