সিলেট ভ্রমণের ইতিবৃত্তান্ত: অপরূপা হামহামের জলকাব্য

হামহাম জলপ্রপাত, ছবিঃ লেখক

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ট্যুর সিলেট ট্যুরের প্রথম দিন কেটে গেল মাধবকুণ্ডের অপার্থিবতা উপভোগ করতে করতে। মাধবকুণ্ড থেকে সন্ধ্যায় চলে এলাম শ্রীমঙ্গল শহরে। আমাদের সাথে আছে ট্যুরমেট হাসিবের চাচাতো ভাইয়ের দেয়া চান্দের গাড়িজাতীয় পিক-আপ আর তার ড্রাইভার।

পরদিন খুব ভোরে চলে আসবে বলে বাজারে নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন তিনি। আমরা চাচাতো ভাই এর বাসার জন্য কিছু খাবার-দাবার কিনে নিয়ে ঢুকে গেলাম বাসায়। রাতে ড্রাইভার ফোন করে ভাইকে জানালো আগামীকাল হামহামের উদ্দেশ্যে রওনা হবো আমরা। যারা সিলেট ভ্রমণ সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখে তারাও হামহামের নাম শুনেছে।

খুবই সুন্দর এক ঝর্ণার নাম হামহাম। রাতে বাসায় খাওয়া-দাওয়া করে সবাই একটু আড্ডা দিয়ে রাত একটার দিকে ঘুমোতে চলে গেলাম। ভ্রমণের প্রথম দিন হিসেবে বেশ ভালোই কাটলো আমাদের।

চান্দের গাড়ি এবং আমরা, ছবিঃ ওয়াহিদুজ্জামান

পরদিন সকাল সকাল ড্রাইভার বাসায় এসে হাজির। এদিকে হাসিবের আব্বু-আম্মু মানে আমাদের আংকেল আন্টিও ভাইয়ের বাসায় এসেছেন গতরাতে। বেশ উৎসবমুখর একটা পরিবেশে সকালে নাস্তা সেরে উঠে পড়লাম গাড়িতে। আমাদের এই প্রথম ট্যুরে তেমন কোনো টাকাই খরচ হয়নি, শুধু গাড়ির তেল খরচটা আমরা দিয়ে দিয়েছি।

তবে ঢাকা থেকে হামহাম যেতে হলে প্রথম শ্রীমঙ্গল বা সিলেট আসতে হবে। হামহামে চান্দের গাড়ি ছাড়া কোনো গাড়ি যায় না, ভাড়া ২,৫০০ টাকার মতো। আজ থেকে তিন বছর আগে আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন রাস্তার অবস্থা ভালোই ছিল, এখন নাকি রাস্তার অবস্থা তেমন ভালো না।

হামহামে ট্রেকিং শুরু পথে, ছবিঃ রাশিক রহমান

শ্রীমঙ্গল থেকে হামহাম যাওয়ার রাস্তাটিও বেশ সুন্দর, রাস্তার দুইপাশ উঁচু উঁচু লতাপাতার গাছে ঘেরা। আমরা চান্দের গাড়ির উপরের ছাউনিতে দেয়া কাপড়খানা খুলে দাঁড়িয়ে গেলাম। এদিকে গাড়ি ব্রেক করলে সবাই সামনে গিয়ে পড়ছিলাম, এতে করে ছাউনির খুঁটির সব নাট-বল্টু আলগা হয়ে যাচ্ছিল।

ড্রাইভার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললেন যাতে ছাউনির কাপড় না খুলি, কিন্তু কে শোনে কার কথা। পরে অবশ্য ধীর-স্থির হয়ে ভেতরেই বসে ছিলাম হামহাম যাওয়ার আগ পর্যন্ত।

বিশালতা আর সবুজতা, ছবিঃ নাহিদুল ইসলাম

হামহামে যেতে গাইড প্রয়োজন, গাইডকে দিতে হয় ৩৫০ টাকা। তবে হাসিবের খুব কাছের একজন ভাই নিয়মিত হামহাম যাওয়া-আসা করে, উনি নিজেই একজন গাইড আবার হাসিবের আত্মীয়জাতীয় কিছু। ভাইয়ের নাম সামাদ।

আমরা সামাদ ভাইকে পাই সকালেই, বাসায় চলে এসেছিলেন হাসিবের অনুরোধে। বেশ মজার মানুষ সামাদ ভাই, সাথে সিলেটি ভাষায় এমন এমন সব কথা বলছিলেন যে না হেসে পারা যায় না। ঠিক চা-বাগানের আগে সামাদ ভাই বললেন গাড়ি থামাতে, নেমে গেলাম আমরা সবাই। একটা পাড়া দিয়ে হেঁটে চলে আসলাম, স্থানীয়দের থেকে ৫ টাকা দিয়ে খুঁটি কিনে নিলাম। শুরু হলো আমাদের হামহাম যাত্রা।

তখন নাম-ধাম টুকে হামহাম যেতে হতো না, এখন ৫০ টাকা দিয়ে নাম, পরিচয় লিখিয়ে তারপর যেতে হয় হামহামে। আমাদের প্রথম ট্রেকিং এই হামহাম ট্রেক। তাই জানতাম না কী করতে হবে আর কী করা যাবে না। সবচেয়ে বড় ভুলটা আমিই করলাম, নিজের ব্যাগ নিয়ে আসিনি। বন্ধু আসিফ বিন জামানের ব্যাগে নিজের কাপড়-চোপড় রেখে ১৫ মিনিট করে পালাবদল করছিলাম একটি ব্যাগ।

ব্যাগে ৩টা প্যান্ট, শার্ট, টিশার্ট আর পানির বোতল ছাড়া কিছুই ছিল না। তবুও এত ভারী মনে হচ্ছিলো যে নিজের কাঁধে যখন ব্যাগটা আসছিল শুধু সময় গুনছিলাম কখন ১৫ মিনিট যাবে। আবার বন্ধুর কাঁধে ব্যাগ যাওয়ার ১৫ মিনিট এত দ্রুত যাচ্ছিল যে ভয়ানকভাবে হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম।

হেঁটে চলা হামহামের পথে, ছবিঃ রাশিক রহমান

হামহামের রাস্তা সর্বসাকুল্যে ৬ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগে সর্বনিম্ন দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। একদম সমতল নয় আবার একদম খাড়া পথ নয় এমন রাস্তা হামহামের। তবে যারা ট্রেকিং করা মাত্র শুরু করছেন বা করার কথা ভাবছেন তাদের জন্য সর্বোত্তম গন্তব্যস্থান হলো এই হামহাম ট্রেক।

কখনো কাঠের সাঁকো পেরিয়ে, কখনো দুইপাশে আমাদের উচ্চতা থেকে উঁচু লতাপাতার গাছ পেরিয়ে কখনোবা গাছের গুড়িসংলগ্ন মাটিকে সিঁড়ি বানিয়ে হেঁটে চলছিলাম আমরা। আমি আর আসিফ শেষে ব্যাগটা টানতে পারিনি, রেখে গেছিলাম এক ঝোপের আড়ালে। সাময়িক আরাম পেলেও এটা কত বড় ভুল ছিল সেটা আমরা ফেরার পথে বুঝেছি।

মাথার উপর মস্ত জঙ্গল, ছবিঃ রাশিক রহমান

আমরা যখন হামহাম যাই তখন হামহামের আশেপাশে কোনো দোকান জাতীয় কিছু ছিল না, এখন একটা দোকান হয়েছে শুনেছি। তাই যাবার আগেই বিরিয়ানির প্যাকেট কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। হাতে বিরিয়ানির প্যাকেট, গলার তোয়ালে পেঁচিয়ে আমরা ঝিরিপথের ঠিক আগে এসে থামলাম। যদি গ্রীষ্মকালে হামহাম যাওয়া হয় তবে পাহাড় বা ঝিরিপথের যেকোনো একটা দিয়েই হামহাম চলে আসা যাবে, কিন্তু বর্ষাকালে ঝিরিপথ দিয়ে ভুলেও হামহামে যাওয়া উচিত না।

এর কারণ হলো ঝিরিপথে বর্ষাকালে প্রচুর জোঁক থাকে আর পিচ্ছিল থাকে মারাত্মকভাবে। ঝিরিপথের ঠিক আগে একদম নিচ পর্যন্ত মাটি কেটে সিঁড়ি তৈরী করা আছে। আমরা বর্ষার শুরুতে গিয়েছি বলে কাদায় ভরপুর ছিল সিঁড়িগুলো। তবে সিঁড়ির সাথে বাঁশের অবলম্বন দেয়া ছিল বলে সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছি, শুধু পায়ের কনিষ্ঠ আঙ্গুলখানি একটু কেটে গিয়েছিল বাঁশের ফালিতে লেগে।

ঝিরিপথ দিয়ে হেঁটে চলা, ছবিঃ রাশিক রহমান

ঝিরিপথে নেমেই বুঝতে পারলাম হামহাম আর খুব বেশি দূরে নয়। আমরা হাঁটতে লাগলাম সাবধানে, যেহেতু জোঁকের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নিয়ে আসিনি। জোঁক থেকে রক্ষা পেতে হাতের কাছে লবণ, নারিকেল তেল আর এক প্রকার মলম পাওয়া যায় ঢাকায় সেটা রাখা উচিত। ঝিরিপথের মাঝখানে মাঝখানে কোনো মাটি বা পাথর ছিল না, তাই কিছু সময়ের জন্য ঝিরিপথ থেকে উপরে পাহাড়ে উঠে যেতে হয়েছে।

তবে ভয়ের কোনো কারণ নেই, ঘাস কেটে রাস্তা করা আছে। আমাদের প্রথম ট্রেক হিসেবে জুতসই কোনো জুতোও নিয়ে যাইনি, স্যাণ্ডেল পায়ে চলে গিয়েছিলাম হামহামে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে কাদার প্রাচুর্যতায়। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে হামহাম যাওয়ার এই ঝিরিপথের রাস্তাটি এক কথায় অসাধারণ।

অবশেষে হামহাম দর্শন, ছবিঃ রাশিক রহমান

আমাদের সম্ভবত তিন ঘণ্টা সময় লাগলো হামহাম যেতে। হামহামের প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ে গেলাম ঝর্ণার। যদিও ঝর্ণায় পানি কম ছিল কারণ বর্ষাকাল তখনো শুরু হয়নি, তবুও এতটুকু খারাপ লাগেনি হামহাম। ঝর্ণা দেখামাত্র হাতের লাঠি আর বিরিয়ানির প্যাকেট ফেলে দৌড় লাগালাম ঝর্ণার দিকে, আহা কী যে শান্তি সেই ঝর্ণার ঠাণ্ডা পানিতে! বর্ষাকালে এই ঝর্ণা প্রকাণ্ড রুপ ধারণ করে, তাই বর্ষাকালই হচ্ছে এখানে আসার মোক্ষম সময়।

তবে আসার আগে বান্দরবান থেকে প্যাগাসাস নামক ১৫০ টাকার একটা বেল্টের জুতা পাওয়া যায় সেটা কিনে নেবেন। যেহেতু ঝিরিপথে পানি দিয়ে হাঁটা লাগবে তাই আমার মনে হয়েছে এর চেয়ে ভালো কোনো জুতো হতে পারে না। হামহামে অনেকক্ষণ ধরে গা ভিজালাম, একদম মনের আশা মিটিয়ে। গা ভেজানো শেষে সঙ্গে করে আনা বিরিয়ানি খেয়ে জিরিয়ে নিলাম কিছুক্ষণ।

অপরুপা হামহাম, ছবিঃ রাশিক রহমান

হামহাম থেকে ফেরার পথ ধরি বিকেলের দিকে। যাওয়ার সময় যে উঁচু সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়েছিলাম অনায়াসেই, ফেরার পথে তা বিভীষিকা হয়ে দাঁড়ালো। কষ্ট করে সেটাও উঠে গেলাম। আসার পথে খুঁজছিলাম ঠিক কোথায় ব্যাগ রেখে গেছি, একসময় ব্যাগ রাখার জায়গাটি পেয়েও যাই।

কিন্তু কে জানতো এই ব্যাগ নিয়ে ফেরত যেতে পারবো না আমরা, ঝোপের আড়ালে খুঁজে দেখি ব্যাগ নেই। আমার কয়েকটা জামাকাপড় আর আসিফের জামাকাপড়, আইডি কার্ড, পেনড্রাইভ বাদে আর কিছু ছিল না।

ফেরার পথে, ছবিঃ ওয়াহিদুজ্জামান

পাত্তা দিলাম না বিষয়টাকে, এমন হতেই পারে এই ভেবে ফিরে গেলাম শ্রীমঙ্গলে ঠিক যেভাবে এসেছি সেভাবে। হামহাম থেকে ফিরে আসতে তেমন সময় লাগলো না, দুই ঘণ্টায় চলে আসলাম সমতল পাড়াটিতে। ড্রাউভার আগেই তৈরী ছিলেন, উঠে গেলাম গাড়িতে।

গাড়িতে বসেই পরিকল্পনা করে নিলাম আগামীকাল রাতারগুলে যাচ্ছি। রাতারগুলের গল্প করতে করতে একসময় শ্রীমঙ্গল পৌঁছে গেলাম ভাইয়ের বাসায়। এভাবেই কেটে গেল সিলেট ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনটিও। তবে ভ্রমণ এখনো আরো এক দিন বাকি, রাতারগুলের গল্প নিয়ে আসছি অতি শীঘ্রই।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্ট এন্ড ট্যুর: শ্রীমঙ্গলের কেন্দ্রবিন্দুতে অসাধারণ এক রিসোর্টের গল্প

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের সমাধিক্ষেত্র চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি